ব্যাংককের চ্যাও ফ্রায়া নদীর বুকে তখন গোধূলির শেষ আলোটুকু টুপ করে ডুবে যাচ্ছে। নদীর পানি ধীর গতিতে বয়ে চলেছে, যেন কোনো এক ক্লান্ত যক্ষপুরীর বুক চিরে নিঃশব্দে বয়ে যাওয়া এক কাল্পনিক ধারা। চারপাশের বাতাসে আর্দ্রতা, দূর থেকে ভেসে আসা থাই সংস্কৃতির মৃদু বাদ্যযন্ত্রের সুর আর ক্রুজ জাহাজের সার্চলাইটের আলো—সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত মায়াবী পরিবেশ। এই শহরের একটা নিজস্ব গন্ধ আছে, যা অচেনা মানুষকে মুহূর্তে গ্রাস করে নেয়, আবার চেনা মানুষকে করে তোলে ভীষণ একাকী।
নদীর ঘাটে এসে দাঁড়িয়েছিল এক তরুণী। নাম তার তানিশা। সাধারণ সুতি শাড়ি জড়ানো তার শরীরে, বাতাসে তার চুলগুলো অবাধ্য হয়ে উড়ে এসে বারবার ছুঁয়ে যাচ্ছিল তার গাল। সে কোনো ট্যুরিস্ট বাসের চেনা রুট ধরে এখানে আসেনি, এসেছে নিজের ভেতরের এক অদ্ভুত শূন্যতা লুকানোর খোঁজে। কোলাহলপূর্ণ এই ব্যাংকক শহরের এক কোণে দাঁড়িয়ে সে যখন নদীর ওপারে জ্বলতে থাকা নিয়ন আলোগুলোর দিকে তাকিয়ে ছিল, তখন সে জানত না যে ঠিক কয়েক গজ দূরেই অন্ধকার এক গলির মোড়ে দাঁড়িয়ে এক জোড়া তীক্ষ্ণ চোখ তাকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
সেই চোখ দুটো মোয়াজ্জেমের। কিন্তু এই মুহূর্তে তার কোনো নির্দিষ্ট নাম নেই, নেই কোনো স্থায়ী পরিচয়। সে একজন ছদ্মবেশী সিক্রেট এজেন্ট, যার জীবন প্রতি মুহূর্তে মৃত্যুর সুতোয় ঝুলে থাকে। তার পরনে কালো জ্যাকেট, চোখের ওপর হালকা ঝুঁকে থাকা চুল আর চোয়ালের কঠিন রেখা বলে দিচ্ছিল যে সে এই মায়াবী সন্ধ্যার আনন্দ উপভোগ করতে এখানে আসেনি। তার কান সচল রয়েছে ওয়ারলেসের অদৃশ্য সিগন্যালে, আর চোখ জোড়া খুঁজছে এক কুখ্যাত আন্তর্জাতিক পাচারকারী দলের স্থানীয় এজেন্টকে।
হঠাৎ করেই মোয়াজ্জেমের নজরে এলো এক অদ্ভুত বৈপরীত্য। এই নিঝুম, কিছুটা বিপজ্জনক ঘাটের দিকে এগিয়ে আসছে চার-পাঁচজন স্থানীয় যুবক, যাদের হাঁটার ভঙ্গি এবং চোখের চাউনি ভালো কিছু ইঙ্গিত করছিল না। আর তাদের মূল লক্ষ্য ওই একা দাঁড়িয়ে থাকা বাঙালি মেয়েটি। মোয়াজ্জেম নিজের মিশনের কথা এক মুহূর্তের জন্য ভুলে গেল। তার ভেতরের পেশাদারিত্বকে ছাপিয়ে জেগে উঠল এক অদ্ভুত মানবিক টান, অথবা হয়তো এক অলৌকিক নিয়তি।
