ফরমালিনের কড়া, ঝাঁঝালো গন্ধটা এই ঘরের বাতাসে সবসময়ই একচ্ছত্র অধিপতি হিসেবে রাজত্ব করে। সেন্ট্রাল ইউরোপের এই পুরনো মেডিকেল কলেজ ভবনের দেয়ালগুলো চুনকাম করা হলেও সেগুলোর ভেতর থেকে কেমন যেন একটা ভ্যাপসা, স্যাঁতসেঁতে আর্দ্রতার গন্ধ বের হয়। বাতাস ভারী এবং স্থির। কোনো হাওয়া নেই, অথচ ঘরের ভেতরের পরিবেশটা বুকের ওপর একটা অদৃশ্য পাথরের মতো চেপে বসে থাকে।
জন ডেনিস টেবিলের একপাশে দাঁড়িয়ে নিজের মেটালিক স্ক্যালপেলটা পরিষ্কার করছিল। তার পরনে সাদা অ্যাপ্রন, যার হাতার কাছে হালকা হলদেটে দাগ পড়ে গেছে। ঘরের কোণে রাখা বড় কাঁচের জারগুলোতে রাখা বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ মৃদু আলোয় এক অদ্ভুত বিভীষিকার জন্ম দিচ্ছিল। বাতাসে কোনো বসন্ত বা শীতের ছোঁয়া নেই, কেবল একটা গুমোট, দমবন্ধ করা স্তব্ধতা পুরো অ্যানাটমি ল্যাবটাকে গিলে খেয়েছে।
আজ সন্ধ্যায় অ্যানাটমি ক্লাসের জন্য একটা নতুন ক্যাডাভার বা মৃতদেহ আনা হয়েছে। প্রফেসর ভিক্টর যখন বডিটা ল্যাবে নিয়ে আসার নির্দেশ দিচ্ছিলেন, তখন তার মুখেও এক ধরনের অস্বাভাবিক গাম্ভীর্য ছিল। সাধারণত এই ধরনের অজ্ঞাতপরিচয় লাশগুলো শহরের কোনো পরিত্যক্ত গলি বা নদী থেকে উদ্ধার করা হয়। কিন্তু এই লাশটার মধ্যে একটা অন্যরকম ব্যাপার ছিল।
লাশটি এক তরুণীর।
জন টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল। স্টিলের তৈরি বড় ব্যবচ্ছেদ টেবিলের ওপর শুইয়ে রাখা হয়েছে দেহটি। সাদা কাপড়ে ঢাকা শরীরটার অবয়ব স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। জন কাপড়টা আলতো করে সরিয়ে নিল। ল্যাবের ওপর ঝুলতে থাকা হলদেটে বাতিটার আলো সরাসরি এসে পড়ল মেয়েটির মুখের ওপর।
জন কিছুটা থমকে দাঁড়াল। লাশের মুখমণ্ডল সাধারণত যেমন বিকৃত বা বিবর্ণ হয়, এটি তেমন নয়। মেয়েটির ত্বক মসৃণ, প্রায় ফ্যাকাশে সাদা। তবে তার চুলগুলো ছিল অদ্ভুত রকম কালো এবং অস্বাভাবিক দীর্ঘ, যা টেবিল ছাড়িয়ে মেঝেতে স্পর্শ করার উপক্রম করছিল। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, মেয়েটির ঠোঁটের কোণে হালকা একটা বাঁক রয়েছে, যেন সে ঘুমের ঘোরেও মৃদু হাসছে। কিন্তু অ্যানাটমির ছাত্র হিসেবে জন জানে, মৃত্যুর পর পেশীর যে জড়তা বা রিগর মর্টিস তৈরি হয়, তাতে এমন স্বাভাবিক এবং জীবন্ত ভাব থাকা প্রায় অসম্ভব।
“কী দেখছ এত মনোযোগ দিয়ে, জন?” পেছন থেকে রিচার্ডের কণ্ঠস্বর ভেসে এল। রিচার্ড জনের সহপাঠী এবং ল্যাব পার্টনার। তার হাতে একটা নোটপ্যাড এবং কলম।
