ত্রিপুরার ঘন জঙ্গলঘেরা পাহাড়ি অঞ্চলের বুক চিরে যে কাঁচা রাস্তাটি চলে গেছে, তার শেষ মাথায় এককালে এক প্রতাপশালী জমিদারের শিকারের বাংলোটি দাঁড়িয়ে ছিল। চারপাশের শাল আর সেগুন বনের পাতা বেয়ে অবিরাম বৃষ্টির জল টুপটুপ করে ঝরে পড়ছে। কোনো শীত বা কুয়াশার লেশমাত্র নেই, কেবল এক গুমোট, আর্দ্র এবং থমথমে বর্ষার রাত। মেঘের ডাক মাঝে মাঝেই বনের নিস্তব্ধতাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিচ্ছিল। আকাশে বিদ্যুতের তীব্র ঝলকানি যখন বনের ওপর আছড়ে পড়ছিল, তখন সেই আদিম গাছগুলোর দীর্ঘ ছায়া বাংলোর বারান্দায় এসে আছড়ে পড়ছিল যেন কোনো প্রেতাত্মার হাতছানি।
জমিদার ভবানীপ্রসাদ চৌধুরী ছিলেন শিকারে অত্যন্ত শৌখিন মানুষ। প্রতি বছর এই বর্ষার মরসুমে তিনি একা এসে এই নিভৃত বাংলোয় দু-তিন দিন কাটাতেন। তাঁর সঙ্গে কোনো পাইক-বরকন্দাজ থাকত না, কেবল বনের সীমানায় পাহারা দেওয়ার জন্য বুড়ো দারোয়ান দীনদয়াল একটি ছোট কুটিরে থাকত। ভবানীপ্রসাদ মনে করতেন, শিকারের আসল আনন্দ একা থাকার মধ্যে, প্রকৃতির হিংস্র রূপকে খুব কাছ থেকে অনুভব করার মধ্যে। কিন্তু সেই রাতের অন্ধকার যে তাঁর জীবনের শেষ অন্ধকার হবে, তা কে জানত!
পরদিন সকালবেলা যখন বৃষ্টির বেগ কিছুটা কমে এল, তখন দীনদয়াল প্রথামতো জমিদারের জন্য চা ও কিছু ফলমূল নিয়ে বাংলোর দিকে রওনা হলো। মাটির রাস্তাটি বৃষ্টির জলে নরম কাদায় পরিণত হয়েছিল। দীনদয়াল লক্ষ্য করল, বাংলোর চারপাশের সেই নরম কাদার ওপর কেবল একজোড়া পায়ের ছাপ সোজা ভেতরের দিকে চলে গেছে। সেই ছাপগুলো আর কারও নয়, খোদ জমিদার ভবানীপ্রসাদের নিজের শিকারি জুতোর ছাপ। ভারী বুটের সেই গভীর দাগগুলো স্পষ্ট বুঝিয়ে দিচ্ছিল যে, তিনি হেঁটে ঘরের ভেতর প্রবেশ করেছেন। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, সেই কাদার ওপর অন্য কোনো মানুষের, এমনকি কোনো পশুরও দ্বিতীয় কোনো পদচিহ্ন ছিল না। চারিদিকের নরম কাদা একেবারে অক্ষত, মসৃণ, যেন কোনো কুমার তার চাক থেকে সদ্য মাটির পাত্র নামিয়ে রেখেছে।
দীনদয়াল বারান্দায় উঠে এসে দরজায় মৃদু টোকা দিল, “হুজুর, চা এনেছি।”
ভেতর থেকে কোনো সাড়া শব্দ পাওয়া গেল না। দীনদয়াল আবার ডাকল, এবার একটু জোরে। কিন্তু চারপাশ গভীর নীরবতায় ডুবে রইল। কেবল ছাদ থেকে বৃষ্টির জলের ফোঁটা বারান্দার মেঝেতে পড়ার একটানা শব্দ হচ্ছিল। দীনদয়ালের মনে এক অজানা আশঙ্কার মেঘ দানা বাঁধতে শুরু করল। সে দরজার হাতল ধরে মৃদু চাপ দিতেই দরজাটি ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ করে খুলে গেল। দরজা ভেতর থেকে লক করা ছিল না, কেবল ভেজানো ছিল।
ঘরের ভেতরে পা রাখতেই দীনদয়ালের হাত থেকে চায়ের পাত্রটি মাটিতে পড়ে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। ঘরের মাঝখানে কাঠের আরামকেদারায় বসে আছেন জমিদার ভবানীপ্রসাদ। তাঁর মাথাটি অদ্ভুতভাবে পেছনের দিকে ঝুলে রয়েছে, চোখ দুটো বিস্ফোরিত এবং মুখের ভাব অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক। তাঁর গলার চারপাশের চামড়া কালচে হয়ে গেছে—স্পষ্টতই কেউ তাঁকে পেছন থেকে কোনো শক্ত দড়ি বা তার দিয়ে অত্যন্ত নির্মমভাবে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেছে।
