১৯৫২ সালের জুন মাস। আমাজনের বুক চিরে বয়ে চলা এক বেনামী উপনদীর কুচকুচে কালো জলের ওপর দিয়ে আমাদের ছোট মোটরচালিত নৌকাটা এগিয়ে চলছিল। চারপাশের বাতাস এতটাই ভারী আর আর্দ্র যে, শ্বাস নিতে গেলে মনে হচ্ছিল জলীয় বাষ্প ফুসফুসে জমে যাচ্ছে। মাথার ওপর প্রাচীন মহীরুহদের পাতা আর ডালপালার এমন এক দুর্ভেদ্য চাঁদোয়া তৈরি হয়েছে, যার কারণে ভরদুপুরেও নিচে নেমে এসেছে এক মায়াবী, ভুতুড়ে গোধূলি আলো। এখানে কোনো ঋতুর বদল নেই, আছে শুধু এক অনন্ত, শ্বাসরোধকারী স্যাঁতসেঁতে উত্তাপ আর পচা পাতার তীব্র গন্ধ।
আমার বুটের তলায় জলছাপ লেগে থাকা চামড়ার ব্যাগটার ভেতর যত্নে রাখা আছে ১৯২০ সালের একটি ডায়েরি। ডায়েরিটি আমার দাদু, বিখ্যাত ব্রিটিশ অভিযাত্রী স্যার রিচার্ড হেন্ডারসনের। আজ থেকে ঠিক বত্রিশ বছর আগে তিনি এই নরককুণ্ডে হারিয়ে গিয়েছিলেন। লন্ডনের ধুলোবালি জমা লাইব্রেরি ঘর থেকে যখন আমি তাঁর এই ব্যক্তিগত ডায়েরি আর তার ভাঁজে লুকিয়ে থাকা হাতে আঁকা অদ্ভুত রুট ম্যাপটা খুঁজে পাই, তখন আমার ধমনীতে রক্ত নাচতে শুরু করেছিল। ম্যাপের শেষ প্রান্তে দাদুর কাঁপা কাঁপা হাতের লেখায় লেখা ছিল—‘দ্য গ্রিন সিটি… গড ফরগিভ আস, ইট ইজ অ্যালাইভ!’
“সেনর আর্থার, আর বেশিদূর যাওয়া ঠিক হবে না।”
চমক ভেঙে আমি তাকালাম আমার গাইড ম্যানুয়েলের দিকে। ম্যানুয়েল এই অঞ্চলের আদি বাসিন্দা, যার গায়ের চামড়া আমাজনের মাটির মতোই তামাটে আর শক্ত। কিন্তু এই মুহূর্তে তার সেই শক্ত মুখেও ভয়ের স্পষ্ট ছাপ। সবচেয়ে রহস্যময় হলো ম্যানুয়েলের ডান হাতটা। কনুইয়ের নিচ থেকে তার ডান হাতটা কাটা। কোনো ধারালো অস্ত্র দিয়ে নয়, দেখলে মনে হয় কোনো হিংস্র পশু কামড়ে তার মাংস আর হাড় উপড়ে নিয়েছে। কিন্তু ম্যানুয়েল কখনো বলে না কীভাবে সে হাতটা হারিয়েছে। যখনই জিজ্ঞেস করেছি, সে তার বাম হাত দিয়ে ক্রশ চিহ্ন এঁকে চুপ করে গেছে।
“কেন ম্যানুয়েল? ম্যাপ অনুযায়ী আমরা তো একদম সঠিক পথেই আছি,” আমি আমার কাঁধে ঝোলানো পুরনো লি-এনফিল্ড রাইফেলটা একটু ঠিক করে নিয়ে বললাম। ১৯৫২ সালের এই দুর্গম জঙ্গলে এই একটা অস্ত্রই আমার একমাত্র ভরসা।
“ম্যাপ মানুষের তৈরি হতে পারে সেনর, কিন্তু এই জঙ্গল শয়তানের তৈরি,” ম্যানুয়েল নৌকার গতি কমিয়ে একটা প্রকাণ্ড, জলমগ্ন গাছের শিকড়ের পাশে এসে দাঁড় করাল। “এই সীমানার পর থেকে পাখিরা গান গায় না, বানরেরা ডাকে না। খেয়াল করে দেখুন, চারপাশটা কেমন নিঝুম।”
ম্যানুয়েলের কথাই সত্য। গত এক ঘণ্টা ধরে জঙ্গলের চিরচেনা ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক বা জ্যাকারান্দা পাখির কিচিরমিচির একদম বন্ধ। এক অলৌকিক, থমথমে নীরবতা গ্রাস করেছে পুরো পরিবেশকে। শুধু পানির ছলাৎ ছলাৎ শব্দ আর আমাদের নিজেদের শ্বাসের আওয়াজ ছাড়া আর কিচ্ছু নেই। গাছের গা বেয়ে নেমে এসেছে মোটা মোটা লতা, যেন হাজারটা অজগর সাপ ওপর থেকে নিচে ঝুলছে।