“লাশটা দেখ,” জন নিচু স্বরে বলল, যেন জোরে কথা বললে টেবিলে শুয়ে থাকা মানুষটার ঘুম ভেঙে যাবে। “এর শরীরে কোনো পচন বা ক্ষত নেই। অথচ পুলিশ রিপোর্টে বলা হয়েছে একে এক পরিত্যক্ত গির্জার বেসমেন্ট থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। কতদিন আগের মৃতদেহ, তার কোনো সঠিক হিসাব নেই।”
রিচার্ড এগিয়ে এসে মেয়েটির হাতটা স্পর্শ করল। স্পর্শ করতেই সে একটু চমকে উঠল। “অদ্ভুত তো! শরীরটা একদম শক্ত হয়ে যায়নি। পেশীগুলো এখনো কেমন যেন নমনীয়। কিন্তু কোনো নাড়ির স্পন্দন নেই, শ্বাস-প্রশ্বাস নেই। রক্ত পুরোপুরি জমাট বেঁধে যাওয়ার কথা, অথচ এর ত্বক দেখে মনে হচ্ছে কেবল কয়েক মিনিট আগে প্রাণ গেছে।”
জন পকেট থেকে একটা ছোট ম্যাগনিফায়িং গ্লাস বের করে মেয়েটির চোখের পাতাটা একটু ওপরে তুলল। চোখের মণি দুটো সম্পূর্ণ কালো, কোনো সাদা অংশ প্রায় দেখাই যাচ্ছে না। এক গভীর, অতল অন্ধকারের মতো সেই চোখ। জন যখন চোখের পাতাটা ছেড়ে দিল, তখন তার মনে হলো, ঘরের ভেতরের গুমোট ভাবটা যেন আরও এক ডিগ্রি বেড়ে গেল। দেয়ালের কোণে ঝুলতে থাকা লণ্ঠনের আলোটা একবার কেঁপে উঠল, যদিও ঘরের সব জানালা শক্ত করে বন্ধ।
“আমাদের আজ রাতেই এর প্রাথমিক ব্যবচ্ছেদ রিপোর্ট তৈরি করতে হবে,” রিচার্ড খাতার পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে বলল। “প্রফেসর ভিক্টর আগামীকাল সকালেই এটা দেখতে চেয়েছেন।”
জন মাথা নাড়ল। সে স্ক্যালপেলটা হাতে নিয়ে মেয়েটির বুকের মাঝখানটায় আলতো করে দাগ কাটতে যাবে, ঠিক তখনই ল্যাবের ভারী কাঠের দরজাটা বিকট শব্দে নড়ে উঠল। কেউ যেন বাইরে থেকে দরজায় ধাক্কা দিল।
জন এবং রিচার্ড দুজনেই দরজার দিকে তাকাল। করিডোরে কোনো আলো নেই, কেবল ল্যাবের ভেতরের হলদে আলোটাই দরজার ফাঁক দিয়ে বাইরে গিয়ে পড়েছে।
“কে ওখানে?” রিচার্ড জোরে ডাকল।
কোনো উত্তর এল না। জন স্ক্যালপেলটা টেবিলে রেখে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। সে দরজাটা খুলতেই বাইরের করিডোরের ভ্যাপসা, গরম বাতাস ভেতরে ঢুকে পড়ল। করিডোর সম্পূর্ণ ফাঁকা। দেয়ালে টাঙানো পুরনো ছবিগুলো ধুলো মাখা অবস্থায় ঝুলে আছে। কেউ কোথাও নেই।
“হয়তো বাতাস… বা কোনো বিড়াল,” জন নিজেকে সান্ত্বনা দেওয়ার মতো করে বলল এবং দরজাটা আবার লক করে দিল।
সে যখন টেবিলের দিকে ফিরে এল, তখন রিচার্ডের মুখের রঙ বদলে গেছে। রিচার্ড একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিল লাশের দিকে।
“কী হয়েছে, রিচার্ড?” জন জিজ্ঞেস করল।
রিচার্ড কাঁপা আঙুল দিয়ে টেবিলটা দেখাল। “জন… আমি কি ভুল দেখছি? আমরা যখন দরজার দিকে তাকিয়েছিলাম, তখন কি এই লাশটার মাথাটা সোজা ছিল না?”
