বাংলা ছোট গল্প

দেশলাইয়ের কাঠিটা নিভে যাওয়ার পর ঘরটা যে গভীর অন্ধকারে ডুবে গেল, তা যেন কেবল আলোর অনুপস্থিতি নয়—তা ছিল এক জীবন্ত, ঘন কৃষ্ণবর্ণের অন্ধকার। অবনী বিছানার ওপর পাথরের মতো স্থবির হয়ে বসে রইল। তার বুকের ভেতর হৃৎপিণ্ডের ধকধক শব্দটা এত জোরে হচ্ছিল যে, মনে হচ্ছিল পাঁজরের হাড়গুলো ভেঙে যাবে।
সে আর দেশলাই জ্বালানোর সাহস পেল না। অন্ধকারের মধ্যে সেই ভারী, কর্কশ পুরুষের কণ্ঠস্বরটি অবনীর কানের পর্দায় তখনো প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল—‘আর সামান্য… আর মাত্র একটা নিঃশ্বাস… তারপর খোলস বদল হবে।’
কার খোলস বদল হবে? ওই মাটির পুতুলটার? নাকি পুতুলের ভেতর যে অশরীরী সত্তাটি বন্দি হয়ে আছে, সে মুক্ত হতে চাইছে?
অবনী অন্ধকারের মধ্যেই নিজের দুই হাত দিয়ে কান দুটো চেপে ধরল। সে চোখ বন্ধ করে নিজেকে বারংবার বোঝাতে লাগল, “আমি উচ্চশিক্ষিত, আমি বিজ্ঞানের ছাত্র। এসবই আমার মস্তিষ্কের কোনো জটিল বিকার। দাদির মৃত্যু আর শ্রীধরবাবুর গল্প মিলে আমার অবচেতন মনে এক ভয়ঙ্কর ভ্রম তৈরি করেছে।” কিন্তু মনের এই সান্ত্বনা খড়কুটোর মতো ভেসে গেল, যখন সে অনুভব করল—তার ঘরের ভেতরের তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নিচে নেমে গেছে। তার মুখ দিয়ে হালকা কুয়াশার মতো ঠাণ্ডা হাওয়া বেরোচ্ছে।
মেঝের সেই ফাটল থেকে ফুঁ দেওয়ার শব্দটা আচমকাই বন্ধ হয়ে গেল। চারদিক আবার সেই নিরেট, অসাড় নিস্তব্ধতায় ডুবে গেল। অবনী কান থেকে হাত সরাল। সে অন্ধকারের মধ্যে তীব্র দৃষ্টিতে তাকানোর চেষ্টা করল। কোনো শব্দ নেই।
কিন্তু মানুষের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় যখন জাগ্রত হয়, তখন সে চোখের দেখা বা কানের শোনার বাইরেও এক অদ্ভুত উপস্থিতি টের পায়। অবনী বুঝতে পারছিল, মেঝের ওপর উপুড় হয়ে থাকা সেই জিনিসটি এখন আর সেখানে নেই। ওটা নড়াচড়া করছে। কোনো খসখস শব্দ নেই, কোনো পায়ের আওয়াজ নেই—কিন্তু ঘরের ভেতরের ঘন হাওয়াটা এক পাশ থেকে অন্য পাশে স্থানান্তরিত হচ্ছে।
হঠাৎ করেই অবনীর মনে হলো, তার ডান পায়ের বুড়ো আঙুলে খুব মৃদু, বরফ-শীতল একটা ছোঁয়া লাগল। ছোঁয়াটা মানুষের চামড়ার মতো নরম নয়, তা ছিল খসখসে পোড়ামাটির রুক্ষ স্পর্শ।
“উফ!” অবনী এক ঝটকায় পা দুটো বিছানার ওপর টেনে নিল এবং দেয়ালের দিকে পিঠ ঠেকিয়ে গুটিসুটি মেরে বসল।
ঠিক তখনই মেঘের আড়াল থেকে চাঁদটা বেরিয়ে এল। জানলার ভাঙা কাচ গলে এক ফালি নীলচে চাঁদের আলো এসে পড়ল ঠিক অবনীর বিছানার ওপর। আর সেই আলোয় যা দৃশ্যমান হলো, তা দেখে অবনীর চিৎকার করার ক্ষমতাটুকুও লোপ পেয়ে গেল।
পুতুলটি বিছানার ঠিক মাঝখানে, অবনীর পায়ের কাছে সোজা হয়ে বসে আছে।
লণ্ঠনের আলোয় পুতুলটার চোখ দুটোকে আগে যতটা জীবন্ত মনে হয়েছিল, এই মৃদু চাঁদের আলোয় তা যেন আরও হাজার গুণ তীব্র রূপ ধারণ করেছে। সেই কাচের অক্ষিগোলক দুটি এখন আর স্থির নয়। পুতুলের চোখের ভেতরের কালো মণি দুটো অবনীর চোখের সাথে তাল মিলিয়ে এদিক-ওদিক নড়ছে। অবনী আতঙ্কে চোখ সরাতেই পুতুলের মণি দুটোও সেই দিকে ঘুরে গেল।
সবচেয়ে ভয়াবহ ব্যাপার হলো, পুতুলের সেই পোড়ামাটির মুখের অবয়ব। অবনী স্পষ্ট দেখতে পেল, পুতুলের ঠোঁটের কোণের সেই ক্রূর হাসিটা আরও চওড়া হয়েছে। মাটির ঠোঁট দুটো সামান্য ফাঁক হয়ে গেছে এবং তার ভেতর দিয়ে জ্যান্ত মানুষের মতো সাদা দাঁতের পাটি উঁকি দিচ্ছে। একটা মাটির পুতুলের ভেতরে মানুষের দাঁত কীভাবে থাকতে পারে?