আমি পকেট থেকে দাদুর ডায়েরিটা বের করলাম। হলদে হয়ে যাওয়া পাতার ওপর পেনসিলে আঁকা নদীর বাঁকটা হুবহু মিলে যাচ্ছে এই জায়গার সাথে। ম্যাপের এই অংশটায় একটা ক্রস চিহ্ন দেওয়া আছে, আর তার পাশে লেখা—‘প্রবেশদ্বার’।
“আমাদের এখানেই নামতে হবে, ম্যানুয়েল,” আমি দৃঢ় কণ্ঠে বললাম।
ম্যানুয়েল তার একমাত্র হাত দিয়ে নৌকার নোঙরটা কাদার মধ্যে ছুঁড়ে ফেলল। তার চোখ দুটো ভয়ে চকচক করছিল। “আমি আপনার দাদুকে চিনতাম সেনর। তিনি যখন বত্রিশ বছর আগে এই পথে গিয়েছিলেন, তখন তাঁর সাথে বারোজন সশস্ত্র লোক ছিল। কেউ ফিরে আসেনি। শুধু আমি… আমি তখন ছোট ছিলাম, নৌকায় বসেছিলাম। তাও এই জঙ্গল আমার কাছ থেকে এই হাতটা কেড়ে নিয়েছে।”
আমি ম্যানুয়েলের দিকে তাকালাম। “তাহলে তুমি কেন আমার সাথে আবার এলে?”
“কারণ আমি আপনার বাবার কাছ থেকে টাকা নিয়েছি, আর আমি হেন্ডারসন পরিবারের ঋণ শোধ করতে চাই। কিন্তু মনে রাখবেন সেনর, যদি সবুজ কফিনের ঢাকনা একবার বন্ধ হয়ে যায়, তবে পৃথিবীর কোনো শক্তি আমাদের বাঁচাতে পারবে না।”
নৌকা থেকে আমরা যখন কাদায় পা রাখলাম, তখন এক অদ্ভুত অনুভূতি হলো। পায়ের নিচের মাটিটা যেন সাধারণ কাদা নয়, কেমন যেন নরম আর স্পঞ্জের মতো, যেন কোনো বিশাল জীবন্ত প্রাণীর পিঠের ওপর দাঁড়িয়ে আছি। প্রতিটি কদম ফেলতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছিল। চারপাশের গাছগুলো অস্বাভাবিক রকম সবুজ, এতোটাই গাঢ় যে মনে হয় পাতাগুলোর শিরা-উপশিরা দিয়ে ক্লোরোফিল নয়, খাঁটি বিষ বইছে।
আমরা জঙ্গল কেটে এগোতে লাগলাম। ম্যানুয়েল তার বাম হাতে থাকা ধারালো মাশেতে (এক ধরণের বড় ছুরি) দিয়ে সামনের লতাগুল্ম কেটে পথ তৈরি করছিল। বাতাসে এক ধরণের অদ্ভুত, মিষ্টি সুবাস ভেসে আসছিল। সুবাসটা এতোটাই তীব্র যে মাথা ঝিমঝিম করে ওঠে।
“সাবধান সেনর! এই গন্ধ শুঁকবেন না,” ম্যানুয়েল চিৎকার করে উঠল। সে চট করে তার গলার গামছাটা দিয়ে নাক-মুখ বেঁধে ফেলল। “এটা হলো ‘মায়া লতা’র গন্ধ। এই গন্ধ মানুষকে অবশ করে দেয়, তারপর…”
হঠাৎ এক বিকট খড়খড় শব্দে আমাদের পায়ের নিচের মাটি কেঁপে উঠল।
আমি থমকে দাঁড়ালাম। আমার ঠিক পাঁচ হাত দূরে, একটা বিশাল ফার্ন গাছের ঝোপ নিজে থেকেই নড়ে উঠল। কোনো বাতাস নেই, অথচ পাতাগুলো তীব্রভাবে কাঁপছে। ঠিক তখনই আমি দেখলাম, মাটির নিচ থেকে চাবুকের মতো সরু আর কালো একগুচ্ছ শিকড় সাপের মতো কিলবিল করে বেরিয়ে আসছে।
“দৌড়ান!” ম্যানুয়েল আর্তনাদ করে উঠল।
কিন্তু আমার ঘোর কাটার আগেই, মাটির নিচ থেকে উঠে আসা একটি মোটা লতা তীব্র গতিতে এসে জড়িয়ে ধরল আমার ডান পা! লতাটার গায়ে ছোট ছোট কাঁটা ছিল, যা মুহূর্তের মধ্যে আমার প্যান্ট ফুড়ে চামড়ায় গেঁথে গেল। তীব্র যন্ত্রণায় আমি চিৎকার করে উঠলাম। মনে হলো যেন এক ডজন সুঁই একসাথে আমার পায়ে ফুটিয়ে দেওয়া হয়েছে।
