নিশুতি রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে যখন সেই সুর বাতাসে ভেসে আসে, তখন গ্রামের পাহারাদার হরিসাধন বাবু তার হাতের লাঠিটা শক্ত করে চেপে ধরেন। এই শব্দ কোনো সাধারণ মানুষের তৈরি নয়, এ যেন এক অলৌকিক হাহাকার। সাতক্ষীরার প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থিত এই ভৈরবপুর গ্রামটি দিনের বেলা যতটা শান্ত, রাতের বেলা ঠিক ততটাই রহস্যময় হয়ে ওঠে। বিশেষ করে অমাবস্যার রাতগুলোতে, যখন আকাশ জুড়ে থাকে জমাট বাঁধা অন্ধকার, তখন গ্রামের এক প্রান্তে অবস্থিত বিশাল, পরিত্যক্ত রায়চৌধুরী জমিদার বাড়ি থেকে এক করুণ বেহালার সুর ভেসে আসে।
গ্রামের সাধারণ মানুষ মনে করে, এই সুর কোনো অতৃপ্ত আত্মার আর্তনাদ। বহু বছর আগে এই বাড়ির শেষ জমিদার অদ্ভুত পরিস্থিতিতে মারা গিয়েছিলেন, তারপর থেকেই নাকি এই অভিশাপ। কিন্তু এই গ্রামে মাস তিনেক আগে বদলি হয়ে আসা যুক্তিবাদী স্কুলশিক্ষক প্রমথনাথ রায় এই সমস্ত অলৌকিক তত্ত্বে বিশ্বাসী নন। তিনি গণিত এবং পদার্থবিদ্যার শিক্ষক। তাঁর চোখে পৃথিবীটা চলে কিছু নির্দিষ্ট নিয়মে, যেখানে কার্যকারণ ছাড়া কোনো ঘটনাই ঘটে না।
আজও অমাবস্যা। বাইরে ভ্যাপসা গরম, বাতাসে জলীয় বাষ্পের ভারী উপস্থিতি। বর্ষার শেষের দিকের এই গুমোট আবহাওয়ায় পাতাটিও নড়ছে না। প্রমথবাবু তাঁর ঘরের কাঠের চেয়ারটায় বসে টেবিল ল্যাম্পের আলোয় একটি পুরোনো ডায়েরি পড়ছিলেন। তাঁর ঘড়িতে টিকটিক শব্দ হচ্ছিল। তিনি পকেট থেকে তাঁর রুপোর চেইনযুক্ত পকেট ঘড়িটি বের করলেন। সময়টা নিখুঁতভাবে মেপে নেওয়া তাঁর পুরনো অভ্যাস। রাত তখন পৌনে বারোটা।
তিনি ডায়েরিটা বন্ধ করে চশমাটা নাকের ওপর ঠিকঠাক বসিয়ে নিলেন। আজ তিনি মনস্থির করেছেন, রায়চৌধুরী বাড়ির এই তথাকথিত অলৌকিক সুরের রহস্যের একটা গতি করবেন। গ্রামের মানুষ তাঁকে বারণ করেছিল। প্রধান মোড়ল নিবারণ চক্রবর্তী বলেছিলেন, “মাস্টার মশাই, শহরের লেখাপড়া শিখেছেন ভালো কথা, কিন্তু ওই প্রাচীন ভিটায় পা দেবেন না। ওখানে যা আছে, তা মানুষের বুদ্ধির বাইরে।”
প্রমথবাবু তখন হেসে বলেছিলেন, “নিবারণবাবু, মানুষের বুদ্ধির বাইরে এই মহাবিশ্বে খুব কম জিনিসই আছে। যা আছে, তা হলো আমাদের অজ্ঞতা।”
রাত বারোটা বেজে দশ মিনিট। প্রমথবাবু তাঁর টেবিল থেকে একটি শক্তিশালী টর্চলাইট এবং একটি ছোট নোটবই পকেটে পুরলেন। তাঁর পরনে সাধারণ ধুতি আর সুতির ফতুয়া। পায়ে চটি জুতো। ঘর থেকে বের হওয়ার সময় তিনি চারিদিকের নিস্তব্ধতা অনুভব করলেন। কোথাও কোনো ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক নেই, বাতাসে শুধু এক অদ্ভুত থমথমে ভাব। ভৈরবপুরের মেঠো পথ ধরে তিনি যখন জমিদার বাড়ির দিকে হাঁটতে লাগলেন, তখন তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট এবং পরিমাপ করা।
রায়চৌধুরী জমিদার বাড়িটি প্রায় একশো বছরের পুরনো। ইটের দেওয়ালগুলোয় শ্যাওলা জমে কালো হয়ে গেছে, জায়গায় জায়গায় আস্তরণ খসে পড়েছে। বিশাল সদর দরজাটি বহু বছর ধরে হা করে খোলা, যেন এক অন্ধকারের প্রবেশদ্বার। প্রমথবাবু বাড়ির সীমানায় পৌঁছাতেই তাঁর হাতের ঘড়ির দিকে তাকালেন। ঠিক রাত ১২টা ১৫ মিনিট।
ঠিক সেই মুহূর্তে, যেন কোনো অদৃশ্য জাদুকরের ইশারায়, বাতাসের স্তব্ধতা চিরে সেই করুণ সুর ভেসে এল।
‘উঁউঁউঁ… রেঁ… গাঁ…’— এক অদ্ভুত, কম্পনশীল বেহালার সুর। সুরটি এতটাই স্পষ্ট এবং সূক্ষ্ম যে মনে হবে কেউ খুব নিখুঁতভাবে ছড় টানছে। সুরের মধ্যে কোনো ভুল নেই, কোনো তাল কাটছে না। প্রমথবাবু দাঁড়িয়ে গেলেন।
তিনি কান খাড়া করে সুরের উৎস বোঝার চেষ্টা করলেন। সুরটা কি বাড়ির ভেতর থেকে আসছে, নাকি ওপর থেকে?