পুতুলটা অপলক দৃষ্টিতে অবনীর দিকে তাকিয়ে রইল। সেই দৃষ্টিতে কোনো রাগ নেই, কোনো হিংস্রতা নেই—আছে কেবল এক আদিম, পরম ক্ষুধা। একজন অনাহারী মানুষ যেমন খাদ্যের দিকে তাকিয়ে থাকে, পুতুলটার চোখ দুটো অবনীর দিকে ঠিক সেভাবেই তাকিয়ে ছিল।
অবনী নিজের চোখ দুটো বন্ধ করে নেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করল। কিন্তু এক অদ্ভুত, অদৃশ্য শক্তি তার চোখের পাতা দুটোকে খোলা রাখতে বাধ্য করল। সে চোখ ফেরাতে পারছে না, চোখ বন্ধ করতে পারছে না। পুতুলের সেই অক্ষিগোলক দুটি যেন অবনীর সমস্ত স্নায়ুতন্ত্রকে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিয়েছে। অবনীর মনে হলো, তার চোখের ভেতর থেকে এক তীব্র টান উৎপন্ন হচ্ছে, যা তার মস্তিষ্ককে অবশ করে দিচ্ছে।
কতক্ষণ সে এভাবে সেই মরণ-দৃষ্টির মুখোমুখি বসে ছিল, তার কোনো হিসাব নেই। সময় যেন মুখোপাধ্যায় বাড়ির এই অভিশপ্ত ঘরে এসে থমকে দাঁড়িয়েছিল।
হঠাৎ করেই ভুতনাথপুর গ্রামের দূর প্রান্ত থেকে একটা শিয়াল ডেকে উঠল। রাতের শেষ প্রহরের সেই ডাকটা যেন এক ঝটকায় অলৌকিক মায়াজালটা ছিন্ন করে দিল। অবনী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ল। তার চোখ দিয়ে অনবরত জল পড়ছিল। সে দেখল, জানলার বাইরে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে।
সে তড়িঘড়ি করে টেবিলের দিকে তাকাল। পুতুলটি আবার অলৌকিকভাবে বিছানা থেকে উধাও হয়ে টেবিলের ওপর নিজের নির্দিষ্ট স্থানে ফিরে গেছে।
অবনী আর এক মুহূর্তও সেই ঘরে বসল না। সে প্রায় উন্মাদ বাউন্ডুলের মতো ঘর থেকে ছুটে নিচে নেমে এল। সকালের ঠাণ্ডা হাওয়া তার মুখে লাগতেই সে কিছুটা প্রকৃতিস্থ হলো। বৈঠকখানায় তার বাবা হরিশ্চন্দ্র মুখোপাধ্যায় বসে খবরের কাগজ পড়ছিলেন। হরিশ্চন্দ্রবাবু অত্যন্ত গম্ভীর এবং কড়া মেজাজের মানুষ। সংসারের কোনো বিষয়েই তিনি খুব একটা মাথা ঘামান না।
“বাবা…” অবনী কাঁপতে কাঁপতে তাঁর সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
হরিশ্চন্দ্রবাবু চশমার ওপর দিয়ে অবনীর দিকে তাকালেন। অবনীর উসকোখুসকো চুল, চোখের নিচের কালো দাগ আর ফ্যাকাশে মুখ দেখে তিনি ভ্রু কুঁচকে বললেন, “কী হয়েছে তোর? শরীর খারাপ?”
“বাবা, দাদির ঘরে ওই যে সিন্দুকটা আছে… ওটার ভেতর একটা মাটির পুতুল ছিল। ওটা ভালো জিনিস নয় বাবা। ওটাকে অবিলম্বে এ বাড়ি থেকে দূর করতে হবে।” অবনীর গলা কাঁপছিল।
হরিশ্চন্দ্রবাবু খবরের কাগজটা নামিয়ে রাখলেন। তাঁর চোখ দুটো সরু হয়ে গেল। তিনি শান্ত কিন্তু দৃঢ় গলায় বললেন, “তুই ওটা ছুঁয়েছিস? তোকে কে ওটা বের করতে বলেছিল?”
