আমি যাকে খুন করিনি – পর্ব ১

মেক্সিকোর নির্মম তপ্ত আকাশ থেকে যখন শেষ বিকেলের আলোটুকু চুইয়ে পড়ছিল, তখন চারপাশের বাতাস কোনো এক মৃত মানুষের দীর্ঘশ্বাসের মতো ভারী হয়ে উঠেছিল। মেক্সিকো সিটির উপকণ্ঠের সেই প্রাচীন, জরাজীর্ণ কারাগারের লোহার ভারী ফটকটি যখন এক কর্কশ শব্দে খুলে গেল, তখন বাইরের রুক্ষ ধুলোবালি এসে স্পর্শ করল সোমনাথের বিবর্ণ মুখ।

দীর্ঘ আটটি বছর।

আটটি বছর ধরে এই তপ্ত মাটির নিচে এক অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বন্দি ছিল সে। স্বাধীনতা শব্দটা তার কাছে এখন এক অপরিচিত হ্যালুসিনেশনের মতো শোনায়। তপ্ত তামাটে রঙের দিগন্তের দিকে তাকিয়ে সোমনাথের মনে হলো, এই মুক্তি আসলে মুক্তি নয়, বরং এক নতুন খাঁচায় প্রবেশ মাত্র। বাতাস এতটা শুষ্ক যে, প্রতিবার শ্বাস নেওয়ার সময় ফুসফুসের ভেতরে যেন এক অদৃশ্য ব্লেড চরে বেড়ায়।

সোমনাথের পরনের মলিন জ্যাকেটটা ধূসর ধুলোয় ঢেকে গেছে। পকেটে মাত্র কয়েকটা পেসো আর একটা ভাঙা চশমা। মেক্সিকোর এই তীব্র, নিষ্করুণ রোদ তার চোখের কর্নিয়াকে পুড়িয়ে দিতে চায়। কিন্তু তার চেয়েও তীব্র এক আগুন জ্বলছে তার বুকের গহীনে। আট বছর আগে, তাকে এক নির্মম চক্রান্তের জালে জড়িয়ে এই নরকে নিক্ষেপ করা হয়েছিল। অপরাধ? সব্যসাচী সেনগুপ্তের হত্যাকাণ্ড।

সব্যসাচী— যে ছিল তার ছায়ার মতো বন্ধু, আবার একই সঙ্গে তার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দী। মেক্সিকোর এক নির্জন মরু প্রান্তরের রিসোর্টে সব্যসাচীর রক্তাক্ত, ক্ষতবিক্ষত দেহ উদ্ধার হয়েছিল, আর সমস্ত তথ্যপ্রমাণ আঙুল তুলেছিল সোমনাথের দিকে। সোমনাথের মনে নেই সে রাতে কী হয়েছিল। মদ্যপানের পর এক তীব্র অন্ধকার তার স্মৃতিকে গ্রাস করেছিল, আর যখন চোখ খুলেছিল, তখন তার হাত ছিল সব্যসাচীর রক্তে রাঙানো। অন্তত আদালত এবং পুলিশ তাকে এটাই বিশ্বাস করিয়েছিল।

কারাগারের দেয়াল পেছনে ফেলে সোমনাথ হাঁটতে শুরু করল। তার চারপাশের পৃথিবীটা বদলে গেছে, কিন্তু তার ভেতরের শূন্যতা এক চুলও নড়েনি। ধুলো উড়িয়ে একটা ভাঙা ট্যাক্সি এসে দাঁড়াল তার সামনে। মেক্সিকান চালকটি স্প্যানিশ ভাষায় ভাঙা গলায় জিজ্ঞেস করল, “কোথায় যাবে, সেনিয়র?” সোমনাথ কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইল। তারপর নিচু, প্রায় অমানুষিক এক গলায় বলল, “সান অ্যাঞ্জেল।”

সান অ্যাঞ্জেল— যেখানে আট বছর আগে সমস্ত ধ্বংসলীলার সূত্রপাত হয়েছিল। ট্যাক্সির জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে সোমনাথের মনে হচ্ছিল, চারপাশের ক্যাকটাসগুলো যেন একেকটি ক্রুশবিদ্ধ কঙ্কাল, যা তাকে উপহাস করছে। স্মৃতির পাতাগুলো তার মগজের দেয়ালে আছড়ে পড়তে লাগল। সব্যসাচীর সেই শেষ চিৎকার, চারপাশের রক্তের সেই তীব্র গন্ধ, যা আজও তার নাসিকারন্ধ্র থেকে মুছে যায়নি। কিন্তু সোমনাথ জানত, সে কোনো খুনি নয়। তার অবচেতন মন তাকে প্রতিদিন অবিরত বলে গেছে, সেই রাতে কোনো এক অদৃশ্য তৃতীয় হাত পুরো খেলাটা খেলেছিল। সেই হাতের মালিককে খুঁজে বের করতেই তার এই ফিরে আসা।

ট্যাক্সিটি যখন সান অ্যাঞ্জেলের এক নির্জন কলোনির সামনে এসে থামল, তখন অন্ধকার পুরোপুরি নেমে এসেছে।