সবচেয়ে ভয়ানক ব্যাপার হলো, লতাটা আমাকে মাটির ভেতরের একটা গর্তের দিকে টেনে নিয়ে যেতে শুরু করল। আমি রাইফেলটা তোলার চেষ্টা করলাম, কিন্তু লতার টানে আমি উপুড় হয়ে মাটিতে পড়ে গেলাম। কাদা আর পচা পাতার মধ্যে হিঁচড়ে হেঁচড়ে আমাকে টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। চোখের কোণ দিয়ে দেখলাম, যেখানে লতাটা আমার চামড়া কামড়ে ধরেছে, সেখান থেকে চুইয়ে পড়া রক্ত শুষে নিয়ে লতাটার ফ্যাকাশে রঙ মুহূর্তের মধ্যে টকটকে লাল হয়ে উঠছে! গাছটা আক্ষরিক অর্থেই আমার রক্ত খাচ্ছে!
“ম্যানুয়েল! বাঁচাও!” আমি মরিয়া হয়ে চিৎকার করলাম।
ম্যানুয়েল তার মাশেতে উঁচিয়ে বাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল। তার এক হাতের সবটুকু শক্তি দিয়ে সে কোপ বসাল সেই রক্তচোষা লতার ওপর। একটা অদ্ভুত, মানুষের গোঙানির মতো শব্দ হলো এবং লতাটা থেকে ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে এলো ঘন, আঠালো লাল রঙের তরল—যা দেখতে অবিকল মানুষের রক্ত!
লতাটার বাঁধন আলগা হতেই আমি ছিটকে পিছিয়ে এলাম। ম্যানুয়েল আমার জ্যাকেটের কলার ধরে হ্যাঁচকা টানে আমাকে খাড়া করল। কিন্তু বিপদ সেখানেই শেষ হলো না।
আমাদের চারপাশে, পুরো জঙ্গলটা যেন হঠাৎ ঘুম থেকে জেগে উঠেছে। শত শত গাছপালা, লতাগুল্ম আর শিকড় মাটির নিচে ছটফট করতে শুরু করেছে। মাথার ওপরের ডালপালাগুলো এমনভাবে নিচে নেমে আসছে যেন এক বিশাল সবুজ খাঁচা আমাদের চারপাশ থেকে অবরুদ্ধ করে ফেলছে। আমাদের পিছু হটার সমস্ত পথ বন্ধ হয়ে গেছে। সামনে শুধু একটা অন্ধকার সুড়ঙ্গের মতো পথ খোলা, যা চলে গেছে জঙ্গলের আরও গভীরে, সেই প্রাচীন অভিশপ্ত শহরের দিকে। আর আমাদের ঠিক পেছনেই, মাটি ফুঁড়ে বেরিয়ে আসছে এক প্রকাণ্ড মাংসাশী অর্কিড, যার পাপড়িগুলো হা করা এক নরখাদক পশুর চোয়ালের মতো লালা ঝরাচ্ছে এবং তা দ্রুত গতিতে এগিয়ে আসছে আমাদেরই লক্ষ্য করে!
সামনে হা করা নরখাদক অর্কিডটার ভেতরের হলুদ পুংকেশরগুলো লালচে লালা ঝরাচ্ছিল, আর তীব্র এক পচা মাংসের গন্ধ আমাদের ফুসফুসকে অবশ করে দিচ্ছিল। পেছনে যাওয়ার কোনো পথ নেই; সেখানে শত শত শিকড় একে অপরের সাথে পেঁচিয়ে গিয়ে এক দুর্ভেদ্য সবুজ দেয়াল খাড়া করেছে।
“ঝুঁকে পড়ুন, সেনর!” ম্যানুয়েল কর্কশ গলায় চেঁচিয়ে উঠল।
আমি মাটিতে প্রায় বুক ঠেকিয়ে শুয়ে পড়লাম। ঠিক আমার মাথার ওপর দিয়ে চাবুকের মতো ধেয়ে গেল অর্কিডের একটা চ্যাটচেটে আঠালো পাপড়ি। বাতাসে শাঁ শাঁ শব্দ হলো। যদি ওটা আমার মাথায় লাগত, তবে মগজ ছিটকে বেরিয়ে যেত সন্দেহ নেই। মাটিতে শুয়ে থাকা অবস্থাতেই আমি আমার লি-এনফিল্ড রাইফেলটা সোজা করলাম। ১৯৫২ সালের তৈরি এই শিকারি রাইফেলের নলটা স্থির করলাম অর্কিডটার ঠিক কেন্দ্রস্থলে, যেখান থেকে ওই আঠালো তরল নিঃসৃত হচ্ছে।
ধুম!