দীনদয়াল চিৎকার করে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। তার চিৎকারে বনের পাখিরা ডানা ঝাপটে উড়ে গেল। খবর চলে গেল শহরের প্রবীণ এবং তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন বেসরকারি তদন্তকারী ব্যোমকেশ-সদৃশ ডিটেক্টিভ প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়ের কাছে।
বিকেলের দিকে প্রিয়নাথবাবু তাঁর সহকারী অমলকে নিয়ে ঘটনাস্থলে এসে পৌঁছালেন। প্রিয়নাথবাবুর পরনে ছিল সাধারণ ধুতি ও পাঞ্জাবি, চোখে চশমা, কিন্তু তাঁর চোখের দৃষ্টি ছিল বাজপাখির মতো তীব্র। তিনি বাংলোর চারপাশে দীর্ঘক্ষণ ধরে পরীক্ষা করলেন।
“অমল, ভালো করে দেখ,” প্রিয়নাথবাবু কাদার দিকে আঙুল নির্দেশ করে বললেন, “এই নরম মাটিতে কেবল জমিদারের জুতো পরা পায়ের ছাপ সোজা বারান্দার দিকে গেছে। খুনি যদি এই পথ দিয়ে আসত বা যেত, তবে তার পায়ের ছাপ পড়তে বাধ্য ছিল। মাটি এতটাই নরম যে একটা বেড়াল গেলেও তার থাবার দাগ থেকে যেত। কিন্তু এখানে অন্য কোনো চিহ্ন নেই।”
অমল অবাক হয়ে বলল, “তাহলে খুনি কি ছাদ দিয়ে এসেছিল?”
প্রিয়নাথবাবু ওপরে তাকালেন। ছাদটি খড় ও টিনের মজবুত কাঠামোয় তৈরি, কোথাও কোনো ছিদ্র নেই। ঘরের জানালাগুলো পরীক্ষা করে দেখা গেল, সেগুলো ভেতর থেকে শক্ত খিল দিয়ে বন্ধ করা। কোনো দিক থেকেই ঘরের ভেতরে অন্য কারও প্রবেশের বা বের হওয়ার কোনো উপায় ছিল না।
“তবে কি খুনি শূন্যে ভেসে এসেছিল, প্রিয়দা?” অমল কিছুটা ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করল।
প্রিয়নাথবাবু পকেট থেকে তাঁর নস্যির কৌটোটি বের করে এক চিমটি নস্যি নিলেন, তারপর মাথা নেড়ে বললেন, “বিজ্ঞান ও যুক্তি কখনো শূন্যে ভেসে আসা খুনিকে মেনে নেয় না, অমল। এই আপাত অসম্ভব অপরাধের পেছনে লুকিয়ে আছে এক অসামান্য চাতুর্য। খুনি কোনো অতিপ্রাকৃতিক সত্তা নয়, সে রক্ত-মাংসের মানুষ। কিন্তু সে এমন এক জ্যামিতিক চাতুর্য ব্যবহার করেছে যা আমাদের চোখকে ফাঁকি দিচ্ছে।”
প্রিয়নাথবাবু ঘরের ভেতরে ঢুকলেন। লাশের চারপাশ ঘুরে দেখতে দেখতে তাঁর নজর গেল জমিদারের টেবিলের ওপর। সেখানে একটি ডায়েরি খোলা ছিল, আর তার পাশে পড়ে ছিল একটি দোয়াত, যার কালি মেঝেতে কিছুটা উল্টে পড়েছিল। কিন্তু সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয় হলো, জমিদারের নিজের পরনের শিকারি জুতো জোড়া তাঁর পায়ে ছিল না, সেটি ঘরের এক কোণে অত্যন্ত পরিপাটি করে রাখা ছিল।
প্রিয়নাথবাবু জুতো জোড়া তুলে নিলেন। জুতোর তলায় লেগে থাকা কাদা পরীক্ষা করতে গিয়ে হঠাৎ তাঁর চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। তিনি জুতোর তলার সেই জ্যামিতিক খাঁজগুলো খুব সূক্ষ্মভাবে দেখতে লাগলেন এবং হঠাতই একটি নতুন ধোঁয়াশা তৈরি হলো। জুতোর তলায় যে কাদা লেগে ছিল, তা বাইরের সাধারণ মাটির কাদা নয়; তার মধ্যে মিশে ছিল এক অদ্ভুত লালচে রঙের গুঁড়ো, যা এই বাংলোর আশেপাশে কোথাও পাওয়া যায় না!