মেক্সিকোর রাতগুলো অদ্ভুতভাবে ঠান্ডা আর রহস্যময়। দিনের বেলার সেই রুক্ষ উত্তাপ হঠাৎ করেই এক হাড়কাঁপানো শীতলতায় রূপ নেয়।

সোমনাথ গাড়ি থেকে নেমে একটা পুরনো সস্তা সরাইখানার দিকে এগিয়ে গেল। তাকে আজ রাতটা এখানেই কাটাতে হবে। সরাইখানার কাঠের মেঝেটা প্রতিটি পদক্ষেপে মরণাপন্ন পশুর মতো আর্তনাদ করে উঠছিল। কাউন্টারে বসা বৃদ্ধ মেক্সিকান লোকটা অলস চোখে সোমনাথের দিকে তাকাল, যেন সে কোনো জ্যান্ত মানুষ নয়, বরং এক প্রেতাত্মা দেখছে।

একটা ছোট, স্যাঁতসেঁতে ঘর ভাড়া নিয়ে সোমনাথ বিছানায় গা এলিয়ে দিল। ছাদের দিকে তাকিয়ে সে তার প্রতিশোধের নীল নকশা তৈরি করতে লাগল। সব্যসাচী মারা গেছে, কিন্তু তার সাম্রাজ্য, তার বিপুল অর্থবিত্ত এখন কার দখলে? তার সেই রহস্যময়ী ডায়েরিটা কোথায়, যাতে লুকিয়ে ছিল এক চরম মনস্তাত্ত্বিক সত্য? সোমনাথ চোখ বন্ধ করল। কিন্তু ঘুম তার চোখের পাতা ছুঁতে পারল না। এক অদ্ভুত অস্থিরতা তাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াতে লাগল। মাঝরাতে হঠাৎ তার তৃষ্ণা পেল। ঘরের কোণে রাখা জলের কুঁজোটা শূন্য। সে চাদরটা গায়ে জড়িয়ে ঘরের বাইরে বের হলো, সরাইখানার একতলার লবিতে থাকা জলের ফিল্টারের উদ্দেশ্যে।

নিচের লবিটা তখন ঘুটঘুটে অন্ধকারে নিমজ্জিত। কেবল কাউন্টারের ওপর একটা ছোট হলুদ বাতি টিমটিম করে জ্বলছে। সোমনাথ যখন জলের গ্লাসটা ঠোঁটে ছোঁয়াল, ঠিক তখনই সরাইখানার সদর দরজার কাঁচের ওপার থেকে একটা শব্দ শুনতে পেল সে। কেউ একজন বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। মেক্সিকোর এই জনমানবহীন মাঝরাতে সচরাচর কেউ আসে না। এক অদ্ভুত কৌতূহলে সোমনাথ দরজার দিকে এগিয়ে গেল। বাইরে কুয়াশা আর ধুলোর এক মিশ্রণ তৈরি হয়েছে, যার মধ্য দিয়ে আলো-ছায়ার এক অদ্ভুত খেলা চলছে।

কাঁচের দরজার ঠিক ওপারে, ল্যাম্পপোস্টের আবছা হলদে আলোর নিচে একটা অবয়ব দাঁড়িয়ে ছিল। লোকটার পরনে একটা চওড়া ওভারকোট, মাথায় মেক্সিকান হ্যাট। লোকটা সোমনাথের দিকেই তাকিয়ে ছিল। সোমনাথের বুকের ভেতরটা হঠাৎ এক অজানা আশঙ্কায় মোচড় দিয়ে উঠল। সে চশমাটা ভালো করে নাকের ওপর বসিয়ে চোখ দুটো সরু করল। আলোর কোণটা যখন লোকটার মুখের ওপর এসে পড়ল, সোমনাথের পায়ের নিচের কাঠের মেঝেটা যেন আচমকা এক তীব্র ভূমিকম্পে কেঁপে উঠল। তার ফুসফুস থেকে সমস্ত বাতাস এক নিমেষে উধাও হয়ে গেল।

না, এটা অসম্ভব! এটা কোনো মনস্তাত্ত্বিক বিভ্রম বা হ্যালুসিনেশন হতে পারে না!

সোমনাথের চোখের সামনে, ঠিক পাঁচ হাত দূরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার মুখটা অতি পরিচিত। ডান গালের ওপর সেই গভীর কাটা দাগ, সেই চিল শকুনের মতো তীক্ষ্ণ চোখ।

লোকটা আর কেউ নয়— সব্যসাচী সেনগুপ্ত!