বন্ধুকের বিকট আওয়াজে পুরো জঙ্গল যেন এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। শক্তিশালী কার্তুজের আঘাতে অর্কিডটার মাঝখানটা ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল। ফিনকি দিয়ে বের হতে লাগল হলদে-সবুজ রঙের এক ঝাঁঝালো রস, যা মাটিতে পড়তেই কাদা থেকে ধোঁয়া উঠতে শুরু করল। অ্যাসিডের মতো তীব্র সেই রস! গাছটা এক অদ্ভুত যন্ত্রণাকাতর ভঙ্গিতে দুমড়ে-মুচড়ে মাটিতে আছাড় খেয়ে পড়ল।
“থামবেন না, সেনর! এই আওয়াজে পুরো জঙ্গল আমাদের দিকে ধেয়ে আসবে!” ম্যানুয়েল আমার শার্টের হাতা ধরে এক হ্যাঁচকা টান দিল।
আমরা দৌড়াতে শুরু করলাম। সামনে যে অন্ধকার সুড়ঙ্গের মতো পথটা খোলা ছিল, আমরা সেই দিকেই অন্ধের মতো ছুটলাম। পায়ের নিচে স্পঞ্জের মতো নরম মাটি প্রতি পদক্ষেপে আমাদের গতি কমিয়ে দিচ্ছিল। চারপাশের গাছগুলোর ডালপালা এমনভাবে কাঁপছিল, যেন তারা একে অপরকে সংকেত পাঠাচ্ছে। মাথার ওপরের পাতাগুলোর ঘষাঘষিতে এক অদ্ভুত ফিসফিস শব্দ হচ্ছিল—যেন হাজারটা প্রেতাত্মা ফিসফিস করে আমাদের মৃত্যুর পরোয়ানা পড়ছে।
দৌড়াতে দৌড়াতে আমার ফুসফুস ফেটে যাওয়ার উপক্রম হলো। ১৯৫২ সালের এই গুমোট আর্দ্রতায় শরীর থেকে জল শুকিয়ে আসছিল দ্রুত। আমার কাটা পা-টা থেকে তখনো রক্ত চুইয়ে পড়ছে, যা আমাজনের এই মাংসাশী মাটিকে আরও বেশি ক্ষুধার্ত করে তুলছিল। আমি টের পাচ্ছিলাম, আমাদের পায়ের ঠিক নিচ দিয়েই মাটির গভীর থেকে কিছু একটা সমান্তরালভাবে আমাদের পিছু পিছু ছুটছে। মাটি সামান্য ফুলে ফুলে উঠছে আমাদের ডান পাশে।
“ম্যানুয়েল, ডান দিকে দেখো!” আমি হাঁপাতে হাঁপাতে বললাম।
“ওদিকে তাকাবেন না, শুধু সোজা ছুটুন!” ম্যানুয়েল তার একমাত্র বাম হাত দিয়ে মাশেতে উঁচিয়ে সামনের ঝুলন্ত লতাগুলো কেটে পথ বানাচ্ছিল।
হঠাৎ করেই জঙ্গলটা যেন একটু হালকা হয়ে এলো। আমরা এসে পৌঁছালাম এক বিস্তীর্ণ পাথুরে চত্বরে। জঙ্গল যেখানে শেষ হয়েছে, সেখান থেকে শুরু হয়েছে এক বিশাল পাথরের প্রাচীন দেয়াল। দেয়ালটা প্রকাণ্ড সব পাথরের চাঁই দিয়ে তৈরি, যা দেখে মনে হয় হাজার বছর আগের কোনো সভ্যতার কীর্তি। কিন্তু সেই দেয়ালের প্রতিটি ইঞ্চিতে জেঁকে বসেছে গাঢ় সবুজ রঙের এক অদ্ভুত শ্যাওলা। শ্যাওলাগুলো সাধারণ নয়; সেগুলো হালকাভাবে কাঁপছে, যেন দেয়ালটার গায় কেউ সবুজ রঙের চামড়া পরিয়ে দিয়েছে।
আমরা দেয়ালটার সামনে এসে থামলাম। আমাদের পেছনে জঙ্গলটা থমকে দাঁড়িয়ে গেছে, যেন এক অদৃশ্য সীমারেখা তারা পার হতে পারছে না। কিন্তু সেই বুনো লতা আর শিকড়গুলো সীমানার ওপারেই হিংস্র সাপের মতো ফণা তুলে দুলছে, আমাদের একটু অসতর্কতার অপেক্ষায়।
“আমরা কোথায় এলাম, ম্যানুয়েল?” আমি দেয়ালের গায়ে হাত ছোঁয়াতে গেলাম।
“হাত দেবেন না!” ম্যানুয়েল আমার হাতটা চেপে ধরল। তার কাটা হাতের অবশিষ্টাংশটা কাঁপছিল। “এটা হলো সেই সীমানা, যার পর থেকে কোনো মানুষ জ্যান্ত ফেরেনি। আপনার দাদুর ডায়েরি কী বলে?”