প্রিয়নাথবাবু সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে অমলের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন, কিন্তু সেই হাসির আড়ালে ছিল এক গভীর রহস্যের ইঙ্গিত। তিনি বললেন, “অমল, সমীকরণটা যত সহজ ভাবছিলাম, তত সহজ নয়। এই পায়ের ছাপ আমাদের যতটা সত্য দেখাচ্ছে, তার চেয়ে অনেক বড় মিথ্যা লুকিয়ে রাখছে এর ভেতরে। খুনি জমিদারের নিজের পায়ের ছাপ ব্যবহার করেই ভেতরে ঢুকেছে, কিন্তু কীভাবে? আর এই লাল কাদার রহস্যই বা কী?”
প্রিয়নাথবাবুর এই একটি নতুন ক্লু পুরো ঘটনার মোড় ঘুরিয়ে দিল। খুনি কি তবে জমিদারের চেনা কেউ, যে জমিদারের জুতো পরেই এই কাণ্ড ঘটিয়েছে?
কিন্তু জমিদার তো নিজেই হেঁটে ঘরে ঢুকেছিলেন বলে দীনদয়াল দাবি করেছে! তবে কি…
প্রিয়নাথবাবু জুতোর তলার লালচে গুঁড়ো আঙুল দিয়ে স্পর্শ করলেন। তারপর নাকের কাছে নিয়ে সামান্য শুক্লেন। তাঁর চোখের কোণে এক তীক্ষ্ণ কুঞ্চন দেখা দিল। অমল উৎসুক চোখে তাকিয়ে ছিল। সে আর থাকতে না পেরে জিজ্ঞেস করল, “প্রিয়দা, কিছু বুঝলেন? এই লাল গুঁড়োটা আসলে কী?”
প্রিয়নাথবাবু তৎক্ষণাৎ কোনো উত্তর দিলেন না। তিনি ঘরের মেঝের দিকে তাকালেন। মেঝের কাঠের তক্তাগুলো বেশ পুরোনো, কিন্তু শক্ত। বৃষ্টির আর্দ্রতায় কাঠগুলো সামান্য ফুলে উঠেছে। ঘরের এক কোণে একটি বড় কাঠের আলমারি, আর অন্য প্রান্তে জমিদারের শোবার খাট। প্রিয়নাথবাবু খাটের নিচে ঝুঁকে দেখলেন, সেখানে কোনো ধুলোবালি বা অন্য কোনো সূত্র লুকিয়ে আছে কি না। কিন্তু খাটের তলাটি একেবারে পরিষ্কার।
তিনি আবার টেবিলের কাছে ফিরে এলেন। খোলা ডায়েরিটার পাতা উল্টাতে লাগলেন। ডায়েরির শেষ পাতায় জমিদারের হাতের লেখায় কেবল কয়েকটি অগোছালো শব্দ লেখা ছিল: “জ্যামিতির হিসাব মিলছে না… সে কি তবে জেনেই ফেলেছে?” লেখাটি অধূরা, যেন লিখতে লিখতে তিনি মাঝপথে থেমে গিয়েছিলেন। কলমের নিবটি ডায়েরির ওপরই পড়ে ছিল, যা থেকে কিছুটা কালি কাগজের বুকে লেপ্টে গেছে।
প্রিয়নাথবাবু দীনদয়ালকে ডাকলেন। বৃদ্ধ দারোয়ান দরজার পাশে হাতজোড় করে কাঁপতে কাঁপতে দাঁড়িয়ে ছিল। প্রিয়নাথবাবু শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করলেন, “দীনদয়াল, জমিদারবাবু কাল রাতে কখন এখানে এসেছিলেন?”