যুবকগুলো তানিশার খুব কাছে চলে এলো। একজন থাই ভাষায় কিছু একটা বলে তানিশার হাত ধরার চেষ্টা করতেই তানিশা ভয়ে আঁতকে উঠল। তার চোখের কোণে তখন ভয়ের নীল জল। ঠিক সেই মুহূর্তে, এক ঝড়ের গতিতে তাদের মাঝখানে এসে দাঁড়াল মোয়াজ্জেম। কোনো কথা না বলে, অত্যন্ত নিখুঁত এবং পেশাদারী দক্ষতায় সে প্রথম যুবকের কবজি ধরে এমন এক মোচড় দিল যে সে ব্যথায় চিৎকার করে মাটিতে বসে পড়ল। বাকিরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই মোয়াজ্জেমের শক্ত বুটের লাথি আর কনুইয়ের আঘাতে তারা ছিটকে গেল। পুরো ঘটনাটি ঘটল মাত্র কয়েক সেকেন্ডে, কোনো শব্দ বা আড়ম্বর ছাড়াই।
মোয়াজ্জেম তানিশার হাত শক্ত করে ধরল। তার হাতের স্পর্শে কোনো রুক্ষতা ছিল না, ছিল এক অদ্ভুত অভয়বাণী। সে তানিশার চোখের দিকে তাকিয়ে নিচু কিন্তু গভীর গলায় বলল, “কথা বলার সময় নেই। আমাদের এখান থেকে এখনই পালাতে হবে। ওরা একা নয়, ওদের পুরো গ্যাং আশেপাশে আছে।”
তানিশা কিছু জিজ্ঞেস করার সুযোগ পেল না। অজানা এক আশঙ্কায় আর এই অচেনা যুবকের চোখের এক সম্মোহনী শক্তিতে সে নিজেকে সঁপে দিল। তারা দুজন দৌড়াতে শুরু করল ব্যাংককের ব্যস্ত, আলো-আঁধারিতে ঘেরা অলিগলি ধরে। পেছনে তখন শোনা যাচ্ছে পায়ের শব্দ এবং থাই ভাষায় কিছু কর্কশ চিৎকার। বাতাসে তখন বৃষ্টির পূর্বাভাস, এক ভারী আর্দ্রতা চারপাশকে আরও জটিল করে তুলছিল।
দৌড়াতে দৌড়াতে তানিশার পরনের শাড়ির আঁচল উড়ে যাচ্ছিল, আর মোয়াজ্জেমের শক্ত মুঠো তার হাতটাকে আগলে রেখেছিল যেন এক পরম নির্ভরতায়। গোলকধাঁধার মতো গলির ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় এক জায়গায় এসে মোয়াজ্জেম তানিশাকে দেয়ালের সাথে চেপে ধরে নিজের শরীর দিয়ে আড়াল করল। এত কাছাকাছি তারা দাঁড়িয়ে ছিল যে, তানিশা স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিল মোয়াজ্জেমের ঘন ঘন নিঃশ্বাসের শব্দ। মোয়াজ্জেমের চোখ দুটো তখন বাইরের গলির দিকে, কিন্তু তানিশার চোখ আটকে গিয়েছিল মোয়াজ্জেমের ক্ষতবিক্ষত কিন্তু শান্ত মুখের দিকে।
বাইরে তখন তাড়া করে আসা গ্যাংস্টারদের কোলাহল ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে। কিন্তু এই দেয়ালের আড়ালে, দুই জোড়া চোখের নীরব ভাষায় এক অদ্ভুত অনুভূতির জন্ম নিচ্ছিল। তানিশা ফিসফিস করে বলল, “আপনি কে?”
