অন্ধকার ঘরে পুরনো চামড়ার গন্ধ আর আর্দ্রতার মিশেল। ধুলোয় জমাট বেঁধে থাকা প্রত্নতাত্ত্বিক মানচিত্রটার ওপর লণ্ঠনের আলো এসে পড়েছে। জগদীশ বাবু কাঁপাকাঁপা হাতে মানচিত্রের রেখাগুলোর ওপর আঙুল বোলালেন। মানচিত্রটি সাধারণ নয়, এটি কয়েকশ বছর পুরনো তালপাতায় খোদাই করা। তাতে স্পষ্ট ভাষায় লেখা—‘যক্ষপুরীর চাবুক’।
বাইরে শ্রাবণধারার অবিরাম বর্ষণ। বাংলার গহীন অরণ্যে অবস্থিত সেই পরিত্যক্ত রাজবাড়ির ধ্বংসাবশেষের কথা মনে পড়তেই জগদীশ বাবুর শিরদাঁড়া দিয়ে একটা হিমস্রোত বয়ে গেল। লোকগাথা বলে, মাটির নিচে সাত রাজার ধন লুকিয়ে আছে, কিন্তু সেই ধনসম্পদ মানুষের ভোগের জন্য নয়। ওটি পাহারা দিচ্ছে এক অদৃশ্য, অভিশপ্ত সত্তা।
হঠাৎই জানলার কাঁচে এক বিকট শব্দে ধাক্কা লাগল। যেন কোনো বিশাল ডানাওয়ালা প্রাণী ডানা ঝাপটাচ্ছে। জগদীশ বাবু দ্রুত মানচিত্রটা গুটিয়ে নিলেন। টেবিলের ওপর পড়ে থাকা ডায়েরিটা খুলতেই পাতা থেকে একটা প্রাচীন ধাতব চাবি ঝনঝন করে নিচে পড়ল। চাবিটার গায়ে অদ্ভুত এক প্রতীক—একটি কুণ্ডলী পাকানো সাপের ওপর একটি ছিন্নভিন্ন চাবুক। এটাই কি সেই চাবুক? যা দিয়ে অদৃশ্য সত্তা নিজের সাম্রাজ্য শাসন করে?
তিনি জানতেন, এই যাত্রার কোনো প্রত্যাবর্তন নেই। কৌতুহলের বশবর্তী হয়ে তিনি রাজবাড়ির সেই গোপন দরজাটি উন্মোচন করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি জানতেন না, যে দরজায় হাত দিয়েছেন, তা খুলে গেলে অশুভ ছায়াগুলো দুনিয়ায় নেমে আসবে। হঠাৎ ঘরের আলো দপ করে নিভে গেল। ঘোর অন্ধকার। জানলার বাইরে বৃষ্টির শব্দ থেমে গেছে, এখন শুধুই নিস্তব্ধতা—এক ভয়ানক, পাথুরে নিস্তব্ধতা।
হঠাৎ পায়ের কাছে কিছু একটা খসখস করে উঠল। তিনি হাতের লণ্ঠনটা জ্বালাতে গিয়ে দেখলেন, সেটি পাথরের মেঝেতে পড়ে আছে। নিভে যাওয়া লণ্ঠনের পাশে কালো আলকাতরার মতো কিছু একটা জমাট বাঁধছে। সেটা তরল, কিন্তু তার নড়াচড়া প্রাণীর মতো। জগদীশ বাবু পিছিয়ে যেতেই দেখলেন, দরজার কোণে একটা ছায়া মূর্ত হয়ে উঠেছে। সেটি মানুষের মতো, কিন্তু তার আকার অমানবিক লম্বা। সেটির হাতে সেই প্রাচীন চাবুকের মতোই এক দীর্ঘ, কালো রেখা দেখা যাচ্ছে।
