বিকেলের সোনাঝরা রোদ যখন হিলির রেললাইনের ওপর এসে তীর্যকভাবে পড়ে, তখন চারপাশের বাতাসে এক অদ্ভুত উদাসীনতা খেলা করে। এই রোদ কোনো উৎসবের নয়, এ রোদ যেন এক চিলতে মন খারাপের চাদর।
বাতাসে ধুলো ওড়ে, ওড়ে শুকিয়ে যাওয়া পাতার মর্মর ধ্বনি। লোকালয়ের কোলাহল একটা নির্দিষ্ট দূরত্বে গিয়ে থমকে দাঁড়ায়, যেখানে এসে মিশেছে লোহার তৈরি এক অলঙ্ঘনীয় প্রাচীর—কাঁটাতার।
দুই ভূখণ্ডের মাঝখানে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই কাঁটাতারের বেড়া কেবল দুটি দেশের সীমান্ত নয়, এ যেন মানুষের তৈরি এক নির্মম অহংকার, যা প্রতিনিয়ত বাতাসকে দুভাগ করে, পাখিদের ডানার ছায়াকে খণ্ডিত করে।
সাজিদ প্রতি বিকেলে এই লাইনের ধারে এসে দাঁড়ায়।
তার পরনে সাধারণ সুতির পাঞ্জাবি, চোখে এক অদ্ভুত শান্ত চাউনি। তার ভেতরে কোনো তাড়াহুড়ো নেই, কোনো ব্যাকুলতার প্রকাশ্য আস্ফালন নেই। কিন্তু বুকের বাঁ পাশে যে ধকপকানি, তা কেবল সে নিজেই শুনতে পায়। সে জানে, ঠিক এই সময়ে ওপার থেকেও কেউ একজন পায়ে পায়ে এগিয়ে আসবে। কোনো এক অদৃশ্য সুতোর টানে, কোনো এক অলিখিত নিয়মে।
আজকের বিকেলটা অন্যদিনের চেয়ে একটু বেশি তপ্ত।
বাতাসের শরীর জুড়ে আর্দ্রতা, মেঘের কোনো চিহ্ন নেই আকাশে, অথচ বুকের ভেতর কেমন যেন একটা মেঘলা গুমোট ভাব।
সাজিদ লাইনের পাশে পড়ে থাকা একটা কালভার্টের ওপর বসল। তার চোখ চলে গেল ঠিক ওপারে, জিরো লাইনের ওপাশে ভারতের সীমানায়। সেখানে একটা মস্ত বড় নিমগাছ ডালপালা মেলে দাঁড়িয়ে আছে।
সেই নিমগাছের ছায়াটা এসে পড়েছে বাংলাদেশের মাটিতে।
অদ্ভুত এই প্রকৃতির নিয়ম! কাঁটাতার মানুষকে আটকে রাখতে পারলেও গাছের ছায়াকে আটকে রাখতে পারে না। ওপার থেকে ভেসে আসা বাতাসের ঝাপটা এ পারের মানুষের চুলে বিলি কেটে দিয়ে যায়, তাকে তো আর কোনো পাহারাদার পাসপোর্ট-ভিসা জিজ্ঞেস করে না।
ঠিক তখনই সে এলো।
রিয়া।
পরনে তার হালকা বাসন্তী রঙের সুতির শাড়ি, চুলে আলগা এক খোঁপা। তার হাঁটার মধ্যে কোনো চপলতা নেই, আছে এক গভীর মন্থরতা। সে যখন পায়ে পায়ে এসে নিমগাছটার নিচে দাঁড়াল, তখন দূর থেকেও সাজিদের মনে হলো যেন একটা নিথর নদীর বুকে হঠাৎ কোনো এক চিলতে হাওয়া এসে দোলা দিয়ে গেল। রিয়া এসে কাঁটাতারের দিকে সরাসরি তাকাল না। সে প্রথমে আকাশের দিকে তাকাল, যেন সে মেঘের গতি দেখছে। কিন্তু সাজিদ জানে, ওই চোখের আড়চোখে লুকিয়ে আছে অন্য এক সন্ধান।
দুজনের মাঝখানের দূরত্বটা হয়তো ফুট পঞ্চাশেক। কিন্তু এই পঞ্চাশ ফুট দূরত্ব যেন এক আলোকবর্ষের সমান। মাঝখানে ঝুলছে লোহার তীক্ষ্ণ কাঁটা, যা রোদ লেগে মাঝে মাঝে ঝিলিক দিয়ে ওঠে। সেই ঝিলিক চোখের পর্দায় এসে লাগলে বুকটা ছ্যাঁত করে ওঠে।