তিনি বাড়ির ভেতরে ঢুকলেন। চারদিকে ভাঙা আসবাবপত্র, ধুলোর আস্তরণ। বাতাসে এক ধরণের প্রাচীন, স্যাঁতস্যাঁতে গন্ধ। প্রমথবাবু টর্চের আলো ফেললেন দেওয়ালে। কোনো মানুষের পায়ের ছাপ নেই ধুলোয়। যদি কেউ এখানে এসে বেহালা বাজাত, তবে তার পায়ের ছাপ এই পুরু ধুলোর আস্তরণে স্পষ্ট দেখা যেত। কিন্তু চারপাশ সম্পূর্ণ অক্ষত। সুরটি ক্রমশ তীব্র হচ্ছে। এটি যেন কোনো একটি নির্দিষ্ট স্থান থেকে প্রতিধ্বনিত হয়ে পুরো বাড়িতে ছড়িয়ে পড়ছে।
প্রমথবাবু লক্ষ্য করলেন, সুরের মধ্যে একটা অদ্ভুত যান্ত্রিকতা রয়েছে। প্রতি তিন সেকেন্ড পর পর সুরের কম্পন কিছুটা কমে আবার বেড়ে উঠছে। তিনি তাঁর নোটবই বের করে সুরের এই সময়ের ব্যবধান লিখে নিলেন। তিনি কাঠের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে লাগলেন। প্রতিটি ধাপ পার হওয়ার সময় তিনি অত্যন্ত সতর্ক ছিলেন, পাছে কোনো শব্দ তাঁর সূক্ষ্ম শ্রবণেন্দ্রিয়কে ব্যাহত করে।
দোতলার বারান্দায় পৌঁছানোর পর সুরের তীব্রতা আরও বাড়ল। প্রমথবাবু বুঝতে পারলেন, সুরটি ছাদ থেকে আসছে। তিনি ছাদে যাওয়ার সরু সিঁড়িটি খুঁজে বের করলেন। ছাদের দরজার কপাটটি অনেক আগেই ভেঙে পড়েছে। তিনি যখন ছাদে পা দিলেন, তখন রাতের উষ্ণ বাতাস তাঁর মুখে এসে লাগল। আকাশে মেঘের ঘনঘটা, চাঁদের আলো বলতে কিছুই নেই।
ছাদে দাঁড়িয়ে প্রমথবাবু টর্চের আলো চারদিকে ঘোরালেন। চারপাশ শূন্য। কোনো মানুষ নেই, কোনো বেহালা নেই। কিন্তু সুরটি তাঁর খুব কাছাকাছি, যেন ঠিক তাঁর মাথার ওপর বা পায়ের নিচে থেকে আসছে। তিনি লক্ষ্য করলেন, ছাদের এক কোণায় প্রাচীন স্থাপত্যের একটি কারুকার্যময় উইন্ড-টানেল বা হাওয়া-পথ রয়েছে, যা নিচের তলার সাথে বাতাস চলাচলের জন্য তৈরি করা হয়েছিল। সুরের তীব্রতা এই ফোকরের কাছে সবচেয়ে বেশি।
তিনি ফোকরের কাছে গিয়ে নিচু হলেন। টর্চের তীব্র আলো সেই অন্ধকার সংকীর্ণ গর্তের ভেতরে ফেললেন। ভেতরে যা দেখলেন, তাতে তাঁর চোখ চকচক করে উঠল। এটি কোনো ভূতের কাজ নয়, বরং এক অদ্ভুত এবং জটিল মেকানিক্যাল কৌশল!