তিনি চিৎকার করতে চাইলেন, কিন্তু গলা দিয়ে শব্দ বের হলো না। সেই ছায়াটি ইশারায় যেন তাকে ডাকছে। যেন বলছে, ‘যে দরজা খুলেছ, তার মাশুল এখন দিতেই হবে।’ জগদীশ বাবু নিজের অজান্তেই দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন। ঘর থেকে বেরিয়ে বারান্দায় আসতেই দেখলেন, চারপাশের পৃথিবী বদলে গেছে। রাজবাড়ির সেই জীর্ণ দেওয়ালগুলো হঠাৎ নতুন হয়ে উঠেছে, আর মাটির নিচ থেকে ভেসে আসছে অদ্ভুত এক গুঞ্জন—যেন হাজার হাজার মানুষ একসাথে আর্তনাদ করছে।
তিনি দৌড়াতে শুরু করলেন। পিছু পিছু সেই অদৃশ্য সত্তার পায়ের আওয়াজ। প্রতিটি পদক্ষেপে মাটির নিচে এক গভীর কম্পন অনুভূত হচ্ছে। অরণ্যের গহীন থেকে আসা ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক হঠাৎ থেমে গেছে। রাজবাড়ির মূল ফটকটি খোলা। সেই খোলা ফটকের ভেতর থেকে এক নীল রঙের আভা বেরিয়ে আসছে। তিনি বুঝতে পারলেন, এটাই সেই যক্ষপুরী। কিন্তু ভেতরে যাওয়ার অর্থ নিজেকে অন্ধকারের হাতে সঁপে দেওয়া।
পেছন থেকে এক হিমশীতল বাতাসের ঝাপটা তাঁর ঘাড়ের ওপর দিয়ে বয়ে গেল। তিনি বুঝতে পারলেন, সত্তাটি ঠিক তাঁর পেছনে দাঁড়িয়ে আছে। সেটির দীর্ঘ নখ তাঁর কাঁধ স্পর্শ করল। জগদীশ বাবু এক পা এগিয়ে ফটকের ভেতরে ঝাঁপ দিলেন। কিন্তু ভেতরে পড়ে তিনি যা দেখলেন, তাতে তাঁর রক্ত হিম হয়ে গেল। মেঝেতে সারি সারি মানুষের কঙ্কাল, তাদের সবার হাতে একটা করে অদ্ভুত মুদ্রা। এবং ঠিক সামনেই সেই প্রাচীন সিংহাসন, যার ওপর বসে আছে এক অশরীরী ছায়া। সেই ছায়ার হাতে জ্বলজ্বল করছে সেই অভিশপ্ত চাবুক।
তিনি দেখলেন, সিংহাসনের ওপর খোদাই করা নামগুলো পরিচিত—তাঁর হারিয়ে যাওয়া বন্ধুদের নাম। তিনি বুঝতে পারলেন, তিনি কেবল নিজের জীবন বাজি রাখেননি, তিনি এক এমন খেলায় জড়িয়েছেন যার শেষ কোথায় তা কেউ জানে না। সেই সত্তাটি হঠাৎ চাবুকটি শূন্যে ঘোরাল। একটা বিকট শব্দে ঘরটি কেঁপে উঠল, আর ঠিক তখনই তিনি দেখলেন—তাঁর নিজের ছায়াটা দেওয়াল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আলাদা হয়ে যাচ্ছে। সেটি তাঁর দিকেই তেড়ে আসছে, যেন তাকে শেষ করে দিতেই এই রূপান্তর।