সাজিদ আলতো করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে পকেট থেকে একটা ছোট রুমাল বের করে হাত মুছল। এটা ছিল তাদের মধ্যকার এক গোপন ইশারা। রুমাল বের করার অর্থ—’আমি এসেছি, আমি ভালো আছি।’
ওপার থেকে রিয়া তার শাড়ির আঁচলটা একটু টেনে ঠিক করল। এর উত্তর—’আমিও তোমাকে দেখছি।’
এই তো ভাষা।
মানুষের তৈরি বর্ণমালা যেখানে থমকে যায়, সেখানে চোখের ভাষা আর শরীরের সূক্ষ্ম ভঙ্গি এক বিশাল অভিধান তৈরি করে নেয়। তাদের এই দেখার সূত্রপাত হয়েছিল প্রায় মাস চারেক আগে।
সাজিদ তার মামার কাপড়ের ব্যবসার তদারকি করতে প্রথম হিলিতে আসে। ওপার থেকে আসা পণ্য, এপারের আমদানি-রপ্তানির ব্যস্ততার মাঝে একদিন বিকেলে ক্লান্ত হয়ে সে এই নির্জনতায় এসে দাঁড়িয়েছিল। আর ঠিক তখনই ওপারের ওই নিমগাছতলায় এসে দাঁড়িয়েছিল রিয়া।
প্রথম দিন কেবলই ছিল কৌতূহল—কারা এই মানুষগুলো, যারা মাত্র কয়েক হাত দূরে থেকেও অন্য এক পৃথিবীর বাসিন্দা? কিন্তু দ্বিতীয় দিন, তৃতীয় দিন… ধীরে ধীরে সেই কৌতূহল রূপান্তরিত হলো এক মায়াবী অভ্যাসে। এখন বিকেল মানেই এক অলিখিত প্রতীক্ষা।
বাতাসে আজ ধুলোবালি একটু বেশি। সাজিদ একটু নড়েচড়ে বসল। সে দেখল রিয়া তার হাতের একটি ছোট কাচের চুড়ি আঙুল দিয়ে ঘোরাচ্ছে।
সূর্যের আলো সেই লাল কাচের চুড়িতে লেগে একটা রক্তিম আভা তৈরি করছে। সাজিদের মনে হলো, ওই লাল আভা যেন কাঁটাতারের বুক চিরে এপারে চলে আসছে। সে নিজের অজান্তেই হাতটা একটু বাড়াল, যেন সেই অবাস্তব আলোটাকে ছুঁয়ে দিতে চায়।
কিন্তু পরক্ষণেই বিএসএফের এক জোয়ানের বুটের শব্দে তার ঘোর ভেঙে গেল। জোয়ানটি কাঁধে রাইফেল ঝুলিয়ে অলস ভঙ্গিতে হেঁটে যাচ্ছে। তার জুতো থেকে ওঠা ধুলো রিয়ার বাসন্তী শাড়ির নিচের অংশকে মলিন করে দিচ্ছে। রিয়া একটু পিছিয়ে গেল, তার মুখাবয়বে এক অদ্ভুত ভীতি আর সঙ্কোচ।
সাজিদ লক্ষ্য করল, রিয়া যখন ভয় পায়, তখন সে তার ঠোঁট দুটো শক্ত করে চেপে ধরে।
এই চার মাসে সে রিয়ার প্রতিটা সূক্ষ্ম পরিবর্তন মুখস্থ করে ফেলেছে। সে জানে রিয়া কখন হাসে, কখন তার চোখের পাতা একটু বেশি কাঁপে। এই দূরত্বের প্রেম এক আশ্চর্য সাধনা। যেখানে ছোঁয়া নেই, পাশে বসে কথা বলার কোনো অবকাশ নেই, অথচ প্রতিটা মুহূর্ত এক তীব্র অনুভূতির চাদরে জড়ানো থাকে।
জোয়ানটি চলে যাওয়ার পর রিয়া আবার একটু এগিয়ে এলো। এবার সে চারপাশটা ভালো করে দেখে নিয়ে মুখ খুলল। দূর থেকে তার ঠোঁট নাড়ার ভঙ্গি দেখে সাজিদ বোঝার চেষ্টা করল সে কী বলছে। কোনো শব্দ এপারের বাতাসে এসে পৌঁছায় না, রেললাইনের খটখট শব্দ আর দূরবর্তী বাজারের হট্টগোলে সব হারিয়ে যায়। কিন্তু মনের কান যার সজাগ, সে তো অবলীলায় বুঝে নেয়। রিয়া বোধহয় বলল, “আজ খুব গরম, না?”