মোয়াজ্জেম তানিশার চোখের দিকে তাকাল। তার চোখের সেই চেনা পেশাদারী শীতলতা যেন এক নিমেষে গলে জল হয়ে গেল। সে মৃদু হেসে বলল, “আমি কেউ নই। জাস্ট এক পথচারী, যে ভুল সময়ে সঠিক জায়গায় চলে এসেছে।”
কিন্তু তানিশার মন সেই উত্তর মেনে নিতে পারল না। সে দেখল মোয়াজ্জেমের জ্যাকেটের নিচে লুকানো এক ধাতব বস্তুর অবয়ব, যা সাধারণ মানুষের কাছে থাকে না। এক অদ্ভুত রহস্য আর বিপদের গন্ধ পেয়েও তানিশা কেন যেন ভয় পেল না, বরং তার মনে হলো—এই চেনা পৃথিবীর বুকে এই অচেনা মানুষটাই তার সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়। কিন্তু সে জানত না, এই আশ্রয়ের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক গভীর অন্ধকারের গল্প, যা তাদের দুজনকে এক অনন্ত দূরত্বের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
ব্যাংককের রাত যত বাড়ে, নিয়ন আলোগুলোর তীব্রতা যেন ততটাই উগ্র হয়ে ওঠে। পাতপং-এর সুুুুউচ্চ বহুতল ভবনগুলোর ছাদ থেকে নেমে আসা রঙিন আলো তখন চ্যাও ফ্রায়া নদীর শান্ত পানির ওপর এক কৃত্রিম মায়াজাল তৈরি করেছে। বাতাসে ভেসে আসছে থাই স্ট্রিট ফুডের চেনা সুবাস, সঙ্গে সামুদ্রিক নোনা জলের এক অদ্ভুত আর্দ্রতা।
মোয়াজ্জেম আর তানিশা তখনও এক অন্ধকার গলির শেষ মাথায়, একটা পরিত্যক্ত সুভ্যেনির শপের শেডের নিচে দাঁড়িয়ে ছিল। দুজনেরই বুক কাঁপছিল দ্রুত গতিতে। তবে তানিশার কম্পন ছিল ভয়ের, আর মোয়াজ্জেমের বুকের ভেতর চলছিল এক তীব্র মানসিক দ্বন্দ্ব। তার দীর্ঘদিনের প্রশিক্ষিত মন বারবার বলছিল, ‘এই মেয়েটিকে এখানেই ছেড়ে দাও। তোমার মিশন ঝুঁকির মুখে।’ কিন্তু তার ভেতরের সুপ্ত মানুষটি কিছুতেই এই অসহায় চোখ দুটোকে বিপদের মুখে ফেলে চলে যেতে পারছিল না।
“আমরা কি এখন নিরাপদ?” তানিশা ধীর গলায় প্রশ্ন করল। তার কণ্ঠস্বর তখন ভয়ের চোটে কাঁপছে, দুই হাত দিয়ে সে নিজের শাড়ির আঁচলটা শক্ত করে চেপে ধরে রেখেছে।
মোয়াজ্জেম গলির বাইরে একবার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাল। তারপর তানিশার দিকে ফিরে নিজের কণ্ঠস্বর যতটা সম্ভব স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে বলল, “আপাতত ওরা আমাদের ট্র্যাক হারাতে পেরেছে। কিন্তু এই এলাকাটা ওদের চেনা। যেকোনো মুহূর্তে ওরা আবার ফিরে আসতে পারে। আপনার হোটেল কোথায়?”