আমি কাঁপা কাঁপা হাতে ব্যাগ থেকে স্যার রিচার্ড হেন্ডারসনের ডায়েরিটা বের করলাম। পাতা ওল্টাতেই একটা স্কেচ চোখে পড়ল—এক বিশাল পাথুরে তোরণ, যার ওপরে একটা তিনকোনা চোখের মতো চিহ্ন আঁকা। আমি দেয়ালটার দিকে তাকালাম। ঠিক আমাদের মাথার ওপরে, লতা আর শ্যাওলার নিচে ঢাকা পড়ে আছে সেই প্রাচীন তোরণ আর সেই রহস্যময় তিনকোনা চোখ!
ডায়েরির নিচে দাদুর হাতে লেখা: ‘সবুজ দেয়াল পার হওয়ার একটাই উপায়—শিকড়ের ক্ষুধা শান্ত করা। কিন্তু মূল্য বড় চড়া।’
“মূল্য বড় চড়া… এর মানে কী?” আমি স্বগতোক্তি করলাম।
ঠিক তখনই পাথরের দেয়ালের ওপরের সেই সবুজ শ্যাওলাগুলো নিজে থেকেই সরতে শুরু করল। প্রকট হয়ে উঠল এক গভীর ফাটল, যা একটা অন্ধকার সুড়ঙ্গের মতো ভেতরের দিকে চলে গেছে। কিন্তু সেই ফাটলের মুখটা আটকে আছে এক জাল সদৃশ লালচে শিকড় দিয়ে। সেই শিকড়গুলো থরথর করে কাঁপছে, আর তাদের গা থেকে টপটপ করে ঝরছে এক ধরণের আঠালো লাল তরল। গন্ধটা অবিকল তাজা রক্তের মতো!
হঠাৎ করেই আমাদের পেছনের জঙ্গল থেকে এক তীব্র গর্জন ভেসে এলো। কোনো পশুর নয়, যেন হাজারটা ডালপালা একসাথে ভেঙে পড়ার শব্দ। সীমানার ওপারে থাকা সেই মাংসাশী জঙ্গল যেন এবার তাদের ধৈর্য হারিয়ে ফেলেছে। এক বিশাল লতার বান ডাকল আমাদের দিকে। শত শত ক্যাকটাসের মতো কাঁটাযুক্ত লতা তীরের মতো ধেয়ে আসতে লাগল আমাদের লক্ষ্য করে।
“সেনর! পথ খুলুন, নয়তো আমরা এখানেই শেষ!” ম্যানুয়েল চিৎকার করে তার মাশেতে দিয়ে পেছনের লতাগুলোকে প্রতিহত করার চেষ্টা করতে লাগল।
আমি রাইফেলের কুঁদো দিয়ে দেয়ালের লাল শিকড়ের জালে আঘাত করলাম, কিন্তু তা রবারের মতো শক্ত, কাটছে না। ডায়েরির কথাগুলো মাথায় ঘুরতে লাগল—‘শিকড়ের ক্ষুধা শান্ত করা।’
তাজা রক্ত! এরা রক্ত চায়!
