সূর্য ডোবার পর এই অঞ্চলের আকাশটা কেমন যেন তামাটে রঙ ধারণ করে। গ্রীষ্মের গুমোট গরমে বাতাস ভারী হয়ে থাকে, কোথাও পাতার একটু নড়াচড়া নেই। চারপাশের নিস্তব্ধতা এতটাই প্রগাঢ় যে, নিজের হৃৎপিণ্ডের স্পন্দনও নিজের কানে এসে ধাক্কা খায়। জনবসতি থেকে বহুদূরে, পদ্মার একটা মরা খালের পাড়ে জীর্ণ কঙ্কালের মতো দাঁড়িয়ে আছে নীলকুঠিটা। গাছপালাগুলো সব শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে, কিন্তু তাদের ডালপালাগুলো অদ্ভুতভাবে বেঁকে চুরে অন্ধকারের দিকে হাত বাড়িয়ে আছে।
ম্যাজিস্ট্রেট আর্থার হ্যামিল্টন সাহেব ঘোড়া থেকে নামলেন। দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তি তার চোখে-মুখে, তার সুতি শার্টটি পিঠের সাথে লেপ্টে আছে ঘামে। কোম্পানির তরফ থেকে তাকে এই অঞ্চলের রাজস্ব আদায়ের তদারকি এবং পুরনো নথিপত্র ঘেঁটে সীমানা নির্ধারণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। থাকার জন্য বেছে নেওয়া হয়েছে এই পরিত্যক্ত কুঠিবাড়ি। স্থানীয় রায়তরা তাকে বারবার বারণ করেছিল। তারা বলেছিল, “হুজুর, ওখানে সাঁঝের পর বাতাসও থমকে যায়। ওখানে যাবেন না।”
হ্যামিল্টন সাহেব হেসেই উড়িয়ে দিয়েছিলেন। তিনি যুক্তিবাদী মানুষ, অক্সফোর্ডের ছাত্র। ভূত-প্রেত বা অলৌকিকতায় তার বিন্দুমাত্র বিশ্বাস নেই। তার মতে, ভারতীয়দের স্বভাবই হলো প্রতিটা পুরনো ইটের পেছনে একটা করে গল্প বানিয়ে নেওয়া।
কুঠির সদর দরজাটা প্রকাণ্ড, ভারী কাঠের তৈরি। ল্যাটারাইট পাথরের তৈরি দেয়ালগুলো শ্যাওলা আর লতাগুল্মে ঢাকা, তবে এই তীব্র গরমে সেগুলো শুকিয়ে তামাটে হয়ে গেছে। ভেতরে পা রাখতেই একটা ভ্যাপসা, পুরনো কাগজের গন্ধ নাসারন্ধ্রে প্রবেশ করল। ঘরের ভেতরের বাতাস বাইরের চেয়েও বেশি গরম এবং দমবন্ধ করা।
হ্যামিল্টনের বিশ্বস্ত খানসামা করিম বক্স লণ্ঠনটা জ্বেলে টেবিলের ওপর রাখল। লণ্ঠনের হলদে আলোয় ঘরের বিশালতা এবং শূন্যতা আরও প্রকট হয়ে উঠল। ধুলোর আস্তরণ জমে আছে মেহগনি কাঠের আসবাবপত্রে। হ্যামিল্টন একটা আরামকেদারায় বসলেন।
“করিম, জলদি এক গ্লাস জল নিয়ে এসো। গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে,” হ্যামিল্টন কপাল থেকে ঘাম মুছতে মুছতে বললেন।
করিম জল এনে দিয়ে হাতজোড় করে দাঁড়াল। তার চোখে স্পষ্ট ভয়ের ছাপ। “হুজুর, রাতটা কাচারি ঘরে কাটালে হতো না? এই মূল কুঠির হাওয়া কেমন যেন ভারী।”
“বাজে বকো না, করিম। লণ্ঠনটা এখানে রেখে তুমি নিচে তোমার ঘরে যাও। আমার অনেক নথিপত্র দেখতে হবে,” হ্যামিল্টন গম্ভীর গলায় বললেন।
করিম আর কথা বাড়ানোর সাহস পেল না। সে কুর্নিশ করে ধীর পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। তার জুতো খড়খড়ে মেঝেতে যে শব্দ তুলল, তা যেন অনেকক্ষণ ধরে ঘরের আনাচে-কানাচে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল।