তিনি প্রাণপণে দৌড়াতে লাগলেন সেই সুরঙ্গপথ ধরে। কিন্তু সুরঙ্গটি ছোট হতে শুরু করেছে। দেওয়ালগুলো ক্রমশ সংকীর্ণ হচ্ছে। বাতাসের অভাব অনুভব করছেন তিনি। বাঁচার কোনো পথ নেই। তিনি যখন সুরঙ্গের শেষ মাথায় পৌঁছালেন, দেখলেন সেখানে এক গভীর খাদ। আর সেই খাদের ওপারে দেখা যাচ্ছে ভারতের কোনো এক মন্দিরের আলোকচ্ছটা। কিন্তু খাদের নিচে? নিচে অসংখ্য সাপের ফণা দুলছে। তিনি এখন খাদের কিনারে দাঁড়িয়ে, পেছনে সেই সত্তার খসখস শব্দ এগিয়ে আসছে। ঝাঁপ দেওয়া ছাড়া আর কোনো পথ খোলা নেই।
অতল গহ্বরের কিনারে দাঁড়িয়ে জগদীশ বাবু যখন নিচে তাকালেন, মনে হলো পাতালপুরীর কোনো এক অন্ধকার মুখ হাঁ করে তাকে স্বাগত জানাচ্ছে। খাদের ভেতর থেকে উঠে আসছে নোনা স্যাঁতসেঁতে গন্ধ, আর সেই সাথে সাপের বিষাক্ত ফণায় ঘর্ষণের মৃদু হিসহিস শব্দ। পেছনে সেই ছায়াসঙ্গী—যে এখন তার নিজের ছায়া থেকে জন্ম নেওয়া এক অভিশপ্ত প্রতিচ্ছবি—তার শীতল আঙুল জগদীশ বাবুর ঘাড়ের কাছে প্রায় স্পর্শ করে ফেলেছে।
আর এক মুহূর্ত দেরি করা মানেই চিরস্থায়ী মৃত্যু। জগদীশ বাবু চোখ বন্ধ করে শূন্যে ঝাঁপ দিলেন।
বাতাসে তার শরীরটা যেন এক মুহূর্তের জন্য ঝুলে রইল। তারপরই এক প্রচণ্ড ধাক্কা। পাথরের খাঁজে হাত আটকে তিনি ঝুলে পড়লেন। যন্ত্রণায় মুখ দিয়ে অস্ফুট আর্তনাদ বেরিয়ে এলো, কিন্তু সেটি শোনাবার মতো কেউ নেই। ওপরের দিকে তাকিয়ে দেখলেন, সেই অশরীরী ছায়াটি খাদের কিনারে দাঁড়িয়ে আছে। তার মুখাবয়ব নেই, কেবল শূন্যতায় ভরা একজোড়া চোখ—যেখানে জ্বলছে অতৃপ্ত প্রতিহিংসা। ছায়াটি নিজের দীর্ঘ হাত বাড়িয়ে দিল, চাবুকটা সাপের মতো কুণ্ডলী পাকিয়ে তার মুঠোয় দুলছে।
জগদীশ বাবু দেখলেন, খাদের দেওয়াল থেকে পাথর খসে পড়ছে। নিচের সাপের দল নড়েচড়ে উঠেছে। তিনি হাতের নখ দিয়ে পাথরের খাঁজ আঁকড়ে ধরে ওপরের দিকে ওঠার চেষ্টা করলেন না, বরং নিচের দিকে নামতে শুরু করলেন। কারণ তিনি জানেন, উপরে মৃত্যু নিশ্চিত, নিচে হয়তো কোনো গোপন সুরঙ্গ আছে। নামতে নামতে তার আঙুল ছিঁড়ে রক্ত ঝরছে, পাথরের ধারালো অংশ চামড়া কেটে বসছে। কিন্তু সেই ব্যথার চেয়েও বড় ভয় হলো—যদি নিচে কোনো জ্যান্ত কবর তার জন্য অপেক্ষা করে থাকে?