আমি আর এক মুহূর্তও ভাবলাম না। আমার পকেট থেকে ছোট শিকারি ছুরিটা বের করে নিজের বাম হাতের তালুতে এক পোচ দিলাম। ফিনকি দিয়ে রক্ত ছিটকে পড়ল সেই লাল শিকড়ের জালের ওপর।
মুহূর্তের মধ্যে এক অলৌকিক কাণ্ড ঘটল। রক্ত ছোঁয়া মাত্রই শিকড়গুলো যেন এক পরম তৃপ্তিতে শিউরে উঠল। তারা ক্ষুধার্তের মতো আমার রক্ত চুষে নিতে লাগল এবং চোখের পলকে জালটা সংকুচিত হয়ে দুপাশে সরে গেল, খুলে গেল ভেতরের অন্ধকার পথ।
“ম্যানুয়েল, ভেতরে চলো!” আমি চিৎকার করলাম।
কিন্তু ম্যানুয়েল যখন ঘুরল, আমার বুকটা হিম হয়ে গেল। একটা বিশাল, কালো রঙের কাণ্ডযুক্ত লতা ম্যানুয়েলের একমাত্র বাম হাতটা শক্ত করে পেঁচিয়ে ধরেছে। লতার গায়ের মোটা মোটা কাঁটাগুলো তার মাংস ভেদ করে ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে। ম্যানুয়েল তার মাশেতেটা হাত থেকে ফেলে দিল তীব্র যন্ত্রণায়। লতাটা তাকে পেছনের সেই মাংসাশী জঙ্গলের অতল অন্ধকারের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে, আর পাথরের দেয়ালের প্রবেশদ্বারটি আবার ধীরে ধীরে বন্ধ হতে শুরু করেছে!
পাথরের তোরণের ভারী মুখটা ইঞ্চি ইঞ্চি করে বন্ধ হয়ে আসছিল। ওদিকে ম্যানুয়েলের একমাত্র ভালো হাতটা পেঁচিয়ে ধরেছে সেই কুচকুচে কালো লতা। কাঁটাগুলো তার চামড়া ফুঁড়ে ভেতরে ঢুকতেই ম্যানুয়েলের মুখটা যন্ত্রণায় নীল হয়ে গেল। সে দাঁড়িয়ে থাকার শেষ চেষ্টা করছিল, কিন্তু মাটির তলা থেকে উঠে আসা অদৃশ্য কোনো শক্তি তাকে পেছনের সেই অন্ধকার নরকের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল।
“সেনর আর্থার! আমাকে ছেড়ে দিন! আপনি ভেতরে যান!” ম্যানুয়েল কর্কশ গলায় চিৎকার করে উঠল, তার চোখ দুটো কোটর থেকে বেরিয়ে আসার উপক্রম।
“চুপ করো, ম্যানুয়েল!” আমি চেঁচিয়ে উঠলাম।
আমার বাম হাতের তালু থেকে তখনো তাজা রক্ত টপটপ করে ঝরছিল। সেই কাটা হাত দিয়েই আমি আমার ফেলে দেওয়া লি-এনফিল্ড রাইফেলটা কুড়িয়ে নিলাম। এক হাত দিয়ে রাইফেল চালানো প্রায় অসম্ভব, কিন্তু এই মুহূর্তে আমার মাথায় তখন আদিম এক টিকে থাকার নেশা চেপে বসেছে। রাইফেলের কুঁদোটা বগলে চেপে ধরে আমি ম্যানুয়েলের হাত পেঁচিয়ে ধরা কালো লতাটার মাঝখানটা লক্ষ্য করে ট্রিগার চাপলাম।
ধুম!