জন ভালো করে লক্ষ্য করল। মেয়েটির মাথাটি এখন সামান্য ডানদিকে হেলে আছে, ঠিক যেন সে দরজার দিকে মুখ করে দেখার চেষ্টা করছিল। শুধু তাই নয়, তার দীর্ঘ কালো চুলের কয়েকটি গোছা এখন টেবিলের ওপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, যা আগে একদম গোছানো ছিল।
জনের কপালে সামান্য ঘাম দেখা দিল, এই ভ্যাপসা গরমেও তার পিঠের শিরদাঁড়া দিয়ে একটা শীতল স্রোত বয়ে গেল। সে যুক্তিবাদী মন দিয়ে ভাবার চেষ্টা করল। “পেশীর সংকোচনের কারণে এমনটা হতে পারে। মৃত্যুর পর অনেক সময় পেশী নিজে থেকেই সংকুচিত হয়, যাকে আমরা পোস্ট-মর্টেম মুভমেন্ট বলি।”
“কিন্তু এত দ্রুত আর এতটা নিখুঁতভাবে?” রিচার্ডের গলায় সংশয়।
“আমাদের কাজ শেষ করা দরকার,” জন বলল। সে আর দেরি না করে মেয়েটির বুকের ত্বকে স্ক্যালপেল দিয়ে প্রথম কাটটি দিল।
কিন্তু কাটতেই তারা দুজনেই স্তব্ধ হয়ে গেল। কোনো মৃতদেহ কাটলে যেভাবে জমাট বাঁধা গাঢ় রক্ত বের হওয়ার কথা, এখান থেকে তা হলো না। পরিবর্তে, ক্ষতস্থান থেকে চুইয়ে পড়তে লাগল এক ফোঁটা ঘন, আলকাতরার মতো কালো তরল। আর সেই তরল থেকে নির্গত হতে লাগল এক প্রাচীন, পচা মাংসের তীব্র গন্ধ—যা ল্যাবের চেনা ফরমালিনের গন্ধকেও এক মুহূর্তে ছাপিয়ে গেল।
সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয় হলো, সেই ক্ষতস্থানটি কাটার ঠিক কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে চারপাশের চামড়া আপনাআপনি সংকুচিত হয়ে কাটার দাগটাকে প্রায় ঢেকে ফেলার চেষ্টা করল, যেন শরীরটি নিজের ক্ষত নিজেই নিরাময় করতে চাইছে।
জন স্ক্যালপেলটা হাত থেকে নামিয়ে রাখল। তার বৈজ্ঞানিক যুক্তিগুলো এই প্রথম ল্যাবের বদ্ধ বাতাসে কাঁচের দেয়ালের মতো ভেঙে চুরমার হতে শুরু করেছে।
ল্যাবরেটরির দেয়ালঘড়িটার টিক-টিক শব্দটা এই মুহূর্তে একটা হাতুড়ির মতো জনের কানে বাজছিল। ঘরের বাতাস এতটাই ভারী হয়ে উঠেছে যে, প্রতিটি শ্বাস নিতে বুকটা ব্যথায় টনটন করে ওঠে। রিচার্ড এক কোণে চেয়ার টেনে বসে পড়েছে, তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। বিজ্ঞান যেখানে এসে থমকে দাঁড়ায়, মানুষের আদিম ভয়গুলো ঠিক সেখান থেকেই ডালপালা মেলতে শুরু করে।
“জন, এটা স্বাভাবিক নয়,” রিচার্ডের ফিসফিসে গলাটা ঘরের দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হলো। “আমি অন্তত বিশটা বডি ডিসেকশন করেছি। চামড়া এভাবে কাটার পর সংকুচিত হয়ে মুখ বন্ধ করে দেয় না। আর এই গন্ধটা… এটা ফরমালিনের নয়, এটা কোনো পুরনো সমাধির গন্ধ।”