সেই সরু টানেলের ভেতরে আড়াআড়িভাবে কয়েকটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম কিন্তু শক্ত মেটাল বা ধাতব তার টান টান করে বাঁধা রয়েছে। আর সেই তারগুলোর ঠিক ওপরেই বসানো আছে একটি বিশেষ ধরণের ধাতব চাকা বা ব্লেড, যা বাতাসের সামান্যতম প্রবাহেও ঘোরে। যখনই বাতাস ওই টানেলের ভেতর দিয়ে নির্দিষ্ট গতিতে প্রবাহিত হয়, তখন ওই চাকাটি ঘোরে এবং তার সাথে সংযুক্ত একটি ছোট দণ্ড বা ছড় সেই টান টান তারগুলোর ওপর নিখুঁত ঘর্ষণ তৈরি করে। বাতাসের গতির ওপর নির্ভর করে সুরের ওঠানামা নিয়ন্ত্রিত হয়। যেহেতু এই অঞ্চলে অমাবস্যার রাতে তাপমাত্রার তারতম্যের কারণে একটি নির্দিষ্ট বায়ুপ্রবাহ তৈরি হয়, তাই ঠিক এই সময়েই সুরটি বেজে ওঠে।
প্রমথবাবু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। তাঁর যুক্তি জয়ী হয়েছে। এটি একটি সুপরিকল্পিত মেকানিক্যাল ডিজাইন, যা কেউ বহু বছর আগে তৈরি করে রেখে গেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেন? কেন কেউ এত কষ্ট করে একটি পরিত্যক্ত বাড়ির ছাদে এই সুর তৈরির যন্ত্র স্থাপন করবে? গ্রামবাসীদের ভয় দেখিয়ে দূরে রাখার জন্য? কিন্তু কী লুকানোর জন্য এই আয়োজন?
তিনি তাঁর পকেট ঘড়ির দিকে তাকালেন। ঠিক রাত ১২টা ৩০ মিনিট। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই, যেন এক অলৌকিক নিয়মে, সুরটি সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেল। বায়ুপ্রবাহের সামান্য পরিবর্তন বা যন্ত্রের নিজস্ব কোনো টাইমিং গিয়ার বা চাকার গতি পরিবর্তনের কারণে এটি ঘটে থাকতে পারে। প্রমথবাবু ফোকরের ভেতরে আরও ভালো করে দেখার জন্য হাত বাড়ালেন। তিনি তাঁর টর্চটি ডান হাতে ধরে বাম হাত দিয়ে ভেতরের তারগুলো স্পর্শ করতে গেলেন।
হঠাৎ তাঁর আঙুলে একটা শক্ত এবং ধারালো কিছু ঠেকল। তিনি হাতটি টেনে এনে টর্চের আলোয় দেখলেন, তাঁর আঙুল কেটে সামান্য রক্ত বেরোচ্ছে। কিন্তু যা তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করল, তা হলো সেই ফোকরের ভেতরের দেওয়ালে খোদাই করা একটি অদ্ভুত চিহ্ন। চিহ্নটি একটি সাপের, যা নিজের লেজ নিজেই কামড়ে ধরে আছে—’ইউরোরোবোস’ এর প্রাচীন প্রতীক, যা অনন্তকাল এবং চক্রাকার সময়ের নির্দেশক। কিন্তু তার নিচে একটি ছোট সংখ্যা খোদাই করা ছিল, যা সম্পূর্ণ নতুন এবং সদ্য তৈরি বলে মনে হলো।
সংখ্যাটি হলো: ৩-৫-৯।
প্রমথবাবু ভ্রু কুঁচকে ভাবলেন, এই প্রাচীন জমিদার বাড়িতে এই নতুন সংখ্যাটি কে এবং কেন খোদাই করল? তাহলে কি এই মেকানিক্যাল সুরের পেছনে সমসাময়িক কোনো উদ্দেশ্য রয়েছে? কেউ কি এই সুরের আড়ালে অন্য কোনো বড় খেলা খেলছে?
ঠিক তখনই নিচতলা থেকে একটি ভারী বস্তু পড়ে যাওয়ার শব্দ হলো—’ঝনঝন!’