দীনদয়াল ঢোক গিলে বলল, “হুজুর, সাঁঝের বেলার ঠিক পর পরই বড়বাবু এসেছিলেন। তখন অঝোরে বৃষ্টি পড়ছিল। বড়বাবু নিজের ঘোড়াটি বনের মুখের আস্তাবলে রেখে একাই হেঁটে বাংলোর দিকে আসেন। আমি কুটির থেকে লণ্ঠন নিয়ে বেরিয়ে এসেছিলাম ওনাকে এগিয়ে নিতে, কিন্তু বড়বাবু বললেন, ওনার কাছে টর্চ আছে, আমাকে আসতে হবে না। উনি একাই গটগট করে হেঁটে বাংলোয় ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলেন।”
“তারপর রাতে তুমি আর কোনো শব্দ পাওনি?” প্রিয়নাথবাবুর প্রশ্ন।
“না হুজুর। বৃষ্টির শব্দ আর মেঘের ডাকে অন্য কোনো আওয়াজ পাওয়ার উপায় ছিল না। তবে মাঝরাতের দিকে বনের দিক থেকে একটা অদ্ভুত শব্দ শুনেছিলাম, ঠিক যেন কোনো ভারী জিনিস মাটিতে আছড়ে পড়ার শব্দ। কিন্তু বনের মধ্যে মরা ডালপালা তো প্রায়ই ভেঙে পড়ে, তাই আমি আর পাত্তা দিইনি।” দীনদয়াল মাথা নিচু করে বলল।
প্রিয়নাথবাবু জানালার দিকে এগিয়ে গেলেন। জানালার পাল্লাগুলো টেনে দেখলেন, ভেতরের খিলগুলো লোহার এবং অত্যন্ত মজবুত। বাইরে থেকে কোনোভাবেই এই খিল খোলা বা বন্ধ করা সম্ভব নয়। তিনি ঘরের ছাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, “অমল, তুমি একটু বাইরে গিয়ে দীনদয়ালকে সঙ্গে নিয়ে বাংলোর চারপাশের মাটির পায়ের ছাপগুলো আর একবার ভালো করে মেপে দেখ তো। প্রতিটা ছাপের দূরত্ব এবং গভীরতা সমান কি না।”
অমল মাথা নেড়ে দীনদয়ালকে সাথে নিয়ে বাইরে চলে গেল। বৃষ্টি তখন পুরোপুরি থেমে গেছে, কিন্তু আকাশ থমথমে। চারপাশের জঙ্গল থেকে ভিজে মাটির একটা তীব্র গন্ধ আসছিল।
প্রিয়নাথবাবু একা ঘরে রইলেন। তিনি লাশের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। জমিদার ভবানীপ্রসাদের গলার ক্ষতচিহ্নটি খুব মন দিয়ে দেখতে লাগলেন। শ্বাসরোধের দাগটি গলার সামনের দিকে নয়, বরং পেছনের দিক থেকে এসে দুপাশে চেপে বসেছে। খুনি যদি জমিদারের পেছনে দাঁড়িয়ে এই কাজ করে থাকে, তবে জমিদার কেন বাধা দিলেন না? আরামকেদারার চারপাশের জিনিসপত্র একদম গোছানো, কোথাও কোনো ধস্তাধস্তির চিহ্ন নেই। এর মানে, খুনি যখন জমিদারের পেছনে এসে দাঁড়িয়েছিল, তখন জমিদারবাবু হয় তাকে চিনতেন, না হয় তিনি বুঝতেই পারেননি যে তাঁর পেছনে কেউ দাঁড়িয়ে আছে।
কিন্তু বন্ধ ঘরে কেউ যদি আগে থেকেই লুকিয়ে থাকে, তবে খুনি বের হলো কোন পথ দিয়ে? ছাদ অক্ষত, জানালা বন্ধ, দরজার মুখে কোনো বের হওয়ার পায়ের ছাপ নেই। কেবল একজোড়া ছাপ ঘরে ঢোকার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
কিছুক্ষণ পর অমল ঘরে ফিরে এল। তার কপালে জমারত ঘামের ফোঁটা। সে উত্তেজিতভাবে বলল, “প্রিয়দা, একটা অদ্ভুত জিনিস লক্ষ্য করলাম। জমিদারের জুতোর ছাপগুলো বারান্দা পর্যন্ত আসার পর, প্রথম চার-পাঁচটি ছাপের গভীরতা যতটা, ঘরের ঠিক কাছাকাছি এসে শেষ তিনটি ছাপের গভীরতা তার চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ! মনে হচ্ছে যেন হঠাৎ করেই জমিদারের শরীরের ওজন শেষ মুহূর্তে দ্বিগুণ হয়ে গিয়েছিল!”