প্রায় চল্লিশ ফুট নিচে নামার পর তিনি এক সরু পাথুরে চাতাল দেখতে পেলেন। কোনোমতে লাফিয়ে সেখানে অবতরণ করতেই জায়গাটি কেঁপে উঠল। এটি কোনো প্রাকৃতিক গুহা নয়, বরং কোনো প্রাচীন প্রকৌশলের অংশ। চাতালের দেয়ালে খোদাই করা আছে বিশাল এক মানচিত্র—যার কেন্দ্রবিন্দুতে একটি নির্দিষ্ট মন্দির। জগদীশ বাবু লণ্ঠনটা আবার জ্বালালেন। আলোর রোশনাইয়ে যা ফুটে উঠল, তাতে তার বুক ধড়ফড় করে উঠল। দেয়ালে খোদাই করা চিত্রগুলোতে দেখা যাচ্ছে, একদল মানুষ এক বিশাল ধনভাণ্ডার বয়ে নিয়ে যাচ্ছে, আর তাদের পেছনে দাঁড়িয়ে এক অদৃশ্য সত্তা, যার হাতে চাবুক। নিচে লেখা— ‘যক্ষপুরীর চাবুক, যা লয় করে রক্ত, পায় না মুক্তি’।
ঠিক সেই মুহূর্তে চাতালটি ধসে পড়ার শব্দ শোনা গেল। তিনি বুঝতে পারলেন, ওপর থেকে সেই সত্তাটি কোনো পাথর বা ভারী কিছু ফেলছে। তিনি দৌড় দিলেন সুরঙ্গটার গভীরে। সুরঙ্গটি ক্রমশ নিচের দিকে ঢালু হয়ে নেমে গেছে। বাতাসের বেগ বাড়ছে। দেয়ালগুলো থেকে জল চুইয়ে পড়ছে, কিন্তু সেই জল সাধারণ বৃষ্টির জল নয়—সেটা ঘন, আঠালো এবং রক্তিম।
হঠাৎ তার পায়ের নিচে মাটি সরে গেল। তিনি গড়িয়ে পড়লেন এক বিশাল কক্ষের মাঝে। লণ্ঠনটি হাত থেকে ছিটকে দূরে গিয়ে পড়ল। অন্ধকারে তিনি শুধু শুনতে পাচ্ছেন নিজের হৃদস্পন্দন। চারপাশ থেকে ভারী কোনো ধাতুর নড়াচড়ার শব্দ ভেসে আসছে। যেন কোনো প্রাচীন যান্ত্রিক প্রহরী জেগে উঠেছে। তিনি উঠে দাঁড়াতেই তার হাতের তালুতে কিছু একটা অনুভব করলেন। ঠান্ডা, শক্ত, ধাতব। এটি সেই চাবি যা তিনি ডায়েরির ভেতর পেয়েছিলেন।
হঠাৎই কক্ষের চারকোণে চারটি মশাল দপ করে জ্বলে উঠল। আগুনের শিখা নীল। নীল আগুনের আলোয় তিনি দেখলেন, পুরো কক্ষটি প্রাচীন সোনার কয়েন এবং রত্নপাথরে পূর্ণ। কিন্তু এই সম্পদ সাধারণ নয়—প্রতিটি কয়েনের গায়ে রক্তমাখা মানুষের মুখ খোদাই করা। ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে এক বিশাল পাথরের মূর্তি, যার হাতে চাবুকটি নেই। চাবুকটি এখন শূন্যে ভাসছে, এবং সেটি ধীরে ধীরে জগদীশ বাবুর দিকে এগিয়ে আসছে।
তিনি বুঝতে পারলেন, এই ধনভাণ্ডার পাহারা দেওয়ার জন্য কোনো জীবন্ত মানুষ নেই, আছে এই অভিশপ্ত চাবুক—যা নিজেই নিজের মালিকানা দাবি করছে। চাবুকটি তার গলা জড়িয়ে ধরার উপক্রম করতেই তিনি তার ঝোলা থেকে একটি ছোট প্রত্নতাত্ত্বিক ব্রাশ বের করে সেটা দিয়ে চাবুকের ওপর খোদাই করা প্রতীকে চাপ দিলেন। সাথে সাথে এক প্রচণ্ড বিদ্যুৎস্পর্শে তার সারা শরীর কেঁপে উঠল। চাবুকটি ছিটকে গিয়ে মূর্তির পায়ের কাছে পড়ল। কিন্তু নিস্তব্ধতা ভাঙল এক কান ফাটানো চিৎকারে।
