আমাজনের অদৃশ্য শহর – পর্ব ১

আকাশের বুক চিরে যখন প্রথম জলের ফোঁটাটি সবুজ পাতার অরণ্যে আছড়ে পড়ল, তখন মনে হলো অবাধ্য কোনো আদিম দেবতার দীর্ঘশ্বাস স্তব্ধ করে দিয়েছে পুরো চরাচর। আমাজনের এই গহীন জঠরে বৃষ্টি কেবল আবহাওয়া নয়, তা এক অনন্ত বন্দিশালা। জল আর কাদার মেলবন্ধনে তৈরি হওয়া এক মায়াবী কুয়াশা চারপাশকে এমনভাবে গিলে খাচ্ছিল, যেন বাস্তব আর কল্পনার মাঝখানের দেয়ালটা ক্রমশ পাতলা হয়ে আসছে। গাছের পাতা থেকে টুপটুপ শব্দে ঝরে পড়া প্রতিটি জলের কণা যেন কোনো অদৃশ্য ঘড়ির টিকটিক আওয়াজ, যা অবলীলায় জানান দিচ্ছে—সময় ফুরিয়ে আসছে। চারপাশের এই অতিপ্রাকৃতিক নিস্তব্ধতা আর বৃষ্টির একটানা একঘেয়ে সুর মিলে হাড়হিম করা এক সুরম্য বিষাদের আবহ তৈরি করেছিল, যা মানুষের মগজের ভেতর ধীরে ধীরে থিতু হতে শুরু করে।

অভিযাত্রী দলের প্রধান, প্রবীণ প্রত্নতাত্ত্বিক ড. সনাতন মুখার্জি তাঁর চশমার কাচটা শার্টের হাতা দিয়ে মুছলেন, কিন্তু লাভ হলো না। আর্দ্রতা এত বেশি যে মুহূর্তেই তা আবার ঝাপসা হয়ে গেল। তাঁর অবচেতন মন বলছিল, তাঁরা যেখানে পা রেখেছেন, তা কেবল মানচিত্রের কোনো অজ্ঞাত কোণ নয়; এটি এমন এক স্থান, যা মানব সভ্যতার সমস্ত যুক্তিকে উপহাস করার জন্য অপেক্ষা করছে।

তাঁর পেছনে থাকা বাকি চারজন অভিযাত্রীর মুখেও একই ক্লান্তিকর আতঙ্কের ছাপ। বৃষ্টির করাল থাবায় সবার শরীর ভিজে ভারী হয়ে গেছে, কিন্তু তাদের ভেতরের স্নায়ুগুলো তার চেয়েও বেশি ভারী হয়ে উঠছিল এক অজানা আশঙ্কায়।

“আমরা কি আসলেই সঠিক পথে আছি, ডক্টর?” দলের তরুণ ভূতত্ত্ববিদ ভাস্কর ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল।

তার কণ্ঠস্বর বৃষ্টির শব্দের নিচে চাপা পড়ে যাচ্ছিল। এই গহীন অরণ্যে উচ্চস্বরে কথা বলাটাও যেন এক ধরনের পাপ, যেন সামান্যতম জোরে শব্দ করলেই এই সবুজ দানবটি জেগে উঠে সবাইকে এক নিমেষে গ্রাস করে নেবে।

সনাতন কোনো উত্তর দিলেন না।

তাঁর হাতের প্রাচীন কম্পাসটি অদ্ভুত আচরণ করছে। কাঁটাটি উত্তর বা দক্ষিণ দিক নির্দেশ না করে বনবন করে ঘুরছে, যেন কোনো শক্তিশালী চৌম্বকীয় শক্তি নয়, বরং কোনো জীবন্ত সত্তার হৃদস্পন্দন তাকে নিয়ন্ত্রণ করছে। তিনি চারপাশের বিশালাকার গাছগুলোর দিকে তাকালেন। লতাগুল্মগুলো যেভাবে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে পেঁচিয়ে উঠেছে, তা দেখে মনে হয় যেন কোনো যন্ত্রণাকাতর অবয়ব একে অপরকে আঁকড়ে ধরে শেষ চিৎকার দেওয়ার চেষ্টা করছে।

এই বনের নিজস্ব একটা ঘ্রাণ আছে—ভেজা মাটি, পচনশীল পাতা আর রক্তের মতো কোনো ধাতব উপাদানের মিশ্রণ।

দলের একমাত্র নারী সদস্য, নৃবিজ্ঞানী তন্বী হঠাৎ থমকে দাঁড়াল।

তার দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল মাটির দিকে। কাদার ওপরে কিছু একটা অদ্ভুত আকৃতির ছাপ। কোনো বন্য পশুর পায়ের ছাপ নয় এটি, আবার মানুষের জুতো বা খালি পায়ের ছাপও নয়। এটি দেখতে অনেকটা জ্যামিতিক নকশার মতো, যা কাদার ওপরে নিখুঁতভাবে খোদাই করা হয়েছে।