সাজিদ মাথা নাড়ল। হ্যাঁ, খুব গরম।
সে নিজের কপাল ছুঁয়ে দেখাল যে সে ঘামছে। রিয়া একটু হাসল।
সেই হাসিতে কোনো শব্দ ছিল না, কিন্তু সাজিদের মনে হলো পৃথিবীর সমস্ত বাঁশির সুর যেন একসাথে বেজে উঠল। এক অদ্ভুত মাদকতা ছড়িয়ে পড়ল তার শিরায় শিরায়। সে ভাবল, কেন এই দূরত্ব? কেন এই কাঁটাতার? ঈশ্বর যখন আকাশ তৈরি করেছিলেন, তখন কি তিনি মেপে দিয়েছিলেন যে এই আকাশের নীলটুকু ভারতের আর ওই পাশের মেঘটুকু বাংলাদেশের? মানুষ কেন এত ভাগাভাগি পছন্দ করে?
বিকেলটা ধীরে ধীরে ফুরিয়ে আসছে। পশ্চিম আকাশে সূর্যটা লাল থেকে আস্তে আস্তে বেগুনী রঙের দিকে রূপ বদলাচ্ছে। সীমান্ত এলাকায় সন্ধ্যার আগের এই সময়টা খুব থমথমে হয়ে যায়। দুপাশের সীমান্ত রক্ষীদের টহল বেড়ে যায়। আলোর তীব্রতা কমে যাওয়ার সাথে সাথে দূরত্বের অস্পষ্টতা বাড়ে।
রিয়া এবার যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হলো। সে তার শাড়ির আঁচলটা আবার একটু নাড়ল। এটা বিদায়ের সংকেত।
সাজিদ বসা থেকে উঠে দাঁড়াল। তার বুকের ভেতরটা কেমন যেন খালি হয়ে যেতে লাগল। প্রতিদিন এই সময়টাতে তার মনে হয়, সে যেন তার নিজের একটা অংশ ওপারেই ফেলে যাচ্ছে। সে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল রিয়ার চলে যাওয়ার পথের দিকে। রিয়া ঘুরে দাঁড়াল, কয়েক পা হেঁটে গিয়ে আবার একটু পেছন ফিরে তাকাল। তার চোখে তখন গোধূলির শেষ আলো ঠিকরে পড়ছে। সেই আলোয় সাজিদ রিয়ার চোখে একটা অন্যরকম চাউনি দেখল—সেটা কেবল বিদায়ের নয়, সেটা যেন এক গভীর আশঙ্কার, এক অব্যক্ত যন্ত্রণার।
রিয়া মিলিয়ে গেল ওপাশের ঘরগুলোর আড়ালে। সাজিদ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। বাতাস এখন আরও ঠাণ্ডা হতে শুরু করেছে, চারপাশের ধুলোগুলো থিতিয়ে পড়ছে। কিন্তু সাজিদের মনের ভেতরের ধুলোঝড় তখন কেবল শুরু হয়েছে। সে বাড়ি ফেরার জন্য পা বাড়াল, কিন্তু তার পা দুটো যেন সায় দিচ্ছিল না।
আজ রিয়ার চোখে ওই আশঙ্কার আলো কেন ছিল? সে কি কিছু বলতে চেয়েছিল যা সাজিদ বুঝতে পারেনি? নাকি এই সীমান্তের চোরাবালিতে তাদের এই নীরব ভালোবাসা কোনো বড় বিপদের মুখোমুখি হতে চলেছে? সাজিদ যতবারই ভাবার চেষ্টা করল, ততবারই তার মনের কোণে একটা কালো মেঘ জমে উঠতে লাগল। এই ভালোবাসা কি শুধুই এক বিকেলের খেলা, নাকি এর পরিণতিতে অপেক্ষা করছে এক অলঙ্ঘনীয় অন্ধকার?