রাত বাড়ে। জানলার বাইরে কোনো হাওয়া নেই, অথচ ঘরের ভেতরের মোমবাতির শিখাটা মাঝে মাঝে অদ্ভুতভাবে কেঁপে উঠছে। হ্যামিল্টন সাহেব মন দিলেন পুরনো নথিতে। এগুলো এই কুঠির আদি মালিক, জন ব্ল্যাকউড সাহেবের আমলের ডায়েরি ও হিসাবের খাতা। ব্ল্যাকউড ছিলেন অত্যন্ত নিষ্ঠুর প্রকৃতির মানুষ। এই অঞ্চলে তার অত্যাচারের কাহিনী এখনো মানুষের মুখে মুখে ঘোরে।
হঠাৎ হ্যামিল্টনের মনে হলো, ঘরের ভেতরের তাপমাত্রা যেন এক ধাক্কায় অনেকটা বেড়ে গেল। তার গায়ের চামড়া জ্বলে ওঠার মতো অনুভূতি হলো। তিনি শার্টের বোতাম কটা খুলে দিলেন। ঠিক তখনই শব্দটা হলো।
খড়… খড়… খড়…
খুব মৃদু, কিন্তু অত্যন্ত তীক্ষ্ণ একটা শব্দ। হ্যামিল্টন কান খাড়া করলেন। শব্দটা কোথা থেকে আসছে? মনে হচ্ছে ঠিক তার পেছনের দেয়ালটার ভেতর থেকে। যেন কেউ খুব শক্ত, ধারালো নখ দিয়ে চুনকামের দেয়ালটা আঁচড়াচ্ছে।
তিনি চেয়ার ঘুরিয়ে দেয়ালটার দিকে তাকালেন। লণ্ঠনের আলোয় দেয়ালটা স্বাভাবিকই চেনা যাচ্ছে। কোনো ইঁদুর বা কাঠবিড়ালি হতে পারে ভেবে তিনি আবার নথিতে মন দেওয়ার চেষ্টা করলেন।
কিন্তু শব্দটা থামল না। এবার সেটা আরও স্পষ্ট, আরও ছন্দময় হয়ে উঠল। খড়… খড়… খড়…। যেন কেউ দেয়ালে কিছু লেখার চেষ্টা করছে।
হ্যামিল্টন উঠে দাঁড়ালেন। লণ্ঠনটা হাতে নিয়ে দেয়ালের একদম কাছে গেলেন। দেয়ালের প্লাস্টার অনেক জায়গায় খসে পড়েছে। তিনি ভালো করে লক্ষ্য করলেন। অদ্ভুত ব্যাপার! একটা নির্দিষ্ট জায়গায় ধুলোবালিগুলো কাঁপছে। তিনি হাত বাড়িয়ে দেয়ালটা স্পর্শ করলেন।
তার পুরো শরীর শিউরে উঠল। এই তীব্র গ্রীষ্মের রাতেও দেয়ালের ওই নির্দিষ্ট অংশটা বরফের মতো ঠান্ডা! না, ঠান্ডা ভুল শব্দ, মনে হলো ওখান থেকে এক ধরনের অবশ করে দেওয়া তীব্র অনুভূতি তার আঙুলের ডগা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করছে।
হ্যামিল্টন লণ্ঠনটা আরও উঁচুতে তুললেন। আলোর কোণটা ঠিক হতেই তিনি স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। দেয়ালের গায়ে, চুনকামের ওপর সদ্য কাটা নখের আঁচড়ের দাগ। চারটে সমান্তরাল রেখা, যা ওপর থেকে নিচের দিকে নেমে গেছে। রেখাগুলোর গভীর থেকে চুন খসে পড়ছে, আর সেখান থেকে বেরোচ্ছে এক অদ্ভুত তামাটে রঙের তরল। গন্ধটা রক্তের মতো, কিন্তু অনেক পুরনো, বাসি রক্তের গন্ধ।
হ্যামিল্টন এক পা পিছিয়ে এলেন। তার যুক্তিবাদী মন এই ঘটনার কোনো ব্যাখ্যা খুঁজে পাচ্ছিল না। ঠিক তখনই তার কানে এলো একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস। সেটা কোনো বাতাসের শব্দ নয়, খুব স্পষ্ট একজন নারীর কণ্ঠের ক্লান্ত, যন্ত্রণাদায়ক দীর্ঘশ্বাস। আর সেই শব্দটা ঘরের ভেতর থেকে নয়, আসছে সরাসরি তার নিজের কানের ঠিক পেছন থেকে—যেন কেউ একদম ঘাড়ে মুখ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