জন কোনো কথা বলল না। সে ড্রয়ার থেকে একটা চিমটা আর সুতো বের করল। তার হাত সামান্য কাঁপছিল, যা সে রিচার্ডের কাছ থেকে আড়াল করার চেষ্টা করল। সে টেবিলের দিকে ঝুঁকে ক্ষতস্থানটা আবার পরীক্ষা করতে গেল। কিন্তু টেবিলে চোখ পড়তেই তার বুকের ভেতরটা যেন একটা ওলটপালট খেয়ে গেল।
কালো তরলটা আর চুইয়ে পড়ছে না। ক্ষতস্থানটি পুরোপুরি জোড়া লাগেনি ঠিকই, কিন্তু কাটার দুই প্রান্তের চামড়া এমনভাবে একে অপরের সাথে সেঁটে গেছে যেন কেউ নিখুঁতভাবে সেলাই করে দিয়েছে। শুধু একটা সূক্ষ্ম সুতোর মতো দাগ রয়ে গেছে সেখানে।
“আমরা আজ আর এগোব না,” জন শান্ত গলায় বলল, যদিও তার ভেতরের অশান্তি তখন তুঙ্গে। “বডিটা মর্গের ফ্রিজে ঢুকিয়ে রাখা যাক। কাল সকালে প্রফেসর ভিক্টর নিজে এলে ওনার সামনেই যা করার করা যাবে।”
রিচার্ড যেন এই কথাটার জন্যই অপেক্ষা করছিল। সে দ্রুত উঠে দাঁড়িয়ে মর্গের বড় লোহার ট্রলিটা টেনে নিয়ে এল। দুজনে মিলে লাশটাকে ট্রলিতে তোলার জন্য হাত দিল। লাশটা ধরার সাথে সাথেই জনের হাতের তালুটা কেমন যেন অবশ হয়ে গেল। বডির তাপমাত্রা শীতল, কিন্তু সেটা কোনো বরফশীতল ঠান্ডা নয়; এটি এক ধরনের নিষ্প্রাণ, নিথর জড়তা যা স্পর্শ করলেই জীবনের সমস্ত শক্তি শুষে নেয়।
তারা অত্যন্ত সাবধানে লাশটাকে মর্গের চার নম্বর কোল্ড স্টোরেজ চেম্বারের ভেতর ঢুকিয়ে দিল। ভারী লোহার দরজাটা যখন স্প্রিংয়ের টানে লক হয়ে গেল, তখন একটা ধাতব ‘ক্লিক’ শব্দ পুরো করিডোরে ছড়িয়ে পড়ল। জন চাবিটা ঘুরিয়ে লক করে দিল।
“চল, এখান থেকে বের হওয়া যাক,” রিচার্ড তার অ্যাপ্রনটা খুলতে খুলতে বলল।
ল্যাবরেটরির মেইন সুইচটা বন্ধ করে যখন তারা করিডোরে বের হলো, তখন চারপাশ নিঝুম। এই মেডিকেল কলেজটা প্রায় শত বছরের পুরনো। চওড়া করিডোর, উঁচু সিলিং আর দেয়ালে ঝোলানো পুরনো ডাক্তারদের তৈলচিত্রগুলো রাতের আলো-ছায়ার খেলায় অদ্ভুত সব দানবীয় আকৃতি ধারণ করেছে। বাতাসে এক ধরনের স্যাঁতসেঁতে, গুমোট ভাব। কোনো হাওয়া নেই, অথচ করিডোরের শেষ মাথায় থাকা একটা ভারী পর্দা হালকা দুলছিল।
“তুমি কি আজ রাতে হোস্টেলেই যাচ্ছ?” রিচার্ড জিজ্ঞেস করল।
“হ্যাঁ,” জন করিডোর ধরে হাঁটতে হাঁটতে বলল। “তবে আমার কিছু নোটবুক ল্যাবেই রয়ে গেছে। আমি সেগুলো নিতে একটু লাইব্রেরির দিকের করিডোর হয়ে যাব। তুমি এগোও।”