রেললাইনের পাথরগুলোর ওপর দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে সাজিদের মনে হলো, পেছনের কাঁটাতারটা যেন একটা জীবন্ত পশুর মতো অন্ধকারের মধ্যে হাসছে। এক অজানা আশঙ্কায় তার বুকের স্পন্দন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল।
রাতটা যখন হিলি বর্ডারের ওপর নেমে আসে, তখন চারপাশটা এক নিচ্ছিদ্র স্তব্ধতায় ডুবে যায়। দিনের বেলার সেই কোলাহল, মালবাহী ট্রাকের হর্নের আওয়াজ আর মানুষের ব্যস্ততা এক নিমেষে উধাও হয়ে যায়। শুধু থেকে যায় সার্চলাইটের তীব্র সাদা আলো, যা কিছুক্ষণ পর পর এপার-ওপার ঘুরে বেড়ায়। সেই আলো যখন সাজিদের ঘরের জানালায় এসে পড়ে, তখন দেয়ালের বুকে তার নিজের ছায়াটা এক বিশাল দানবের মতো দেখায়।
সাজিদ বিছানায় শুয়ে এপাশ-ওপাশ করছিল। ঘরের কোণে একটা টিমটিমে হারিকেন জ্বলছে, যার মৃদু আলোয় ঘরের অন্ধকার পুরোপুরি দূর হয় না, বরং এক রহস্যময় পরিবেশ তৈরি করে। তার কান খাড়া হয়ে আছে বাইরের দূরবর্তী কোনো শব্দের দিকে। মাঝে মাঝে সীমান্তরক্ষীদের বুটের আওয়াজ বা কোনো কুকুরের ডাক ছাড়া আর কিছুই শোনা যায় না। কিন্তু সাজিদের মনের ভেতর তখন অন্য এক কোলাহল। রিয়ার সেই শেষ বিকেলের চাউনিটা কিছুতেই তার চোখ থেকে সরছে না। কেন রিয়া ওভাবে তাকাল? কী লুকিয়ে ছিল ওই দুটি চোখের কোণে?
পরদিন সকালে বর্ডারের পরিবেশটা অন্যরকম থাকে। সকালের আলোয় সীমান্তকে অতটা নিষ্ঠুর মনে হয় না।
সাজিদ খুব ভোরেই উঠে পড়েছিল। তার মামার গদিতে যাওয়ার আগে সে একবার রেললাইনের ধারে গিয়ে দাঁড়াল। সকালের নরম আলোয় ওপারের নিমগাছটিকে খুব শান্ত দেখাচ্ছিল। কিন্তু সেখানে এখন কেউ নেই। রিয়ারা ওখানের একটা ছোট কোয়ার্টারের মতো বাড়িতে থাকে, যার চালের একাংশ এপার থেকেও দেখা যায়। সাজিদ সেই চালের দিকে তাকিয়ে রইল, যদি কোনো ধোঁয়া ওড়ে, যদি কোনো মানুষের অবয়ব দেখা যায়। কিন্তু চারপাশটা বড্ড নিঝুম।
দুপুরের দিকে সাজিদকে তার মামা শওকত আলী ডাকলেন। শওকত সাহেব এ অঞ্চলের পুরনো ব্যবসায়ী, বর্ডারের নাড়িভুঁড়ি তার চেনা। তিনি চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে সাজিদের দিকে তাকালেন।
“কী রে সাজিদ, ইদানীং তোকে কেমন যেন উনমনো দেখি। ব্যবসা-বাণিজ্যে মন আছে তো?”