“আমি দাদির স্মৃতি হিসেবে ওটা আমার ঘরে রেখেছিলাম। কিন্তু বাবা, বিশ্বাস করো, ওটা সাধারণ পুতুল নয়। ওটা নড়াচড়া করে! ওটার চোখ দুটো মানুষের মতো জীবন্ত! ওটা রাতে ফুঁ দেয়!” অবনী প্রায় চিৎকার করে উঠল।
হরিশ্চন্দ্রবাবু রেগে উঠলেন না, বরং তাঁর মুখে এক গভীর, অন্ধকার বিষাদের ছায়া নেমে এল। তিনি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “তুই কলকাতার কলেজে বিজ্ঞান পড়িস অবনী। তোর মুখে এসব কথা শোভা পায় না। তবে হ্যাঁ… পুতুলটা এ বাড়িতে আর রাখা যাবে না। ওটা গিরিবালার বাপের বাড়ির অভিশাপ। তুই ওটা এখনই নিয়ে গিয়ে ভুতনাথপুরের শ্মশানের পাশে যে বড় পুকুরটা আছে, সেখানে ফেলে দিয়ে আয়।”
বাবার এই আকস্মিক সম্মতি অবনীকে অবাক করল। হরিশ্চন্দ্রবাবুও তবে কিছু জানেন? কিন্তু অবনী আর কোনো প্রশ্ন করার সুযোগ পেল না, কারণ তাঁর বাবা চট করে উঠে নিজের ঘরের দিকে চলে গেলেন।
অবনী আর দেরি করল না। সে ওপরে গিয়ে পড়ার টেবিল থেকে পুতুলটাকে একটা চটের বস্তার ভেতর পুরল। বস্তাটা ছোঁয়ার সময়ও তার মনে হলো, ভেতরের মাটির পুতুলটা যেন মৃদু কাঁপছে।
দুপুরের কড়া রোদের মধ্যে অবনী চটের বস্তাটা হাতে নিয়ে গ্রামের শ্মশানের দিকে রওনা দিল। ভুতনাথপুরের শ্মশানটা বেশ নির্জন, একপাশে একটা বিশাল কালচে জলের পুকুর—যার নাম ‘কালীদিঘী’। লোকমুখে শোনা যায়, এই দিঘীর জল নাকি অতল। যা একবার এর ভেতর পড়ে, তা আর কোনোদিন ভেসে ওঠে না।
দিঘীর পাড়ে এসে অবনী দাঁড়াল। চারপাশটা খাঁ খাঁ করছে। চটের বস্তার মুখটা খুলে সে পুতুলটাকে শেষবারের মতো দেখল। দুপুরের প্রখর সূর্যের আলোতেও পুতুলের সেই কাচের চোখ দুটো যেন এক অদ্ভুত শীতলতায় জ্বলজ্বল করছে। যেন পুতুলটা অবনীকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।
“তোর এই খেলা আমি আজ এখানেই শেষ করছি।” অবনী দাঁতে দাঁত চেপে বলল।
সে নিজের পুরো শক্তি সঞ্চয় করে পুতুলটাকে কালীদিঘীর মাঝখানের গভীর জলের দিকে ছুঁড়ে দিল।
ছপাস!
একটা বড় শব্দ করে পুতুলটা জলের ভেতর তলিয়ে গেল। জলের বুকে কিছু বুদবুদ উঠল, তারপর বৃত্তাকার তরঙ্গগুলো আস্তে আস্তে দিঘীর পাড়ে এসে মিলিয়ে গেল। জল আবার শান্ত, নিস্পৃহ হয়ে গেল।
অবনী একটা পরম শান্তির দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। তার মন থেকে যেন একটা বিশাল পাথরের বোঝা নেমে গেল। সে বাড়ির দিকে রওনা দিল। আজ রাতে সে অন্তত শান্তিতে ঘুমাতে পারবে।
সন্ধ্যাবেলা অবনী বেশ ফুরফুরে মেজাজে রাতের খাবার খেল। মা সুহাসিনী দেবীও পুতুলটা ফেলে দেওয়া হয়েছে শুনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। রাতে ঘরে ফিরে অবনী লণ্ঠনটা জ্বালিয়ে পড়ার টেবিলে বসল। টেবিলটা ফাঁকা দেখে তার মনটা হালকা লাগল।
রাত এগারোটার দিকে সে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ল। কয়েকদিনের ক্লান্তিতে তার চোখ দুটো দ্রুত বুজে এল। সে এক গভীর, শান্ত ঘুমের রাজ্যে তলিয়ে গেল।
কতক্ষণ ঘুমিয়েছিল সে জানে না। হঠাৎ করেই তার ঘুমের ঘোরে মনে হলো, জানলার বাইরে থেকে একটা অদ্ভুত ছপছপ শব্দ আসছে। যেন কেউ ভেজা পায়ে হেঁটে আসছে।
অবনী ধড়মড় করে বিছানায় উঠে বসল। ঘর অন্ধকার। কিন্তু জানলার বাইরে থেকে একটা কালচে জলের গন্ধ, শেওলার গন্ধ ঘরের ভেতর ভেসে আসছে। গন্ধটা কালীদিঘীর জলের গন্ধের মতো।
সে দেয়াল হাতড়ে লণ্ঠনটা জ্বালাল। আলোর শিখাটা বাড়াতেই সে পড়ার টেবিলের দিকে তাকাল। টেবিলটা ফাঁকা। অবনী হাসল, “আমি শুধু শুধু ভয় পাচ্ছি।”