“ডক্টর, একটু এদিকে দেখুন,” তন্বীর কণ্ঠস্বর কেঁপে উঠল।

সনাতন এগিয়ে গেলেন। তাঁর টর্চের আলো সেই ছাপটার ওপর পড়তেই জলের ফোঁটাগুলো চকচক করে উঠল। আলোকরশ্মি যেন এক অদ্ভুত মায়াজাল তৈরি করল তাঁদের চোখের সামনে। সনাতন নিচু হয়ে হাত দিয়ে ছোঁয়া মাত্রই তাঁর মনে হলো, মাটির নিচে কিছু একটা তীব্রভাবে কেঁপে উঠল। খুব মৃদু, কিন্তু সুনিশ্চিত একটা ধকধক শব্দ, যা সরাসরি তাঁর হাতের আঙুল বেয়ে মস্তিষ্কে গিয়ে আঘাত করল। তিনি চমকে হাতটা সরিয়ে নিলেন। তাঁর কপালে বৃষ্টির জলের সাথে সাথে ঠান্ডা ঘাম জমে উঠল।

“এটা কোনো প্রাকৃতিক তৈরি জিনিস নয়,” সনাতন ফিসফিসিয়ে বললেন, “আমরা খুব কাছে চলে এসেছি। সেই প্রাচীন শহর, যা হাজার বছর ধরে মানুষের ইতিহাস থেকে নিজেকে লুকিয়ে রেখেছে। কিন্তু…” তিনি কথাটি শেষ করলেন না। তাঁর মনের ভেতরের কুয়াশা মাটির এই কম্পনের সাথে সাথে আরও ঘনীভূত হতে শুরু করল।

বৃষ্টির বেগ আরও বেড়ে গেল। চারপাশের আলো এত দ্রুত কমে আসছিল যে ঘড়িতে বিকেল চারটে বাজলেও মনে হচ্ছিল গভীর রাত। গাছের ডালপালার ফাঁক গলে যেটুকু আলো আসছিল, তা সবুজ রঙের এক অদ্ভুত আভা তৈরি করছিল। মনে হচ্ছিল তারা কোনো এক দানবের পেটের ভেতর হেঁটে চলেছে।

দলের মেকানিক ও গাইড রিয়াজ, যার শক্ত সমর্থ শরীরটাও এই অবর্ণনীয় আবহে কাঁপছিল, সে ফিসফিস করে বলল, “ডক্টর, আমার মনে হচ্ছে কেউ আমাদের দেখছে। এই গাছগুলো… এরা শুধু দাঁড়িয়ে নেই। এরা আমাদের প্রতিটা পদক্ষেপ লক্ষ করছে।”

ভাস্কর শুষ্ক হাসার চেষ্টা করল, “পাগলামো করো না, রিয়াজ। এগুলো শুধু গাছ। আমাজনের রেইনফরেস্টে এমন আবহাওয়া আর পরিবেশ হ্যালুসিনেশন তৈরি করার জন্য যথেষ্ট। আমাদের মগজ অক্সিজেনের তারতম্য আর ক্লান্তির কারণে এসব ভাবছে।”

কিন্তু ভাস্করের নিজের চোখও তখন এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখছিল। টর্চের আলোর পরিধির ঠিক বাইরে, কুয়াশার চাদরের আড়ালে যেন কিছু একটা নড়েচড়ে উঠল। একটা দীর্ঘাবয়ব, যা মানুষের মতো কিন্তু তার হাত-পাগুলো গাছের ডালের মতো দীর্ঘ এবং বাঁকানো। ভাস্কর চোখ রগড়ে আবার তাকাল, কিন্তু সেখানে এখন শুধুই কুয়াশা আর বৃষ্টির জল। মনের ভেতর একটা তীব্র ছটফটানি শুরু হলো তার। পরের মুহূর্তে কী ঘটতে চলেছে, এই অনিশ্চয়তা যেন তাদের মগজকে কামড়ে ধরে অবশ করে দিচ্ছিল।

তারা আরও গভীরে প্রবেশ করল। হঠাৎ করেই বনের ঘনত্ব কমে এল এবং তাদের সামনে উন্মোচিত হলো এক অবিশ্বাস্য দৃশ্য। বৃষ্টির পর্দার ওপারে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল এক প্রাচীর। কোনো সাধারণ পাথর দিয়ে তৈরি নয় এটি, কালো রঙের এক অজানা ধাতু বা পাথর, যার ওপর সবুজ রঙের শ্যাওলা আর লতা এমনভাবে ডিজাইন করে গজিয়েছে, যেন কোনো শিল্পী নিখুঁত পরিকল্পনায় এটি তৈরি করেছে। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, সেই প্রাচীরের গা বেয়ে বৃষ্টির জল যেভাবে গড়িয়ে পড়ছে, তা দেখে মনে হচ্ছে প্রাচীরটি ঘামছে। কোনো জীবন্ত শরীর যেভাবে উত্তেজনায় বা ভয়ে ঘামে, ঠিক তেমনি।

