নিশিরাতের উইল – পর্ব ১

আকাশের মুখভার গত তিন দিন ধরেই। আষাঢ়ের শেষাশেষি, অথচ বৃষ্টির দেখা নেই; কেবল একটা ভ্যাপসা, গুমোট গরম চারপাশের বাতাসকে ভারী করে রেখেছে। মাঝে মাঝে দু-এক ফোঁটা আলগা বৃষ্টি পিচের রাস্তা কিংবা গাছের পাতায় টুপটাপ শব্দে ঝরে পড়ছে বটে, কিন্তু তাতে গরম কমছে না, উল্টে মাটির তপ্ত ভাপ উঠে সারা শরীর চটচটে করে তুলছে। কলকাতার এক কোণে নিজের বৈঠকখানায় বসে হাতপাখা নাড়ছিলেন গোয়েন্দা রঞ্জন। টেবিলের ওপর রাখা কাঁচের গ্লাসে বরফ দেওয়া জল ইতিমধ্যেই ঘরের উত্তাপে স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। রঞ্জনের পরনে পাতলা খদ্দরের পাঞ্জাবি, চোখে একজোড়া তীক্ষ্ণ এবং শান্ত দৃষ্টি। তিনি কোনো সাধারণ অপরাধী বা পকেটমারের পেছনে ছোটেন না; তাঁর মস্তিস্ক খোঁজে এমন কিছু, যা যুক্তি আর বিজ্ঞানের চেনা সীমানাকে বুড়ো আহমদ দেখায়।

ঠিক এমন সময় ঘরের দরজায় মৃদু করাঘাত হলো। ভেতরে প্রবেশ করলেন বীরভূমের বিখ্যাত মহেশপুর রাজবাড়ির দেওয়ান হরিশঙ্করবাবু। প্রৌঢ় ভদ্রলোকের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম, পরনের ধুতি-পাঞ্জাবি কুঁচকানো, আর চোখের কোণে এক চরম আতঙ্ক ও ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। তিনি ঘরে ঢুকেই কোনো ভূমিকা না করে সোজা রঞ্জনের সামনের চেয়ারে বসে পড়লেন।

রঞ্জন শান্ত গলায় বললেন, “বসুন হরিশঙ্করবাবু। জল খাবেন?”

হরিশঙ্করবাবু মাথা নেড়ে না বললেন, তারপর ফিসফিস করে বললেন, “রঞ্জনবাবু, একটা অসম্ভব কাণ্ড ঘটে গেছে। কুমার বাহাদুর… অর্থাৎ আমাদের বৃদ্ধ জমিদার বীরেন্দ্রনারায়ণ রায়চৌধুরী খুন হয়েছেন।”

রঞ্জন হাতপাখা নাড়ানো বন্ধ করলেন না, কেবল চোখের মণি দুটো সামান্য সংকুচিত হলো। তিনি বললেন, “জমিদার বীরেন্দ্রনারায়ণ? তাঁর তো বয়স হয়েছিল। কিন্তু খুন বলছেন কেন? স্বাভাবিক মৃত্যুও তো হতে পারত।”

“যদি স্বাভাবিক হতো, তবে আপনার কাছে ছুটে আসতাম না রঞ্জনবাবু,” হরিশঙ্করবাবুর গলা কাঁপছিল। “অপরাধটা যেভাবে ঘটেছে, তা কোনো মানুষের পক্ষে করা সম্ভব বলে মনে হচ্ছে না। এটি একটি অসম্ভব অপরাধ।”

“অসম্ভব বলে পৃথিবীতে কিছু নেই, হরিশঙ্করবাবু। যা আমাদের বুদ্ধির বাইরে, তাকেই আমরা অসম্ভব বলি। খুলে বলুন, ঠিক কী ঘটেছে।”

হরিশঙ্করবাবু পকেট থেকে একটা রুমাল বের করে কপাল মুছলেন, তারপর বলতে শুরু করলেন, “মহেশপুর রাজবাড়ির দক্ষিণ মহলের দোতলায় কুমার বাহাদুরের খাস শোবার ঘর। সেই ঘরটি এক দুর্ভেদ্য দুর্গ। চারিদিকের দেওয়াল তিন ফুট পুরু পাথরের। ঘরের দুটি জানালা, দুটোতেই ভেতর থেকে লোহার মজবুত গরাদ এবং তার ওপরে ভারী কাঠের কপাট রয়েছে, যা ভেতর থেকে খিল দেওয়া ছিল। আর ঘরের মূল দরজাটি নিরেট সেগুন কাঠের, যার ভেতরে বসানো আছে এক বিশাল লোহার খিল। গতকাল রাতে কুমার বাহাদুর রাত দশটা নাগাদ তাঁর ঘরে ঢোকেন। প্রতিদিনের মতো তিনি ভেতর থেকে দরজা-জানালা সব বন্ধ করে দেন। ঘরের ভেতরে তিনি ছাড়া আর কেউ ছিল না।”