কিন্তু তার হাসির রেখাটা এক সেকেন্ডের মধ্যেই মিলিয়ে গেল, যখন সে খেয়াল করল—পড়ার টেবিলের ঠিক নিচ থেকে মেঝের ওপর এক সারি ভেজা পায়ের ছাপ ঘরের ভেতরের দিকে এগিয়ে এসেছে। ছাপগুলো মানুষের পায়ের নয়, ছোট ছোট, তিন আঙুল বিশিষ্ট কোনো এক অদ্ভুত অবয়বের পায়ের ছাপ, যা কাদা আর কালীদিঘীর কালচে শেওলা দিয়ে মাখামাখি হয়ে আছে।
এবং সেই ভেজা পায়ের ছাপগুলো এসে থেমেছে ঠিক অবনীর বিছানার পায়ের কাছে।
অবনী ভয়ে কাঠের মতো শক্ত হয়ে নিচের দিকে তাকাল। বিছানার চাদরের তলা থেকে একটা কালচে, ভেজা পোড়ামাটির হাত আস্তে আস্তে ওপরের দিকে উঠে আসছে। আর সেই হাতের নখগুলো জ্যান্ত মানুষের মাংসের মতো লালচে রক্তে ভেজা।
বিছানার চাদরের তলা থেকে উঠে আসা সেই ভেজা পোড়ামাটির হাতের স্পর্শ অবনীর পায়ের চামড়ায় লাগা মাত্রই তার মনে হলো, এক দলা বরফ কেউ তার ধমনীর ভেতর ঢুকিয়ে দিয়েছে। ছপছপ শব্দটা এবার তার কানের ঠিক পেছনে, বিছানার জীর্ণ কাঠের ফ্রেমের ওপার থেকে আসতে লাগল। কালচে শেওলা আর পচা পাঁকের গন্ধটা এতটাই তীব্র যে অবনীর পেটের ভেতর থেকে বমি উছলে আসতে চাইল।
সে এক ঝটকায় বিছানা থেকে নেমে ঘরের অন্য কোণে ছিটকে গেল। লণ্ঠনের আলোটা কাঁপছে। অবনী দেখল, বিছানার চাদরটা ভেজা কাদার দাগে মাখামাখি হয়ে আছে, কিন্তু সেখানে কোনো পুতুল নেই। শুধু মেঝের ওপর সেই তিন আঙুলের কাদাটে পায়ের ছাপগুলো জ্বলজ্বল করছে। সেগুলো যেন ঘরের দেয়াল বেয়ে ওপরের দিকে উঠে গেছে।
অবনী ওপরের দিকে তাকাল। কড়িকাঠের অন্ধকারের মধ্যে দুটো বিন্দু তীব্রভাবে জ্বলছে। কালীদিঘীর অতল জল থেকেও ওটা ফিরে এসেছে। ওটা কোনো সাধারণ মাটি আর কাচের পুতুল নয়, ওটা এক জীবন্ত অভিশাপ।
“কে তুই? কী চাস আমার কাছে?” অবনী আর্তনাদ করে উঠল।
কড়িকাঠের অন্ধকার থেকে কোনো জবাব এল না, শুধু একটা শীতল বাতাসের ঝাপটা নেমে এসে লণ্ঠনের আলোটাকে এক ফুঁয়ে নিভিয়ে দিল। ঘরটা আবার নিশ্ছিদ্র অন্ধকারের চাদরে ঢাকা পড়ে গেল। অবনী আর ঘরে থাকার সাহস পেল না। সে অন্ধকারের মধ্যেই দরজা হাতড়ে ছিটকিনিটা খুলল এবং বারান্দা দিয়ে প্রায় অন্ধের মতো দৌড়ে নিচে নেমে এল।
নিচের তলায় তখনো একটা নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে। অবনী তার বাবার ঘরের দরজায় গিয়ে সজোরে ধাক্কা দিতে লাগল। “বাবা! দরজা খোলো! ওটা ফিরে এসেছে! কালীদিঘীর জল থেকেও ওটা ফিরে এসেছে!”
কয়েকবার ধাক্কা দেওয়ার পর দরজাটা খুলে গেল। হরিশ্চন্দ্রবাবু হ্যারিকেন হাতে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর চোখে ঘুম নেই, বরং এক গভীর, প্রাচীন আশঙ্কার ছায়া। তিনি অবনীকে ভেতরে টেনে নিয়ে দরজাটা বন্ধ করে দিলেন।
“আমি জানতাম ওটা ফিরে আসবে,” হরিশ্চন্দ্রবাবু নিচু, ভাঙা গলায় বললেন। তিনি ঘরের কোণে রাখা একটা কাঠের আরামকেদারায় গিয়ে বসলেন। হ্যারিকেনের আলোয় তাঁর বৃদ্ধ মুখটাকে আরও জীর্ণ দেখাচ্ছিল।
“তুমি জানতে?” অবনী বাবার সামনে মেঝেতে বসে পড়ল। “তাহলে আমাকে ওটা পুকুরে ফেলতে বললে কেন? কী ইতিহাস লুকিয়ে আছে এই পুতুলের পেছনে? দাদি কেন ওটার সামনে বসে ফুঁ দিতেন? বাবা, দোহাই তোমার, আমাকে সত্যিটা বলো, নাহলে আমি পাগল হয়ে যাব।”
হরিশ্চন্দ্রবাবু ঘরের জানলার বাইরে অন্ধকারের দিকে তাকালেন। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতে শুরু করলেন, যা অবনীর চেনা যুক্তিবাদী পৃথিবীকে চিরতরে ওলটপালট করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল।