সাজিদ একটু থতমত খেয়ে বলল, “হ্যাঁ মামা, আছে। আসলে এই গরমের জন্য শরীরটা একটু ম্যাজম্যাজ করে।”
শওকত আলী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “বর্ডারের বাতাস ভালো না রে বাবা। এ পারের হাওয়া ওপারে যায়, ওপারের হাওয়া এপারে আসে—কিন্তু মানুষের যাতায়াত বড় কঠিন। ইদানীং শুনছি ওপারে নাকি কড়াকড়ি আরও বাড়াবে। বিএসএফের নতুন কোম্পানি এসেছে। ওরা নাকি জিরো লাইনের কাছাকাছি কাউকে ঘেঁষতে দেবে না।”
মামার কথা শুনে সাজিদের বুকের ভেতরটা যেন এক মুহূর্তের জন্য সটান দাঁড়িয়ে গেল। কড়াকড়ি বাড়বে?
তার মানে কি রিয়া আর ওই নিমগাছতলায় আসতে পারবে না? তাদের বিকেলের ওই অবোধ্য, অথচ পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর কথোপকথন কি চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে? সাজিদ আর গদিতে বসতে পারল না। এক অদ্ভুত অস্থিরতা তাকে তাড়া করে বেড়াতে লাগল।
বিকেল হওয়ার অনেক আগেই সে গিয়ে কালভার্টের ওপর বসল। আজকের আকাশটা একটু মেঘলা, সূর্যটা মেঘের আড়ালে লুকিয়ে আছে বলে গুমোট ভাবটা আরও বেশি। সাজিদ পকেটে হাত দিয়ে সেই রুমালটা শক্ত করে চেপে ধরল। তার চোখ নিবদ্ধ ওপারের সেই চেনা পথের দিকে।
সময় যেন কাটতেই চায় না। প্রতিটা মিনিট যেন এক একটি যুগের মতো ভারী হয়ে সাজিদের বুকের ওপর চেপে বসছে। অবশেষে, সূর্য যখন পশ্চিম আকাশে হেলে পড়েছে, তখন ওপাশের গলিপথ দিয়ে একটা চেনা অবয়ব বেরিয়ে এলো। রিয়া।
কিন্তু আজ রিয়ার হাঁটার গতিতে কোনো মন্থরতা নেই, আছে এক তীব্র তাড়াহুড়ো। তার পরনে একটা সাধারণ সুতির সালোয়ার-কামিজ। সে যখন নিমগাছটার নিচে এসে দাঁড়াল, সাজিদ লক্ষ্য করল তার মুখটা ভীষণ ফ্যাকাশে। চোখের নিচে কালচে ছায়া। রিয়া এদিক-ওদিক তাকাল, তার চোখে এক চরম আতঙ্ক।
সাজিদ তড়িঘড়ি করে উঠে দাঁড়াল। সে কাঁটাতারের আরও একটু কাছে এগিয়ে যেতে চাইল, কিন্তু ঠিক তখনই এপারে বিজিবির একজন জোয়ান তাকে ধমকে উঠল, “এই ছেলে! অত সামনে যাচ্ছ কেন? পেছনে সরো!” সাজিদ বাধ্য হয়ে দু পা পিছিয়ে এলো। তার বুকটা তখন কামারের হাপরের মতো ওঠানামা করছে। সে ওপারে রিয়ার দিকে তাকাল। রিয়া দেখল সাজিদকে বাধা দেওয়া হয়েছে। সে তার ডান হাতটা বুকের কাছে এনে এক অদ্ভুত ভঙ্গি করল—যেন সে কিছু লুকাতে চাইছে, অথবা কাউকে ডাকছে।