প্রমথবাবু চমকে উঠলেন। তিনি দ্রুত ছাদের সিঁড়ির দিকে এগোলেন। টর্চের আলো নিচতলার অন্ধকারের দিকে ফেলতেই তাঁর মনে হলো, এই রহস্য যতটা সহজ ভেবেছিলেন, আসলে তা নয়। এই সুর কেবল এক প্রাচীন সিন্দুকের আবরণ মাত্র নয়, এর পেছনে লুকিয়ে আছে এমন এক জীবিত মানুষের মস্তিষ্ক, যে এই মুহূর্তেও এই বাড়ির কোনো এক কোণায় লুকিয়ে আছে।
প্রমথবাবু সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে বুঝতে পারলেন, কাহিনীর শুরু মাত্র হলো, আর এর গভীরতা অনেক বেশি।
নিচতলা থেকে ভেসে আসা সেই তীব্র ‘ঝনঝন’ শব্দটা প্রমথবাবুর কান এড়ায়নি। প্রাচীন কাঠের সিঁড়ি বেয়ে তিনি যখন নিচে নামছিলেন, তখন তাঁর ডান হাতের টর্চের আলোটা অন্ধকার বারান্দা আর ভাঙা দেওয়ালগুলোর ওপর দ্রুত নাচছিল। তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল অত্যন্ত মাপা, কারণ তিনি জানেন—অন্ধকারে সামান্য অসতর্কতাও শত্রুর জন্য বড় অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে।
দোতলার শেষ ধাপে আসতেই তিনি থমকে দাঁড়ালেন। নিচতলার হলঘরের ঠিক মাঝখানে টর্চের আলো ফেলতেই দেখা গেল, একটি প্রাচীন পেতলের ফুলদানি মেঝেতে পড়ে আছে। ফুলদানিটি সম্ভবত ওপরের কোনো তাক থেকে পড়েছে, কিংবা কেউ যাওয়ার সময় অসাবধানে গা বাঁচিয়ে যাওয়ার চেষ্টায় এটিকে ফেলে দিয়েছে। প্রমথবাবু দ্রুত এগিয়ে গেলেন। তিনি ফুলদানিটির পাশে হাঁটু গেড়ে বসলেন এবং টর্চের আলো খুব কাছ থেকে মেঝের ওপর ফেললেন।
জমিদার বাড়ির এই অংশটায় ধুলোর আস্তরণ অত্যন্ত পুরু। প্রমথবাবুর তীক্ষ্ণ চোখ জোড়া ধুলোর ওপর এক জোড়া সদ্য পড়া পায়ের ছাপ আবিষ্কার করল। ছাপগুলো চটি জুতোর নয়, বরং ভারী কোনো বুট জুতো বা খড়ম জাতীয় কিছুর। পায়ের ছাপগুলো হলঘরের পেছনের দরজা দিয়ে ভেতরের অন্ধকারের দিকে চলে গেছে। প্রমথবাবু তাঁর নোটবই বের করে জুতোর মাপটা আনুমানিকভাবে লিখে নিলেন—দৈর্ঘ্য প্রায় এগারো ইঞ্চি, গোড়ালির অংশটা বেশ চওড়া।
তিনি উঠে দাঁড়ালেন। মনে মনে হিসেব কষলেন, ছাদ থেকে তাঁর নিচে নামতে সময় লেগেছে ঠিক এক মিনিট পনেরো সেকেন্ড। এই অল্প সময়ের মধ্যে যে মানুষটি এখানে ছিল, সে খুব বেশি দূরে যেতে পারেনি। কিন্তু এই প্রাচীন প্রাসাদের গোলকধাঁধায় কোন দিকে গেছে, তা অনুমান করা কঠিন। তিনি পেছনের দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকলেন। এই অংশটা এক সময় জমিদারদের অন্দরমহল ছিল। চারদিকে কাঠের বড় বড় আলমারি, ভাঙা খাট আর ছেঁড়া পর্দার অবশিষ্টাংশ।
টর্চের আলো ঘরের এক কোণায় থাকা একটি বিশাল বেলজিয়াম কাঁচের আয়নার ওপর পড়ল। আয়নাটি ধুলো আর মাকড়সার জালে প্রায় ঢেকে গেছে, কিন্তু তার এক কোণ পরিষ্কার। প্রমথবাবু আয়নাটার দিকে এগিয়ে গেলেন। কেউ একজন খুব সম্প্রতি তাঁর হাত দিয়ে আয়নার ধুলো মুছেছে। কেন? কেউ কি নিজের চেহারা দেখতে এসেছিল এই মাঝরাতে? নাকি এই আয়নার পেছনে অন্য কিছু আছে?