প্রাচীরের মাঝখানে একটা বিশাল তোরণ। সেই তোরণের মুখে দাঁড়িয়ে ড. সনাতন মুখার্জির মনে হলো, তাঁরা কোনো শহরের ধ্বংসাবশেষে এসে পৌঁছাননি। এই তোরণটি কোনো এক অতিকায় প্রাণীর হা করা মুখের মতো, যা অত্যন্ত ধৈর্যের সাথে তাদের ভেতরে প্রবেশ করার জন্য অপেক্ষা করছিল। হাজার বছর ধরে এই শহরটা মৃত ছিল না, সে কেবল ঘুমিয়ে ছিল। অথবা হয়তো, সে জেগে থেকেই অপেক্ষা করছিল ঠিক এই অভিযাত্রী দলটার জন্য।

তন্বী তোরণের গায়ের প্রাচীন লিপিগুলোর দিকে টর্চ ধরল। তার চোখ দুটো বিস্ময়ে এবং এক অজানা আতঙ্কে বড় বড় হয়ে গেল। সে তোতলামো করে বলল, “ডক্টর… এই ভাষা… এটা কোনো মৃত ভাষা নয়। এই লিপির ভেতরের খাঁজগুলো দেখুন। এগুলো নড়ছে!”

সবাই স্তম্ভিত হয়ে তোরণের দিকে তাকাল। বৃষ্টির জলের প্রবাহের সাথে সাথে পাথরের গায়ে খোদাই করা লিপিগুলো যেন কৃমির মতো কিলবিল করে নিজেদের স্থান পরিবর্তন করছে। এক অদ্ভুত, সুরহীন ফিসফিসানি শব্দ বাতাসে ভাসতে শুরু করল, যা বৃষ্টির শব্দের চেয়েও তীব্র। সেই শব্দ সরাসরি কানের পর্দায় নয়, প্রতিধ্বনিত হতে লাগল তাদের মাথার ভেতরে। এক তীব্র মানসিক হ্যালুসিনেশন সবাইকে গ্রাস করতে লাগল; তাদের মনে হতে লাগল তারা নিজেদের অতীত জীবনের অন্ধকারতম স্মৃতিগুলো চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছে।

সনাতন বুঝতে পারলেন, তাঁরা এক মায়াবী এবং মনস্তাত্ত্বিক ফাঁদে পা দিয়ে ফেলেছেন। এই শহর তাদের অবচেতন মনকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করেছে। কিন্তু ফেরার কোনো পথ নেই। পেছনের পথটা ইতিমধ্যেই কুয়াশা আর বনের লতাগুল্মে এমনভাবে বন্ধ হয়ে গেছে, যেন তারা এক নতুন মহাবিশ্বে প্রবেশ করেছেন।

তিনি পা বাড়ালেন তোরণের ভেতরে। বাকিরা যেন কোনো এক অদৃশ্য মায়াজালে সম্মোহিত হয়ে তাঁর পিছু পিছু চলতে লাগল। তোরণের ভেতর পা রাখামাত্রই একটা শীতল বাতাস তাদের স্পর্শ করল, যা বনের বাইরের ভেজা গরম আবহাওয়ার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। আর ঠিক তখনই, পুরো শহরের বুক থেকে এক দীর্ঘশ্বাস ভেসে এল। মাটির নিচ থেকে আসা সেই গভীর, তীব্র কম্পন এবার আর মৃদু রইল না। পুরো শহরটা যেন একটা বিশাল ফুসফুসের মতো বাতাস টেনে নিল ভেতরে, আর তাদের পায়ের নিচের মাটি এক অদ্ভুত ছন্দে স্পন্দিত হতে শুরু করল। তারা বুঝতে পারল, তারা কোনো পাথরের শহরের ওপর দাঁড়িয়ে নেই; তারা দাঁড়িয়ে আছে এক দানবীয়, জীবন্ত সত্তার হৃৎপিণ্ডের ওপর, যা তাদের আগমনে চঞ্চল হয়ে উঠেছে।