রিচার্ড আর দ্বিধা না করে মেইন গেটের দিকে চলে গেল। জন একা হয়ে পড়ল। তার জুতোর শব্দটা ফাঁকা করিডোরে দ্বিগুণ জোরে বাজছিল। লাইব্রেরির দিকে যাওয়ার সময় হঠাৎ করেই জনের মনে হলো, তার পেছনে কেউ হাঁটছে। খুব মৃদু, খালি পায়ের শব্দ।
সে ঝট করে পেছনে তাকাল। কেউ নেই। ল্যাম্পপোস্টের আবছা আলো জানালার কাঁচ গলে করিডোরের মেঝেতে এসে পড়েছে। জন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার হাঁটতে শুরু করল। কিন্তু তিন পা যাওয়ার পরই সে থমকে দাঁড়াল।
পেছন থেকে একটা শব্দ আসছে। খুবই পরিচিত একটা শব্দ।
কোনো ধাতব হাতল ঘোরানোর শব্দ।
জন ধীরে ধীরে ঘুরল। তার চোখ চলে গেল করিডোরের শেষ প্রান্তে, যেখানে অ্যানাটমি ল্যাব আর মর্গ অবস্থিত। দূর থেকে আবছা আলোয় সে দেখতে পেল, মর্গের চার নম্বর চেম্বারের ভারী লোহার হাতলটা আস্তে আস্তে ওপরের দিকে উঠছে। যেন ভেতর থেকে কেউ অত্যন্ত শক্তিশালী হাতে সেটাকে ঠেলে ওপরে তুলছে।
জন নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। সে লকের চাবিটা নিজের পকেটে হাত দিয়ে দেখল—চাবিটা ওখানেই আছে। তাহলে লকটা খুলছে কীভাবে?
লোহার হাতলটা পুরোপুরি ওপরে উঠে যাওয়ার পর একটা কানফাটানো শব্দ করে চেম্বারের দরজাটা ইঞ্চি চারেক খুলে গেল। ভেতরের অন্ধকার যেন এক নিমিষে বাইরের করিডোরের আলোটুকুকেও শুষে নিল। আর সেই অন্ধকারের ভেতর থেকে বেরিয়ে এল দুটো দীর্ঘ, কালো চুলের গোছা, যা মেঝের ওপর সাপের মতো কিলবিল করে ছড়িয়ে পড়ল।
জন স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার পা দুটো যেন মেঝের সাথে জমে গেছে। ঠিক তখনই মর্গের ভেতর থেকে একটা অদ্ভুত শব্দ ভেসে এল। সেটা কোনো মানুষের কণ্ঠ নয়, বরং কোনো প্রাচীন, হিংস্র প্রাণীর চাপা গর্জন বা গোঙানির মতো।
আর তার পরপরই, পুরো মেডিকেল কলেজের সমস্ত লাইট একসাথে দপ করে নিভে গেল। চারপাশ ডুবে গেল এক নিশ্ছিদ্র, নিরেট অন্ধকারে। সেই অন্ধকারের মধ্যেই জন অনুভব করল, মর্গের দরজাটা সম্পূর্ণ খুলে গেছে এবং কোনো একটা অবয়ব অত্যন্ত ধীর গতিতে, ঘষটে ঘষটে তার দিকেই এগিয়ে আসছে।
ভয়ের চরম সীমায় পৌঁছে জন অন্ধের মতো উল্টোদিকে দৌড় দিল। সে যখন হোস্টেলের নিজের ঘরে পৌঁছাল, তখন সে হাপাচ্ছে। সারারাত সে চোখে পাতা এক করতে পারল না।
পরদিন সকালে জন যখন ল্যাবে পৌঁছাল, তখন রিচার্ড এবং প্রফেসর ভিক্টর ইতিমধ্যেই সেখানে উপস্থিত। ল্যাবের লাইটগুলো জ্বলছে। কিন্তু ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা প্রফেসরের মুখের এক্সপ্রেশন দেখে জনের বুকটা কেঁপে উঠল।