“তারপর?” রঞ্জন জিজ্ঞেস করলেন।

“আজ সকালে যখন সাড়ে সাতটা বেজে গেল, তাও কুমার বাহাদুরের কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া গেল না। সাধারণত তিনি ভোর পাঁচটায় ওঠেন। আমরা প্রথমে ভাবলাম হয়তো ক্লান্তির কারণে ঘুমাচ্ছেন। কিন্তু বেলা আটটা বাজতেই আমাদের সন্দেহ হলো। আমি, তাঁর ভাইপো শশাঙ্ক এবং বাড়ির পুরনো ভৃত্য সনাতন মিলে দরজায় ধাক্কাধাক্কি শুরু করলাম। কোনো সাড়া নেই। ভেতর থেকে লোহার খিল আটকানো ছিল, তাই ধাক্টা দিয়ে দরজা ভাঙা অসম্ভব ছিল। শেষ পর্যন্ত আমরা শাবল এবং কুঠার নিয়ে এসে প্রায় এক ঘণ্টার চেষ্টায় দরজার কব্জা কেটে ভেতরে ঢুকলাম।”

“ভেতরে ঢুকে কী দেখলেন?” রঞ্জনের কণ্ঠে এবার গভীর কৌতূহল।

“যা দেখলাম, তা দেখার জন্য আমরা কেউ প্রস্তুত ছিলাম না,” হরিশঙ্করবাবু শিউরে উঠলেন। “कुमार বাহাদুর বিছানায় সোজা হয়ে বসে আছেন, যেন তিনি কারোর সঙ্গে কথা বলছিলেন। কিন্তু তাঁর চোখ দুটো খোলা, স্থির। আর তাঁর পিঠে… ঠিক দুই পাঁজরের মাঝখানে গভীর থোকা দিয়ে গেঁথে দেওয়া হয়েছে একটা প্রাচীন রাজস্থানী ছোরা। রক্ত গড়িয়ে বিছানার চাদর লাল করে দিয়েছে। তিনি তখন সম্পূর্ণ মৃত, শরীর শক্ত হয়ে গেছে।”

রঞ্জন কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তাঁর দীর্ঘ আঙুলগুলো টেবিলের ওপর তাল ঠুকছিল। “ঘরটির জানালাগুলো কেমন অবস্থায় ছিল?”

“সম্পূর্ণ বন্ধ। ভেতর থেকে লোহার ভারী হুক এবং খিল আঁটা। আমরা পরীক্ষা করে দেখেছি, জানালার একটি সুতো গলার জায়গাও খোলা ছিল না। ঘরের ছাদ এবং মেঝে সম্পূর্ণ নিরেট পাথর ও চুনকামের তৈরি, কোথাও একটা ফাটল পর্যন্ত নেই। অর্থাৎ, খুনি ঘরের ভেতরে ঢোকেনি, আবার ঘর থেকে বেরও হয়নি। অথচ কুমার বাহাদুরের পিঠে ছোরা বসানো।”

রঞ্জন মৃদু হাসলেন। “চমকপ্রদ। আর ঘরের ভেতর অন্য কিছু চোখে পড়েছে?”

“হ্যাঁ,” হরিশঙ্করবাবু বললেন, “টেবিলের ওপর একটা হ্যারিকেন জ্বলছিল। সকালের আলোতেও সেই হ্যারিকেনের শিখা টিমটিম করে জ্বলছিল, তেল প্রায় শেষ। আর তার ঠিক পাশেই পড়ে ছিল কুমার বাহাদুরের খাস উইল বা সম্পত্তি বণ্টনের খাতাটি। সেই খাতার অর্ধেকটা পুড়ে ছাই হয়ে গেছে, যেন কেউ ইচ্ছে করে তাতে আগুন ধরিয়েছিল, কিন্তু পুরোটা পোড়ার আগেই আগুন নিভে গেছে।”

রঞ্জন উঠে দাঁড়ালেন। ঘরের এক কোণে রাখা তাঁর লাঠিটা তুলে নিলেন। বললেন, “হরিশঙ্করবাবু, গরমটা আজ সত্যিই অসহ্য। তবে মহেশপুরের এই বন্ধ ঘরের ঠাণ্ডা রহস্যটা আমার মস্তিস্ককে কিছুটা আরাম দিতে পারে। চলুন, এখনই রওনা হতে হবে। তবে যাওয়ার আগে একটা কথা বলুন, ওই রাতে রাজবাড়িতে কারা কারা উপস্থিত ছিল?”