তোরণের ভেতরের অন্ধকারটা যেন বাইরের অন্ধকারের চেয়েও ঘন এবং চটচটে। এখানে বৃষ্টির জল সরাসরি গায়ে পড়ছে না বটে, কিন্তু বাতাসের আর্দ্রতা শরীরকে এক পরম ক্লান্তিতে অবশ করে দিচ্ছে। দেয়াল বেয়ে নেমে আসা জলের রেখাগুলো টর্চের আলোয় দেখাচ্ছিল অবিকল কালো রক্তের মতো। ড. সনাতন মুখার্জি তাঁর কম্পাসটির দিকে তাকালেন; কাঁটাটি এখন পুরোপুরি স্থির হয়ে গেছে, কিন্তু তা কোনো নির্দিষ্ট দিক দেখাচ্ছে না, বরং মাটির দিকে নির্দেশ করে ঝুলে রয়েছে। যেন এই শহরের সমস্ত আকর্ষণ, সমস্ত রহস্য লুকিয়ে আছে ঠিক তাদের পায়ের নিচের ওই অতল গভীরে।

“আমাদের এখান থেকে বের হওয়া দরকার, ডক্টর,” ভাস্করের কণ্ঠস্বরে এখন আর কোনো ভূতত্ত্ববিদের যুক্তি ছিল না, সেখানে কেবলই এক আদিম চিলতে আতঙ্ক। “এই স্পন্দন… এটা স্বাভাবিক নয়। কোনো টেকটোনিক প্লেটের নড়াচড়া এমন ছন্দময় হতে পারে না। এটা… এটা কোনো কিছুর শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়ার মতো।”

“বের হওয়ার পথ কোথায়, ভাস্কর?” তন্বী ফিসফিস করে বলল। সে তোরণের বাইরের দিকে আঙুল তুলল।

সবাই পেছনে তাকিয়ে দেখল, যে তোরণ দিয়ে তারা একটু আগে প্রবেশ করেছে, সেখানে এখন আর কোনো ফাঁকা জায়গা নেই। বিশালাকার কালো পাথরের চাঁইগুলো যেন তরল মোমের মতো গলে গিয়ে একে অপরের সাথে জুড়ে গেছে। আমাজনের সেই আদিম বৃষ্টি এখন আর দেখা যাচ্ছে না, শুধু পাথরের ওপাশ থেকে এক নিরেট, বধির করে দেওয়া জলের গর্জন ভেসে আসছে। মনে হচ্ছে তারা কোনো এক পাতালপুরীর অ্যাকোয়ারিয়ামের ভেতর বন্দি হয়ে পড়েছে, যার কাচটা যেকোনো মুহূর্তে ভেঙে চুরমার হয়ে যেতে পারে।

“আমরা বন্দি,” রিয়াজ তার হাতের ধারালো মাচেতে (জঙ্গলের বড় ছুরি) শক্ত করে ধরল। তার মাংসপেশিগুলো টানটান। সে বহু বছর এই জঙ্গলে কাটিয়েছে, বহু হিংস্র পশুর মুখোমুখি হয়েছে, কিন্তু এমন এক অদৃশ্য শত্রুর সামনে সে নিজেকে বড় অসহায় বোধ করছে। “এই শহর আমাদের শিকার করছে।”

“শিকার নয়, রিয়াজ,” সনাতন শান্ত গলায় বললেন, তবে তাঁর চোখের মণি দুটো অস্বাভাবিকভাবে বড় হয়ে উঠেছিল। “সে আমাদের আমন্ত্রণ জানিয়েছে। হাজার বছর ধরে যে দেবতারা এই মাটির নিচে ঘুমিয়ে আছেন, তারা তাদের নৈবেদ্যর জন্য অপেক্ষা করছিলেন। এই লিপিগুলো দেখো।”

তন্বী তার ক্যামেরাটা অন করার চেষ্টা করল, কিন্তু স্ক্রিনটা শুধু সাদা-কালো ঝিলমিল করে বন্ধ হয়ে গেল। কোনো এক অজানা তরঙ্গ এখানকার সমস্ত ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতিকে নিষ্ক্রিয় করে দিয়েছে। সে বাধ্য হয়ে তার ডায়েরি আর পেনসিল বের করল। তোরণের ভেতরের দেয়ালে খোদাই করা নকশাগুলো বাইরের চেয়েও জটিল। সেখানে মানুষের অবয়ব আঁকা রয়েছে, কিন্তু তাদের প্রত্যেকের মাথা থেকে গাছের ডালপালার মতো কিছু একটা বের হয়ে আকাশের দিকে উঠে গেছে। আর তাদের পায়ের নিচে আঁকা রয়েছে একটা বিশাল বৃত্ত, যার ভেতরে অসংখ্য ছোট ছোট বিন্দু—ঠিক যেন এই অভিযাত্রী দলটার মতোই কিছু মানুষের প্রতীক।

“ডক্টর, এগুলো কোনো সাধারণ লিপি নয়,” তন্বী বলল, তার আঙুলগুলো খাতার ওপর কাঁপছিল। “এটি একটি মনস্তাত্ত্বিক নকশা। আপনি যত সময় এর দিকে তাকিয়ে থাকবেন, এটি আপনার মস্তিষ্কের ভেতরের চিন্তাগুলোকে পরিবর্তন করতে শুরু করবে। আমার… আমার মনে হচ্ছে আমি আমার মায়ের কণ্ঠ শুনতে পাচ্ছি। যিনি দশ বছর আগে মারা গেছেন।”