তিনি ঝট করে পেছনে ফিরলেন। কেউ নেই। শূন্য ঘর, স্থির মোমবাতির আলো। কিন্তু টেবিলের ওপর রাখা জন ব্ল্যাকউডের ডায়েরির পাতাগুলো নিজে থেকেই উল্টে যেতে শুরু করেছে, যেন কোনো অদৃশ্য হাত দ্রুত পাতার পর পাতা উল্টে কোনো একটা নির্দিষ্ট পাতায় এসে থামল।
হ্যামিল্টন কাঁপা পায়ে টেবিলের দিকে এগিয়ে গেলেন। ডায়েরির খোলা পাতায় তাকাতেই তার চোখ স্থির হয়ে গেল। ১৮৮০ সালের জুন মাসের একটি পাতায় ব্ল্যাকউড সাহেবের হাতের লেখায় লেখা রয়েছে: “সে আজও দেয়ালের ওপাশ থেকে ডাকে। আমি জানি সে বের হতে পারবে না। কিন্তু তার নখের শব্দ আমার মগজ কুড়ে খাচ্ছে।”
হ্যামিল্টন ডায়েরি থেকে চোখ তুলে আবার দেয়ালের দিকে তাকালেন। এবার তার মনে হলো, দেয়ালের ভেতরের নখের আঁচড়ানোর শব্দটা আর লৌকিক কোনো প্রাণীর নয়। আর সবচেয়ে ভীতিজাগানিয়া বিষয় হলো, যে নখের দাগগুলো তিনি একটু আগে দেখেছিলেন, সেগুলো এখন আর ওপর থেকে নিচে নয়, বরং দেয়ালের ভেতর থেকে বাইরের দিকে ঠেলে বের হওয়ার চেষ্টা করছে—যেন কোনো জ্যান্ত মানুষ দেয়ালের ভেতরে বন্দি হয়ে ছটফট করছে।
কিন্তু তার চেয়েও বড় ধাক্কাটা অপেক্ষা করছিল হ্যামিল্টনের জন্য। লণ্ঠনের আলোয় নিজের ছায়ার দিকে তাকাতেই তার বুকটা ধড়াস করে উঠল। দেয়ালে তার যে ছায়াটা পড়েছে, তার মাথায় কোনো হ্যাট নেই, অথচ হ্যামিল্টন নিজের মাথায় হ্যাট পরে আছেন। আর সেই ছায়ার অবয়বটা হ্যামিল্টনের চেয়ে অনেক বেশি চওড়া এবং তার হাতে চাবুকের মতো কিছু একটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।
হ্যামিল্টন সাহেব স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। হাতের লণ্ঠনটা সামান্য কাঁপছে, আর সেই সাথে দেয়ালে দুলছে সেই অদ্ভুত অবয়বটি। তিনি নিজের হাতটা তুললেন, কিন্তু দেয়ালে প্রতিফলিত ছায়াটি নড়ল না। সেটি স্থির, উদ্ধত এবং এক হাত কোমরে রেখে দাঁড়িয়ে আছে—ঠিক যেভাবে কোনো চাবুকধারী নীলকর সাহেব তার প্রজাদের সামনে দাঁড়াত।
ঘরের ভেতরের ভ্যাপসা গরমটা যেন এক মুহূর্তে উধাও হয়ে গেল, অথচ কোথাও কোনো বাতাসের আভাস নেই। হ্যামিল্টন নিজের কপাল ছুঁয়ে দেখলেন, ঘামগুলো শুকিয়ে চটচটে হয়ে গেছে। তিনি চোখ বন্ধ করলেন এবং মনে মনে নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করলেন, “ক্লান্তি, এটা কেবলই দীর্ঘ ভ্রমণের ক্লান্তি। অতিরিক্ত পরিশ্রমে মস্তিস্ক বিভ্রান্তিকর বিভ্রম তৈরি করছে।”
কিন্তু চোখ খোলামাত্রই সেই যুক্তি খড়কুটোর মতো উড়ে গেল।