যে সব্যসাচীকে খুন করার অপরাধে সে জীবনের আটটি বসন্ত নরককুণ্ডে কাটিয়ে এসেছে, সেই সব্যসাচী জীবিত, রক্ত-মাংসের শরীরে তার সামনে দাঁড়িয়ে হাসছে। এক পৈশাচিক, শীতল হাসি। সোমনাথের চোখের মণি স্থির হয়ে গেল, তার অবশ হাত থেকে কাঁচের গ্লাসটি মেঝেতে পড়ে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল। কিন্তু মেঝের সেই তীব্র শব্দকে ছাপিয়ে সোমনাথের মগজে তখন একটা সত্য হাতুড়ির মতো আঘাত করছিল— যদি সব্যসাচী জীবিত থাকে, তবে আট বছর ধরে সে কাকে খুন করার শাস্তি ভোগ করল? আর যদি এই মানুষটি সত্যিই সব্যসাচী হয়, তবে তার জীবনের এই ধ্বংসযজ্ঞের আসল খলনায়ক কে? লোকটা অন্ধকার গলির ভেতর মিলিয়ে যাওয়ার আগে সোমনাথের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট নাড়িয়ে শুধু একটা শব্দ উচ্চারণ করল, যার কোনো শব্দ হলো না, কিন্তু সোমনাথ স্পষ্ট বুঝতে পারল সব্যসাচী কী বলল— “স্বাগত।”

ভাঙা কাঁচের টুকরোগুলো মেক্সিকান সরাইখানার কাঠের মেঝেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে রইল, ঠিক যেভাবে সোমনাথের চেনা পৃথিবীর সমস্ত যুক্তি আর বিশ্বাস এক মুহূর্তে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেছে। ঘরের ভেতর জমে থাকা স্তব্ধতা যেন একটা জীবন্ত সত্তার মতো তার গলা টিপে ধরছিল। সোমনাথ হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে দরজার ছিটকিনি খুলে অন্ধকারের মধ্যে ছুটে বের হলো। সান অ্যাঞ্জেলের সেই সরু, পাথুরে গলিটায় কুয়াশার মতো ধুলো উড়ছে। ল্যাম্পপোস্টের হলদে আলোয় ধূলিকণাগুলো নাচছে, যেন কোনো এক অদৃশ্য জাদুকরের সম্মোহনী ইশারা।

“সব্যসাচী!” সোমনাথের গলা দিয়ে এক অমানুষিক চিৎকার বেরিয়ে এলো, কিন্তু সেই শব্দ মেক্সিকোর রাতের শীতল বাতাসে ধাক্কা খেয়ে তার নিজের কানেই ফিরে এলো। গলিটা সম্পূর্ণ জনমানবহীন। কেবল দূর থেকে কোনো এক তৃষ্ণার্ত কুকুরের কান্নার মতো আওয়াজ ভেসে আসছিল। সোমনাথ চারদিকে পাগলের মতো তাকাতে লাগল। তার বুকের ভেতরের হৃৎপিণ্ডটা এত জোরে আছাড় খাচ্ছিল যে, মনে হচ্ছিল পাঁজরের হাড়গুলো ভেঙে এখনই বাইরে বেরিয়ে আসবে।

এটা কি কোনো দৃষ্টিবিভ্রম? আট বছরের একাকীত্ব আর অন্ধকার প্রকোষ্ঠের মানসিক যন্ত্রণা কি তার মগজের কোষে কোষে কোনো স্থায়ী বিকৃতি ঘটিয়ে দিয়েছে? সাইকোলজির পরিভাষায় একে বলে ‘ভিজ্যুয়াল হ্যালুসিনেশন’। কিন্তু সোমনাথ খুব ভালো করেই জানে, সেই চিরচেনা ক্রুর হাসি, ডান গালের ওপর সেই গভীর কাটা দাগ— যা এককালে এক কুখ্যাত গ্যাংস্টারের ছুরির আঘাতে তৈরি হয়েছিল— তা কোনো মরীচিকা হতে পারে না। সব্যসাচী বেঁচে আছে। এই সত্যটা বিষাক্ত সাপের মতো সোমনাথের মেরুদণ্ড বেয়ে নেমে গেল।

যদি সব্যসাচী বেঁচে থাকে, তবে আট বছর আগে মেক্সিকোর ওক্সাকা মরুভূমির সেই বিলাসবহুল রিসোর্টে কার রক্তাক্ত লাশ উদ্ধার করেছিল পুলিশ? কার বিকৃত হয়ে যাওয়া লাশের আঙুলের ছাপ আর সোমনাথের হাতের রক্ত এক সুতোয় বেঁধে দিয়েছিল আদালত? সোমনাথের মনে পড়ে গেল সেই অভিশপ্ত রাতের কথা। সব্যসাচী তাকে মেক্সিকোতে ডেকে এনেছিল এক বিশেষ প্রত্নতাত্ত্বিক ব্ল্যাকমেলিংয়ের খেলা খেলতে। মেক্সিকোর প্রাচীন মায়ান সভ্যতার কিছু দুষ্প্রাপ্য সোনা আর প্রাচীন পাণ্ডুলিপি পাচারের কারবারে জড়িয়ে পড়েছিল সব্যসাচী। সোমনাথ ছিল তার আইনি উপদেষ্টা। কিন্তু সে রাতে মদ্যপানের পর সোমনাথের স্মৃতিতে একটা প্রকাণ্ড ব্ল্যাকআউট তৈরি হয়েছিল। যখন তার চেতনা ফিরেছিল, তখন সে নিজেকে আবিষ্কার করেছিল এক রক্তস্নাত ঘরে, আর তার ডানহাতে ছিল একটা ধারালো মেক্সিকান ড্যাগার।