“সুকুমভিত রোডের দিকে একটা ছোট গেস্ট হাউজে,” তানিশা নিচু চোখে উত্তর দিল। “আমি একা একাই ঘুরতে বেরিয়েছিলাম। বুঝতে পারিনি এই ঘাটটা এত রাতে এতটা নির্জন আর বিপজ্জনক হয়ে যাবে।”
মোয়াজ্জেম মনে মনে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সুকুমভিত এখান থেকে বেশ দূরে। আর এই মুহূর্তে কোনো পাবলিক ট্যাক্সি নেওয়া মানেই নিজেদের লোকেশন শত্রুদের জানিয়ে দেওয়া। কারণ, এই শহরের লোকাল গ্যাংস্টারদের নেটওয়ার্ক অত্যন্ত শক্তিশালী, বিশেষ করে নদীর আশেপাশের অঞ্চলগুলোতে।
“চলুন আমার সাথে। সোজা রাস্তায় যাওয়া যাবে না,” মোয়াজ্জেম সংক্ষিপ্ত ভঙ্গিতে বলল।
তানিশা কোনো প্রশ্ন করল না। এই অচেনা মানুষটার শরীরে এক অদ্ভুত কর্তৃত্ব আছে, যা অবাধ্য হতে দেয় না। তারা আবার হাঁটতে শুরু করল। এবার আর দৌড়ানো নয়, বরং অতি সাধারণ দুজন ট্যুরিস্টের মতো স্বাভাবিক ভঙ্গিতে মিশে গেল চেইনাটাউনের জনাকীর্ণ গলির ভিড়ে। চারপাশের চীনা লণ্ঠনের লাল আলো তানিশার ফর্সা মুখে এসে পড়ছিল, আর মোয়াজ্জেম পাশ থেকে সেই মুখের দিকে তাকিয়ে এক অদ্ভুত মায়া অনুভব করছিল। তার দীর্ঘ ছদ্মবেশী জীবনে কত শত মানুষের সাথে তার পরিচয় হয়েছে, কত নারীর সান্নিধ্যে সে এসেছে মিশনের খাতিরে, কিন্তু এই সাধারণ মেয়েটির চোখের সরলতা কেন যেন তার চেনা পাথুরে মনটাকে নাড়িয়ে দিচ্ছিল।
“আপনার নামটা কিন্তু এখনও বলেননি,” তানিশা ভিড়ের মাঝে মোয়াজ্জেমের একটু কাছে ঘেঁষে এসে বলল।
মোয়াজ্জেম এক মুহূর্ত থমকে গেল। তার আসল নাম সে কাউকে বলতে পারে না। ওটা ফাইলের লাল কালিতে বন্ধ এক গোপন রহস্য। সে নিজের মনের ভেতর দ্রুত একটা নাম হাতড়ে নিয়ে বলল, “মুনিম। আমি এখানে একটা এক্সপোর্ট-ইম্পোর্ট ফার্মের কাজে এসেছি।”
“মিথ্যা বলছেন,” তানিশা সোজা মোয়াজ্জেমের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল। “একজন এক্সপোর্ট ব্যবসায়ী ওভাবে চারজন সশস্ত্র গুন্ডাকে এক নিমেষে মাটিতে ফেলে দিতে পারে না। আর আপনার জ্যাকেটের নিচে ওটা কী? আমি অন্ধ নই, মুনিম সাহেব।”
মোয়াজ্জেমের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। সে বুঝতে পারল, এই মেয়েটি কেবল সরল নয়, যথেষ্ট বুদ্ধিমানও বটে। সে মৃদু হেসে বলল, “ব্যাংককের মতো শহরে একা চলতে গেলে কিছু আত্মরক্ষা জানা থাকা ভালো। আর ওটা একটা লাইটার, কোনো অস্ত্র নয়।”
তানিশা আর কথা বাড়াল না, তবে তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে অবিশ্বাসের হাসি ফুটে উঠল। সেই হাসিটা ছিল এক কুহকের মতো, যা মোয়াজ্জেমকে আরও বেশি আবিষ্ট করে তুলছিল।
হাঁটতে হাঁটতে তারা এসে পৌঁছাল এক ছোট, নিরিবিলি থাই ক্যাফের সামনে। ক্যাফেটির বাইরে কাঠের তৈরি ছোট ছোট টেবিল-চেয়ার পাতা। মোয়াজ্জেম চারপাশটা ভালো করে পরীক্ষা করে নিয়ে তানিশাকে বসার ইঙ্গিত করল।
“এখানে একটু বসুন। আমি আসছি,” বলে মোয়াজ্জেম ক্যাফের ভেতরে ঢুকে গেল।
তানিশা একা বসে রইল। রাতের বাতাস তখন কিছুটা ভারী হয়ে আসছিল। দূর আকাশ থেকে মেঘের ডাক শোনা যাচ্ছে। ব্যাংককের এই এক অদ্ভুত নিয়ম, হুট করেই বৃষ্টি নেমে আসে কোনো আগাম বার্তা ছাড়াই। তানিশা নিজের হাত দুটোর দিকে তাকাল। যে হাতটা একটু আগে মুনিম নামের এই অদ্ভুত মানুষটি ধরে রেখেছিল, সেখানে এখনও এক মৃদু ওষ্ণতা লেগে আছে। সে নিজেকে বারবার প্রশ্ন করছিল—কে এই মানুষটি? কেন সে নিজের জীবন বাজি রেখে তাকে বাঁচাতে গেল?