দেয়ালের নখের আঁচড়ানোর শব্দটা এবার একটু বদলে গেছে। তীব্র খড়খড়ে আওয়াজের জায়গায় এখন শোনা যাচ্ছে একটা ভারী কিছু টেনে নিয়ে যাওয়ার শব্দ। যেন দেয়ালের ওপাশে কেউ একটা নিথর দেহ মেঝে হিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে। হ্যামিল্টন টেবিলের ওপর থেকে জন ব্ল্যাকউডের ডায়েরিটা আবার টেনে নিলেন। পাতার পর পাতা উল্টে তিনি আরও পেছনের তারিখগুলো দেখতে চাইলেন, কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার, ডায়েরির পাতাগুলো কেমন যেন আঠার মতো লেগে গেছে। শুধু সেই নির্দিষ্ট পাতাটিই খোলা, যেখানে লেখা রয়েছে সেই অভিশপ্ত বাক্য।
“করিম!” হ্যামিল্টন চেঁচিয়ে উঠলেন। তার কণ্ঠস্বর বিশাল ঘরের দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে কেমন যেন বিকৃত শোনাল। কোনো উত্তর এলো না। নিচতলা থেকে করিমের সাড়াশব্দ পাওয়ার কথা, কিন্তু পুরো কুঠিবাড়িটা যেন এক আদিম, নিরেট স্তব্ধতায় ডুবে গেছে।
হ্যামিল্টন লণ্ঠনটা হাতে নিয়ে ঘরের দরজার দিকে এগোলেন। তিনি এই বন্ধ ঘর থেকে বের হতে চান। কিন্তু দরজার হাতলে হাত দিতেই তিনি ছিটকে পিছিয়ে এলেন। পিতলের হাতলটা এতটাই গরম যে তার হাতের তালু প্রায় পুড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। ঠিক তখনই তার নাসারন্ধ্রে এসে ধাক্কা দিল এক তীব্র সুবাস।
এটা কোনো চেনা ফুলের গন্ধ নয়। এটা ল্যাভেন্ডার এবং এক ধরণের দামী ফরাসি সুগন্ধির মিশ্রণ, যা সাধারণত ইউরোপীয় অভিজাত নারীরা ব্যবহার করেন। এই মরা খালের পাড়ে, ভাঙা কুঠির ভেতর এমন তীব্র বিলাসী সুগন্ধ কোথা থেকে আসতে পারে? গন্ধটা এতই ঘন যে হ্যামিল্টনের দম আটকে আসতে লাগল।
হঠাৎ ঘরের কোণে রাখা প্রকাণ্ড মেহগনি কাঠের আলমারিটার পাল্লা নিজে থেকেই সামান্য ফাঁক হয়ে গেল। ভেতর থেকে একটা খসখস শব্দ ভেসে এলো। হ্যামিল্টন সম্মোহিতের মতো সেদিকে পা বাড়ালেন। যুক্তিবাদী ম্যাজিস্ট্রেট এখন সম্পূর্ণ এক আদিম ভয়ের কবলে, কিন্তু তার ভেতরের কৌতূহল তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে অন্ধকারের দিকে।
লণ্ঠনের আলো আলমারির ভেতরের দিকে ফেলতেই হ্যামিল্টনের চোখ বড় বড় হয়ে গেল। আলমারির ভেতরে কোনো কাপড় নেই, শুধু ঝুলে আছে একটি জীর্ণ, মাকড়সার জালে জড়ানো সিল্কের গাউন। তামাটে রঙের সেই গাউনের বুকের কাছে বড় একটা কালচে দাগ—ঠিক যেন রক্তের শুকিয়ে যাওয়া ক্ষত। আর সেই গাউন থেকেই বেরোচ্ছে ল্যাভেন্ডারের সেই তীব্র ঘ্রাণ।
ঠিক তখনই আলমারির ভেতরের অন্ধকার থেকে একটা ফিসফিসানি ভেসে এলো। কোনো ভাষা নয়, শুধু একটা নাম—“আর্থার…”