“আজ থেকে প্রায় সত্তর বছর আগে, এই ভুতনাথপুর গ্রামে যখন প্লেগের মহামারী দেখা দিয়েছিল, তখন প্রতিদিন শয়ে শয়ে মানুষ মারা যাচ্ছিল। সেই সময় সনাতন পাল নামের ওই মৃৎশিল্পী তাঁর একমাত্র ছোট মেয়েকে হারান। মেয়ের অকালমৃত্যু সনাতন বাবু মেনে নিতে পারেননি। তিনি তন্ত্রসাধনা শুরু করেন। তাঁর ধারণা ছিল, কোনো মানুষের মৃত্যুর ঠিক শেষ মুহূর্তে, তার মুখ থেকে বের হওয়া শেষ নিঃশ্বাসটুকু যদি কোনো মাটির খোলসে বন্দি করা যায়, তবে সেই আত্মা চিরকাল পৃথিবীতে থেকে যাবে।”
অবনী স্তব্ধ হয়ে শুনছিল। হরিশ্চন্দ্রবাবু বলতে লাগলেন, “সনাতন পাল সফল হয়েছিলেন। তিনি তাঁর মেয়ের শেষ নিঃশ্বাস একটা বিশেষ উপায়ে তৈরি মাটির পুতুলের ভেতর বন্দি করেন। কিন্তু মাটির তো নিজস্ব কোনো ইন্দ্রিয় নেই। তাই পুতুলের ভেতরের সেই আত্মা ছটফট করতে লাগল বাইরের জগৎকে দেখার জন্য, অনুভব করার জন্য। সনাতন পাল তখন এক ভয়ঙ্কর কাণ্ড করলেন। তিনি শ্মশান থেকে এক সদ্যমৃত যুবকের চোখ উপড়ে নিয়ে সেই পুতুলের কোটরে বসিয়ে দেন।”
অবনী শিউরে উঠল, “মানুষের আসল চোখ?”
“হ্যাঁ,” হরিশ্চন্দ্রবাবু মাথা নাড়লেন। “পোড়ামাটির ভেতরে সেই চোখ দুটো অলৌকিক উপায়ে জীবন্ত হয়ে রইল। কিন্তু আত্মার ক্ষুধা তো শুধু দেখায় মেটে না। সে চায় রক্তমাংসের শরীর। সনাতন পাল বুঝতে পেরেছিলেন তিনি এক রাক্ষস তৈরি করেছেন। তিনি পুতুলটাকে ধ্বংস করার চেষ্টা করেন, কিন্তু পুতুলটা নিজেই সনাতন পালের শরীরের সমস্ত প্রাণ ফুঁ দিয়ে শুষে নেয়। সনাতন পালের মৃতদেহ যখন পাওয়া যায়, তখন তাঁর শরীরটা ছিল শুষ্ক, চামড়া মড়মড়ে পোড়ামাটির মতো শক্ত।”
হরিশ্চন্দ্রবাবু থামলেন। তাঁর কপাল বেয়ে ঘাম ঝরছে। “তোর দাদির বাবা ছিলেন সনাতন পালের জমিদার। তিনি পুতুলের এই অলৌকিক ক্ষমতার কথা জানতে পেরে লোভের বশে ওটা নিজের কাছে নিয়ে আসেন। বংশের সমৃদ্ধির জন্য। কিন্তু পুতুলটার একটা নিয়ম আছে—তাকে প্রতি রাতে মানুষের জ্যান্ত নিঃশ্বাস খাওয়াতে হয়। তোর দাদি গিরিবালা নিজের যৌবন, নিজের শরীরের শক্তি ওই পুতুলকে ফুঁ দিয়ে দিয়ে উৎসর্গ করেছিলেন, যাতে বাড়ির বাকি সদস্যরা বেঁচে থাকে। কিন্তু শেষ বয়সে তিনি আর পারছিলেন না। তাই পুতুলটা এখন নতুন শিকার খুঁজছে।”
“নতুন শিকার? তার মানে ওটা এখন আমার শরীরটা চায়?” অবনীর গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল।
“ও তোর চোখের মণি দুটো কাড়তে চায় অবনী। তোর চোখের আলো দিয়ে ও নিজের মাটির খোলস থেকে মুক্ত হয়ে জ্যান্ত মানুষ হতে চায়,” হরিশ্চন্দ্রবাবু ভয়ার্ত চোখে অবনীর দিকে তাকালেন।
ঠিক সেই মুহূর্তে, ঘরের বাইরে বারান্দায় একটা ভারী কিছু টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়ার শব্দ হলো।
খসখস… খসখস…
শব্দটা হরিশ্চন্দ্রবাবুর ঘরের দরজার ঠিক সামনে এসে থেমে গেল। দরজার নিচের ফাঁক দিয়ে একটা কালচে, ভেজা তরল ঘরের ভেতরে ঢুকতে শুরু করেছে। গন্ধটা সেই কালীদিঘীর পচা পাঁকের গন্ধ।
আর তার পরেই, দরজার কাঠে কেউ একজন সজোরে আঁচড়াতে লাগল। নখের সেই কর্কশ আওয়াজ অবনী আর তার বাবার বুকের ভেতরটা কাঁপিয়ে তুলল।
কিন্তু সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হলো, দরজার ওপার থেকে একটা চেনা কণ্ঠস্বর ফিসফিস করে ডাকল—”অবনী… ওরে অবনী, দরজাটা খোল। আমি তোর দাদি… দেখ, আমি তোর জন্য কালীদিঘীর জল থেকে পুতুলটা কুড়িয়ে এনেছি…”
শব্দটা গিরিবালা দেবীর অবিকল কণ্ঠস্বর, যিনি দুদিন আগে পঞ্চত্বে প্রাপ্ত হয়েছেন। অবনী তার বাবার দিকে তাকাল। হরিশ্চন্দ্রবাবুর মুখটা তখন ভয়ে নীল হয়ে গেছে। তিনি হ্যারিকেনটা শক্ত করে ধরে বিড়বিড় করলেন, “ও গিরিবালার গলা নকল করছে। দরজা একদম খুলবি না।”