সোমনাথ ধীর পায়ে সরাইখানার ঘরে ফিরে এলো। তার শরীর কাঁপছে, কিন্তু মগজ এখন এক অদ্ভুত, বরফশীতল শান্ততায় রূপ নিয়েছে। সে বিছানায় বসে নিজের দুই হাতের তালুর দিকে তাকাল। এই হাত দুটো আট বছর ধরে এক মৃত মানুষের বোঝা বয়ে বেড়িয়েছে। অথচ সেই মানুষটা আজ বাইরে মুক্ত বাতাসে ঘুরে বেড়াচ্ছে, আর তাকে এক অদ্ভুত খেলায় আমন্ত্রণ জানাচ্ছে। ‘স্বাগত’— সব্যসাচীর ঠোঁটের সেই নির্বাক উচ্চারণটা সোমনাথের কানের পর্দায় অবিরাম হাতুড়ি পেটা করতে লাগল।

পরদিন সকালে মেক্সিকো সিটির রোদ যখন আবার তার রুক্ষ রূপ নিয়ে আত্মপ্রকাশ করল, সোমনাথ তখন তৈরি। সে সরাইখানা ছেড়ে বেরিয়ে পড়ল। তার প্রথম গন্তব্য— কার্লোস ফুয়েন্তেস। কার্লোস ছিল সেই মেক্সিকান ডিটেকটিভ, যে আট বছর আগে সোমনাথকে গ্রেপ্তার করেছিল। কার্লোস এখন অবসরপ্রাপ্ত, সান অ্যাঞ্জেলেরই এক জরাজীর্ণ কলোনিতে নিজের পক্ষাঘাতগ্রস্ত স্ত্রীর সাথে দিন কাটায়।

কার্লোসের বাড়ির দরজাটা যখন সোমনাথ ধাক্কা দিল, তখন ভেতর থেকে এক বৃদ্ধ, খসখসে গলা স্প্যানিশ ভাষায় জানতে চাইল, “কে?” সোমনাথ ভাঙা স্প্যানিশেই উত্তর দিল, “আমি সোমনাথ। আট বছর আগের সেই ভারতীয় কয়েদি।”

ভেতরে একটা ভারী নীরবতা নেমে এলো। কয়েক মুহূর্ত পর দরজাটা খুলে গেল। হুইলচেয়ারে বসে থাকা কার্লোসের চোখ দুটো সোমনাথকে দেখেই চিল শকুনের মতো সংকুচিত হয়ে উঠল। তার মুখে জমে থাকা বলিরেখাগুলো যেন আরও গভীর হলো। সে সোমনাথকে ভেতরে আসার ইঙ্গিত করল। ঘরের ভেতরটা পুরনো কাগজের গন্ধ আর চুরুটের ধোঁয়ায় অন্ধকার হয়ে আছে।

“আমি জানতাম তুমি আসবে,” কার্লোস চুরুটে একটা দীর্ঘ টান দিয়ে ধোঁয়া ছাড়ল। “কিন্তু এত তাড়াতাড়ি আসবে, তা ভাবিনি।”

সোমনাথ কার্লোসের ঠিক সামনে একটা কাঠের চেয়ার টেনে বসল। তার চোখ দুটো স্থির, শীতল। “কার্লোস, আমি এখানে কোনো আইনি লড়াই করতে আসিনি। আমি শুধু একটা প্রশ্নের উত্তর জানতে এসেছি। আট বছর আগে তোমরা ওক্সাকার রিসোর্ট থেকে কার বডি রিকভার করেছিলে?”

কার্লোস চমকে উঠল না। সে কেবল শান্ত চোখে সোমনাথের দিকে তাকিয়ে রইল। “সব্যসাচী সেনগুপ্তের। ডিএনএ রিপোর্ট, ডেন্টাল রেকর্ড, এমনকি হাতের আঙুলের ছাপ— সব ম্যাচ করেছিল, সোমনাথ।”

“তাহলে কাল রাতে সান অ্যাঞ্জেলের গলিতে আমি কাকে দেখলাম?” সোমনাথের গলার স্বর নিচু কিন্তু তাতে এক তীব্র হিংস্রতা ছিল। “যে মানুষটাকে আমি নিজের চোখে মরতে দেখিনি, যার চিতার আগুনে আমি নিজে কাঠ দিইনি, সে কাল রাতে আমার সামনে দাঁড়িয়ে হাসছিল। কার্লোস, বিজ্ঞান কি ভুল বলতে পারে, নাকি বিজ্ঞানকে কেনা যায়?”