হঠাৎ করেই রিয়া তার ওড়নার আড়াল থেকে একটা ছোট চিরকুট বের করল। কাগজটা খুব ছোট, দলা পাকানো। সে চারপাশটা এক পলক দেখে নিয়ে, হাতের এক ঝটকায় কাগজটা কাঁটাতারের এপারে ছুঁড়ে দেওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু বাতাস আর দূরত্বের কারণে কাগজটা ঠিক বর্ডারের জিরো লাইনের মাঝখানে, নো-ম্যানস ল্যান্ডের কাঁটাঝোপের ভেতর গিয়ে আটকে রইল।
সাজিদের মনে হলো তার ফুসফুস থেকে সমস্ত বাতাস কেউ টেনে বের করে নিয়েছে। কাগজটা ওভাবে ওখান পড়ে থাকলে যে কোনো সময় টহলদারদের চোখে পড়ে যাবে! আর সেটা হলে রিয়ার কী শাস্তি হবে, তা ভেবেই সাজিদের হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে এলো।
ওপারে রিয়া নিজের কপালে হাত দিয়ে এক মুহূর্তের জন্য চোখ বন্ধ করল। তার মুখে চরম হতাশা আর ভয়ের ছাপ। সে সাজিদের দিকে তাকাল, তার চোখ দুটো তখন টলটল করছে অশ্রুতে। সে ঠোঁট নেড়ে কিছু একটা বলল, যার অর্থ সাজিদ উদ্ধার করতে পারল না, কিন্তু তার গভীরতা অনুভব করতে পারল। রিয়া আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না, পেছন ফিরে প্রায় দৌড়ে চলে গেল।
সাজিদ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। নো-ম্যানস ল্যান্ডের ওই কাঁটাঝোপের দিকে সে তাকাল। সাদা কাগজের টুকরোটা বাতাসের দোলায় মৃদু নড়ছে। ওটার ভেতরে কী লেখা আছে? রিয়া কেন এত ভয় পাচ্ছিল? কড়াকড়ির খবর কি তবে সত্যি? নাকি অন্য কোনো ঝড় ধেয়ে আসছে তাদের জীবনে?
সন্ধ্যা নেমে আসছে দ্রুত। কুয়াশা নেই, কিন্তু মেঘের ছায়ায় চারপাশটা অন্ধকার হয়ে আসছে। সাজিদ জানে, ওই কাগজের টুকরোটা উদ্ধার না করতে পারলে সে আজ রাতে ঘুমাতে পারবে না। কিন্তু ওখানে যাওয়া মানে নিজের জীবনকে বাজি রাখা। এক বুক নীরবতা আর তীব্র আতঙ্ক নিয়ে সাজিদ অন্ধকারের ঘন হওয়ার অপেক্ষা করতে লাগল। তাদের ভালোবাসার ওপর প্রথম কালচে ছায়াটা তখন পুরোপুরি গ্রাস করেছে সীমান্তকে।
অন্ধকার যখন আরও গাঢ় হলো, তখন আকাশের মেঘগুলো যেন আরও নিচে নেমে এলো। বর্ডারের সার্চলাইটের তীব্র আলোটা প্রতি কয়েক মিনিট পর পর বৃত্তাকারে নো-ম্যানস ল্যান্ডের ওপর দিয়ে ঘুরে যাচ্ছে। সাজিদ কালভার্টের পাশে একটা ঝোপের আড়ালে অন্ধকারে মিশে দাঁড়িয়ে ছিল। তার পুরো শরীর ঘামে ভিজে গেছে, অথচ হাতের তালু দুটো বরফের মতো ঠাণ্ডা।
সামনে জিরো লাইনের সেই কাঁটাঝোপ, যেখানে রিয়ার ছুঁড়ে দেওয়া কাগজের টুকরোটা আটকে আছে। সার্চলাইটের আলো যখন ওই জায়গাটায় পড়ে, তখন সাদা কাগজটা এক মুহূর্তের জন্য চকচক করে ওঠে, যেন সাজিদকে ইশারায় ডাকছে। সাজিদ জানে, এই কাঁটাতার পার হওয়া বা নো-ম্যানস ল্যান্ডে পা রাখা মানে সরাসরি মৃত্যুর মুখে দাঁড়ানো। দুপাশের সেন্ট্রিদের রাইফেলের ট্রিগারে সবসময় আঙুল তৈরি থাকে। সামান্য একটা সন্দেহজনক নড়াচড়াও ডেকে আনতে পারে ঝাঁঝরা বুলেট।