তিনি আয়নাটার ফ্রেমের ওপর হাত রাখলেন। একটু চাপ দিতেই এক অদ্ভুত ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ হলো। আয়নাটি দেওয়ালের সাথে স্থায়ীভাবে আটকানো নয়, এটি আসলে একটি গোপন কবজার ওপর বসানো! প্রমথবাবু সাবধানে আয়নাটিকে ডানদিকে ঘোরালেন। সঙ্গে সঙ্গে দেওয়ালের একটি অংশ সরে গিয়ে একটি সরু অন্ধ কুঠুরি উন্মোচিত হলো।
ভেতরে টর্চের আলো ফেলতেই প্রমথবাবুর চোখ স্থির হয়ে গেল। কুঠুরির ভেতরে কোনো সোনা-দানা বা অলঙ্কার নেই। সেখানে মেঝেতে পড়ে আছে একটি আধুনিক দেশলাইয়ের বাক্স, কয়েকটি আধপোড়া মোমবাতি এবং একটি পুরোনো ছেঁড়া কাগজ। প্রমথবাবু পকেট থেকে রুমাল বের করে অত্যন্ত সাবধানে দেশলাইয়ের বাক্স আর কাগজটি তুলে নিলেন, যাতে নিজের হাতের ছাপ আসল সূত্রের ওপর না পড়ে।
তিনি কাগজটি মেলে ধরলেন। সেটি কোনো মানচিত্র নয়, বরং একটি হিসাবের খাতা থেকে ছিঁড়ে নেওয়া পাতা। পাতায় পুরোনো দিনের বাংলা হরফে কিছু নাম আর সংখ্যা লেখা আছে। বেশির ভাগ নামই কেটে দেওয়া, শুধু একটি নাম অক্ষত রয়েছে—‘নীলকণ্ঠ রায়’। নামের পাশে লেখা আছে একটি সময়: ‘১২:১৫ – ১২:৩০’। আর তার নিচে একটি ছোট ছক কাটা, যা দেখতে ঠিক ছাদের সেই উইন্ড-টানেলের মেকানিক্যাল নকশার মতো!
প্রমথবাবু বিড়বিড় করলেন, “নীলকণ্ঠ রায়… রায়চৌধুরী বংশের শেষ জমিদারের ছোট ভাই, যিনি বছর কুড়ি আগে নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিলেন। তাহলে কি তিনি এখনও বেঁচে আছেন? নাকি তাঁর নাম ব্যবহার করে অন্য কেউ এই খেলা খেলছে?”
হঠাৎ করেই অন্দরমহলের বাইরে, সদর দরজার দিক থেকে এক জোড়া দ্রুত পায়ের আওয়াজ শোনা গেল। কেউ একজন জমিদার বাড়ি থেকে ছুটে বেরিয়ে যাচ্ছে। প্রমথবাবু আর এক মুহূর্তও নষ্ট করলেন না। তিনি গোপন কুঠুরি থেকে বের হয়ে দ্রুত হলঘর পার হয়ে সদর দরজার দিকে ছুটলেন। বাইরে ভ্যাপসা গরমের মধ্যে হালকা বাতাস দিতে শুরু করেছে, আকাশে মেঘগুলো আরও ঘনীভূত হচ্ছে।
টর্চের আলো ফেলে তিনি দেখলেন, সদর দরজার বাইরের মেঠো পথ ধরে একটি কালো ছায়ামূর্তি দ্রুত গতিতে গ্রামের দিকে ছুটে যাচ্ছে। প্রমথবাবুও তাঁর পেছনে ধাওয়া করলেন। কিন্তু গ্রামের আঁকাবাঁকা গলি আর ঝোপঝাড়ের মধ্যে কিছুদূর যাওয়ার পর ছায়ামূর্তিটি সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয়ে গেল।
প্রমথবাবু হাঁপাতে হাঁপাতে দাঁড়িয়ে পড়লেন। তিনি পকেট ঘড়িটি বের করে দেখলেন—রাত তখন একটা বেজে দশ মিনিট। অমাবস্যার রাত এখন আরও গভীর এবং রহস্যময়। তিনি বুঝতে পারলেন, এই রহস্যের শিকড় শুধু এই পরিত্যক্ত জমিদার বাড়িতেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি ছড়িয়ে আছে খোদ এই ভৈরবপুর গ্রামেরই কোনো বাসিন্দার অন্দরে।
তিনি গ্রামের পথ ধরে নিজের ঘরের দিকে ফিরতে লাগলেন। তাঁর মাথায় তখন ঘুরছে তিনটি জিনিস: ছাদের দেওয়ালে খোদাই করা সংখ্যা ‘৩-৫-৯’, আয়নার পেছনের কাগজে লেখা নাম ‘নীলকণ্ঠ রায়’, এবং মেঝের ধুলোয় পাওয়া সেই ভারী জুতোর ছাপ।
পরদিন সকালে গ্রামের চায়ের দোকানে নিবারণ চক্রবর্তীর সাথে প্রমথবাবুর দেখা হলো। নিবারণবাবু তামাক টানতে টানতে জিজ্ঞেস করলেন, “কী মাস্টার মশাই? কাল রাতে তো কোনো শব্দ শুনলাম না। ভূত বাবাজি কি আপনার ভয়ে পালালো?”