“বাড়িতে কুমার বাহাদুরের ভাইপো শশাঙ্কবাবু ছিলেন, তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী চারুলতা দেবী ছিলেন, কুমার বাহাদুরের ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডাক্তার অনাথবন্ধু মিত্র ছিলেন, আর পুরনো ভৃত্য সনাতন। এঁরা প্রত্যেকেই দাবি করছেন যে তাঁরা নিজ নিজ ঘরে ঘুমাচ্ছিলেন। কিন্তু…”

“কিন্তু কী?”

“প্রত্যেকেরই কোনো না কোনো অলীক বা অদ্ভুত অ্যালিবাই আছে, যা বিশ্বাস করা কঠিন, আবার ভেঙে ফেলাও অসম্ভব। আর সবচেয়ে বড় কথা, কুমার বাহাদুর কাউকেই বিশ্বাস করতেন না। তিনি ঘুমানোর আগে ঘরের প্রতিটি খিল নিজে তিনবার পরীক্ষা করতেন।”

রঞ্জন জানালার বাইরে তাকালেন। আকাশে মেঘের ঘনঘটা জমছে, কিন্তু বৃষ্টির দেখা নেই। এক ভ্যাপসা, রহস্যময় আবহাওয়া যেন পুরো বাংলাকে গ্রাস করে রেখেছে। তিনি ফিসফিস করে বললেন, “ভেতর থেকে বন্ধ দরজা, পিঠে ছোরা, জ্বলন্ত হ্যারিকেন আর আধপোড়া উইল। খুনি কি তবে বাতাস হয়ে ঘরে ঢুকেছিল, হরিশঙ্করবাবু? চলুন, মহেশপুর রাজবাড়ির এই অভেদ্য বৃত্তের ভেতরে আমাদের প্রবেশ করতে হবে।”

(রঞ্জন ও হরিশঙ্করবাবু কলকাতার স্টেশন থেকে দুপুরের ট্রেনে চেপে বসলেন। ট্রেনের কামরায় ঘামের গন্ধ আর গরমের তীব্রতা। জানালার বাইরে বাংলার দিগন্ত বিস্তৃত মাঠ, হালকা বৃষ্টির ফোঁটায় ভিজে উঠছে মাঠের মাটি। রঞ্জন চোখ বন্ধ করে ট্রেনের চাকার ছন্দোবদ্ধ শব্দ শুনছিলেন, কিন্তু তাঁর মস্তিস্কে তখন ঘুরছিল সেই চারটে দেয়ালের ভেতরের এক অসম্ভব দৃশ্য।)

বিকেলের দিকে যখন তাঁরা মহেশপুর রাজবাড়িতে পৌঁছালেন, তখন আকাশ আরও অন্ধকার হয়ে এসেছে। রাজবাড়িটি বিশাল, কিন্তু তার জৌলুস অনেকখানি ম্লান। প্রাচীন পাথরের দেওয়ালগুলোতে শ্যাওলা জমেছে। চারপাশের গাছপালাগুলো বাতাসে নিস্পন্দ দাঁড়িয়ে আছে। এক অদ্ভুত থমথমে নীরবতা গ্রাস করেছে পুরো প্রাসাদকে।

রঞ্জন সোজা দোতলার সেই দক্ষিণ মহলের ঘরে গেলেন। ঘরটি এখনো ঠিক তেমনই রাখা হয়েছে, পুলিশকে খবর দেওয়া হলেও স্থানীয় দারোগা বাবু রঞ্জনের আসার কথা শুনে কুমার বাহাদুরের মৃতদেহ ছাড়া অন্য কিছুতে হাত দেননি। রঞ্জন ঘরের দরজার সামনে দাঁড়ালেন। ভাঙা কব্জাগুলো ঝুলে আছে। তিনি ঘরের ভেতরে পা রাখলেন।

ঘরের বাতাস ভারী এবং সেখানে একটা চটচটে রক্তের গন্ধ আর তেলের পোড়া গন্ধ মিশে আছে। রঞ্জন প্রথমে বিছানার দিকে গেলেন। কুমার বাহাদুরের মৃতদেহটি সরিয়ে নেওয়া হলেও রক্তের দাগগুলো বিছানায় এক বীভৎস মানচিত্র তৈরি করেছে। তিনি বিছানার ঠিক পেছনের দেওয়ালে হাত দিলেন। নিরেট পাথর। কোনো গোপন সুড়ঙ্গ বা গুপ্ত দরজা থাকা অসম্ভব।