সবাই স্তব্ধ হয়ে গেল। তন্বীর কথা শেষ হতেই ভাস্কর হঠাৎ এক পা পিছিয়ে গেল। তার চোখ দুটো শূন্যে স্থির। সে বিড়বিড় করতে লাগল, “না… ওটা হতে পারে না। আমি ওটা ফেলে এসেছি। সেই ল্যাবরেটরি… সেই আগুন…”

“ভাস্কর! নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখো!” সনাতন চিৎকার করে উঠলেন। তাঁর চড়া গলা এই পাথরের করিডোরে ধাক্কা খেয়ে শত শত প্রতিধ্বনিতে রূপান্তরিত হলো। মনে হলো পুরো দেওয়ালটা তাদের পরিহাস করে হেসে উঠল।

মাটির নিচের সেই ধকধক শব্দটা এবার আরও স্পষ্ট হলো। এটি আর শুধু পায়ের নিচে নয়, মনে হচ্ছে তাদের বুকের পাঁজরের ভেতরেও একই ছন্দে স্পন্দন তৈরি হচ্ছে। তাদের হৃদপিণ্ড যেন নিজের গতি হারিয়ে এই শহরের আদিম ছন্দের সাথে তাল মেলাতে বাধ্য হচ্ছে। এক তীব্র মানসিক ছটফটানি তাদের গ্রাস করতে লাগল। প্রত্যেকেই এক অদ্ভুত হ্যালুসিনেশনের শিকার হচ্ছিল—চোখের সামনে ভেসে উঠছিল তাদের জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার, অপরাধবোধে ভরা মুহূর্তগুলো।

রিয়াজ হঠাৎ তার ছুরিটা উঁচিয়ে ধপধপ করে করিডোরের ভেতরের দিকে হাঁটতে শুরু করল। “আমি আর এই আলো-আঁধারির খেলা সইতে পারছি না। সামনে যা আছে, আমি তার মুখোমুখি হব।”

“রিয়াজ, থামো! একা যেয়ো না!” সনাতন বারণ করার আগেই রিয়াজ কুয়াশাচ্ছন্ন করিডোরের বাঁকে অদৃশ্য হয়ে গেল।

তার ভারী বুটের শব্দ ধীরে ধীরে মিলিয়ে আসছিল। বাকি তিনজন পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল। এক সেকেন্ড, দুই সেকেন্ড, তিন সেকেন্ড… পুরো করিডোর আবার সেই আদিম, নিস্তব্ধতায় ডুবে গেল। শুধু ওপর থেকে টুপটুপ করে জলের ফোঁটা পড়ার শব্দ।

হঠাৎ করেই অন্ধকার ফুঁড়ে রিয়াজের এক বুকফাটা চিৎকার ভেসে এল। এমন এক আর্তনাদ, যা কোনো মানুষের গলা থেকে বের হওয়া অসম্ভব। সেই চিৎকারের সাথে সাথে চারপাশের দেওয়ালে খোদাই করা লিপিগুলো তীব্র সবুজ আলোয় জ্বলে উঠল। আলোর সেই তীব্রতায় সনাতন, তন্বী আর ভাস্কর চোখ বন্ধ করতে বাধ্য হলো।

চিৎকারটা এক সেকেন্ডের জন্য স্থায়ী হয়েছিল, তারপরই সব শান্ত। কিন্তু সেই নিস্তব্ধতা ছিল আরও বেশি ভীতিপ্রদ।

“রিয়াজ!” ভাস্কর চিৎকার করে দৌড় দিতে চাইল, কিন্তু সনাতন তার হাত শক্ত করে ধরে ফেললেন।

“যেয়ো না, ভাস্কর। ওটা ফাঁদ হতে পারে।”

তারা তিনজন সাবধানে, একে অপরের পিঠ ঠেকিয়ে রিয়াজের যাওয়ার অভিমুখে এগোতে লাগল। টর্চের আলোটা করিডোরের দেয়ালে অদ্ভুত সব ছায়া তৈরি করছিল। কয়েক কদম যাওয়ার পরই তারা দেখতে পেল রিয়াজের টর্চলাইটটি মাটিতে পড়ে আছে, তার আলোটা দেয়ালের এক কোণকে আলোকিত করে রেখেছে।