কার্লোসের হাতটা সামান্য কেঁপে উঠল। সে চুরুটের ছাইটা অ্যাসট্রেতে ঝেড়ে বলল, “বিজ্ঞান ভুল বলে না, সোমনাথ। কিন্তু বিজ্ঞানের পেছনে যে মানুষগুলো থাকে, তাদের মনস্তত্ত্ব বড় জটিল। মেক্সিকোর ডার্ক আন্ডারওয়ার্ল্ডে এমন কিছু ল্যাবরেটরি আছে, যেখানে জীবন্ত মানুষের আইডেন্টিটি মুছে ফেলা যায়, আবার মৃত মানুষকে কাগজের কলমে জীবিত করা যায়। কিন্তু তুমি যা বলছ, তা যদি সত্যি হয়…” কার্লোস থামল। তার চোখে এক অদ্ভুত ভয়ের ছায়া খেলে গেল।

“যদি সত্যি হয়, তবে কী?” সোমনাথ ঝুঁকে এল।

“তবে তুমি এক বিশাল মাকড়সার জালের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছ, সোমনাথ। যার সুতোগুলো মেক্সিকো থেকে শুরু করে ভারতের কলকাতা পর্যন্ত বিস্তৃত। সব্যসাচী একা ছিল না। তার পেছনে এক অদৃশ্য শক্তি কাজ করছিল, যারা চেয়েছিল সব্যসাচী অফিশিয়ালি মারা যাক, আর তুমি তার বলির পাঁঠা হও।” কার্লোস ফিসফিস করে বলল।

সোমনাথ সোজা হয়ে দাঁড়াল। তার মনের ভেতরের ধোঁয়াশাটা এবার কাটতে শুরু করেছে, কিন্তু সেই জায়গায় এক তীব্র দহন শুরু হয়েছে। সে কার্লোসের বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য পা বাড়াল। ঠিক তখনই কার্লোস পেছন থেকে বলে উঠল, “সোমনাথ, সাবধান! মেক্সিকোর ধুলোয় যা মিশে যায়, তা আর কখনো পবিত্র হয়ে ফিরে আসে না। সব্যসাচী যদি বেঁচে থাকে, তবে সে তোমাকে মুক্তি দেওয়ার জন্য ফিরে আসেনি। সে এসেছে তার অসমাপ্ত বৃত্তটা সম্পূর্ণ করতে।”

সোমনাথ কোনো উত্তর দিল না। সে হনহন করে রাস্তা দিয়ে হাঁটতে লাগল। মেক্সিকোর তপ্ত হাওয়া তার মুখে আছড়ে পড়ছে। প্রতিটি ধূলিকণা যেন এক একটা ছোট ছোট রহস্যের কণা, যা তাকে অন্ধ করে দিতে চায়। সে বুঝতে পারল, সব্যসাচীকে খুঁজতে হলে তাকে সেই পুরনো সূত্রে ফিরে যেতে হবে— ওক্সাকার সেই পরিত্যক্ত রিসোর্ট ‘এল ফ্যান্টাসমা’।

সে একটা বাসের টিকিট কাটল। সান অ্যাঞ্জেল থেকে ওক্সাকার দূরত্ব কয়েক ঘণ্টার। বাসের জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে সোমনাথের বারবার মনে হতে লাগল, পেছনের সিটে বসা মেক্সিকান লোকটা, কিংবা রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা ক্যাকটাসের ছায়া— সবাই যেন তাকে লক্ষ্য করছে। পুরো মেক্সিকো শহরটাই যেন একটা বিশাল সাইকোলজিক্যাল ল্যাবরেটরি, যেখানে সোমনাথ একটা গিনিপিগ।

বাসটা যখন ওক্সাকার ধূ ধূ মরুভূমির মাঝখান দিয়ে যাচ্ছিল, তখন সূর্য পশ্চিম দিগন্তে হেলে পড়েছে। রক্তিম আলোয় চারপাশের বালিয়াড়িগুলোকে মনে হচ্ছিল কোনো এক রক্তাক্ত প্রান্তর। ঠিক তখনই সোমনাথের কোটের পকেটে একটা কাঁপুনি অনুভূত হলো। তার পুরনো মলিন জ্যাকেটের ভেতরের পকেটে একটা সস্তা এনালগ ফোন রাখা ছিল, যা সে জেল থেকে বের হওয়ার সময় এক দালালের কাছ থেকে কিনেছিল। এই নম্বরটা কারোর জানার কথা নয়।

সোমনাথ ফোনটা বের করে কানের কাছে ধরল। ওপাশ থেকে কোনো শব্দ এলো না। শুধু এক গভীর, চেনা শ্বাসের আওয়াজ। সোমনাথের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।

“সোমনাথ…” ওপাশ থেকে একটা খসখসে, অতি পরিচিত কণ্ঠস্বর ভেসে এলো। সব্যসাচী!