এরপর তিনি টেবিলের দিকে এগোলেন। টেবিলের ওপর রাখা সেই হ্যারিকেন। রঞ্জন হ্যারিকেনটি তুলে নিলেন। কাঁচের গায়ে কিছুটা ঝুল জমেছে। তিনি হ্যারিকেনের তেলের ট্যাঙ্কটি নাড়ালেন। সামান্য তেল পড়ে আছে তলায়। তার পাশেই সেই আধপোড়া খাতা। রঞ্জন খুব সাবধানে খাতার পাতাগুলো উল্টাতে লাগলেন। বেশির ভাগ অংশই পুড়ে কালো কয়লা হয়ে গেছে, তবে কিছু কিছু লাইনের অবশিষ্টাংশ বোঝা যাচ্ছে। সেখানে কুমার বাহাদুর তাঁর সমস্ত সম্পত্তি কাকে যেন লিখে দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু সেই নামটিই পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।

রঞ্জন ঘরের জানালা দুটির কাছে গেলেন। লোহার গরাদগুলো পরীক্ষা করলেন। প্রতিটি গরাদ শক্তভাবে পাথরের কাঠামোতে গাঁথা। জানালার কাঠের খিলগুলো ভারী লোহার পাত দিয়ে তৈরি। ভেতর থেকে বন্ধ থাকলে বাইরে থেকে তা খোলার কোনো উপায়ই নেই।

রঞ্জন ঘরের মাঝখানে এসে দাঁড়ালেন। তাঁর চোখ দুটো ঘরের মেঝেতে আটকে গেল। মেঝের এক কোণে, টেবিল থেকে কিছুটা দূরে, সামান্য কাদা এবং জলের দাগ শুকিয়ে রয়েছে। এই শুকনো কাদার দাগটা খুব ছোট, কিন্তু রঞ্জনের তীক্ষ্ণ চোখ তা এড়িয়ে গেল না। আষাঢ় মাসের হালকা বৃষ্টিতে বাইরের মাটি কাদা হয়ে আছে, কেউ একজন সেই কাদা পায়ে নিয়ে এই ঘরে এসেছিল। কিন্তু দরজা তো ভেতর থেকে বন্ধ ছিল!

রঞ্জন পকেট থেকে একটি ছোট আতশ কাঁচ বের করে সেই কাদার দাগটি পরীক্ষা করতে লাগলেন। তখনই তাঁর নজরে এলো এক অদ্ভুত জিনিস। কাদার দাগের ঠিক মাঝখানে একটা সুক্ষ্ম সুতোর টুকরো পড়ে আছে। সুতোটি সাধারণ সুতো নয়, এটি এক ধরনের রেশমি সুতো, যা সাধারণত দামী পোশাক বা কোনো বিশেষ মলাট বাঁধাইয়ের কাজে ব্যবহৃত হয়।

রঞ্জন সুতোর টুকরোটি তুলে নিজের পকেটে রাখলেন। তাঁর মুখে এক রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল।

হরিশঙ্করবাবু দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি ভেতরে এসে জিজ্ঞেস করলেন, “কিছু বুঝলেন রঞ্জনবাবু? কোনো ক্লু পেলেন?”

রঞ্জন টেবিলের আধপোড়া খাতার দিকে তাকিয়ে বললেন, “ক্লু তো ছড়িয়েই আছে হরিশঙ্করবাবু। তবে যা দেখছি, তা যত না অপরাধের প্রমাণ, তার চেয়ে বেশি এক মনস্তাত্ত্বিক ধাঁধা। খুনি কেবল কুমার বাহাদুরকে হত্যা করেনি, সে আমাদের বুদ্ধিকে চ্যালেঞ্জ করেছে।”

“কিন্তু কীভাবে সম্ভব? দরজা-জানালা ভেতর থেকে বন্ধ থাকলে খুনি বের হলো কোন পথে?” হরিশঙ্করবাবু ব্যাকুল হয়ে উঠলেন।

রঞ্জন হ্যারিকেনের জ্বলন্ত শিখাটির কথা ভাবছিলেন। সকালে যখন দরজা ভাঙা হয়, তখনো হ্যারিকেন জ্বলছিল। এর মানে কী? কুমার বাহাদুর কি সারারাত হ্যারিকেন জ্বালিয়ে রেখেছিলেন, নাকি খুনি খুন করার পর হ্যারিকেনটি জ্বালিয়ে দিয়েছিল? যদি খুনি ঘরের ভেতরেই না ঢোকে, তবে হ্যারিকেন কে জ্বালল? আর এই উইল খাতাটিতে আগুনই বা কে ধরাল?