হ্যামিল্টন চমকে উঠলেন। তার নাম এই জনহীন কুঠিতে কে জানবে? ব্ল্যাকউড সাহেবের ডায়েরিতে কি তার নাম ছিল? না, অসম্ভব। তিনি লণ্ঠনটা নামিয়ে রাখতে গিয়ে দেখলেন, টেবিলের ওপর রাখা লণ্ঠনের কাচটা নিজে থেকেই চড়চড় করে ফেটে গেল। ঘরটা মুহূর্তের মধ্যে ঘুটঘুটে অন্ধকারে ডুবে গেল, শুধু টেবিলের ওপরের মোমবাতিটার মরণোন্মুখ শিখা টুকু টিমটিম করে জ্বলছে।
সেই আবছা আলোয় হ্যামিল্টন দেয়ালে নিজের ছায়ার দিকে তাকালেন। এবার ছায়াটা আর স্থির নেই। ছায়ার হাতটা ধীরে ধীরে উঠছে, আর তার নিজের ডান হাতটাও নিজের অজান্তেই ওপরের দিকে উঠে যাচ্ছে। তিনি চাইলেন হাতটা নামিয়ে নিতে, কিন্তু তার পেশীগুলো যেন তার নিজের নিয়ন্ত্রণে নেই। তার শরীর সম্পূর্ণ অবশ, যেন কোনো অদৃশ্য সুতোয় তাকে পুতুলের মতো নাচানো হচ্ছে।
দেয়ালের সেই ছায়াটি এবার ধীরে ধীরে হ্যামিল্টনের দিকে ঘুরে দাঁড়াল। ছায়ার মুখাবয়ব স্পষ্ট নয়, কিন্তু চোখের জায়গায় দুটো জলজ্বলে শূন্যতা। হ্যামিল্টন অনুভব করলেন, তার নিজের গলার ভেতরটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে, তিনি চিৎকার করতে পারছেন না।
ঠিক এই সময়েই জানলার বাইরে একটা তীব্র আলোর ঝলকানি দেখা গেল। কোনো মেঘ নেই, বিদ্যুৎ চমকানোর কথা নয়, অথচ পুরো আকাশটা এক সেকেন্ডের জন্য রক্তাক্ত লাল হয়ে উঠল। আর সেই আলোয় হ্যামিল্টন দেখতে পেলেন, ঘরের মেঝের ওপর অসংখ্য নখের আঁচড়ের দাগ তৈরি হচ্ছে, যা টেবিল থেকে শুরু করে সোজা চলে গেছে সেই বন্ধ দেয়ালটার দিকে।
হ্যামিল্টন নিজের পকেট থেকে একটি দেশলাই বের করার আপ্রাণ চেষ্টা করলেন। অনেক কষ্টে অবশ হাতটা পকেটে ঢুকিয়ে একটা কাঠি জ্বালালেন তিনি। ছোট আগুনের শিখাটা জ্বলে উঠতেই ঘরের ভেতরের দৃশ্যটা বদলে গেল।
তিনি দেখলেন, তিনি আর আধুনিক জুতোর ওপর দাঁড়িয়ে নেই। তার পায়ে এখন কারুকার্য করা চামড়ার ভারী বুট জুতো, যা সাধারণত উনিশ শতকের নীলকরেরা পরত। আর টেবিলের ওপর রাখা নথিপত্রগুলো সব বদলে গেছে। সেখানে এখন রাখা আছে ১৮৮০ সালের নীল চাষের খতিয়ান এবং চাষীদের ওপর চাবুক মারার হিসাবের খাতা।
সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা এলো যখন তিনি দেশলাইয়ের আলোয় নিজের হাতের দিকে তাকালেন। তার ফর্সা, মসৃণ হাতটা এখন রোমশ, খসখসে এবং আঙুলের নখগুলো অদ্ভুতভাবে বড় ও কালো হয়ে গেছে—ঠিক যেন কোনো হিংস্র পশুর হাত।
দেশলাইয়ের কাঠিটা নিভে যাওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে, ঘরের সেই বন্ধ দেয়াল থেকে একটা ভারী চাঙ্গড় খসে পড়ার শব্দ হলো। হ্যামিল্টন অন্ধকারের মধ্যেই শুনতে পেলেন, দেয়ালের ভেতর থেকে একটা নারীকণ্ঠ অত্যন্ত শান্ত অথচ ক্রূর গলায় বলল, “তুমি ফিরে এসেছ, জন।”