কিছুক্ষণ পর মোয়াজ্জেম ফিরে এলো হাতে দুটো ধোঁয়া ওঠা থাই গ্রিন টি-র কাপ নিয়ে। সে একটা কাপ তানিশার দিকে এগিয়ে দিয়ে নিজে উল্টো দিকের চেয়ারটায় বসল।
“চা-টা খেয়ে নিন। ক্লান্তি কাটবে,” মোয়াজ্জেম বলল।
তানিশা কাপটা হাতে নিয়ে আলতো করে চুমুক দিল। চায়ের ওষ্ণতা তার ভেতরের জড়তা কিছুটা কমিয়ে দিল। সে মোয়াজ্জেমের দিকে তাকিয়ে বলল, “ধন্যবাদ। আজ আপনি না থাকলে আমার কী হতো, আমি ভাবতেও পারছি না।”
“ধন্যবাদ দেওয়ার কিছু নেই। যেকোনো মানুষই এটা করত,” মোয়াজ্জেম উদাসীনভাবে বলল।
“সব মানুষ করে না,” তানিশা দৃঢ় গলায় বলল। “মানুষ আজকাল নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত থাকে। আপনি নিজের ঝুঁকি নিয়ে আমাকে বাঁচিয়েছেন। আপনার এই ঋণ আমি কোনোদিন শোধ করতে পারব না।”
মোয়াজ্জেম চায়ের কাপে চোখ রেখে বলল, “ঋণের কথা ভাববেন না। কাল সকালেই হয়তো আমরা দুজন দুদিকে চলে যাব। এই শহরের ভিড়ে আমাদের আর কোনোদিন দেখাও হবে না। এটাকে একটা দুঃস্বপ্ন ভেবে ভুলে যাবেন।”
ভুলে যাওয়া? তানিশার বুকের ভেতর কেমন যেন একটা মোচড় দিয়ে উঠল। এই কয়েক ঘণ্টার তীব্র উত্তেজনা, এই অদ্ভুত মায়াবী রাত, আর এই মানুষটার চোখের শান্ত গভীরতা—এসব কি এত সহজে ভুলে যাওয়া সম্ভব?
হঠাৎ করেই আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামল। বড় বড় ফোঁটায় বৃষ্টি পড়তে শুরু করল ক্যাফের কাঠের ছাদের ওপর। চারপাশের মানুষজন দিগ্বিদিক ছুটে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজ করতে লাগল। মোয়াজ্জেম আর তানিশা ক্যাফের শেডের নিচে আরও কিছুটা কাছাকাছি চলে এলো। বৃষ্টির ছাঁট এসে লাগছিল তানিশার মুখে, তার চুলগুলো আবার ভিজে জাপ্টে যাচ্ছিল কপালে।
ঠিক তখনই মোয়াজ্জেমের পকেটে থাকা গোপন ডিভাইসটি ভাইব্রেট করে উঠল। সে চট করে আড়ালে গিয়ে সিগন্যালটি চেক করল। স্ক্রিনে ভেসে উঠেছে তার হেডকোয়ার্টারের জরুরি বার্তা: ‘টার্গেট তোমাকে চিনে ফেলেছে। ওরা ক্যাফে এলাকার দিকেই এগোচ্ছে। অবিলম্বে স্থান ত্যাগ করো।’
মোয়াজ্জেমের বুকের ভেতরটা হিম হয়ে গেল। তার একটা ভুলের জন্য এখন এই নিষ্পাপ মেয়েটির জীবনও চরম বিপন্ন। সে দ্রুত তানিশার কাছে ফিরে এলো এবং তার কাপটা টেবিল ছুড়ে ফেলে দিয়ে হাতটা শক্ত করে ধরল।
“কী হয়েছে?” তানিশা চমকে উঠে জিজ্ঞেস করল।