রাইফেলের তীব্র ধাক্কায় আমার কাঁধের হাড় যেন চটকে গেল। কিন্তু নিশানা ভুল হয়নি। বুলেটটা লতার একটা বড় অংশ উড়িয়ে দিল। ছিটকে বের হলো কালচে সবুজ আঠালো রস। লতাটা যন্ত্রণায় ছটফট করে ম্যানুয়েলের হাতটা ছেড়ে দিল, কিন্তু পরমুহূর্তেই তার ক্ষতবিক্ষত অংশ থেকে আরও তিনটা নতুন উপশাখা তীরের মতো ম্যানুয়েলের দিকে ধেয়ে এলো।
আমি রাইফেল ফেলে দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লাম ম্যানুয়েলের ওপর। তাকে এক হ্যাঁচকা টানে পাথরের তোরণের ভেতরের দিকে টেনে নিলাম। ঠিক সেই মুহূর্তেই, প্রকাণ্ড পাথরের চাঁইটা এক তীব্র ঘর্ষণের শব্দ তুলে বন্ধ হয়ে গেল। বাইরের আলো পুরোপুরি মুছে গেল। জঙ্গল আর তার ভেতরের সেই মাংসাশী দানবদের শব্দ এক লহমায় স্তব্ধ হয়ে গেল, যেন কেউ পৃথিবীর সব আওয়াজ একটা বোতাম টিপে বন্ধ করে দিয়েছে।
চারপাশে এখন ঘুটঘুটে, নিচ্ছিদ্র অন্ধকার। শুধু আমাদের দুজনের ভারী শ্বাসের শব্দ আর ম্যানুয়েলের যন্ত্রণাকাতর গোঙানি এই বদ্ধ সুড়ঙ্গের বাতাসকে কাঁপিয়ে তুলছিল। বাতাসে এক ধরণের প্রাচীন, বন্ধ স্যাঁতসেঁতে গন্ধ, যেন কোনো কবরখানার নিচে আমরা এসে দাঁড়িয়েছি।
“ম্যানুয়েল? তুমি ঠিক আছো?” আমি পকেটে হাত দিয়ে দিয়াশলাইয়ের বাক্সটা খুঁজলাম। ১৯৫২ সালের এই ওয়াটারপ্রুফ দেশলাইয়ের বাক্সটাই এখন আমাদের একমাত্র আলোর উৎস।
একটা কাঠি জ্বালতেই চারপাশটা সামান্য আলোকিত হয়ে উঠল। আগুনের হলুদ আলোয় যা দেখলাম, তাতে আমার শিরদাঁড়া বেয়ে শীতল স্রোত বয়ে গেল। ম্যানুয়েলের বাম হাতটার চামড়া অলৌকিক উপায়ে কালো হয়ে গেছে। ওই লতার কাঁটাগুলো শুধু তার মাংস ফোটায়নি, তার শরীরের ভেতরে কোনো তীব্র বিষ বা পরজীবী ঢুকিয়ে দিয়েছে। তার হাতের শিরাগুলো কালচে রঙের হয়ে ফুলে উঠেছে, আর সেগুলো চামড়ার নিচে সাপের মতো নড়াচড়া করছে!
“সেনর…” ম্যানুয়েল বিড়বিড় করল, তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। “ওরা… ওরা আমার ভেতরে ঢুকে গেছে। বত্রিশ বছর আগে… ঠিক এভাবেই আমার ডান হাতটা…”
কথা শেষ করতে পারল না ম্যানুয়েল। সে জ্ঞান হারিয়ে মাটির ওপর ধপাস করে পড়ে গেল।
দিয়াশলাইয়ের কাঠিটা নিভে গেল। আবার সব অন্ধকার। আমি দ্রুত আমার ব্যাকপ্যাক থেকে জলপাই রঙের একটা ছোট টর্চলাইট বের করলাম। ব্যাটারির টিমটিমে আলোয় ম্যানুয়েলের হাতের দিকে তাকালাম। কালচে ভাবটা তার কবজি পেরিয়ে কনুইয়ের দিকে এগোচ্ছে। খুব দ্রুত কিছু না করলে এই বিষ বা যা-ই হোক না কেন, তার হৃৎপিণ্ডে পৌঁছে যাবে।
আমার হাত কাঁপছিল। আমি আমার পকেট থেকে শিকারি ছুরিটা বের করলাম। ১৯৫২ সালের যুদ্ধের দিনগুলোতে সামরিক ডাক্তারদের অস্ত্রোপচার করতে দেখেছি, কিন্তু নিজের হাতে একজন জীবন্ত মানুষের অঙ্গচ্ছেদ করার কথা কখনো ভাবিনি। কিন্তু এই মুহূর্তে ম্যানুয়েলকে বাঁচাতে হলে এছাড়া কোনো পথ নেই। এই জঙ্গল তাকে পুরোপুরি গিলে খাওয়ার আগেই আমাকে ব্যবস্থা নিতে হবে।
“ঈশ্বর, আমাকে শক্তি দাও,” আমি ফিসফিস করে বললাম।
টর্চলাইটটা একটা পাথরের ওপর এমনভাবে সেট করলাম যাতে আলোটা ম্যানুয়েলের কনুইয়ের ওপর পড়ে। তারপর আমার জ্যাকেটের বেল্টটা খুলে ম্যানুয়েলের বাহুর ওপরের অংশে শক্ত করে বাঁধলাম, যাতে রক্তচলাচল বন্ধ হয়। ছুরিটার ফলকটা দিয়াশলাইয়ের আগুনে সামান্য সেঁকে নিলাম।