প্রিয়নাথবাবু চশমাটা নাকের ওপর ঠিক করে বসালেন। তাঁর মুখে এক রহস্যময় তৃপ্তির আভাস ফুটে উঠল। তিনি বললেন, “চমৎকার অমল! মাটির নীরবতা ভেঙে তুমি এক অত্যন্ত মূল্যবান সত্য বের করে এনেছ। মানুষের শরীরের ওজন কখনো হঠাৎ করে দ্বিগুণ হতে পারে না, যদি না…”
তিনি কথা শেষ করলেন না। আলমারির দিকে এগিয়ে গিয়ে তার পাল্লা দুটো টেনে খুললেন। আলমারির ভেতর জমিদারের কিছু শিকারের পোশাক আর একটা দড়ি ছাড়া আর কিছুই ছিল না। কিন্তু প্রিয়নাথবাবু আলমারির নিচের তাকের কাঠের পাটাতনে আঙুল দিয়ে সামান্য চাপ দিতেই একটা খটকা আওয়াজ হলো। পাটাতনটি সামান্য আলগা!
তিনি পাটাতনটি তুলতেই ভেতরে একটি ছোট চামড়ার থলি দেখতে পেলেন। থলিটি খুলে প্রিয়নাথবাবু স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। তার ভেতরে কোনো টাকা-পয়সা বা গয়না ছিল না, ছিল চার টুকরো ধারালো লোহার পাত এবং একটি ছোট জ্যামিতিক কম্পাস! আর সেই লোহার পাতের গায়ে লেগে ছিল একই রকম লালচে গুঁড়ো!
অমল অবাক হয়ে বলল, “এগুলো এখানে কেন? জমিদারবাবু কি তবে নিজেই কিছু লুকাচ্ছিলেন?”
প্রিয়নাথবাবু থলিটি পকেটে পুরে বললেন, “না অমল, এই জিনিসগুলো জমিদারের নয়। এগুলো খুনির চাতুর্যের অবশিষ্টাংশ, যা সে তাড়াহুড়ো করে এখানে ফেলে গেছে। খুনি বাইরে থেকে আসেনি অমল, সে এই ঘরেই ছিল। কিন্তু কাদার ওপর পায়ের ছাপের যে ধাঁধা আমরা দেখছি, তার আসল সত্য লুকিয়ে আছে জমিদারের নিজের জুতোর গঠনে।”
প্রিয়নাথবাবু টেবিলের ওপর রাখা জমিদারের জুতো জোড়া আবার তুললেন এবং জুতোর হিল বা গোড়ালির অংশটা ধরে একটা মোচড় দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে জুতোর গোড়ালির ভেতরের একটা গোপন ল্যাচ খুলে গেল এবং জুতোটার তলদেশ সম্পূর্ণ আলগা হয়ে উল্টে গেল!
অমল চোখ বড় বড় করে বলল, “এ কী! জুতোটা উল্টো হয়ে যায়?”
“হ্যাঁ,” প্রিয়নাথবাবু গম্ভীর গলায় বললেন, “এই জুতোর জ্যামিতি এমনভাবে তৈরি, যা সোজা হাঁটলেও মাটির ওপর উল্টো হাঁটার ছাপ তৈরি করতে পারে। কিন্তু এখানেই শেষ নয়। খুনি আমাদের বোকা বানানোর জন্য যে চালটি চেলেছে, তা যেমন নিখুঁত, তেমনই বিপজ্জনক। তবে সে একটা মস্ত বড় জ্যামিতিক ভুল করে গেছে, যা সে নিজেও বুঝতে পারেনি।”
ঠিক এই সময় ঘরের বাইরে বনের দিক থেকে একটা তীব্র শিস দেওয়ার শব্দ ভেসে এল। দীনদয়াল বাইরে থেকে চিৎকার করে উঠল, “বাবু! ওদিকে কে যেন পালাচ্ছে!”
প্রিয়নাথবাবু আর অমল দ্রুত বারান্দায় ছুটে এলেন। বনের ভেজা অন্ধকারের মধ্যে একটা কালো ছায়া দ্রুত গাছের আড়ালে মিলিয়ে গেল। কিন্তু প্রিয়নাথবাবু তাকে তাড়া করলেন না। তিনি শান্তভাবে দাঁড়িয়ে রইলেন।
অমল বলল, “প্রিয়দা, আমরা ধরলাম না কেন?”