রঞ্জন জানালার বাইরে তাকালেন। দূরের আমবাগান থেকে একটা রাতকানা পাখির ডাক ভেসে এলো। বাতাসের গুমোট ভাবটা যেন আরও বেড়ে গেছে। তিনি ফিসফিস করে বললেন, “এই বন্ধ ঘরের চাবিকাঠি দরজার খিলে নেই হরিশঙ্করবাবু, চাবিকাঠিটা লুকিয়ে আছে ওই জ্বলন্ত হ্যারিকেন আর আধপোড়া খাতার পাতায়। কিন্তু তার আগে আমাকে বাড়ির বাকি সদস্যদের সঙ্গে কথা বলতে হবে। প্রত্যেকের অলীক অ্যালিবাইগুলো একবার বাজিয়ে দেখা দরকার।”

তিনি ঘর থেকে বের হতে যাবেন, এমন সময় তাঁর পা থমকে গেল। দরজার চৌকাঠের ঠিক নিচে, যেখানে লোহার খিলটি এসে মেঝের গর্তে বসে, সেখানে একটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম, প্রায় অদৃশ্য আঁচড়ের দাগ রয়েছে। দাগটি নতুন, এবং তা ওপর থেকে নিচের দিকে নয়, বরং নিচ থেকে ওপরের দিকে টানা হয়েছে।

রঞ্জনের চোখের মণি আবার সংকুচিত হলো। তিনি মনে মনে বললেন, ‘তাহলে সমীকরণটা যেভাবে ভাবা হচ্ছিল, ঠিক সেভাবে নয়। খুনি আমাদের যা দেখাতে চেয়েছে, আমরা ঠিক সেটাই দেখছি। কিন্তু আসল সত্য এর সম্পূর্ণ বিপরীত।’

তিনি হরিশঙ্করবাবুর দিকে ফিরে বললেন, “আজ রাতেই আমি বাকিদের সঙ্গে কথা বলব। এই অভেদ্য বৃত্তের প্রথম কপাটটি হয়তো বন্ধ, কিন্তু তার পেছনে যে অন্ধকারের জাল পাতা আছে, তা এবার ছিঁড়তে শুরু করেছে।”

মহেশপুর রাজবাড়ির নাটমন্দিরের পাশ দিয়ে যখন রঞ্জন বৈঠকখানার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন চারদিকের অন্ধকার আরও ঘনীভূত হয়েছে। বিকেলের সেই গুমোট ভাবটা কাটিয়ে এখন ঝিরঝির করে হালকা বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে। তবে বাতাসে বিন্দুমাত্র ঠাণ্ডা ভাব নেই, বরং ভেজা মাটির সোঁদা গন্ধের সঙ্গে এক অদ্ভুত গরম ভাপ মিশে চারপাশটাকে আরও বেশি দমবন্ধকর করে তুলেছে।

বৈঠকখানাটি বেশ বড়। মেহগনি কাঠের ভারী আসবাবপত্র, দেওয়ালে পূর্বপুরুষদের তৈলচিত্র আর এক কোণে রাখা বিশাল এক গ্রামোফোন। ঘরের একদিকের দেওয়ালের কাছে ইজিচেয়ারে বসে ছিলেন শশাঙ্কবাবু—জমিদারের একমাত্র জীবিত ভাইপো। তাঁর চোখে-মুখে এক তীব্র অস্থিরতা, অনবরত একটা রুপোর নস্যির কৌটো আঙুল দিয়ে নাড়াচাড়া করছেন। তাঁর ঠিক পাশেই সোফায় বসে আছেন ডাক্তার অনাথবন্ধু মিত্র। ডাক্তারবাবুর বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি, চোখে মোটা কাঁচের চশমা, পরনে কোট-প্যান্ট থাকলেও গরমের চোটে টাইটা অনেকখানি আলগা করে রেখেছেন।

রঞ্জন ঘরে ঢুকে একটা চেয়ার টেনে বসলেন। হরিশঙ্করবাবু এক কোণে দাঁড়িয়ে রইলেন নীরব দর্শকের মতো।

রঞ্জন শশাঙ্কবাবুর দিকে তাকিয়ে সরাসরি প্রশ্ন করলেন, “শশাঙ্কবাবু, গত পরশু রাতে আপনার জ্যাঠামশাই যখন নিজের ঘরে ঢোকেন, তখন আপনি কোথায় ছিলেন?”

শশাঙ্কবাবু নস্যির কৌটোটা শক্ত করে চেপে ধরে বললেন, “আমি আমার নিজের ঘরেই ছিলাম, রঞ্জনবাবু। আমার ঘর তো এই মহলেরই ঠিক উল্টোদিকে। রাত দশটা নাগাদ জ্যাঠামশাই যখন শুতে যান, আমি তখন বারান্দায় দাঁড়িয়ে একটা চুরুট খাচ্ছিলাম। আমি নিজে দেখেছি তিনি ঘরে ঢুকে ভেতর থেকে ভারী লোহার খিলটা আটকে দিলেন। সেই কর্কশ শব্দটা আমি খুব স্পষ্ট শুনেছি।”