ম্যানুয়েল অচেতন, কিন্তু তার শরীর থরথর করে কাঁপছিল। আমি ছুরিটা তার কনুইয়ের ঠিক নিচে বসালাম।
প্রথম কোপটা দিতেই ম্যানুয়েল একটা পশুর মতো গোঙানি দিয়ে উঠল, তার চোখ দুটো বন্ধ অবস্থাতেই কোটর থেকে ঠিকরে আসতে চাইল। কিন্তু জঙ্গল তাকে এতটাই অবশ করে দিয়েছিল যে সে জেগে উঠতে পারল না। আমি দাঁতে দাঁত চেপে ছুরিটা আরও গভীরে চালালাম। মাংস কাটার পর যখন ছুরিটা হাড়ের গায়ে ঠেকল, তখন আমার নিজের বমি পাওয়ার উপক্রম হলো। ডায়েরি, অ্যাডভেঞ্চার, প্রাচীন শহর—সবকিছু এক নিমেষে অর্থহীন মনে হতে লাগল এই রক্ত আর মাংসের নারকীয় বাস্তবতার সামনে।
আমি ব্যাকপ্যাক থেকে ছোট হ্যাকসো ব্লেডটা বের করলাম, যা দুর্গম পথে ডালপালা কাটার জন্য এনেছিলাম। ধাতুর সাথে হাড়ের ঘর্ষণের সেই কর্কশ শব্দ এই প্রাচীন সুড়ঙ্গে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। প্রতিটা মুহূর্ত মনে হচ্ছিল একেকটা যুগ। অবশেষে, একটা চটচটে শব্দের সাথে ম্যানুয়েলের বাম হাতের অবশিষ্টাংশটা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে মাটিতে পড়ে গেল।
সবচেয়ে অদ্ভুত এবং ভয়াবহ দৃশ্যটা দেখলাম তখনই। বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া হাতটা মাটিতে পড়ার পরও শান্ত হয়নি। তার ভেতরের সেই কালচে শিরাগুলো মাটি স্পর্শ করতেই শিকড়ের মতো রূপ নিল! হাতটার আঙুলগুলো নড়ে উঠল এবং ছটফট করতে করতে সুড়ঙ্গের দেয়ালের একটা ফাটলের ভেতর ঢুকে গেল, যেন ওটা কোনো মানুষের হাত ছিল না, ছিল জংলি কোনো উদ্ভিদের অংশ!
আমি দ্রুত ম্যানুয়েলের ক্ষতস্থানে ফাস্ট-এইড বক্সের ওষুধ আর ব্যান্ডেজ শক্ত করে চেপে ধরলাম। রক্তপাত কিছুটা থামল, কিন্তু ১৯৫২ সালের এই অ্যান্টিসেপটিক কতক্ষণ এই বুনো জীবাণুকে আটকে রাখতে পারবে, তা আমি জানি না। ম্যানুয়েলের এখন দুটো হাতই কাটা। সে পুরোপুরি পঙ্গু আর এই নরকে আমার ওপর নির্ভরশীল।
আমি ক্লান্ত হয়ে সুড়ঙ্গের দেয়ালে পিঠ দিয়ে বসলাম। টর্চের আলোটা সামনের দিকে ফেলতেই দেখতে পেলাম, সুড়ঙ্গটা সোজা নিচের দিকে নেমে গেছে। আর সেই সুড়ঙ্গের দেয়ালে খোদাই করা আছে প্রাচীন কিছু লিপি আর ছবি। ছবিগুলো সাধারণ কোনো আদিবাসীর নয়। সেখানে দেখানো হয়েছে, বিশাল বিশাল আকৃতির কিছু মানুষ ডালপালা ছড়ানো গাছের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে আছে, আর সেই গাছগুলোর শিকড় সরাসরি ঢুকে গেছে ওই মানুষদের বুকের ভেতর।
হঠাৎ, সুড়ঙ্গের গভীর থেকে একটা মৃদু, ছন্দময় শব্দ ভেসে এলো। ধুক-ধুক… ধুক-ধুক…
শব্দটা কোনো পাথরের পতনের নয়, কোনো পানির ফোঁটার নয়। এটা অবিকল একটা বিশাল, প্রকাণ্ড হৃদপিণ্ডের স্পন্দনের শব্দ! সুড়ঙ্গের দেয়ালগুলো সেই শব্দের সাথে সাথে সামান্য স্পন্দিত হচ্ছে। পায়ের নিচের মাটিটাও যেন সেই ছন্দে কাঁপছে। যেন আমরা কোনো সুড়ঙ্গে নেই, আমরা ঢুকে পড়েছি কোনো এক আদিম, দানবীয় প্রাণীর খাদ্যনালীর ভেতর, যা এখন ধীরে ধীরে আমাদের হজম করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে!
পর্ব ১ সমাপ্ত