প্রিয়নাথবাবু বনের দিকে তাকিয়ে বললেন, “তাড়া করে লাভ নেই অমল। সে নিজেই আমাদের ফাঁদে পা দিতে বাধ্য। তবে এখন আমাদের দেখতে হবে, এই বাংলোর নিচে কোনো গোপন কুঠুরি বা সুরঙ্গ আছে কি না। কারণ কাদার পায়ের ছাপ যদি আমাদের মিথ্যা বলে, তবে মাটির নিচের নীরবতাই আমাদের আসল সত্য জানাবে।”
তিনি বারান্দার এক কোণে মাটির দিকে তাকালেন, যেখানে বৃষ্টির জল জমে একটা ছোট কাদার গর্ত তৈরি হয়েছিল। আর সেই গর্তের ঠিক পাশে পড়ে ছিল একটা ছেঁড়া সুতোর টুকরো—যার রঙ ছিল গাঢ় লাল।
বনের দিক থেকে আসা সেই রহস্যময় শিসধ্বনি বাতাসে মিলিয়ে যাওয়ার পরও প্রিয়নাথবাবু বেশ কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। তাঁর দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল বারান্দার কোণে জমে থাকা সেই লাল সুতোর টুকরোটির ওপর। অমল হ্যারিকেনের আলোটা সুতোর ওপর ফেলতেই দেখা গেল, সেটি সাধারণ কোনো সুতো নয়; বেশ শক্ত এবং কিছুটা তৈলাক্ত, যেন কোনো বিশেষ যন্ত্র বা বড় কোনো শক্ত বাঁধনে এটি ব্যবহার করা হতো।
“প্রিয়দা,” অমল ফিসফিস করে বলল, “খুনি কি তবে আমাদের আশেপাশেই কোথাও ওত পেতে বসে আছে?”
প্রিয়নাথবাবু সুতোর টুকরোটি সাবধানে একটা ছোট কাগজে মুড়ে পকেটে রাখলেন। তারপর বললেন, “খুনি শুধু আশেপাশেই নেই অমল, সে আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপের ওপর নজর রাখছে। তবে সে একটা বিষয়ে অত্যন্ত নিশ্চিত ছিল—তার জ্যামিতিক চাতুর্য কেউ ধরতে পারবে না। কিন্তু অতি-চালাকের গলায় দড়ি পড়তে বেশি সময় লাগে না।”
তাঁরা আবার ঘরের ভেতরে ফিরে এলেন। জমিদার ভবানীপ্রসাদের মৃতদেহটি তখনো সেই আরামকেদারায় একইভাবে স্থির হয়ে ছিল। প্রিয়নাথবাবু টেবিলের ওপর রাখা সেই অদ্ভুত শিকারি জুতো জোড়া আবার হাতে তুলে নিলেন। এবার তিনি ঘরের মেঝের ওপর জুতো জোড়া রেখে নিজেই পরীক্ষা করতে লাগলেন।
তিনি লক্ষ্য করলেন, জুতোর গোড়ালি এবং সামনের অংশের ল্যাচটি যখন উল্টে দেওয়া হয়, তখন পায়ের পাতার যে অংশটি মাটিতে পড়ার কথা, তার অবয়ব সম্পূর্ণ বদলে যায়। অর্থাৎ, একজন মানুষ যদি সোজা হেঁটে ঘরের ভেতরে ঢোকে, তবে মাটির ওপর যে ছাপটি পড়বে, তা দেখে মনে হবে কেউ ঘর থেকে পেছনের দিকে হেঁটে বাইরে বেরিয়ে গেছে।
“অমল, এবার জ্যামিতির সমীকরণটা বোঝার চেষ্টা করো,” প্রিয়নাথবাবু চশমার কাচটা মুছে বললেন, “দীনদয়াল সকালে দেখেছে কেবল একজোড়া পায়ের ছাপ সোজা ঘরের দিকে ঢুকেছে। কোনো বের হওয়ার ছাপ নেই। তার মানে, খুনি যদি জমিদারের জুতো পরে ঘর থেকে বের হতো, তবে বাইরে বের হওয়ার ছাপ পড়ত। কিন্তু কাদার ওপর আছে কেবল ভেতরে ঢোকার ছাপ।”
অমল মাথা চুলকে বলল, “প্রিয়দা, মাথাটা কেমন গুলিয়ে যাচ্ছে। যদি কেবল ভেতরে ঢোকার ছাপ থাকে, তার মানে তো জমিদার নিজেই ভেতরে ঢুকেছিলেন। খুনি যদি জমিদারের জুতো পরে বাইরে বের হতো, তবে কাদার ওপর বাইরে যাওয়ার ছাপ পড়ার কথা ছিল। কিন্তু বাইরে যাওয়ার তো কোনো ছাপই নেই!”