“তুই বেঁচে আছিস, সব্য?” সোমনাথ নিজের ভেতরের উত্তেজনা চেপে শান্ত গলায় বলল।

ওপাশ থেকে এক পৈশাচিক হাসি ভেসে এলো। “বেঁচে থাকা আর মৃত হওয়ার মাঝখানে যে একটা সূক্ষ্ম রেখা থাকে সোমনাথ, তুই কি তা জানিস? আট বছর তুই যে নরকে ছিলি, সেটা তো কেবল শুরু ছিল। আসল খেলা তো এবার শুরু হবে। বাসের জানলা দিয়ে একটু ডানদিকে তাকা।”

সোমনাথ চমকে উঠে জানলা দিয়ে ডানদিকের মরুভূমির দিকে তাকাল। বাসটা তখন একটা পাহাড়ি বাঁক পার হচ্ছিল। মাইলের পর মাইল বিস্তৃত বালির রাজ্যে একটা বড় পাথরের ওপর একটা অবয়ব দাঁড়িয়ে আছে। লোকটার হাতে একটা দূরবিন, যা সরাসরি এই বাসের জানলার দিকে তাক করা। আর লোকটার ঠিক পাশেই জ্বলছে একটা জ্বলন্ত চিতা— যার আগুন মেক্সিকোর তপ্ত বাতাসকে আরও খ্যাপাটে করে তুলছে। ফোনের ওপাশ থেকে সব্যসাচীর শেষ বাক্যটি ভেসে এলো, যা সোমনাথের রক্তকে এক মুহূর্তে হিম করে দিল, “তোর চিতাগ্নি মেক্সিকোর মাটিতেই প্রস্তুত, সোমনাথ। আর মাত্র কয়েকটা স্টেশন।”

ওক্সাকার রক্তাভ মরুভূমির বুক চিরে বাসটা যখন গোঙাতে গোঙাতে এগিয়ে চলছিল, সোমনাথের কানের কাছে তখন ফোনের ওপাশের সেই যান্ত্রিক নীরবতা এক তীব্র চিৎকারে রূপ নিয়েছে। লাইনটা কেটে গেছে। সে জানলা দিয়ে বাইরে তাকাল, কিন্তু সেই পাহাড়ি বাঁকটা পেরিয়ে আসার পর মরুভূমির ধূ ধূ প্রান্তর ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়ল না। সেই জ্বলন্ত চিতা, সেই চেনা অবয়ব— সব যেন এক পলকের বিভ্রমে মিলিয়ে গেছে। সোমনাথের কপাল বেয়ে এক ফোঁটা ঠান্ডা ঘাম নেমে এলো। মনের ভেতর জেগে ওঠা এই তীব্র মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব তাকে ক্রমশ এক গোলকধাঁধার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সব্যসাচী কি আসলেই সেখানে ছিল, নাকি আট বছরের বন্দিত্ব সোমনাথের মগজে এক এমন প্রতিবিম্ব তৈরি করেছে যা সে অবচেতনভাবে দেখতে চাইছে?

বাস থেকে যখন সে ওক্সাকার মাটিতে পা রাখল, তখন সূর্য দিগন্তের ওপারে ডুবে গেছে। চারিদিকের অন্ধকার যেন এক চটচটে আলকাতরার মতো মেক্সিকোর এই প্রান্তরকে গিলে খাচ্ছে। বাতাস এখন পুরোপুরি শীতল, যার মধ্যে এক অদ্ভুত বুনো ফুলের গন্ধ মিশে আছে। সোমনাথ একটা চাদর ভালো করে গায়ে জড়িয়ে নিয়ে হাঁটতে শুরু করল। তার গন্তব্য ‘এল ফ্যান্টাসমা’ রিসোর্ট। স্থানীয় মানুষেরা এই জায়গাটাকে এড়িয়ে চলে। আট বছর আগের সেই রোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের পর রিসোর্টটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছিল। মেক্সিকানদের বিশ্বাস, ওখানে এখনও এক অতৃপ্ত ভারতীয়র আত্মা ঘুরে বেড়ায়।

সোমনাথের ঠোঁটের কোণে এক নিষ্ঠুর হাসি ফুটে উঠল। আত্মা? সব্যসাচীর মতো এক চরম বস্তুবাদী, নিষ্ঠুর আর চতুর মানুষের কোনো আত্মা থাকতে পারে না; তার যা আছে, তা হলো এক নিখুঁত পরিকল্পনা।

প্রায় আধ ঘণ্টা হাঁটার পর অন্ধকারের মধ্যে রিসোর্টের বিশাল লোহার গেটটা দৃশ্যমান হলো। মরিচা ধরা গেটটা অর্ধেক খোলা। ভেতরে লতাপাতা আর বুনো ক্যাকটাস এমনভাবে গজিয়েছে যে, মনে হয় কোনো প্রাচীন মায়ান সভ্যতার ধ্বংসস্তূপ। সোমনাথ পকেট থেকে একটা ছোট ফ্ল্যাশলাইট বের করল। আলোর ক্ষীণ রশ্মিটা যখন রিসোর্টের মূল ভবনের ওপর পড়ল, সোমনাথের বুকের ভেতর একটা চেনা কাঁপুনি খেলে গেল। এই সেই চত্বর, যেখানে আট বছর আগে সে সব্যসাচীর সাথে শেষবার বসে স্কচ পান করেছিল।