কিন্তু সাজিদের ভেতরে তখন কোনো যৌক্তিক ভয় কাজ করছিল না। তার চোখের সামনে কেবল ভাসছিল রিয়ার সেই অশ্রুসজল, আতঙ্কিত মুখ। ওই চিরকুটে নিশ্চয়ই এমন কিছু লেখা আছে যা তাদের দুজনের অস্তিত্বের সাথে জড়িত।
সার্চলাইটের আলোটা জাস্ট এপাশ থেকে ওপাশে ঘুরে গেল। পরবর্তী আলোটা ফিরে আসতে সময় লাগবে ঠিক এক মিনিট চল্লিশ সেকেন্ড। সাজিদ মনে মনে গুনল—এক, দুই, তিন…। সে নিচু হয়ে, প্রায় মাটির সাথে বুক মিশিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে গেল কাঁটাঝোপের দিকে। কাঁটাতারের ধারালো অগ্রভাগ তার সুতির পাঞ্জাবির হাতা ছিঁড়ে চামড়াতে গিয়ে বিঁধল। একটা তীব্র জ্বালা অনুভব করল সে, কিন্তু মুখ থেকে কোনো শব্দ বের হতে দিল না।
হাতটা বাড়িয়ে সে অন্ধের মতো খুঁজল। ঝোপের কাঁটা তার আঙুলের ডগা ছিলে দিল। রক্ত চুইয়ে পড়ছে, কিন্তু সেদিকে খেয়াল নেই। অবশেষে তার আঙুল একটা দলা পাকানো কাগজের স্পর্শ পেল। পরম যত্নে সেটা মুঠোর ভেতর পুরে নিয়ে সে ঠিক একইভাবে পেছনের দিকে পিছিয়ে এলো। সে যখন আবার নিজের পারের নিরাপদ অন্ধকারে এসে পৌঁছাল, ঠিক তখনই সার্চলাইটের তীব্র সাদা আলোটা সেই নো-ম্যানস ল্যান্ডের ওপর এসে পড়ল। সাজিদ জোরে জোরে শ্বাস নিতে লাগল, তার বুকটা তখন এত জোরে ধড়ফড় করছিল যে মনে হচ্ছিল এই বুঝি ফেটে যাবে।
সে আর এক মুহূর্তও বর্ডারে দাঁড়াল না। অন্ধকারে প্রায় অন্ধের মতো হেঁটে সে নিজের ঘরের দিকে রওনা দিল। পথে দুবার বিজিবির টহল দলের মুখোমুখি হতে হতেও সে বেঁচে গেল ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে থেকে।
নিজের ঘরে ফিরে সাজিদ দরজাটা ভেতর থেকে খিল তুলে দিল। হারিকেনের আলোটা একটু বাড়িয়ে দিল সে। তার হাত দুটো তখনও কাঁপছে। পাঞ্জাবির হাতা বেয়ে কবজি দিয়ে সামান্য রক্ত গড়িয়ে পড়ছে, সেদিকে তার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। সে পরম আবেগে মুঠোর ভেতর থেকে দলা পাকানো কাগজটা বের করল। রক্ত আর ঘামে কাগজের একটা কোণ কিছুটা ভিজে গেছে।
খুব সাবধানে, যেন কোনো পবিত্র জিনিস স্পর্শ করছে, সে ভাজগুলো খুলল। ভেতরে সস্তা নীল কালির কলমে কাঁপাকাঁপাক্ষরে লেখা কয়েকটা লাইন। লেখাগুলো ছোট ছোট, পরিচ্ছন্ন, কিন্তু দেখলেই বোঝা যায় তীব্র তাড়াহুড়ো করে লেখা।
সাজিদ পড়া শুরু করল:
“সাজিদ, হয়তো এটাই আমার তোমাকে লেখা প্রথম ও শেষ চিঠি। কাল রাত থেকে বাবা আর কাকা ঘরের ভেতর ফিসফিস করে কথা বলছেন। আমি আড়াল থেকে শুনেছি। ওপার থেকে বিএসএফের বড় বাবু এসেছিলেন। আমাদের এই কোয়ার্টারটা নাকি ভেঙে দেওয়া হবে বর্ডারের নতুন সীমানা প্রাচীর তোলার জন্য। আর… বাবা আমার বিয়ে ঠিক করেছেন ওপারের এক দূর সম্পর্কের আত্মীয়ের সাথে। ছেলে লরি চালায়, কোলকাতায় থাকে। আগামী সপ্তাহেই নাকি ওরা আমাকে নিয়ে যাবে। আমি বাঁচব না সাজিদ। আমি প্রতিদিন বিকেলে ওই নিমগাছতলায় শুধু তোমার চোখের দিকে তাকিয়ে বেঁচে থাকার শক্তি পেতাম। ওরা আমাকে চিরতরে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আমি তোমাকে ছাড়া অন্য কাউকে ভাবতে পারি না। যদি পারো, আমাকে বাঁচাও। কিন্তু কীভাবে? মাঝখানে যে এই লোহার দেয়াল। ইতি—তোমার রিয়া।”
চিঠির শেষ লাইনটা পড়তে পড়তে সাজিদের চোখের সামনে চারপাশটা যেন দুলতে লাগল। ঘরের টিমটিমে হারিকেনের আলোটাও যেন ফিকে হয়ে এলো। রিয়াকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে? কোলকাতায়? তার মানে এই হিলি বর্ডারের চেনা বিকেল, সেই বাসন্তী শাড়ির আঁচল, সেই লাল কাচের চুড়ির ঝিলিক—সব চিরতরে হারিয়ে যাবে?
সে চিঠির কাগজটা বুকের ওপর চেপে ধরল। রিয়ার কান্নার গন্ধ যেন লেগে আছে ওই সস্তা কাগজে। এই প্রথম সাজিদ অনুভব করল, সীমান্ত কেবল দুটো দেশকে আলাদা করে না, তা মানুষের ভাগ্যকে, মানুষের হৃদয়কে করাত দিয়ে কেটে দুটুকরো করে দেয়। এক টুকরো এপারে পড়ে থাকে ধুঁকে ধুঁকে মরার জন্য, আর অন্য টুকরো ওপারে ভেসে যায় এক অজানা অন্ধকারে।
সে বিছানায় বসে দেয়ালে মাথা ঠেকাল। বাইরে বাতাসের বেগ বাড়ছে। জানালার পাল্লাটা বাতাসে খটখট করে শব্দ করছে। সাজিদ বুঝতে পারছে না সে এখন কী করবে। সে একজন সাধারণ কাপড়ের ব্যবসায়ী, তার কোনো ক্ষমতা নেই এই অলঙ্ঘনীয় সীমান্ত আইনকে বুড়ো আঙুল দেখানোর। কিন্তু তার বুকের ভেতরের ভালোবাসা তো কোনো আইন চেনে না।
সে চোখ বন্ধ করল। অন্ধকার ঘরের নীরবতা যেন তাকে গ্রাস করতে চাইল। কিন্তু সেই নীরবতার গভীর থেকে এক তীব্র প্রতিজ্ঞা জন্ম নিল সাজিদের মনে। সে রিয়াকে এভাবে হারিয়ে যেতে দিতে পারে না। যদি এই সীমান্ত তাদের আলাদা করতে চায়, তবে সে এই সীমান্তের শেষ সীমানা পর্যন্ত লড়াই করবে। কিন্তু কীভাবে? এই প্রশ্নের কোনো উত্তর এই গভীর রাতে তার জানা ছিল না। শুধু জানা ছিল, এক অনিশ্চিত ঝড়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে তাদের দুটি হৃদয়।
পর্ব ১ সমাপ্ত