“ঠিক তাই,” প্রিয়নাথবাবু বললেন, “এটাই হলো এই খুনের সবচেয়ে বড় ধাঁধা। খুনি এমন এক ব্যবস্থা করেছিল যাতে ঘরের ভেতরে ঢোকার ছাপটাই তৈরি হয়, কিন্তু আসলে সেই ছাপ তৈরি করার সময় মানুষটি সোজা হাঁটছিল না, হাঁটছিল উল্টো! একটু ভালো করে ভাবো। খুনি যদি জমিদারের জুতো জোড়ার ল্যাচটি উল্টে দিয়ে, বাংলোর দরজা থেকে পেছনের দিকে হেঁটে হেঁটে বনের দিকে চলে যায়—তবে মাটির ওপর কেমন ছাপ পড়বে?”
অমলের চোখ দুটো হঠাৎ উজ্জ্বল হয়ে উঠল, “ওহ! বুঝতে পেরেছি! জুতো উল্টো করা থাকলে, কেউ যদি ঘর থেকে পেছনের দিকে হেঁটে বনের দিকে যায়, তবে মাটির ওপর তৈরি হবে সোজা ঘরের দিকে আসার ছাপ! অর্থাৎ, খুনি আসলে ঘর থেকে বেরিয়ে বনের দিকে পালিয়ে গেছে, কিন্তু জুতোর চাতুর্যের কারণে আমাদের মনে হচ্ছে কেউ বনের দিক থেকে ঘরের দিকে এসেছে!”
“চমৎকার ধরেছ, অমল,” প্রিয়নাথবাবু পিঠ চাপড়ে বললেন, “কিন্তু এখানেই একটা মস্ত বড় খটকা আছে। যদি খুনি ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় এই চাল চালত, তবে জমিদারের নিজের পায়ের ছাপ কখন তৈরি হলো? জমিদার তো নিজেই হেঁটে ঘরে ঢুকেছিলেন, দীনদয়াল তা নিজের চোখে দেখেছে। তার মানে কাদার ওপর দুই জোড়া ছাপ থাকার কথা ছিল—এক জোড়া জমিদারের নিজের, আর এক জোড়া খুনির তৈরি করা সেই ছদ্মবেশী ছাপ। কিন্তু কাদার ওপর ছাপ আছে মাত্র এক জোড়া! এক জোড়া ছাপ দিয়ে দুটি ভিন্ন মানুষের যাতায়াত কীভাবে সম্ভব?”
অমল আবার দমে গেল, “তাই তো! কাদার ওপর তো কোনো ওভারল্যাপিং বা এক ছাপের ওপর অন্য ছাপের দাগ নেই। একটি মাত্র নিখুঁত চেইন অফ ফুটপ্রিন্টস।”
প্রিয়নাথবাবু ঘরের এক কোণে রাখা আলমারিটার দিকে গেলেন। তিনি আলমারির তলার সেই আলগা কাঠের পাটাতনটি আবার সরালেন। সেখান থেকে পাওয়া সেই চার টুকরো লোহার পাত আর জ্যামিতিক কম্পাসটি বের করে টেবিলের ওপর রাখলেন। তিনি একটি পাত তুলে নিয়ে আলোর সামনে ধরলেন। পাতের এক প্রান্তে ছোট ছোট দুটি স্ক্রু লাগানোর ছিদ্র রয়েছে।
“এই পাতগুলো সাধারণ কোনো লোহার টুকরো নয়, অমল,” প্রিয়নাথবাবু বললেন, “এগুলো হলো জুতোর তলায় লাগানোর বিশেষ এক্সটেনশন প্লেট। খুনি যখন জমিদারের জুতো জোড়া ব্যবহার করেছিল, তখন সে এই পাতের সাহায্যে নিজের পায়ের মাপ আর জমিদারের পায়ের মাপের ব্যবধানটুকু দূর করেছিল। আর এই পাতের গায়ে লেগে থাকা লাল গুঁড়ো আসলে কোনো মাটি নয়, এটা হলো এক ধরণের বিশেষ খনিজ মরিচা, যা কেবল চা বাগানের কারখানায় বা কোনো খনির যন্ত্রপাতিতে ব্যবহার করা হয়।”
“চা বাগান?” অমল অবাক হয়ে বলল, “এখান থেকে মাইল পাঁচেক দূরেই তো ত্রিপুরার মহারাজার অধীনস্থ একটা বড় চা বাগান আছে।”
“হ্যাঁ,” প্রিয়নাথবাবু গম্ভীর হলেন, “এবং সেই চা বাগানের ম্যানেজার হলেন মিস্টার হেমেন চ্যাটার্জি। জমিদার ভবানীপ্রসাদের সাথে তাঁর দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক শত্রুতা ছিল বলে আমি কলকাতায় খবর পেয়েছিলাম। কিন্তু হেমেনবাবু কি এত বড় ঝুঁকি নিজের হাতে নেবেন? নাকি এর পেছনে অন্য কেউ আছে?”