প্রমথবাবু মৃদু হেসে চায়ের কাপে চুমুক দিলেন। তারপর অত্যন্ত শান্ত গলায় বললেন, “ভূত নয় নিবারণবাবু, মানুষ। আর সে মানুষের পায়ের জুতো জোড়া বেশ ভারী। আপনার চেনা-জানার মধ্যে ভৈরবপুরে এমন কে আছে, যে খড়ম বা ভারী বুট জুতো পরে ঘোরে?”
নিবারণবাবুর হাতের তামাকের কলকেটা সামান্য কেঁপে উঠল। তিনি চোখ বড় বড় করে প্রমথবাবুর দিকে তাকালেন। তাঁর মুখের চেনা হাহাসিটা যেন এক নিমেষে উধাও হয়ে গেল। তিনি নিচু গলায় বললেন, “ভারী জুতো? এ গ্রামে তো কেবল একজনই ওমন জুতো পরে চলেন…”
“কে?” প্রমথবাবুর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিবারণবাবুর মুখের ওপর স্থির হলো।
নিবারণবাবু চারপাশটা একবার দেখে নিয়ে ফিসফিস করে বললেন, “আমাদের গ্রামের প্রাচীন মন্দিরের পুজারী ভৈরব চক্রবর্তী। তিনি সিদ্ধপুরুষ, সবসময় খড়ম পরে হাঁটেন। কিন্তু তিনি তো কাল রাতে মন্দিরের গর্ভগৃহে জপ-তপ করছিলেন বলে জানি!”
প্রমথবাবু মনে মনে সমীকরণটা মেলাবার চেষ্টা করলেন। কিন্তু তখনই চায়ের দোকানের বাইরে থেকে একজন এসে খবর দিল—আজ সকালে রায়চৌধুরী জমিদার বাড়ির পেছনের পুকুরে একটি অজ্ঞাতপরিচয় লাশ ভেসে উঠেছে!
প্রমথবাবু চায়ের কাপটা টেবিলে রেখে দ্রুত উঠে দাঁড়ালেন। রহস্যের জল এবার আরও ঘোলাটে হতে শুরু করেছে।
পুকুরের পাড়ে যখন প্রমথবাবু পৌঁছালেন, তখন সেখানে ভৈরবপুর গ্রামের অর্ধেক মানুষ ভিড় করে দাঁড়িয়েছে। মানুষের গুঞ্জন আর ভ্যাপসা গরমের অস্বস্তি বাতাসে উথাল-পাথাল করছে। আকাশ মেঘলা, সূর্যের আলো মেঘের আড়ালে ঢাকা পড়ে চারপাশটাকে এক ম্লান ধুসর রঙে রাঙিয়ে দিয়েছে। প্রমথবাবু ভিড় ঠেলে সামনে এগিয়ে গেলেন।
জমিদার বাড়ির পেছনের পুকুরটি কচুরিপানা আর শ্যাওলায় বোজা। সেই নোংরা জলের ওপর উপুড় হয়ে ভাসছে একটি মধ্যবয়সী পুরুষের দেহ। পরনে সাধারণ সুতির ধুতি, কিন্তু পিঠের ওপর এক অদ্ভুত কালচে দাগ। গ্রামবাসীদের কয়েকজন মিলে লাশটি জল থেকে টেনে তুলল। লাশটি যখন পাড়ের ঘাসের ওপর চিত করে শোয়ানো হলো, তখন প্রমথবাবুর তীক্ষ্ণ চোখ জোড়া মৃতদেহের প্রতিটি খুঁটিনাটি খতিয়ে দেখতে লাগল।
মৃত ব্যক্তির চেহারা ভৈরবপুর গ্রামের কারও চেনা নয়। লোকটার বয়স আনুমানিক চল্লিশ থেকে পঁয়তাল্লিশের মধ্যে। মুখাবয়বে এক ধরণের শহুরে ছাপ স্পষ্ট। তবে প্রমথবাবুকে সবচেয়ে বেশি যা চমকে দিল, তা হলো লোকটার ডান হাতের মুঠো। হাতটি শক্ত হয়ে জমে গেছে, যেন মৃত্যুর শেষ মুহূর্তেও সে কোনো কিছু আঁকড়ে ধরার আপ্রাণ চেষ্টা করছিল। প্রমথবাবু নিচু হয়ে সাবধানে সেই শক্ত আঙুলগুলো আলগা করলেন।
মুঠোটি খুলতেই ভেতর থেকে বেরিয়ে এল একটি ছোট ব্রোঞ্জের চাবি। চাবিটির মাথায় একটি সাপের নকশা খোদাই করা—ঠিক কাল রাতে ছাদের ফোকরে দেখা সেই ‘ইউরোরোবোস’ প্রতীকের মতো!