কক্ষটির ছাদ থেকে ধুলো ঝরছে। দেয়ালগুলো সরতে শুরু করেছে। তিনি দেখলেন, দরজার বাইরে অগণিত ছায়া মূর্তি সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে। তারা ভেতরে আসার জন্য উদগ্রীব। তিনি পকেট থেকে মানচিত্রটা বের করলেন। মানচিত্রের সেই প্রাচীন মন্দিরের চিহ্নটি এখন উজ্জ্বল হয়ে জ্বলছে। তিনি বুঝতে পারলেন, এটিই তার পরবর্তী গন্তব্য।
তিনি দৌড়ে কক্ষের অন্য প্রান্তের একটি সরু ফাটল দিয়ে বেরোনোর চেষ্টা করলেন। ফাটলটি দিয়ে গলতে গলতে দেখলেন, পেছনের কক্ষটি পাথরের বিশাল স্ল্যাবে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেল। কিন্তু তিনি একা নন। ফাটলের ভেতরেই আরেকটি হাত তার পা টেনে ধরার চেষ্টা করল। সেই হাতের চামড়া নেই, শুধু হাড়। তিনি পায়ের লাথি মেরে সেই হাড়ের হাতটি ভেঙে দিলেন।
তিনি এখন এক অন্ধকার গলি দিয়ে ছুটছেন। বাঁচার পথ কোথায়? তার মনে হলো, কেউ তাকে অনুসরণ করছে না, বরং সবাই তার জন্য অপেক্ষা করছে সামনে। প্রতিটা মোড়ে মোড়ে নতুন নতুন বিপদ। তিনি একটি পাথরের দরজার সামনে এসে থামলেন। দরজায় একটি অদ্ভুত লক সিস্টেম। তার হাতের সেই চাবিটা কি এখানে লাগবে? তিনি চাবিটা লকের খাঁজে ঢোকাতে গেলেন, ঠিক তখনই তার কানের কাছে এক ফিসফিসানি শোনা গেল— ‘যক্ষপুরী তার চাবুক ফেরত চায়, নয়তো প্রাণ।’
তিনি চাবি ঘোরালেন। দরজা খোলার শব্দে চারপাশ কেঁপে উঠল। কিন্তু দরজা খুলে যা দেখলেন, তাতে তার আত্মা শুকিয়ে গেল। দরজাটা কোনো বাইরের জগতের দিকে খোলেনি, বরং সেটি খোলেনি এক বিশাল সাপসংকুল কুয়ার দিকে, যেখানে হাজার হাজার জীবন্ত সাপ ফণা তুলে তার দিকে তাকিয়ে আছে। সে পড়ে যাচ্ছে সেই কুয়ার ভেতরে।
সার্পিল অতল গহ্বরের অন্ধকার মুখে পড়ার মুহূর্তটি ছিল এক অনন্ত পতনের মতো। জগদীশ বাবু জানতেন, এই কুয়ার তলদেশে সাপের বিষাক্ত ছোবল তার জন্য অপেক্ষা করছে। কিন্তু মৃত্যুর এক চুল আগে, নিজের জীবনের শেষ শক্তিটুকু দিয়ে তিনি দুহাত প্রসারিত করলেন। আঙুলের ডগায় স্পর্শ পেলেন কোনো এক পাথুরে কার্নিশের। শরীরের ওজন ঝুলে পড়ল সেখানে। নিচে সাপের হিসহিস শব্দ আরও তীব্র হলো, তাদের বিষাক্ত ফণাগুলো অন্ধকারে জ্বলে ওঠা আগুনের মতো কাঁপছে।
কোনোমতে কার্নিশ ধরে শরীরটাকে টেনে তুললেন তিনি। হাঁপাচ্ছেন। কপালে জমে থাকা বিন্দু বিন্দু ঘাম আর রক্ত মিশে চোখের ওপর এসে পড়ছে। কুয়ার দেওয়াল বেয়ে একটু একটু করে ওপরে ওঠার চেষ্টা করলেন, কিন্তু প্রতিটা ইঞ্চিতে যেন এক অশুভ শক্তি তাকে নিচের দিকে টেনে ধরছে। ওপরের দিকে তাকাতেই তার রক্ত হিম হয়ে গেল। কুয়ার মুখটা ধীরে ধীরে একটি পাথরের স্ল্যাব দিয়ে বন্ধ হয়ে আসছে। কেউ—অথবা কিছু একটা—বাইরে থেকে তাকে জ্যান্ত কবর দেওয়ার ষড়যন্ত্র করছে।