“তারপর? আপনি সারা রাত নিজের ঘরেই ছিলেন?” রঞ্জনের দৃষ্টি শশাঙ্কবাবুর মুখের প্রতিটি পেশীর ওঠানামা লক্ষ্য করছিল।

“হ্যাঁ। তবে আমার একটা বাতের ব্যথার ধাত আছে। এই ভ্যাপসা গরমে আর বৃষ্টির শুরুতে ব্যথাটা বড্ড বাড়ে। তাই রাত দেড়টা নাগাদ আমি একবার নিচে নেমেছিলাম, সনাতনের কাছ থেকে একটু গরম জল নেওয়ার জন্য। জল নিয়ে এসে পায়ে মালিশ করে শুয়ে পড়ি। ব্যস, এটুকুই।”

রঞ্জন এবার ডাক্তার অনাথবন্ধুর দিকে ফিরলেন। “ডাক্তারবাবু, আপনি তো কুমার বাহাদুরের খাস চিকিৎসক। তাঁর শরীরের অবস্থা কেমন ছিল?”

ডাক্তার মিত্র চশমাটা ঠিক করতে করতে বললেন, “বীরেন্দ্রনারায়ণের শরীর মোটেই ভালো ছিল না। হৃদযন্ত্রের দুর্বলতা তো ছিলই, তার ওপর ইদানীং এক চরম মানসিক অবসাদে ভুগছিলেন। কাউকে বিশ্বাস করতে পারতেন না। আমাকেও মাঝে মাঝে বলতেন, ‘অনাথবন্ধু, তোমরা সবাই আমার টাকার পেছনে লেগেছ।’ তবে পরশু রাতে আমি সাড়ে নটা নাগাদ তাঁকে একটা ঘুমের ওষুধ দিয়ে আমার ঘরে চলে যাই। আমার ঘর রাজবাড়ির বাইরের মহলে। রাতে আমি একবারের জন্যও এদিকে আসিনি।”

“ঘুমের ওষুধ?” রঞ্জন একটু নড়েচড়ে বসলেন। “কী ওষুধ দিয়েছিলেন?”

“একটি মৃদু সিডেটিভ। যা খেলে অন্তত ছ-সাত ঘণ্টা গভীর ঘুম হওয়ার কথা। সাধারণত এই ওষুধ খাওয়ার পর বীরেন্দ্রনারায়ণের পক্ষে মাঝরাতে উঠে কোনো উইল লেখা বা হ্যারিকেন জ্বালানোর মতো মানসিক সচেতনতা থাকার কথা নয়,” ডাক্তারবাবু জোর দিয়ে বললেন।

রঞ্জন কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তাঁর মাথায় একটা নতুন সমীকরণ দানা বাঁধছিল। যদি কুমার বাহাদুর গভীর ঘুমের ওষুধ খেয়ে থাকেন, তবে মাঝরাতে টেবিলের ওপর হ্যারিকেন জ্বেলে কে বসেছিল? আর উইলের খাতায় আগুনই বা কে দিল? কুমার বাহাদুর নিজে? নাকি খুনি? কিন্তু খুনি যদি ঘরে না-ই ঢুকে থাকে, তবে ঘরের ভেতরের হ্যারিকেন আর আধপোড়া খাতার রহস্য কীভাবে ব্যাখ্যা করা যাবে?

রঞ্জন ভৃত্য সনাতনকে ডেকে পাঠালেন। সনাতন প্রাচীন ভৃত্য, চুল-দাড়ি পেকে সাদা। সে কাঁপতে কাঁপতে ঘরের দরজায় এসে দাঁড়াল।

“সনাতন,” রঞ্জন নরম গলায় বললেন, “শশাঙ্কবাবু বলছেন রাত দেড়টা নাগাদ তিনি তোমার কাছ থেকে গরম জল নিয়েছিলেন। এটা কি সত্যি?”

“হ্যাঁ বাবু,” সনাতন হাতজোড় করে বলল, “ছোটবাবু নিচে এসেছিলেন। আমি তখন রান্নাঘরের দাওয়ায় বসে হাতপাখা নাড়ছিলাম, গরমে চোখে ঘুম আসছিল না। ছোটবাবুকে জল ফুটিয়ে দেওয়ার পর আমি আবার শুয়ে পড়ি।”

“তুমি রাতে কোনো অদ্ভুত শব্দ বা কারোর পদধ্বনি শোননি?”