“এই লোকটিকে আপনারা কেউ আগে কখনো গ্রামে দেখেছেন?” প্রমথবাবু সমবেত গ্রামবাসীদের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করলেন।
সবাই মাথা নাড়ল। মোড়ল নিবারণ চক্রবর্তী ভিড় থেকে সামনে এসে লাশটির দিকে তাকিয়ে বললেন, “না মাস্টার মশাই, এ তো আমাদের চেনা কেউ নয়। কিন্তু এই অভিশপ্ত ভিটায় এর কী কাজ ছিল? আর এর হাতে ওটা কীসের চাবি?”
প্রমথবাবু চাবিটি নিজের পকেটে পুরে নিলেন। তিনি মৃতদেহের পকেটগুলো হাতড়ে দেখলেন। জামার পকেটে কোনো পরিচয়পত্র নেই, তবে একটি ভিজা ট্রেনের টিকিট পাওয়া গেল। টিকিটটি ঢাকা থেকে খুলনা আসার, যার তারিখটি মাত্র দুদিন আগের। প্রমথবাবু টিকিটটি সাবধানে নিজের নোটবইয়ের পাতায় চেপে রেখে শুকাতে দিলেন। লোকটা শহর থেকে এসেছে, এবং সরাসরি এই রায়চৌধুরী জমিদার বাড়িতেই হানা দিয়েছিল। কেন?
তিনি লাশটির গলার দিকে তাকালেন। সেখানে কোনো ফাঁসের দাগ নেই, কিন্তু কপালে একটি গভীর ক্ষতচিহ্ন রয়েছে, যা দেখে মনে হয় কোনো শক্ত পাথুরে বা ধাতব বস্তুর আঘাতে এই ফাটল তৈরি হয়েছে। প্রমথবাবু উঠে দাঁড়িয়ে পুকুর পাড় থেকে জমিদার বাড়ির পেছনের দেওয়ালের দিকে তাকালেন। অন্দরমহলের একটি জানালার কাঁচ ভাঙা। জানালার ঠিক নিচেই রয়েছে শক্ত ইটের চাতাল।
তিনি দ্রুত সেই চাতালের দিকে এগিয়ে গেলেন। চাতালের ওপর শুকনো রক্ত এবং মাথার চুলের কয়েকটি টুকরো পড়ে থাকতে দেখলেন। তাঁর মস্তিষ্কের গাণিতিক হিসাব সচল হয়ে উঠল। লোকটিকে পুকুরে মারা হয়নি। তাকে অন্দরমহলের ওই জানালা দিয়ে নিচে ফেলে দেওয়া হয়েছিল, অথবা সে ওপর থেকে পড়ে গিয়ে চাতালে মাথায় আঘাত পায় এবং পরে তার দেহ পুকুরে ফেলে দেওয়া হয়।
প্রমথবাবু ওপরের দিকে তাকালেন। জানালার কার্নিশে একটি নতুন ফাটল তৈরি হয়েছে। তিনি আবার জমিদার বাড়ির ভেতরে ঢোকার সিদ্ধান্ত নিলেন। এবার তাঁর লক্ষ্য অন্দরমহলের সেই ঘরটি, যার জানালা দিয়ে এই পতন ঘটেছে।
ভেতরে ঢোকার সময় তিনি লক্ষ্য করলেন, ভৈরব চক্রবর্তী—যাঁর কথা চায়ের দোকানে নিবারণবাবু বলেছিলেন—তিনি মন্দিরের পোশাকে দূর থেকে প্রমথবাবুর সমস্ত কর্মকাণ্ড লক্ষ্য করছেন। তাঁর পায়ে সেই ভারী কাঠের খড়ম। প্রমথবাবু তাঁর দিকে তাকিয়ে একটু হাসলেন, কিন্তু ভৈরব চক্রবর্তী কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে হনহন করে মন্দিরের দিকে হেঁটে চলে গেলেন।