প্রিয়নাথবাবু হঠাৎ জমিদারের আরামকেদারার নিচে মেঝের তক্তাগুলোর দিকে তাকালেন। তিনি ঝুঁকে পড়ে একটি তক্তার ওপর আঙুল দিয়ে চাপ দিতেই দেখলেন, তক্তাটি সামান্য নড়ছে। তিনি অমলকে বললেন, “অমল, আমার পকেট থেকে ছোট করাত আর চাড় দেওয়ার লোহাটা বের করো তো। এই মেঝের নিচে কিছু একটা লুকিয়ে আছে।”
অমল দ্রুত ব্যাগ থেকে সরঞ্জাম বের করে দিল। প্রিয়নাথবাবু অত্যন্ত সাবধানে মেঝের সেই তক্তাটি আলগা করতে লাগলেন। পুরোনো তক্তাটি ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ করে একপাশে সরে যেতেই নিচের অন্ধকার গহ্বর থেকে একটা স্যাঁতসেঁতে, গন্ধযুক্ত হাওয়া ওপরে উঠে এল।
হ্যারিকেনের আলো নিচে ফেলতেই দেখা গেল, মেঝের নিচে কোনো গোপন সুরঙ্গ নেই, কিন্তু সেখানে একটি কাপড়ের থলে পড়ে আছে। প্রিয়নাথবাবু হাত বাড়িয়ে থলেটি ওপরে তুলে আনলেন। থলেটি খুলতেই তার ভেতর থেকে বেরিয়ে এল একটি দামী সোনার পকেট ঘড়ি, যার কাচটি ভাঙা। ঘড়ির কাঁটা দুটি রাত বারোটা বেজে পনেরো মিনিটে গিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে আছে। আর সেই ঘড়ির পেছনে খোদাই করে লেখা ছিল একটা নাম—‘রমেশ চৌধুরী’।
“রমেশ চৌধুরী!” অমল চমকে উঠল, “উনি তো জমিদারবাবুর ছোট ভাই! যিনি প্রায় পাঁচ বছর আগে নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিলেন বলে সবাই জানে!”
প্রিয়নাথবাবু ঘড়িটি হাতের তালুতে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখলেন। ঘড়ির চেইনের সাথে লেগে রয়েছে একই রকম তৈলাক্ত লাল সুতোর একটি অবশিষ্টাংশ।
প্রিয়নাথবাবু জানালার দিকে তাকিয়ে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “রহস্যের জ্যামিতি এবার আরও জটিল হয়ে উঠছে, অমল। যে মানুষটি পাঁচ বছর আগে মরে গেছে বা হারিয়ে গেছে, তার ঘড়ি আজ রাতে এই বন্ধ ঘরে জমিদারের লাশের নিচে কী করছে? আর এই ঘড়ির কাঁটা কি আমাদের খুনের সঠিক সময় বলছে, নাকি এটাও খুনির সাজানো কোনো নতুন গোলকধাঁধা?”
ঠিক তখনই বাইরে আবার ভারী বৃষ্টির শব্দ শুরু হলো। মেঘের গর্জনে পুরো বাংলোটি কেঁপে উঠল। আর সেই অন্ধকারের বুক চিরে বারান্দায় একটি ভারী পায়ের শব্দ শোনা গেল—যেন কেউ একজন ভেজা জুতো নিয়ে অত্যন্ত ধীরে ধীরে ঘরের দরজার দিকে এগিয়ে আসছে।
পর্ব ১ সমাপ্ত