কিন্তু দরজার ওপার থেকে আঁচড়ানোর শব্দটা ক্রমশ বাড়তে লাগল। একসময় মনে হলো, কাঠের ভারী দরজাটা যেন পুতুলের সেই মাটির হাতের ধাক্কায় মটমট করে ভেঙে পড়বে।
হঠাৎ করেই সব শব্দ বন্ধ হয়ে গেল। পুরো বাড়িটা আবার সেই নিস্তব্ধতায় ডুবে গেল। অবনী নিঃশ্বাস বন্ধ করে অপেক্ষা করতে লাগল।
কয়েক মিনিট কেটে যাওয়ার পর, হরিশ্চন্দ্রবাবু আস্তে আস্তে দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন। দরজার একটা ছোট ফাটল দিয়ে তিনি বাইরে দেখার চেষ্টা করলেন। বাইরে ঘুটঘুটে অন্ধকার। তিনি হ্যারিকেনের আলোটা ফাটলের কাছে ধরলেন।
“কিছু দেখতে পাচ্ছ বাবা?” অবনী ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল।
হরিশ্চন্দ্রবাবু কোনো উত্তর দিলেন না। তিনি ফাটলে চোখ রেখে একদম স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। তাঁর শরীরটা কেমন যেন কাঁপতে শুরু করল।
“বাবা?” অবনী একটু এগিয়ে গেল।
হরিশ্চন্দ্রবাবু আস্তে আস্তে পেছন দিকে ঘুরলেন। হ্যারিকেনের আলোটা তাঁর মুখের ওপর পড়তেই অবনী আতঙ্কে চিৎকার করে দুপা পিছিয়ে গেল।
হরিশ্চন্দ্রবাবুর চোখের সেই চেনা মণি দুটো আর নেই। তাঁর চোখের কোটরে এখন জ্বলজ্বল করছে দুটো সম্পূর্ণ সাদা আর কালো কাচের গোলক—ঠিক সেই মাটির পুতুলটার চোখের মতো জড়াগ্রস্ত, অপলক। আর তাঁর মুখটা হাঁ হয়ে গেছে, যা থেকে নির্গত হচ্ছে এক হিমশীতল, পচা মাটির গন্ধযুক্ত ফুঁ।
হরিশ্চন্দ্রবাবুর চোখের সেই চেনা মণি দুটো যেখানে থাকার কথা, সেখানে এখন দুটো প্রাণহীন, কালচে কাচের অক্ষিগোলক স্থির হয়ে বসে আছে। তাঁর মুখটা পশুর মতো হাঁ হয়ে গেছে, আর সেই হাঁ হওয়া মুখের ভেতর থেকে অবিরাম বেরোচ্ছে পচা পাঁক আর চিতার ভস্মের মতো এক শীতল ফুঁ। সেই ফুঁয়ের ঝাপটা অবনীর মুখে লাগামাত্রই তার মনে হলো, এক মুহূর্তের জন্য তার নিজের শরীরের সমস্ত রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে।
“বাবা! তুমি… তোমার চোখ দুটো…” অবনী দেয়ালের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে মেঝেতে বসে পড়ল। তার যুক্তিবাদী মন এই নির্মম বাস্তবতাকে আর সইতে পারছিল না।
হরিশ্চন্দ্রবাবু কোনো কথা বললেন না। তিনি রোবটের মতো যান্ত্রিক পায়ে এক পা এক পা করে অবনীর দিকে এগিয়ে আসতে লাগলেন। তাঁর হাত দুটো সামনের দিকে বাড়ানো, যেন তিনি অন্ধকারের মধ্যে অবনীকে ছুঁতে চাইছেন। কিন্তু অবনী ভালো করেই জানে, তিনি অন্ধ নন; তাঁর ওই কাচের চোখ দুটো অবনীর প্রতিটি নড়াচড়া নিখুঁতভাবে লক্ষ্য করছে।
ঠিক তখনই ঘরের এক কোণ থেকে একটা মৃদু খিলখিল হাসির শব্দ ভেসে এল। শব্দটা কোনো মানুষের নয়, মাটির তৈরি কোনো অবয়বের ভেতর থেকে উঠে আসা এক বিকৃত, তীক্ষ্ণ হাসির আওয়াজ।
অবনী হ্যারিকেনের ক্ষীণ আলোয় দেখতে পেল, ঘরের খাটের নিচে অন্ধকারের মধ্যে সেই পুতুলটি সোজা হয়ে বসে আছে। পুতুলটার চোখ দুটো এখন আর কাচের নয়। পুতুলের সেই পোড়ামাটির কোটরে এখন জ্বলজ্বল করছে হরিশ্চন্দ্রবাবুর আসল, রক্তমাংসের চোখ দুটো! সেই চোখে এখনো রয়ে গেছে তীব্র আকুতি, বেদনা আর এক চরম অসহায়তা। পুতুলের চোখের কোণ বেয়ে ফোঁটা ফোঁটা তাজা রক্ত মেঝের ধুলোয় মিশে যাচ্ছে।
পুতুলটা তার বাবার চোখ দুটো চুরি করেছে।
“না!” অবনী নিজের সর্বশক্তি দিয়ে চিৎকার করে উঠল। সে মেঝের ওপর পড়ে থাকা হ্যারিকেনটা তুলে নিয়ে সজোরে ছুঁড়ে মারল খাটের নিচের পুতুলটার দিকে।
ঝনঝন!