“জন, রিচার্ড… তোমরা কি গতকাল বডিটা ঠিকমতো লক করেছিলে?” প্রফেসর ভিক্টরের গলা থমথমে।
“হ্যাঁ, স্যার। আমি নিজে লক করেছি,” জন এগিয়ে গেল।
“তাহলে এটা আমাকে ব্যাখ্যা করো,” প্রফেসর মর্গ চেম্বারের দিকে আঙুল নির্দেশ করলেন।
জন এগিয়ে গিয়ে দেখল, চার নম্বর চেম্বারের দরজাটা বন্ধই আছে। কিন্তু মেঝেতে ছড়িয়ে আছে এক অদ্ভুত দৃশ্য। মর্গ থেকে শুরু করে অ্যানাটমি টেবিল পর্যন্ত একটা ভেজা, চটচটে লাইনের দাগ চলে গেছে। যেন রাতে কেউ মর্গ থেকে বের হয়ে টেবিলে গিয়েছিল এবং আবার মর্গে ফিরে এসেছে।
কিন্তু চমকের তখনও বাকি ছিল। জন যখন চার নম্বর চেম্বারের লক খুলে ভেতরের ট্রলিটা টেনে বের করল, তখন তার আর রিচার্ডের মুখ দিয়ে কোনো কথা সরল না।
লাশটি আগের মতোই শুয়ে আছে। কিন্তু তার ডান হাতটি আর শরীরের পাশে সোজা হয়ে নেই। হাতটি এখন তার নিজের বুকের ওপর রাখা, আর তার ফ্যাকাশে আঙুলগুলোর নখের নিচে লেগে আছে তাজা, লাল মাংসের টুকরো এবং রক্ত—যা গতকাল সেখানে মোটেও ছিল না।
ল্যাবরেটরির বাতাসটা এখন আর শুধু গুমোট নয়, এর সাথে মিশেছে এক তীব্র ধাতব গন্ধ। তাজা রক্তের গন্ধ। প্রফেসর ভিক্টর চশমাটা নাক থেকে নামিয়ে টেবিলের ওপর রাখলেন। তার কপালে চিন্তার গভীর ভাঁজ। তিনি একজন কড়া যুক্তিবাদী মানুষ, সারাজীবন বিজ্ঞানের কাটাছেঁড়া নিয়ে কাটিয়েছেন। কিন্তু এই মুহূর্তে তার চোখের সামনে যা ঘটছে, তা কোনো মেডিকেল টেক্সটবুকের সমীকরণে মেলে না।
“জন,” প্রফেসর ভিক্টর নিচু কিন্তু গম্ভীর গলায় ডাকলেন। “গতকাল তোমরা যখন এই বডিটার প্রাইমারি ইনসিশন বা প্রথম কাটাছেঁড়া করছিলে, তখন কি ল্যাবে আর কেউ ছিল? কোনো আউটসাইডার?”
“না, স্যার,” জন শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে বলল। “আমি আর রিচার্ড ছাড়া পুরো ফ্লোরে কেউ ছিল না। আর ল্যাবের মেইন দরজাও লক করা ছিল।”
“তাহলে এই মাংসের টুকরো আর নখের নিচের রক্ত কোথা থেকে এল?” প্রফেসর ভিক্টরের আঙুলটা লাশের ফ্যাকাশে, দীর্ঘ আঙুলগুলোর দিকে নির্দেশ করল। “মৃত্যুর পর রক্ত জমাট বেঁধে যায়, পেশী নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। এই বডিটার নখের নিচে যে রক্ত লেগে আছে, তা সম্পূর্ণ তাজা। যেন কয়েক ঘণ্টা আগে কোনো জীবন্ত শরীর থেকে এটা উপড়ে নেওয়া হয়েছে।”