প্রমথবাবু আবার অন্দরমহলে ঢুকলেন। দিনের আলোয় কাল রাতের সেই বেলজিয়াম কাঁচের আয়নাটি আরও বেশি ধুলোমলিন দেখাচ্ছে। তিনি কাল রাতের সেই গোপন কুঠুরির ঘরটির ঠিক পাশের ঘরে ঢুকলেন—যেখানকার জানালাটি ভাঙা। ঘরের মেঝেতে ধুলোর ওপর ধস্তাধস্তির স্পষ্ট চিহ্ন রয়েছে। পায়ের ছাপে চারপাশটা ওলটপালট হয়ে গেছে। চটি জুতো এবং সেই ভারী বুট বা খড়মের দাগ একে অপরের ওপর উঠে গেছে।
মেঝের এক কোণায় প্রমথবাবু একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ক্লু খুঁজে পেলেন। সেটি একটি ছোট চশমার ভাঙা কাঁচ। লোকটির চোখে কোনো চশমা ছিল না, তার মানে এই চশমাটি খুনি বা আক্রমণকারীর! প্রমথবাবু চশমার কাঁচটি তুলে আলোর সামনে ধরলেন। এটি সাধারণ চশমার কাঁচ নয়, এটি একটি হাই-পাওয়ারের সিলিন্ড্রিক্যাল লেন্স, যা কেবল তীব্র দৃষ্টিত্রুটি থাকা মানুষই ব্যবহার করে।
তিনি ঘরের দেওয়ালে হাত বুলিয়ে দেখার সময় হঠাৎ একটি খসখসে শব্দ শুনতে পেলেন। দেওয়ালের চুনকাম করা আস্তরণের নিচে একটি ফাটল দেখা দিয়েছে। প্রমথবাবু তাঁর পকেট থেকে একটি ছোট ছুরি বের করে সেই ফাটলের ওপরের প্লাস্টারটুকু আলগা করতেই ভেতরে একটি তামার পাত দেখতে পেলেন। তামার পাতের ওপর কিছু ইংরেজি অক্ষর এবং সংখ্যা খোদাই করা।
তিনি ধুলো পরিষ্কার করে পড়তে লাগলেন: X = 3, Y = 5, Z = 9
প্রমথবাবু থমকে গেলেন। ৩-৫-৯! কাল রাতে ছাদের দেওয়ালে পাওয়া সেই সংখ্যাগুলোই এখানে চলক বা ভ্যারিয়েবল হিসেবে দেখা দিচ্ছে। এটি একটি নিখুঁত মেথমেটিক্যাল ইকুয়েশন বা সমীকরণের অংশ। জমিদার বাড়ির এই দেওয়ালগুলোর পেছনে কোনো গোপন নকশা লুকানো রয়েছে, যা এই সংখ্যার বিন্যাস ছাড়া বোঝা অসম্ভব।
তাহলে কি মৃত ব্যক্তি এই সমীকরণের সমাধান খুঁজতেই এখানে এসেছিল? আর তাকে যে খুন করেছে, সেও কি এই গুপ্তধনের সন্ধানী?
ঠিক এই সময় ঘরের বাইরে হুটোপুটি শব্দ হলো। প্রমথবাবু দ্রুত বারান্দায় বেরিয়ে এলেন। তিনি দেখলেন, একজন লোক দেওয়ালের আড়াল থেকে ছুটে পালিয়ে যাচ্ছে। প্রমথবাবু চিৎকার করে উঠলেন, “কে ওখানে?”
তিনি পেছনে ধাওয়া করলেন, কিন্তু লোকটা ততক্ষণে সদর দরজা পার হয়ে উধাও। তবে এবার প্রমথবাবু সম্পূর্ণ শূন্যহাতে ফিরলেন না। লোকটা তাড়াহুড়ো করে পালানোর সময় তার পকেট থেকে একটি ছোট কাপড়ের থলি মেঝেতে ফেলে গেছে।
প্রমথবাবু থলিটি কুড়িয়ে নিলেন। ভেতরে হাত দিতেই তাঁর আঙুলে ঠাণ্ডা ধাতুর স্পর্শ লাগল। তিনি থলির ভেতর থেকে বের করে আনলেন একটি রুপোর তৈরি পুরোনো পকেট ঘড়ি। ঘড়িটির ডালা খুলতেই প্রমথবাবুর বুকটা ধক করে উঠল। ঘড়ির ভেতরের কাঁচের ওপর রক্ত দিয়ে একটি নাম লেখা রয়েছে—’প্রমথ’।
খুনি কি তবে প্রমথবাবুকে আগে থেকেই চেনে? নাকি এটি তাঁর জন্য কোনো বড় ফাঁদ? সমীকরণটা এক নিমিষে সম্পূর্ণ উল্টে গেল।
পর্ব ১ সমাপ্ত