“ওরা আমাদের খুঁজে পেয়েছে। আমাদের এখনই এই বৃষ্টির মধ্যে বের হতে হবে,” মোয়াজ্জেমের কণ্ঠে এবার আর কোনো লুকোচুরি ছিল না, ছিল এক চরম সত্যের কঠোরতা।
তারা ক্যাফে থেকে বের হয়ে বৃষ্টির মধ্যেই দৌড়াতে শুরু করল। কিন্তু এবার গলি পেরিয়ে প্রধান সড়কের কাছাকাছি আসতেই একটা কালো রঙের কাঁচ ঢাকা গাড়ি তীব্র গতিতে এসে তাদের সামনে ব্রেক কষল। গাড়ির দরজা খুলে বেরিয়ে এলো দুজন চওড়া কাঁধের মানুষ, যাদের হাতে চকচক করছে রিভলভারের নল।
মোয়াজ্জেম তানিশাকে নিজের পেছনে টেনে নিল। বৃষ্টির জলের সাথে মিশে যাচ্ছিল তার কপালের ঘাম। দূরত্বের দেয়ালটা যেন আরও দীর্ঘ হতে শুরু করল, কারণ মোয়াজ্জেম বুঝতে পারল—তার বিপজ্জনক জীবন এবার তানিশাকে এক অন্ধকার অতলে টেনে নিয়ে এসেছে।
বৃষ্টির ধারা তখন আরও তীব্র রূপ নিয়েছে। ব্যাংককের আকাশ ভেঙে যেন এক অনন্ত জলরাশি নেমে এসেছে চ্যাও ফ্রায়ার বুক চিরে। কালো রঙের গাড়িটার হেডলাইটের তীব্র আলো এসে পড়ছিল মোয়াজ্জেম আর তানিশার মুখে। তীব্র আলোয় চোখ দুটো কুঁচকে গেল তানিশার, কিন্তু মোয়াজ্জেমের দৃষ্টি স্থির। তার পুরো শরীর এক অদৃশ্য স্প্রিংয়ের মতো টানটান হয়ে উঠেছে, যা যেকোনো মুহূর্তে অবমুক্ত হওয়ার জন্য প্রস্তুত।
গাড়ি থেকে নেমে আসা দুই থাই গ্যাংস্টার কোনো কথা বলার সুযোগ দিল না। প্রথমজন রিভলভারের ব্যারেল সোজা মোয়াজ্জেমের বুক লক্ষ্য করে তাক করতেই মোয়াজ্জেম চোখের পলকে এক অবিশ্বাস্য কাণ্ড ঘটাল। সে তানিশাকে সজোরে একপাশে ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে দিল এবং নিজে স্লাইড করে অপরাধীর পায়ের ওপর আছড়ে পড়ল। বৃষ্টির পানিতে ভেজা পিচ্ছিল রাস্তায় মোয়াজ্জেমের এই আকস্মিক মুভমেন্ট শত্রুর হিসাব নিকাশ ওলটপালট করে দিল।
একটি চাপা গুলির শব্দ হলো, কিন্তু বুলেটটি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে ক্যাফের সাইনবোর্ডে গিয়ে লাগল। মোয়াজ্জেম মাটিতে পড়েই লোকটির পা টেনে ধরে তাকে আছাড় মারল। মাটিতে পড়ার সাথে সাথেই লোকটির হাত থেকে অস্ত্রটি ছিটকে গেল বৃষ্টির পানির নালায়। দ্বিতীয়জন গুলি করার আগেই মোয়াজ্জেম তার জ্যাকেটের ভেতর থেকে এক বিশেষ ধরনের ট্যাকটিক্যাল নাইফ বের করে লোকটির উরুতে গেঁথে দিল। এক আর্তনাদ করে সেও মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।