রিচার্ড এক কোণে দাঁড়িয়ে নিজের কাঁপতে থাকা হাত দুটোকে অ্যাপ্রনের পকেটে লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করছিল। সে জনের দিকে তাকাল, তার চোখে পরিষ্কার ফুটে উঠেছে গতরাতের সেই বিভীষিকা। কিন্তু সে মুখ খুলল না। জনও গতরাতের দরজা খোলার ঘটনাটা চেপে গেল। কারণ সে জানে, প্রমাণ ছাড়া অলৌকিক কিছুর দাবি করলে প্রফেসর তাদের মেডিকেল লাইসেন্স বাতিলের সুপারিশ করতে পারেন।
“আজ রাতে আমরা এই বডির ফুল অটোপ্সি (ময়নাতদন্ত) করব,” প্রফেসর ভিক্টর ঘোষণা করলেন। “আমি নিজে উপস্থিত থাকব। আমার ধারণা, এই বডির ভেতরে কোনো বিশেষ ধরনের প্রিজারভেটিভ বা কেমিক্যাল ব্যবহার করা হয়েছে, যার কারণে সেলগুলো এখনও জীবিত মানুষের মতো আচরণ করছে। আমাদের এর সত্যতা জানতে হবে।”
প্রফেসর চলে যাওয়ার পর ল্যাবে আবার সেই নিস্তব্ধতা নেমে এল। জন লাশের দিকে তাকাল। মেয়েটির মুখাবয়ব যেন আরও কিছুটা উজ্জ্বল হয়েছে। ঠোঁটের সেই অদ্ভুত, রহস্যময় বাঁকটা এখন আরও স্পষ্ট। জন ল্যাপেল মাইক্রোফোন আর নোটবুক গুছিয়ে রাখার সময় হঠাৎ খেয়াল করল, টেবিলের একপাশে মেঝেতে একটা ছোট কাগজের টুকরো পড়ে আছে।
সে ঝুঁকে কাগজের টুকরোটা তুলে নিল। এটা সাধারণ কোনো কাগজ নয়, বেশ পুরনো এবং খসখসে চামড়ার মতো। তার ওপর গাঢ় লাল কালিতে (নাকি রক্তে?) একটা অদ্ভুত প্রতীক আঁকা। একটা বৃত্ত, যার মাঝখানে একটা উল্টানো ত্রিভুজ এবং তার ভেতর একটি চোখের অবয়ব। প্রতীকটার নিচে ল্যাটিন ভাষায় কিছু একটা লেখা, যা সময়ের নিয়মে প্রায় আবছা হয়ে গেছে।
জন কাগজটা নিজের পকেটে ঢুকিয়ে নিল। রিচার্ড তখন ল্যাবের জানালাগুলো বন্ধ করছিল।
“জন, আমার ভালো ঠেকছে না,” রিচার্ড জানালার পাল্লাটা টেনে লক করতে করতে বলল। “এই বডিটা আসার পর থেকে কলেজের পরিবেশটা কেমন যেন বদলে গেছে। খেয়াল করেছিস, আজ সকাল থেকে ক্যাম্পাসে কোনো পাখি ডাকেনি? এমনকি ল্যাবের পেছনের নর্দমায় যে ইঁদুরগুলো ঘোরাঘুরি করত, সেগুলোও উধাও।”
জন রিচার্ডের কথার পিঠে কিছু বলল না, তবে সে মনে মনে রিচার্ডের সাথে একমত। ঘরের বাতাসটা এতটাই স্থির যে, একটা দেশলাইয়ের কাঠি জ্বালালেও তার ধোঁয়া সোজা ওপরের দিকে উঠে যায়, ডানে-বামে একটুও হেলে না।
রাত ১০টা।
পুরো মেডিকেল কলেজ ভবন নিঝুম অন্ধকারে ডুবে গেছে। করিডোরের লণ্ঠনগুলো নিস্তেজ আলো ছড়াচ্ছে। অ্যানাটমি ল্যাবের ভেতরে বড় হ্যালোজেন লাইটটা জ্বালানো হয়েছে, যা টেবিলের ওপর শুয়ে থাকা লাশটাকে এক তীব্র, নিষ্ঠুর আলোয় ভাসিয়ে দিয়েছে।
প্রফেসর ভিক্টর মেটালিক গাউন আর গ্লাভস পরে তৈরি। তার হাতে চকচকে পোস্ট-মর্টেম করাত আর স্ক্যালপেল। জন আর রিচার্ড টেবিলের দুপাশে দাঁড়িয়ে।