হ্যারিকেনের কাচটা ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেল এবং ভেতরের কেরোসিন ছিটকে পড়ে মেঝেতে আগুন ধরে গেল। আগুনের হলকাটা এক মুহূর্তে খাটের তোশক আর মশারিকে গ্রাস করে নিল। সেই লালচে আগুনের আলোয় অবনী দেখল, তার বাবা হরিশ্চন্দ্রবাবু আগুনের শিখাকে বিন্দুমাত্র পরোয়া না করে জ্যান্ত লাশের মতো তাঁর কাচের চোখ দুটো নিয়ে অবনীর দিকেই হাত বাড়াচ্ছেন। তাঁর গায়ের পাঞ্জাবিতে আগুন লেগে গেছে, কিন্তু তাঁর মুখে কোনো যন্ত্রণার অভিব্যক্তি নেই।
অবনী আর এক সেকেন্ডও সেখানে দাঁড়াল না। সে ঘরের জানলাটা সজোরে ধাক্কা দিয়ে খুলে ফেলল। মুখোপাধ্যায় বাড়ির এই নিচতলার জানলাটি বেশ বড় এবং এর বাইরেই রয়েছে উঠোনের নরম কাদা মাটি। অবনী জানলা গলে এক লাফে বাইরে উঠোনে এসে পড়ল।
বাইরে তখনো অবিরাম বৃষ্টি হয়ে চলেছে। লাল মাটির উঠোনটা কাদায় থমথম করছে। আকাশ ভাঙা মেঘের আড়ালে আলো-ছায়ার খেলা চলছে। অবনী কাদার ওপর আছাড় খেয়ে পড়ল, কিন্তু পরক্ষণেই উঠে দাঁড়িয়ে বাড়ির সদর দরজার দিকে দৌড় দিল। সে এই অভিশপ্ত বাড়ি, এই অভিশপ্ত গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে যেতে চায়। তার আর কোনো তত্ত্ব, কোনো ইতিহাসের কৌতূহল নেই; সে শুধু বাঁচতে চায়।
দৌড়াতে দৌড়াতে সে গ্রামের মূল রাস্তার দিকে চলে এল। মাঝরাতের এই অন্ধকারে সারা গ্রাম যেন নিঝুম, নিস্পৃহ হয়ে ঘুমোচ্ছে। মুখোপাধ্যায় বাড়িতে আগুন লেগেছে, কিন্তু কোনো গ্রামবাসী ঘর থেকে বেরোচ্ছে না। যেন তারা সবাই এক গভীর, অলৌকিক মায়ার চাদরে অবশ হয়ে পড়ে আছে।
কাদামাখা পায়ে অবনী যখন গ্রামের প্রাচীন কালী মন্দিরের চাতালে এসে পৌঁছাল, তখন সে সম্পূর্ণ ক্লান্ত। তার ফুসফুস দুটো যেন ফেটে যাবে। সে মন্দিরের পাথরের স্তম্ভটা ধরে মেঝেতে বসে পড়ল। মন্দিরের ভেতরে কোনো পুরোহিত নেই, শুধু একটি মাত্র টিমটিমে প্রদীপ জ্বলছে মা কালীর ভয়ঙ্কর মূর্তির সামনে।
“তুমি এখানে কেন বাবা? এই মাঝরাতে মুখোপাধ্যায় বাড়ির ছেলের শ্মশানের দিকে যাওয়ার কথা, মন্দিরে কেন?”
হঠাৎ মন্দিরের অন্ধকূপ থেকে একটা চেনা কণ্ঠস্বর ভেসে এল। অবনী চমকে উঠে তাকিয়ে দেখল, লাইব্রেরিয়ান শ্রীধরবাবু একটা ছেঁড়া চাদর গায়ে জড়িয়ে মন্দিরের কোণ থেকে বেরিয়ে আসছেন। তাঁর হাতে একটা প্রাচীন, তামাটে রঙের পুঁথি।
“দাদু! আমার বাবা… আমাদের বাড়িতে আগুন…” অবনী কাঁদতে কাঁদতে শ্রীধরবাবুর পা জড়িয়ে ধরল। “ওই পুতুলটা… ওটা আমার বাবার চোখ দুটো কেড়ে নিয়েছে! ওটা জ্যান্ত হতে চায় দাদু! আমাকে বাঁচান!”