অন্ধকার যেন তরল আলকাতরার মতো গায়ের ওপর চেপে বসছিল। দেশলাইয়ের কাঠিটা নিভে যাওয়ার পর হ্যামিল্টন সাহেব কয়েক মুহূর্তের জন্য সম্পূর্ণ দিশেহারা হয়ে পড়লেন। তার বুকের ভেতরটা এত জোরে কাঁপছিল যে মনে হচ্ছিল পাঁজরের হাড়গুলো ভেঙে যাবে। তিনি হাত বাড়িয়ে টেবিলটা খোঁজার চেষ্টা করলেন, কিন্তু তার হাত গিয়ে ঠেকল একটা খসখসে, অসমাপ্ত দেয়ালের গায়ে।
অথচ তিনি নিশ্চিত জানতেন, টেবিলটা ঘরের মাঝখানে থাকার কথা।
“করিম! লণ্ঠনটা নিয়ে এসো!” হ্যামিল্টন চিৎকার করতে চাইলেন, কিন্তু তার গলা দিয়ে কোনো আওয়াজ বেরোল না। কেবল একটা ঘড়ঘড়ে, ভারী খসখসে শব্দ বাতাসের বুকে মিলিয়ে গেল। সেই কণ্ঠস্বর তার নিজের নয়। ওটা কোনো এক প্রৌঢ়, কর্কশ এবং কর্তৃত্ববাদী পুরুষের কণ্ঠ।
হ্যামিল্টন নিজের হাত দুটো মুখের সামনে আনলেন। ঘুটঘুটে অন্ধকারেও তিনি অনুভব করতে পারছিলেন, তার আঙুলগুলো আগের চেয়ে অনেক বেশি চোট খাওয়া, শক্ত আর খসখসে। হাতের তালুতে যেন চাবুকের হাতল ধরার চড়া পড়ে গেছে। আতঙ্কে তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে লাগল। এই গ্রীষ্মের গুমোট গরমেও তার মেরুদণ্ড বেয়ে একটা হিমশীতল স্রোত নেমে গেল। না, এটা বাইরের আবহাওয়া নয়, এটা এক আদিম, অবশ করে দেওয়া অলৌকিক ভয়।
ঠিক তখনই ঘরের তাপমাত্রা আরও একধাপ বেড়ে গেল। বাতাস যেন আগুনের হলকার মতো তার ফুসফুসে ঢুকতে লাগল। আর সেই তপ্ত বাতাসের সাথে ভেসে এলো এক অদ্ভুত গন্ধ—পোড়া মাংস আর কাঁচা চুনকামের তীব্র গন্ধ।
ঠক… ঠক… ঠক…
মেঝেতে কিছু একটা পড়ার শব্দ হলো। হ্যামিল্টন কুঁজো হয়ে হাতড়ে হাতড়ে মেঝের ওপর কিছু একটা খোঁজার চেষ্টা করলেন। তার হাত গিয়ে ঠেকল একটা গোল, মসৃণ বস্তুর ওপর। বস্তুটা ভারী আর কিছুটা স্যাঁতসেঁতে। হ্যামিল্টন সেটাকে তুলে নিয়ে অন্ধকারের মধ্যেই অনুভব করার চেষ্টা করলেন। দুটো গভীর গর্ত, একটা ভাঙা চোয়াল… ওটা একটা মানুষের খুলি!
ভয়ে হ্যামিল্টন ওটা হাত থেকে ফেলে দিতে চাইলেন, কিন্তু তার হাতটা যেন অবশ হয়ে গেছে। আঙুলগুলো খুলিটাকে আরও শক্ত করে চেপে ধরল। যেন তার শরীর অন্য কোনো এক ইচ্ছার দাসে পরিণত হয়েছে।
হঠাৎ ঘরের কোণ থেকে একটা মৃদু, নীলচে আলো জ্বলে উঠল। কোনো মোমবাতি বা লণ্ঠনের আলো নয়, ওটা যেন পচা কাঠ থেকে বের হওয়া ফসফরাসের আলো। সেই আলোয় হ্যামিল্টন দেখলেন, ঘরের চারপাশের চেনা মেহগনি আসবাবপত্রগুলো সব গায়েব হয়ে গেছে। ঘরটা এখন সম্পূর্ণ শূন্য, কেবল চারদিকে কাঁচা ইটের দেয়াল গাঁথা হচ্ছে। আর তিনি নিজে দাঁড়িয়ে আছেন সেই ঘরের ঠিক মাঝখানে, তার পরনে তামাটে রঙের কোট এবং পায়ে সেই ভারী বুট জুতো।
সবচেয়ে ভয়ংকর দৃশ্যটা ছিল তার ঠিক সামনে।
মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে আছে এক নারী। তার পরনে সেই ল্যাভেন্ডার সুবাসিত ফরাসি সিল্কের গাউন, যার বুকটা রক্তে ভেসে যাচ্ছে। নারীটির পিঠ হ্যামিল্টনের দিকে ফেরানো। তার লম্বা, কালো চুলগুলো পিঠ বেয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়েছে। সে দুই হাতে মেঝের ইটের ওপর নখ দিয়ে কিছু আঁচড়ানোর চেষ্টা করছে।