“টাইম অফ স্টার্ট: রাত ১০টা বেজে ১৫ মিনিট,” প্রফেসর ভিক্টর ডিক্টাফোনে বলতে শুরু করলেন। “ক্যাডাভার নম্বর ৪৭। অজ্ঞাতপরিচয় তরুণী। বাহ্যিক পরীক্ষায় কোনো পচন বা রিগর মর্টিসের লক্ষণ নেই। আমরা এখন থোরাসিক ক্যাভিটি (বুকের খাঁচা) উন্মুক্ত করব।”
প্রফেসর স্ক্যালপেলটা নিয়ে মেয়েটির বুকের মাঝখানটায় চাপ দিলেন। গতকাল জনের করা সেই সূক্ষ্ম দাগটার ওপর দিয়েই তিনি কাটতে শুরু করলেন। কিন্তু অদ্ভুত বিষয়, এবার কোনো কালো তরল বের হলো না। চামড়াটা মাখনের মতো কেটে গেল।
প্রেরফসর করাতটা হাতে নিলেন বুকের হাড় কাটার জন্য। ধাতব করাতটা যখন হাড়ের ওপর বসল, তখন পুরো ঘরে এক বিকট, হাড় কাঁপানো কিড়মিড় শব্দ তৈরি হলো। রিচার্ড কান বন্ধ করার উপক্রম করল।
ঠিক তখনই, ল্যাবের সমস্ত লাইট একসাথে কাঁপতে শুরু করল। ভোল্টেজ এক ধাক্কায় এত নিচে নেমে গেল যে, হ্যালোজেন আলোটা হালকা হলদেটে হয়ে এল।
“জন, ভোল্টেজ স্ট্যাবিলাইজারটা দেখ!” প্রফেসর চিৎকার করে উঠলেন।
জন জেনারেটরের সুইচের দিকে পা বাড়াতেই পুরো ঘরটা এক সেকেন্ডের জন্য সম্পূর্ণ অন্ধকার হয়ে গেল। আর সেই এক সেকেন্ডের অন্ধকারেই, ল্যাবের ভেতর একটা তীব্র, শীতল বাতাসের ঝাপটা বয়ে গেল—যদিও ঘরের সব দরজা-জানালা বন্ধ ছিল।
লাইটটা যখন আবার জ্বলে উঠল, তখন প্রফেসরের হাত থেকে করাতটা মেঝেতে পড়ে গেছে। তিনি পাথরের মতো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন, তার চোখ দুটো কোটর থেকে বেরিয়ে আসার উপক্রম।
জন আর রিচার্ড টেবিলের দিকে তাকাল। তাদের হৃদপিণ্ড যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল।
মেয়েটির বুকের খাঁচাটা উন্মুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু ভেতরে কোনো ফুসফুস, ধমনী বা চেনা অ্যানাটমির অস্তিত্ব নেই। বুকের ভেতরের পুরো গহ্বরটা এক অদ্ভুত, ঘন কালো কুয়াশায় পূর্ণ। আর সেই কুয়াশার ঠিক মাঝখানে একটা জিনিস স্পন্দিত হচ্ছে।
একটা হৃদপিণ্ড।
কিন্তু সেটা এই মৃতদেহের নিজস্ব হৃদপিণ্ড নয়। সেটা আকারে অনেক বড়, এবং সেটি তখনও জীবন্ত মানুষের মতো ধক-ধক করে কাঁপছে। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বিষয় হলো, সেই হৃদপিণ্ডের ওপর তখনও লেগে আছে একটা চেনা ধাতব চাবির রিং, যা এই কলেজেরই নাইট গার্ড পিটারের। পিটার আজ সকাল থেকে নিখোঁজ।
আর ঠিক সেই মুহূর্তে, টেবিলের ওপর শুয়ে থাকা লাশটির বন্ধ চোখের পাতা দুটো আস্তে আস্তে খুলতে শুরু করল।
পর্ব ১ সমাপ্ত