শ্রীধরবাবু অবাক হলেন না। তিনি অবনীর মাথায় হাত রেখে এক দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তাঁর চোখ দুটো চশমার মোটা কাচের ওপার থেকে বড় বড় দেখাল। তিনি বললেন, “আমি তোকে আগেই বলেছিলাম অবনী, সনাতন পালের তৈরি ওই পুতুল সাধারণ জিনিস নয়। ওটা রক্তের টান চেনে। গিরিবালা যখন মারা গেল, তখন পুতুলের সেই তৃষ্ণা মেটানোর জন্য এই বংশের পরবর্তী রক্তের প্রয়োজন ছিল। হরিশ্চন্দ্র নিজেকে উৎসর্গ করতে চেয়েছিল তোকে বাঁচানোর জন্য। কিন্তু পুতুলের ক্ষুধা তাতে মিটবে না। ও তোর চোখের মণি দুটো না পাওয়া পর্যন্ত শান্ত হবে না।”
“কোনো উপায় নেই দাদু? ওটাকে ধ্বংস করার কোনো পথ নেই?” অবনী আর্তনাদ করে উঠল।
শ্রীধরবাবু তাঁর হাতের প্রাচীন পুঁথিটা খুললেন। প্রদীপের আলোয় পুঁথির জীর্ণ পাতাগুলো হলুদ দেখাল। তিনি আঙুল দিয়ে একটা প্রাচীন মন্ত্রের দিকে নির্দেশ করে বললেন, “সনাতন পালের এই পুঁথিতে লেখা আছে—পোড়ামাটির এই খোলস কেবল তখনই ধ্বংস হবে, যখন এর ভেতরে বন্দি থাকা আত্মার আদিমতম বাসনাটি পূর্ণ হবে। অথবা… যদি এই বংশের শেষ প্রদীপ নিজের চোখ দুটো নিজের হাতে উপড়ে সেই পুতুলের কোটরে সমর্পণ করে। তবেই সেই অভিশাপের মুক্তি ঘটবে।”
“নিজের চোখ উপড়ে দেব?” অবনী স্তব্ধ হয়ে গেল। তার বিজ্ঞানমনস্ক মন এই মধ্যযুগীয় বর্বরতাকে মেনে নিতে চাইল না। সে চিৎকার করে বলল, “না! এটা হতে পারে না! আমি আমার চোখ দেব না! আমি শহর থেকে পুলিশ নিয়ে আসব, বিজ্ঞান দিয়ে ওটাকে ভাঙব!”
শ্রীধরবাবু এক মলিন, ক্রূর হাসলেন। তিনি চশমাটা খুলে টেবিলের ওপর রাখলেন। “পুলিশ? বিজ্ঞান? এই ভুতনাথপুর গ্রামের সীমানা পার হওয়ার ক্ষমতা কি তোর আছে অবনী? তুই ভেবেছিস তুই নিজের ইচ্ছায় এই মন্দিরে এসেছিস?”
অবনীর বুকের ভেতরটা আবার ঠাণ্ডা হয়ে গেল। সে দেখল, শ্রীধরবাবুর গলার আওয়াজটা আস্তে আস্তে বদলে যাচ্ছে। সেই বৃদ্ধ, জীর্ণ কণ্ঠস্বরটি পরিবর্তিত হয়ে এক ভারী, কর্কশ পুরুষের কণ্ঠস্বরে রূপ নিচ্ছে—যা অবনী নিজের ঘরে, মেঝের ফাটলের নিচে শুনেছিল।
শ্রীধরবাবু তাঁর মাথাটা এক ঝটকায় সোজা করলেন। মন্দিরের প্রদীপের আলোয় অবনী দেখল, শ্রীধরবাবুর চোখের কোটরে কোনো চোখ নেই—সেখানে শুধু দুটো কুচকুচে কালো গর্ত, যা থেকে তরল কাদা গড়িয়ে পড়ছে।
এবং সেই গর্তের গভীর থেকে ভেসে এল সনাতন পালের সেই আদিম কণ্ঠস্বর—”খোলস বদলের সময় পার হয়ে যাচ্ছে অবনী… তোর রক্তের টানেই তো ও ফিরে এসেছে। দেখ, তোর পেছনে কে দাঁড়িয়ে আছে।”
অবনী ধড়মড় করে পেছন ফিরে তাকাল। মন্দিরের চাতালের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে আসছে এক বীভৎস অবয়ব। তার সারা শরীর আগুনে পুড়ে কালো হয়ে গেছে, জামাকাপড় ভস্মীভূত। কিন্তু তার চোখের কোটরে জ্বলছে সেই দুটো সাদা-কালো কাচের পুতুলের চোখ।
তার বাবা, হরিশ্চন্দ্র মুখোপাধ্যায়, পুতুলের আদেশে নিজের ছেলের চোখ দুটো কেড়ে নিতে মন্দিরের চাতালে এসে দাঁড়িয়েছেন। আর তাঁর ঠিক কাঁধের ওপর বসে আছে সেই কালচে মাটির পুতুলটি, যার কোটরে থাকা হরিশ্চন্দ্রবাবুর জ্যান্ত চোখ দুটো অবনীর দিকে তাকিয়ে অঝোরে রক্তাশ্রু বিসর্জন করছে।
পর্ব ২ সমাপ্ত । বাংলা ছোট গল্প