স্ল্যাবটা প্রায় আশি শতাংশ বন্ধ হয়ে গেছে। আর দেরি করা যাবে না। তিনি তার ঝোলা থেকে একটি দড়ি বের করলেন, যা দিয়ে প্রত্নতাত্ত্বিক খনন কাজে তিনি পাথর মাপতেন। দড়িটির শেষ মাথায় হুক আটকে তিনি উপরের লোহার গরাদ লক্ষ্য করে ছুঁড়লেন। একবারে, নিখুঁতভাবে আটকে গেল সেটি। তিনি নিজের ওজন দড়ির ওপর ছেড়ে দিয়ে বিদ্যুৎগতিতে ওপরে উঠতে শুরু করলেন।
পাথর যখন প্রায় বন্ধ হয়ে এসেছে, তখন তিনি শরীরের অর্ধেকটা বের করে এনেছেন। কিন্তু তখনই তার পায়ের গোড়ালি কামড়ে ধরল সেই অদৃশ্য সত্তার শীতল নখ। নিচের অন্ধকারে ঝুলে থাকা সাপের দল যেন তাকে টেনে নামাতে চাইছে। জগদীশ বাবুর আর্তনাদ গুহার দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হলো। তিনি হাতের পিস্তল বা অন্য কোনো অস্ত্র ব্যবহার করতে পারলেন না, কারণ তার পুরো মনোযোগ তখন দড়িটা ধরে রাখার ওপর। তিনি তার পকেটে থাকা সেই প্রাচীন ধাতব চাবিটি বের করে সজোরে পেছনের ছায়াটার দিকে ছুঁড়ে মারলেন। চাবিটি ধাতব শব্দে কোথাও গিয়ে ধাক্কা খেল, আর অমনি একটি অদ্ভুত যান্ত্রিক গর্জন উঠল। কুয়ার মুখটি আবার খুলে গেল।
তিনি ছিটকে বাইরে এলেন। রাজবাড়ির ধ্বংসাবশেষের এক অন্য অংশে তিনি এসে পড়েছেন, যা এতোদিন সবার চোখের আড়ালে ছিল। এটি যেন কোনো এক প্রাচীন কারাগারের মেঝে। চারপাশ জুড়ে ছড়ানো শত শত নরকঙ্কাল। তাদের হাতের মুদ্রাগুলো এখন উজ্জ্বল হয়ে জ্বলছে। তিনি বুঝতে পারলেন, এই মুদ্রাগুলোই হলো সেই চাবুকটির শক্তির উৎস। এগুলো কোনো সাধারণ সম্পদ নয়, এগুলো অভিশাপের বাহক।
হঠাৎ করেই বাতাসের গতিবেগ বেড়ে গেল। তার চারপাশ ঘিরে থাকা কঙ্কালগুলো নড়াচড়া করতে শুরু করেছে। হাড়ের ঠকঠক আওয়াজ পুরো রাজবাড়িতে ছড়িয়ে পড়ছে। এক অশরীরী হাওয়া তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল। মেঝেতে পড়ার সাথে সাথে তিনি দেখলেন, তার পায়ের কাছের ছায়াটি আরও দীর্ঘ হচ্ছে। সেটি এখন শুধু একটি ছায়া নয়, সেটি একটি আস্ত প্রতিমূর্তি হয়ে উঠেছে। তার নিজের চেহারারই এক বিকৃত রূপ।
সেই প্রতিচ্ছবিটি হাসল—এক নিষ্ঠুর, অমানবিক হাসি। সে জগদীশ বাবুর সামনে দাঁড়িয়ে বলল, “তুমি যা খুঁজছ, তা পাওয়ার যোগ্য নও। তুমি তো কেবল এক মৃত্যুকে সঙ্গী করে পথ চলছ।”
জগদীশ বাবু পিছু হটলেন। তিনি দেখলেন, সেই প্রতিচ্ছবিটির হাতে একটি প্রাচীন ডায়েরি। সেটি তার নিজের ডায়েরি, যা তিনি হারিয়ে ফেলেছিলেন! ডায়েরির প্রতিটি পাতায় তার ভবিষ্যৎ লেখা আছে। তিনি পাতাগুলো উল্টে দেখলেন, শেষ পাতায় তার নিজের মৃত্যুর তারিখ আজকেই!