সে ধীর পায়ে ভবনের ভেতরে ঢুকল। চারদিকের দেয়ালে নোনা ধরে চুনকাম খসে পড়েছে। মেঝেতে পুরু ধুলোর আস্তরণ। সোমনাথ সিঁড়ি বেয়ে দোতলার সেই ১০৪ নম্বর ঘরের দিকে এগিয়ে গেল। ঘরের দরজাটা হা হয়ে খোলা ছিল। পুলিশি তদন্তের পর যেভাবে ঘরটা সিল করা হয়েছিল, কালের নিয়মে সেই সিল ছিঁড়ে গেছে। সোমনাথ ঘরের ভেতরে পা রাখল।

টর্চের আলোটা সে মেঝেতে ফেলল। কাঠের মেঝের ওপর এক জায়গায় এক বিশাল কালো দাগ। সোমনাথ হাঁটু গেড়ে বসল। এটা রক্তের দাগ। আট বছর পুরনো শুকিয়ে যাওয়া রক্ত, যা মেক্সিকোর ধুলোর সাথে মিশে একাকার হয়ে গেছে। সোমনাথ সেই দাগটার ওপর হাত রাখল। এক অদ্ভুত অনুভূতি তার আঙুলের ডগা বেয়ে মগজে পৌঁছে গেল। তার মনে পড়ে গেল সেই রাতের শেষ দৃশ্য— সব্যসাচী মেঝেতে পড়ে ছটফট করছে, আর তার বুকের মাঝখানে গোঁজা সেই মেক্সিকান ড্যাগার।

“যদি তুই এখানেই মরে থাকিস, তবে কাল রাতে আমার সামনে কে দাঁড়িয়েছিল?” সোমনাথ ফিসফিস করে নিজেকেই প্রশ্ন করল।

ঠিক তখনই ঘরের কোণে রাখা একটা ভাঙা ড্রেসিং টেবিলের আয়নার ওপর টর্চের আলো পড়ল। ধুলো আর মাকড়সার জালে ঢাকা সেই আয়নায় সোমনাথ নিজের প্রতিবিম্ব দেখতে পেল। তার চোখ দুটো বসে গেছে, দাড়ি-গোঁফে মুখটা ঢেকে গেছে। কিন্তু হঠাৎ করেই সোমনাথের মনে হলো, আয়নার ভেতরে থাকা প্রতিবিম্বটা তার নিজের নয়। আয়নার ভেতরের অবয়বটা যেন তার দিকে তাকিয়ে এক ক্রুর হাসি হাসছে। সে চোখ পিটপিট করে তাকাল। না, ওটা সে নিজে নয়। ওটা সব্যসাচী!

সোমনাথ চমকে দু-পা পিছিয়ে গেল। তার হাত থেকে টর্চটা পড়ে গিয়ে মেঝেতে গড়াতে লাগল, যার ফলে ঘরের আলো-ছায়ার বিন্যাসটা এক ভৌতিক রূপ নিল।

“মনস্তত্ত্বের একটা নিয়ম আছে, সোমনাথ,” ঘরের অন্ধকার কোণ থেকে একটা চেনা কণ্ঠস্বর ভেসে এলো। “মানুষ যখন কোনো একটা অপরাধবোধ বা তীব্র প্রতিশোধের আগুনে বছরের পর বছর জ্বলতে থাকে, তখন তার মস্তিষ্ক নিজের শত্রুর প্রতিবিম্ব সব জায়গায় দেখতে শুরু করে। তুই কি পাগল হয়ে যাচ্ছিস?”

সোমনাথ দ্রুত পকেট থেকে রিভলভারটা বের করল, যা সে সান অ্যাঞ্জেলের এক দালালের কাছ থেকে চড়া দামে কিনেছিল। সে টর্চটা কুড়িয়ে নিয়ে আলোর অভিমুখটা সেই অন্ধকার কোণের দিকে ঘোরাল।

সেখানে একটা কাঠের চেয়ারে শান্ত হয়ে বসে আছে এক ব্যক্তি। কিন্তু আলোর নিচে লোকটার মুখ স্পষ্ট হতেই সোমনাথের ভ্রু কুঁচকে গেল। লোকটা সব্যসাচী নয়। লোকটার বয়স আনুমানিক চল্লিশ, পরনে দামী মেক্সিকান স্যুট, চোখে পাতলা ফ্রেমের চশমা। তার চেহারায় এক তীক্ষ্ণ আভিজাত্য এবং বুদ্ধিমত্তার ছাপ।

“কে আপনি?” সোমনাথ গর্জে উঠল।

লোকটা মৃদু হাসল, তার বসার ভঙ্গিতে কোনো ভয়ের লেশমাত্র নেই। সে পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে লাইটার দিয়ে জ্বালাল। আগুনের ক্ষণস্থায়ী আলোয় তার চোখ দুটো চিল শকুনের মতো চকচক করে উঠল।

“আমার নাম ডক্টর দিয়েগো সান্তোস। আমি একজন ফরেনসিক সাইক্রিয়াট্রিস্ট। আর আট বছর আগে, এই ওক্সাকা হত্যাকাণ্ডের সময় আমি মেক্সিকান পুলিশের প্রধান মনস্তাত্ত্বিক উপদেষ্টা ছিলাম।”

সোমনাথ রিভলভারটা নামাল না। “আপনি এখানে কী করছেন? মাঝরাতে এই পরিত্যক্ত নরকে আপনার কী কাজ?”