সনাতন একটু ইতস্তত করল, তারপর বলল, “একটা কথা মনে পড়ছে বাবু। রাত তখন আনুমানিক তিনটে হবে। হঠাৎ একটা ভারী কিছু পড়ার শব্দ পেয়েছিলাম উপর থেকে। যেন কোনো লোহার জিনিস মেঝেতে আছড়ে পড়ল। কিন্তু এই রাজবাড়িতে চামচিকের উপদ্রব খুব বেশি, আর ঝোড়ো বাতাসও দিচ্ছিল, তাই ভেবেছিলাম জানালার কপাট নড়ছে। ওপরে আর আসিনি।”

লোহার জিনিস পড়ার শব্দ! রঞ্জনের মনে পড়ে গেল কুমার বাহাদুরের ঘরের সেই বিশাল লোহার খিলের কথা। দরজার চৌকাঠের নিচে যে সুক্ষ্ম আঁচড়ের দাগটা তিনি দেখেছিলেন, তার সঙ্গে এই শব্দের কি কোনো যোগ আছে?

রঞ্জন উঠে দাঁড়ালেন। বললেন, “হরিশঙ্করবাবু, আমাকে আরও একবার কুমার বাহাদুরের শোবার ঘরে যেতে হবে। এবার একা।”

তিনি আবার সেই অন্ধকার, গুমোট দক্ষিণ মহলের ঘরের দিকে রওনা হলেন। বাইরে বৃষ্টির বেগ কিছুটা বেড়েছে, কিন্তু জানালার বাইরে তাকালে শুধু জলীয় ভাপ আর জমাট অন্ধকার চোখে পড়ে। রঞ্জন কুমার বাহাদুরের ঘরে ঢুকে হ্যারিকেনটি আবার হাতে নিলেন।

তিনি হ্যারিকেনের কাঁচের গায়ের ঝুল পরীক্ষা করতে লাগলেন। ঝুল সাধারণত তখনই জমে, যখন হ্যারিকেনের সলতেটি প্রয়োজনের চেয়ে বেশি উঁচুতে তুলে দেওয়া হয়। কিন্তু এই হ্যারিকেনের সলতেটি এখন একদম নিচে নামানো, আলোটা টিমটিম করে জ্বলছিল। এর মানে, কেউ একজন সলতেটি কমিয়ে দিয়েছিল, অথবা তেল শেষ হয়ে আসায় আলো নিজে থেকেই কমে গিয়েছিল। কিন্তু সলতে যদি উঁচুতে চড়ানো না থাকে, তবে কাঁচের ভেতরের একদিকের দেওয়ালে এত ঘন ঝুল জমল কীভাবে?

রঞ্জন হ্যারিকেনটি টেবিলের ওপর রাখলেন। তাঁর চোখ গেল আধপোড়া উইলের খাতাটির দিকে। খাতাটি যেভাবে পুড়েছে, তা অত্যন্ত অদ্ভুত। আগুনের উৎসটি ছিল খাতার ঠিক মাঝখান থেকে, কোণ থেকে নয়। যেন কেউ খাতার পাতার মাঝখানে কোনো জ্বলন্ত বস্তু চেপে ধরেছিল।

তিনি পকেট থেকে আবার সেই আতশ কাঁচটি বের করলেন। টেবিলের কাঠের উপরিভাগটি ভালো করে পরীক্ষা করতেই তিনি দেখতে পেলেন, হ্যারিকেনটি যেখানে রাখা ছিল, তার ঠিক পাশে একটা ছোট বৃত্তাকার তেলের দাগ রয়েছে। দাগটি কেরোসিন তেলের নয়, এটি কোনো উদ্ভিজ্জ তেলের দাগ—সম্ভবত তিল বা সরষের তেল, যা রাজবাড়ির চুলে মাখার জন্য ব্যবহার করা হয়।

রঞ্জনের ঠোঁটের কোণে আবার সেই রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল। তিনি বিড়বিড় করে বললেন, “তাহলে হ্যারিকেনটি কেবল আলো দেওয়ার জন্য জ্বলছিল না। ওটি ছিল সময়ের একটা সূচক। কিন্তু খুনি এত সূক্ষ্ম চাল চালল কীভাবে?”

তিনি ঘরের জানালার দিকে তাকালেন। ভেতর থেকে বন্ধ খিল। রঞ্জন খিলটি হাত দিয়ে নাড়াচাড়া করে দেখলেন। কোনো ফাঁক নেই। বাইরে থেকে কোনো সুতো বা তার গলিয়ে এই ভারী লোহার খিল তোলা বা নামানো কোনোমতেই সম্ভব নয়।

হঠাৎ তাঁর মনে হলো, তিনি ঘরের একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদানকে অবহেলা করছেন। মৃতদেহের পিঠে বসা সেই প্রাচীন রাজস্থানী ছোরা। ছোরাটির হাতলটি ছিল হাতির দাঁতের তৈরি, যার ওপর একটা সিংহের অবয়ব খোদাই করা ছিল। হরিশঙ্করবাবু জানিয়েছিলেন, এই ছোরাটি কুমার বাহাদুরের নিজের সংগ্রহশালার জিনিস, যা বৈঠকখানার একটা কাঁচের আলমারিতে রাখা থাকত।

যদি ছোরাটি সংগ্রহশালার হয়, তবে খুনি নিশ্চয়ই সেটি আগে থেকে সংগ্রহ করেছিল। কিন্তু খুনি যদি বাইরের কেউ হতো, তবে সে জানত না যে ছোরাটি কোথায় থাকে। তার মানে খুনি ভেতরেরই কেউ। কিন্তু ভেতরের কেউ হলেও, সে বন্ধ ঘরে ঢুকল কী করে?