কিন্তু রিয়াজ সেখানে নেই।

মাটিতে কোনো রক্তের দাগ নেই, ধস্তাধস্তির কোনো চিহ্ন নেই। শুধু তার হাতের সেই ভারী ছুরিটা মাটির পাথরে বিঁধে রয়েছে, যেন কেউ প্রবল শক্তিতে ওটা ওপর থেকে নিচে গেঁথে দিয়েছে। আর যেখানে ছুরিটা বিঁধে আছে, ঠিক তার চারপাশের কালো পাথরটা মানুষের চামড়ার মতো কুঁচকে গেছে এবং সেখান থেকে এক চটচটে, হালকা সবুজ রঙের রস নিঃসৃত হচ্ছে।

তন্বী নিচু হয়ে ছুরিটার হাতল স্পর্শ করতে গেল, কিন্তু সনাতন তাকে বাধা দিলেন। “ছুঁয়ো না! ওটা কোনো পাথর নয়।”

ঠিক তখনই, রিয়াজের ফেলে যাওয়া টর্চের আলো যে দেওয়ালের ওপর পড়েছিল, সেখানে একটা পরিবর্তন লক্ষ্য করল ভাস্কর। সে কাঁপতে কাঁপতে আঙুল দিয়ে দেখাল।

দেয়ালের কালো পাথরের ভেতর থেকে ধীরে ধীরে একটা অবয়ব ফুটে উঠছে। যেন কেউ তরল পাথরের ওপাশ থেকে হাত ঠেলে বাইরে আসার চেষ্টা করছে। অবয়বটির মুখাবয়ব স্পষ্ট হতেই তন্বী নিজের মুখে হাত দিয়ে চিৎকার চেপে ধরল।

পাথরের খোদাই করা সেই নতুন মুখটি আর কারও নয়—সেটি রিয়াজের। তার চোখ দুটো বন্ধ, মুখে এক অবর্ণনীয় যন্ত্রণার অভিব্যক্তি, কিন্তু সবচেয়ে ভীতিপ্রদ বিষয় হলো, পাথরের ভেতরের সেই রিয়াজের ঠোঁট দুটো ধীরে ধীরে নড়ে উঠল। কোনো শব্দ বের হলো না তার মুখ থেকে, কিন্তু তার ঠোঁটের নড়াচড়া এক স্পষ্ট সংকেত দিচ্ছিল, যা সরাসরি তাদের মস্তিষ্কে অনুদিত হয়ে গেল: ‘ওরা আমাদের চেনে। ওরা আমাদের ভেতরেই আছে।’

পরের মুহূর্তেই, পুরো করিডোরের আলো একযোগে নিভে গেল এবং তাদের পায়ের নিচের মাটি এক প্রবল ঝাকুনিতে ওপরের দিকে উঠতে শুরু করল, যেন কোনো বিশাল রাক্ষস তার পিঠটা সোজা করে দাঁড়াচ্ছে।

অন্ধকার যখন চারপাশকে গ্রাস করে, তখন মানুষের পঞ্চেন্দ্রিয় নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। কিন্তু এই অন্ধকার সাধারণ ছিল না। এটি ছিল এক ঘন, ভারী নিস্তব্ধতার চাদর, যা নাসারন্ধ্র দিয়ে ঢুকে ফুসফুসকে অবশ করে দিতে চায়। ড. সনাতন মুখার্জি টের পেলেন তাঁর পায়ের নিচের মেঝেটি তীব্র গতিতে ওপরের দিকে উঠছে না, বরং চারপাশের দেওয়ালগুলো ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আসছে। এটি কোনো ভৌগোলিক ওলটপালট নয়, এ এক মনস্তাত্ত্বিক চক্রব্যূহ।

“ডক্টর! আমার হাত ধরুন!” তন্বীর কণ্ঠস্বর বহুদূর থেকে ভেসে আসা কোনো প্রতিধ্বনির মতো শোনাল।

সনাতন অন্ধকারে হাতড়াতে হাতড়াতে একটা বরফশীতল হাত চেপে ধরলেন। কিন্তু হাতটা স্পর্শ করতেই তাঁর শিরদাঁড়া বেয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল। চামড়াটা মানুষের মতো মসৃণ নয়, বরং খসখসে, গাছের ছালের মতো শুষ্ক এবং তার নিচে কোনো ধমনীর রক্তপ্রবাহ নেই, আছে এক অদ্ভুত আঠালো তরলের মন্থর চলন। তিনি চমকে হাতটা ছেড়ে দিতে চাইলেন, কিন্তু সেই হাত তাঁকে আরও শক্ত করে চেপে ধরল।

“কোথায় যাচ্ছো, সনাতন? তুমি তো আমাকে এখানেই ফেলে গিয়েছিলে…” অন্ধকারের ভেতর থেকে একটা চেনা, অতিপরিচিত কণ্ঠস্বর ভেসে এল।