খড়… খড়… খড়…
সেই চেনা, হাড়হিম করা শব্দটা এবার সরাসরি হ্যামিল্টনের চোখের সামনে ঘটছে। হ্যামিল্টন চাইলেন দুই পা পিছিয়ে যেতে, কিন্তু তার পা দুটো যেন মেঝের সাথে জমে গেছে।
ঠিক তখনই নারীটি ধীরে ধীরে তার মাথাটা পেছনের দিকে ঘোরাতে শুরু করল। মানুষের ঘাড় যেভাবে ঘোরে, এটা সেভাবে নয়। হাড় মড়মড় করার তীব্র শব্দ তুলে তার মাথাটা পুরো একশত আশি ডিগ্রি ঘুরে গেল।
হ্যামিল্টনের চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। নারীটির কোনো মুখ নেই! চোখ, নাক, ঠোঁটের জায়গায় কেবল মসৃণ, চামড়া দিয়ে ঢাকা একটা অবয়ব। কিন্তু সেই মুখের চামড়ার নিচ থেকে কেউ যেন অনবরত সুচ ফুটিয়ে বাইরে বের হওয়ার চেষ্টা করছে। চামড়াটা তড়পাতে লাগল, আর সেখান থেকে একটা ফিসফিসানি কণ্ঠস্বর বেরোলো: “তুমি আমাকে এখানে একা ফেলে গেলে কেন, জন? দেয়ালের ভেতর বড্ড গরম… বড্ড দমবন্ধ লাগে…”
হ্যামিল্টন নিজের অজান্তেই তার ডান হাতটা ওপরে তুললেন। তিনি দেখলেন, তার হাতে একটা ভারী লোহার হাতুড়ি। হাতুড়ির মাথায় লেগে আছে তাজা লাল রক্ত। তার ভেতরের সত্তা চিৎকার করে বলছিল, ‘না! আমি এটা করিনি!’, কিন্তু তার শরীর হাতুড়িটা নিয়ে আরও একধাপ এগিয়ে গেল সেই নারীমূর্তির দিকে।
“না!” হ্যামিল্টন এবার সমস্ত শক্তি দিয়ে নিজের গলার রুদ্ধদ্বার ভেঙে চিৎকার করে উঠলেন।
এক মুহূর্তের জন্য চারপাশের নীলচে আলোটা দপ করে নিভে গেল। হ্যামিল্টন জোরে একটা ঝাঁকুনি খেলেন। তিনি চোখ মেলে দেখলেন, তিনি তার সেই আরামকেদারায় বসে আছেন। ঘরের কোণে মোমবাতিটা তখনো মৃদু আলো ছড়াচ্ছে। তার পরনে তার নিজের সুতি শার্ট। হাত দুটোও তার নিজের, মসৃণ এবং স্বাভাবিক।
তিনি হাঁপাতে লাগলেন। কপাল থেকে টপ টপ করে ঘাম ঝরছে। “স্বপ্ন? তবে কি সবটাই এক ভয়ংকর দুঃস্বপ্ন ছিল?” তিনি বিড়বিড় করলেন।
নিজের মনকে শান্ত করার জন্য তিনি টেবিলের ওপর রাখা জলের গ্লাসটার দিকে হাত বাড়ালেন। কিন্তু গ্লাসটা ছোঁবামাত্রই তার চোখ গেল নিজের ডান হাতের তালুর দিকে।
লণ্ঠনের আবছা আলোয় তিনি স্পষ্ট দেখতে পেলেন, তার ডান হাতের তালুতে চারটে গভীর, কাঁচা নখের আঁচড়ের দাগ। সেখান থেকে এখনো তাজা রক্ত গড়িয়ে পড়ছে টেবিলের ওপর রাখা ১৮৮০ সালের সেই অভিশপ্ত ডায়েরির পাতার ওপর। আর ডায়েরির সেই পাতায় নতুন একটি লাইন যোগ হয়েছে, যা একটু আগেও সেখানে ছিল না—“ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব, অতিপ্রাকৃতিক সত্তা কোনো ভ্রম নয়, এটি একটি ফাঁদ। তুমি ইতিমধ্যেই ভেতরে পা দিয়েছ।”
পর্ব ১ সমাপ্ত