“তানিশা, উঠুন!” মোয়াজ্জেমের চিৎকার বৃষ্টির শব্দের মাঝেই বাতাসে চাবুকের মতো শোনাল।
তানিশা তখনও মাটিতে পড়ে কাঁপছিল, তার শাড়ি কাদায় আর পানিতে মাখামাখি। সে কোনোমতে উঠে দাঁড়াতেই মোয়াজ্জেম তার হাত ধরে আবার এক অন্ধকার, সরু গলির দিকে ছুটল। এই গলিটি মূল চেইনাটাউন থেকে কিছুটা ভেতরের দিকে চলে গেছে, যেখানে দিনের আলোতেও মানুষ সহজে প্রবেশ করতে চায় না।
গলির ভেতরে তখন ঘুটঘুটে অন্ধকার। শুধু দূর থেকে ভেসে আসা নিয়ন আলোর একটা ক্ষীণ আভা গলির দেয়ালে আবছা ছায়া তৈরি করছিল। মোয়াজ্জেম তানিশাকে টেনে নিয়ে এক পরিত্যক্ত সুয়্যারেজ পাম্পের পাশে এসে দাঁড় করাল। লোহার একটা ভারী দরজার আড়ালে নিজেদের লুকিয়ে ফেলে তারা দুজনই হাঁপাতে লাগল।
তানিশা থরথর করে কাঁপছিল। শীত না থাকলেও বৃষ্টির তীব্রতা আর ভয়ের চরম আতঙ্ক তাকে অসাড় করে দিয়েছিল। সে মোয়াজ্জেমের জ্যাকেটের কলার দুটো হাত দিয়ে খপ করে ধরে ফেলল। তার চোখ দিয়ে তখন অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে, যা বৃষ্টির জলের সাথে মিশে একাকার।
“আপনি কে? আমাকে সত্যি করে বলুন, ওটা কি গুলির শব্দ ছিল? ওরা আপনাকে মারতে চায় কেন? আর আমি… আমি কেন এই নরকে জড়িয়ে গেলাম?” তানিশার কণ্ঠস্বর কান্নায় ভেঙে পড়ল।
মোয়াজ্জেম চুপ করে রইল। তার বুকটা ধকধক করে কাঁপছে। এই প্রথম সে নিজের কর্তব্যের সামনে এক গভীর অপরাধবোধ অনুভব করল। একজন এজেন্টের কোনো আবেগ থাকতে নেই, কোনো দুর্বলতা থাকতে নেই। কিন্তু এই মেয়েটির চোখের জল তার বুকের ভেতর এক অজানা ক্ষতের সৃষ্টি করছিল।
সে আলতো করে তানিশার কাঁধে হাত রাখল। মোয়াজ্জেমের হাতের সেই ওষ্ণতা তানিশার কাঁপুনি কিছুটা কমিয়ে দিল। মোয়াজ্জেম নিচু, গম্ভীর কিন্তু অসম্ভব নরম গলায় বলল, “তানিশা, আমার দিকে তাকান।”
তানিশা চোখ তুলে তাকাল। অন্ধকারেও মোয়াজ্জেমের চোখের মণি দুটো এক অদ্ভুত ছায়ার মতো জ্বলছিল।
“আমি আপনাকে বলেছিলাম, আমার সাথে থাকলে আপনার বিপদ বাড়বে। আমার জীবনটা এক অন্ধকার ছায়াপথ, যেখানে নক্ষত্ররা জন্ম নেওয়ার আগেই মারা যায়। আমি কে, সেটা জানার চেয়ে বড় সত্য হলো—এই মুহূর্তে ওরা আপনাকেও আমার সহযোগী ভাবছে। তাই আপনাকে নিরাপদ না করা পর্যন্ত আমি আপনাকে ছাড়তে পারছি না। আপনি কি আমার ওপর ভরসা রাখতে পারেন?”