সনাতনের বুকের ভেতরটা খাঁ খাঁ করে উঠল। এই কণ্ঠস্বর সুমিত্রার—তাঁর স্ত্রী, যে আজ থেকে পনেরো বছর আগে এক পথদুর্ঘটনায় মারা গিয়েছিল। যে দুর্ঘটনার জন্য সনাতন আজ অবদি নিজেকে ক্ষমা করতে পারেননি। তাঁর চোখের সামনে হ্যালুসিনেশনের চাদরটি আরও গাঢ় হলো। পিচঢালা অন্ধকার করিডোরটি মুহূর্তের মধ্যে রূপ নিল এক বৃষ্টিভেজা শহরের রাস্তায়। চারপাশ থেকে গাড়ির হর্নের শব্দ, ব্রেকের তীব্র ক্যাঁচক্যাঁচ আওয়াজ আর রক্তের লাল আভা তাঁর মগজকে কামড়ে ধরল।

“না, এটা সত্যি নয়! এটা বিভ্রম!” সনাতন নিজের মাথায় হাত দিয়ে চিৎকার করে উঠলেন।

ঠিক তখনই একটা তীব্র আলো অন্ধকারের বুক চিরে জ্বলে উঠল। ভাস্কর তার পকেট থেকে একটা পুরনো দেশলাই বাক্স বের করে একটা কাঠি জ্বেলেছে। সেই সামান্য একটু হলদেটে আলোয় চারপাশের মায়াজাল মুহূর্তের মধ্যে কেটে গেল। সনাতন দেখলেন, তিনি যার হাত ধরেছিলেন, তা কোনো সুমিত্রা বা তন্বী নয়—সেটি দেওয়াল থেকে বেরিয়ে আসা একটি বিশালাকার শিকড়, যা দেখতে হুবহু মানুষের হাতের মতো। আর তন্বী একটু দূরে মাটির ওপর হাঁটু গেড়ে বসে নিজের দুহাতে মুখ ঢেকে কাঁদছে।

“ডক্টর, আমরা হ্যালুসিনেট করছি,” ভাস্করের গলা কাঁপছিল, দেশলাইয়ের কাঠিটা তার আঙুলের ডগায় এসে নিভে গেল। সে দ্রুত আরেকটি কাঠি জ্বালল। “বাতাসে কোনো গ্যাস আছে, কিংবা এই দেওয়ালের শ্যাওলাগুলো কোনো নিউরোটক্সিন ছড়াচ্ছে। আমাদের মগজ আমাদের নিজেদের ভয়গুলোকে আমাদের সামনে দৃশ্যমান করে তুলছে।”

“শুধু নিউরোটক্সিন নয়, ভাস্কর,” সনাতন নিজের চশমাটা ঠিক করতে করতে বললেন, তাঁর কণ্ঠস্বর এখন স্বাভাবিকের চেয়েও ধীর। “এই শহর আমাদের মনের গভীরতম ক্ষতগুলোকে চেনে। এটি আমাদের অবচেতন মনের সাথে সংযোগ স্থাপন করেছে। রিয়াজ তার ভয়ের কাছে হেরে গেছে, তাই এই দেওয়াল তাকে শুষে নিয়েছে।”

“তাহলে আমাদের কী হবে?” তন্বী মুখ তুলল। তার চোখ দুটো লাল হয়ে গেছে। “আমি দেখছিলাম আমার ছোটবেলার সেই ঘরটা… যেখানে আগুন লেগেছিল। আমি স্পষ্ট পোড়া গন্ধ পাচ্ছিলাম, ডক্টর।”

“আমাদের নিজেদের আবেগগুলোকে অবশ করে ফেলতে হবে,” সনাতন দৃঢ় কণ্ঠে বললেন। “ভয়, অপরাধবোধ, দুঃখ—এই শহর ঠিক এই অনুভূতিগুলোকেই জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করছে। আমাদের পুরোপুরি যুক্তি দিয়ে ভাবতে হবে।”

ভাস্করের হাতের দ্বিতীয় দেশলাই কাঠিটাও নিভে গেল। কিন্তু এবার আর সম্পূর্ণ অন্ধকার নেমে এল না। করিডোরের শেষ প্রান্তে, যেখানে পথটা বাঁক নিয়েছে, সেখান থেকে একটা মৃদু নীলচে আলো বিচ্ছুরিত হচ্ছে। সেই আলো কোনো স্থির উৎস থেকে আসছে না, তা যেন তরঙ্গের মতো কাঁপছে। আলোর সাথে সাথে এক অদ্ভুত সুমিষ্ট সুবাস ভেসে এল, যা এই বনের পচা পাতার গন্ধকে এক নিমেষে উধাও করে দিল। এই সুবাস এতটাই সম্মোহনী যে, চাইলেও কেউ তার আকর্ষণ এড়াতে পারবে না।