ডক্টর দিয়েগো একটা দীর্ঘ ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, “আমি তোমার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম সোমনাথ। আমি জানতাম, জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর তুমি সোজা এখানে আসবে। কারণ তোমার অবচেতন মন খুব ভালো করেই জানে, এই ঘরের ভেতরেই তোমার সমস্ত প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে।”

“আপনি কী জানেন?” সোমনাথের গলার স্বর আরও তীক্ষ্ণ হলো।

“আমি জানি যে, আট বছর আগে এই ঘরে যে লাশটা পাওয়া গিয়েছিল, সেটা সব্যসাচী সেনগুপ্তের ছিল না,” দিয়েগো শান্ত গলায় বললেন।

সোমনাথের মাথার ভেতর যেন একটা পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটল। সে দেয়ালটা ধরে নিজেকে সামলাল। “কী বলছেন আপনি? কার্লোস বলল সমস্ত ডিএনএ আর ডেন্টাল রেকর্ড ম্যাচ করেছিল!”

“হ্যাঁ, ম্যাচ করানো হয়েছিল,” দিয়েগো চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালেন এবং সোমনাথের দিকে কয়েক পা এগিয়ে এলেন। “মেক্সিকোর ডার্ক ওয়েবে এমন কিছু ল্যাব আছে, যারা নিখুঁতভাবে ডিএনএ ডাটাবেস হ্যাক করতে পারে। সব্যসাচী মরেনি সোমনাথ। সে তার নিজের এক যমজ সদৃশ মানুষকে খুন করে, তার মুখে প্লাস্টিক সার্জারির কিছু বিকৃতি ঘটিয়ে নিজের লাশ হিসেবে চালিয়ে দিয়েছিল। আর পুরো দায়টা চাপিয়ে দিয়েছিল তোমার ওপর। কারণ সে জানত, তুমি আইনি মারপ্যাঁচে জড়িয়ে তার আসল অপরাধটা ধরে ফেলেছিলে।”

সোমনাথের চোখের সামনে মেক্সিকোর এই অন্ধকার ঘরটা যেন দুলতে লাগল। এক চরম সত্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সে স্তব্ধ হয়ে গেছে। “তার মানে… আমি আট বছর ধরে এক জীবিত মানুষের খুনের সাজা খাটলাম? কিন্তু সব্যসাচী এখন কোথায়?”

ডক্টর দিয়েগো সান্তোস সোমনাথের একেবারে মুখোমুখি এসে দাঁড়ালেন। তার চোখের মণি দুটো এক অদ্ভুত সম্মোহনী শক্তিতে জ্বলছে। সে সোমনাথের কাঁধে একটা হাত রাখল। “সে তোমার খুব কাছেই আছে সোমনাথ। এতটাই কাছে যে, তুমি প্রতি মুহূর্তে তাকে স্পর্শ করছ, অথচ দেখতে পাচ্ছ না। সে তোমাকে মেক্সিকোর এই ধুলোয় টেনে এনেছে এক বিশেষ কারণে। সে চায়, তুমি নিজের হাতে আসল সব্যসাচীকে খুন করো, যাতে এবার সত্যিই সে মৃত প্রমাণিত হয় আর তুমি চিরকালের জন্য এক উন্মাদ খুনি হিসেবে এই মেক্সিকোর মাটিতেই শেষ হয়ে যাও।”

সোমনাথ দিয়েগোর চোখের দিকে তাকিয়ে এক তীব্র শীতলতা অনুভব করল। ঠিক তখনই রিসোর্টের বাইরে একটা তীব্র গাড়ির হর্নের শব্দ শোনা গেল, আর সেই সাথে এক ঝাঁক বুলেটের আওয়াজ কাঁচের জানলাগুলো ভেঙে ঘরের ভেতর আছড়ে পড়ল। দিয়েগো সোমনাথকে ধাক্কা দিয়ে মেঝেতে ফেলে দিলেন। অন্ধকারের মধ্য দিয়ে সোমনাথ দেখতে পেল, ডক্টর দিয়েগোর বুকের মাঝখান থেকে রক্ত ফিনকি দিয়ে বেরোচ্ছে, আর তার ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা সেই শেষ হাসিটা যেন অবিকল সব্যসাচীর মতো! দিয়েগো মরার আগে সোমনাথের কানের কাছে ফিসফিস করে বললেন, “আয়নায় যাকে দেখেছিস সোমনাথ, সে ভুল ছিল না…”

পর্ব ১ সমাপ্ত

আপনার মন্তব্য জানান।

Your email address will not be published. Required fields are marked *

0% | 0মি 0সে
Scroll to Top