তানিশা মোয়াজ্জেমের চোখের সেই গভীর বিষাদ আর সততা দেখতে পেল। এই মানুষটি চাইলে তাকে ফেলে একাই পালিয়ে যেতে পারত। তার ট্রেইনিং আর ক্ষমতা দিয়ে সে নিমেষেই এই শহর থেকে উধাও হতে পারত, কিন্তু সে তা করেনি। সে তানিশাকে আগলে রেখেছে।
“আমি ভয় পাচ্ছি, মুনিম,” তানিশা ফিসফিস করে বলল, অবচেতনভাবেই সে মোয়াজ্জেমের ছদ্মনামটি ধরে ডাকল।
“ভয় পাবেন না। যতক্ষণ আমার শরীরে শেষ নিঃশ্বাস আছে, কেউ আপনার গায়ে হাত দিতে পারবে না,” মোয়াজ্জেমের এই একটি বাক্যে যেন এক অলৌকিক শক্তি ছিল। তানিশার মনের ভেতরের সব সংশয় এক মুহূর্তে কেটে গেল।
বৃষ্টির বেগ একটু কমে এলে মোয়াজ্জেম পকেট থেকে তার আসল যোগাযোগের ডিভাইসটি বের করল। অত্যন্ত চতুরতার সাথে সে লোকাল নেটওয়ার্ক হ্যাক করে একটা ছদ্মবেশী ট্যাক্সি বুক করল, যা কোনো সাধারণ ট্র্যাকিং সিস্টেমে ধরা পড়বে না।
প্রায় বিশ মিনিট পর গলির মুখে একটা পুরনো ধূসর রঙের গাড়ি এসে দাঁড়াল। মোয়াজ্জেম তানিশাকে নিয়ে দ্রুত গাড়িতে উঠে বসল। চালক এক বৃদ্ধ থাই নাগরিক, যে মোয়াজ্জেমের ইশারায় কোনো কথা না বলে গাড়ি স্টার্ট দিল।
গাড়ির পেছনের সিটে তারা দুজন পাশাপাশি বসে ছিল। জানালার বাইরে ব্যাংকক শহরের আলোগুলো দ্রুত পেছনে ছুটে যাচ্ছিল, যেন এক একটা রঙিন উল্কাপাত। তানিশার মাথাটা ক্লান্তিতে আর মানসিক চাপে একসময় মোয়াজ্জেমের কাঁধের ওপর হেলে পড়ল। সে ঘুমিয়ে পড়েছে।
মোয়াজ্জেম নড়াচড়া করল না। সে জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল। তার কাঁধে তানিশার মৃদু নিঃশ্বাসের স্পর্শ লাগছিল। সে তার ডান হাতটা আলতো করে তানিশার চুলের ওপর রাখল। এক চরম নিষিদ্ধ ভালোলাগা তার মনের কোণে উঁকি দিচ্ছিল। কিন্তু সে জানত, এই ভালোলাগা এক মায়াজাল মাত্র। হেডকোয়ার্টার থেকে ইতিমিধ্যেই নতুন নির্দেশ চলে এসেছে—আগামীকাল ভোরের আলো ফোটার আগেই তাকে মূল টার্গেটের ডেরায় হানা দিতে হবে।
গাড়ি এসে থামল ব্যাংককের উপকণ্ঠে এক নিরিবিলি মোটেলে। মোয়াজ্জেম তানিশাকে আলতো করে ডেকে তুলল। কিন্তু মোটেলে ঢোকার মুখে কাউন্টারে বসা লোকটির চোখের এক অদ্ভুত চাউনি দেখে মোয়াজ্জেমের মন আবার কু ডাকল। এখানেও কি শত্রুর ছায়া পৌঁছে গেছে? দূরত্বের এক নতুন দেয়াল যেন তাদের মাঝখানে নিঃশব্দে খাড়া হচ্ছিল।
পর্ব ১ সমাপ্ত