উত্তেজনা আর ভয়ে তার মস্তিষ্ক কাজ করা বন্ধ করে দিচ্ছে। তিনি দেখলেন, রাজবাড়ির দেওয়ালগুলো ক্রমশ সংকীর্ণ হচ্ছে। ছাদ নিচে নেমে আসছে। তিনি যদি এই মুহূর্তে এখান থেকে পালাতে না পারেন, তবে এই প্রাচীন কারাগারের অংশ হয়ে যাবেন চিরতরে। সামনেই একটি বড় আয়না। সেই আয়নায় তিনি নিজের প্রতিচ্ছবি দেখতে পেলেন, কিন্তু আয়নার ভেতরের জগদীশ বাবু তাকে টেনে নিতে চাইছে। আয়নার ভেতর থেকে একটা হাত বেরিয়ে এসেছে—সেটা তার নিজের হাত, কিন্তু তাতে নখগুলো ধারালো এবং চামড়া পচে যাওয়া।
তিনি প্রাণপণে দৌড় দিলেন। দরজার দিকে। কিন্তু দরজাটা এখন আর নেই, সেখানে একটা বিশাল দেয়াল। তিনি তার প্রত্নতাত্ত্বিক হাতুড়ি দিয়ে দেয়ালে আঘাত করলেন। দেওয়াল থেকে পাথর নয়, রক্ত ঝরতে শুরু করল। পুরো ঘরটা এখন রক্তের বন্যায় ভাসছে। সাঁতার কেটে তাকে বাঁচতে হবে। তিনি দেখলেন, দূরে এক মৃদু আলোর রেখা। সেটি কোনো দরজা নয়, সেটি একটি ড্রেন পাইপের মতো সরু রাস্তা। তার শরীরের মাপের চেয়েও ছোট। তাকে তার সমস্ত হাড় গুঁড়িয়ে দিয়ে হলেও ওদিকে যেতে হবে।
পিছনে সেই অশরীরী ছায়াটি তার পিঠের ওপর চাবুকের আঘাত করল। পিঠে জ্বালাপোড়া করা ব্যথা নিয়ে তিনি সেই সরু পাইপের ভেতর ঢুকে পড়লেন। পাইপের ভেতর থেকে আসা দমকা হাওয়ায় তিনি বুঝতে পারলেন, বাইরে এখন ঝড় বইছে। তাকে টেনে হিঁচড়ে পাইপ থেকে বের করে দিল বাইরের ঝোড়ো হাওয়া। তিনি যখন ঝোপের ওপর পড়লেন, দেখলেন রাজবাড়িটি তার চোখের সামনেই মুহূর্তের মধ্যে মাটির নিচে তলিয়ে যাচ্ছে। সাথে সাথে এক বিকট শব্দে আকাশ চিরে বিদ্যুৎ পড়ল—ঠিক তার পায়ের কাছে থাকা এক পুরনো পাথরের মন্দিরের প্রতীকের ওপর। তিনি কি বুঝতে পারলেন, ধ্বংসলীলা কেবল শুরু?
পর্ব ১ সমাপ্ত