রঞ্জন দরজার দিকে এগোলেন। সেই নতুন আঁচড়ের দাগটি আবার পরীক্ষা করলেন। এবার তিনি মেঝের দিকে আরও ঝুঁকে পড়লেন। দরজার চৌকাঠের নিচ দিয়ে একটা অত্যন্ত সরু ফাটল রয়েছে, যা মেঝের ক্ষয়ীভবনের কারণে তৈরি হয়েছে। ফাটলটি এতই ছোট যে সেখান দিয়ে একটা পাতলা লোহার পাত বা শক্ত সুতো গলানো সম্ভব।

রঞ্জন পকেট থেকে আগের পর্বে পাওয়া সেই রেশমি সুতোর টুকরোটি বের করলেন। তিনি সুতোটি সেই ফাটলের ভেতরে গলানোর চেষ্টা করলেন। সুতোটি অনায়াসে গলে গেল।

রঞ্জনের চোখের সামনে যেন অন্ধকারের একটা পর্দা সরে গেল। তিনি বুঝতে পারলেন, খুনি কীভাবে ঘর থেকে বের হয়েও দরজাটি ভেতর থেকে বন্ধ দেখাতে পেরেছে। এটা কোনো ভৌতিক কাণ্ড নয়, তীব্র বৈজ্ঞানিক এবং মনস্তাত্ত্বিক কারসাজি।

কিন্তু একটা খটকা এখনো রয়ে গেছে। পিঠের ছোরাটি। কুমার বাহাদুর যদি ঘুমের ওষুধ খেয়ে বিছানায় শুয়ে থাকতেন, তবে ছোরাটি তাঁর পিঠে সোজা হয়ে বসল কীভাবে? তিনি তো উপুড় হয়ে ঘুমাননি, তিনি বিছানায় সোজা বসে থাকা অবস্থায় মৃত উদ্ধার হয়েছেন। ঘুমের ওষুধ খাওয়া একজন মানুষ সোজা বসে থাকতে পারেন না, যদি না তাঁকে কেউ জাগিয়ে তোলে।

তাহলে কি খুনি ঘরে ঢুকেছিল? কিন্তু দরজা-জানালা তো ভেতর থেকে বন্ধ!

রঞ্জন যখন এই ধাঁধার জালে হাবুডুবু খাচ্ছেন, ঠিক তখনই বাইরে থেকে একটা বিকট চিৎকার ভেসে এলো। চিৎকারটি চারুলতা দেবীর ঘর থেকে আসছিল—জমিদারের ভাইপো শশাঙ্কবাবুর দ্বিতীয় স্ত্রী।

রঞ্জন দ্রুত পা চালিয়ে বৈঠকখানা পার হয়ে চারুলতা দেবীর ঘরের দিকে ছুটলেন। ঘরে ঢুকে দেখলেন চারুলতা দেবী মেঝেতে অর্ধচেতন অবস্থায় পড়ে আছেন, আর তাঁর হাতের কাছে পড়ে আছে একটা চায়ের কাপ, যা থেকে নীলচে রঙের একটা তরল মেঝেতে গড়িয়ে পড়ছে। বাতাস মুহূর্তের মধ্যে এক চেনা কিন্তু মারাত্মক বিষের গন্ধে ভরে গেল।

রঞ্জন ডাক্তার মিত্রের দিকে তাকিয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন, “ডাক্তারবাবু, জলদি দেখুন! সায়ানাইড!”

রঞ্জনের চেনা সমীকরণটা যেন এক ঝটকায় উল্টে গেল। যে চারুলতা দেবীর অলীক অ্যালিবাই নিয়ে তিনি একটু আগে ভাবছিলেন, সে নিজেই এখন মৃত্যুর মুখে। খুনি কি তবে তার নিজের ছক ঢাকতে আরও একটা চাল চালল? নাকি এই বিষের পেছনে লুকিয়ে আছে অন্য কোনো ভয়াবহ খেলা?

পর্ব ১ সমাপ্ত

আপনার মন্তব্য জানান।

Your email address will not be published. Required fields are marked *

0% | 0মি 0সে
Scroll to Top