তিনজন অবশ পায়ের পাতায় সেই আলোর অভিমুখে হাঁটতে শুরু করল। প্রতিটি পদক্ষেপের সাথে সাথে মাটির নিচের সেই ধকধক শব্দটা আরও তীব্র হচ্ছিল। তবে এবার সেই শব্দে কোনো হিংস্রতা ছিল না, ছিল এক অদ্ভুত একাত্মতা। মনে হচ্ছিল যেন তারা নিজেদের মায়ের হৃদস্পন্দনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

বাঁকটা পার হতেই তারা এক বিশাল খোলা চত্বরে এসে পৌঁছাল। চারিদিকের দৃশ্য দেখে তাদের মুখের কথা হারিয়ে গেল। এটি কোনো গুহা বা করিডোর নয়, এটি একটি আস্ত পাতাল নগরী। মাথার ওপরে কোনো পাথরের ছাদ নেই, আছে এক অবর্ণনীয় কুয়াশার স্তর যা নীলচে আলোয় জ্বলছে। আর সেই আলোর নিচে দাঁড়িয়ে আছে শত শত কাচের মতো স্বচ্ছ স্তম্ভ। প্রতিটি স্তম্ভের ভেতরে জ্বলছে একটা করে জীবন্ত হৃৎপিণ্ড, যা থেকে অসংখ্য লতা আর শিকড় বেরিয়ে মাটির নিচে চলে গেছে।

আর সেই চত্বরের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে এক অলৌকিক অবয়ব। লম্বায় প্রায় দশ ফুট, শরীরটা লতা আর নিখুঁত কালো পাথরের মিশ্রণে তৈরি। তার কোনো চোখ বা মুখ নেই, কিন্তু তার বুকের ঠিক মাঝখানে একটা বিশাল সবুজ স্ফটিক জ্বলছে, যা থেকে পুরো শহরের আলো আর স্পন্দন নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে।

“স্বাগতম,” কোনো শব্দ ছাড়াই এক গম্ভীর, রাজকীয় কণ্ঠস্বর তাদের তিনজনের মাথার ভেতরে প্রতিধ্বনিত হয়ে উঠল। সেই আওয়াজ এত শক্তিশালী ছিল যে ভাস্করের হাত থেকে দেশলাইয়ের বাক্সটা মাটিতে পড়ে গেল।

তন্বী সম্মোহিতের মতো এক পা এগিয়ে গেল, “তুমি… তুমি কে? এই শহরটা কী?”

“আমরাই এই অরণ্য। আমরাই এই পৃথিবী। তোমরা যাকে ইতিহাস বলো, আমরা তার চেয়েও প্রাচীন,” মাথার ভেতরের সেই কণ্ঠস্বর উত্তর দিল। “তোমরা এখানে এসেছো এক মৃত শহরের খোঁজে। কিন্তু যা জীবিত, তাকে তোমরা মৃত ভাবলে কীভাবে? তোমাদের প্রজাতি কেবল ধ্বংস করতে জানে, আর আমরা সংরক্ষণ করি।”

“রিয়াজ কোথায়?” সনাতন সোজা হয়ে দাঁড়ালেন, তাঁর মনের ভেতরের সমস্ত ভয়কে একপাশে সরিয়ে রেখে তিনি তাঁর বৈজ্ঞানিক সত্তাটাকে জাগ্রত করলেন।

“সে এখন আমাদের অংশ। তার ক্ষোভ, তার ভয় আমাদের শক্তি জোগাচ্ছে। ঠিক যেভাবে তোমরা তিনজন দেবে,” অবয়বের বুকের সবুজ স্ফটিকটি আরও তীব্রভাবে জ্বলে উঠল।

হঠাৎ করেই, তন্বী আর ভাস্করের চোখ দুটো সম্পূর্ণ শূন্য হয়ে গেল। তারা সনাতনের দিকে তাকাল, কিন্তু সেই চোখে কোনো চেনা মানুষের দৃষ্টি ছিল না। তারা যান্ত্রিকভাবে সনাতনের দিকে এগোতে লাগল, তাদের হাত দুটো শিকারি পশুর মতো বাঁকা হয়ে উঠছে। সনাতন বুঝতে পারলেন, এই আদিম সত্তাটি তাঁর দলের সদস্যদের সম্পূর্ণ নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিয়েছে।

ঠিক তখনই, চত্বরের ওপরের সেই নীল কুয়াশা ভেদ করে আবার এক প্রবল বৃষ্টি নামল। কিন্তু এই বৃষ্টি জল নয়—এটি ছিল এক চটচটে, উষ্ণ তরল, যা গায়ের চামড়ায় লাগামাত্রই তা অবশ হয়ে যেতে শুরু করল। সনাতন পেছাতে চাইলেন, কিন্তু তাঁর পা দুটো ততক্ষণে মাটির লতার সাথে মিশে যেতে শুরু করেছে।

পর্ব ১ সমাপ্ত

আপনার মন্তব্য জানান।

Your email address will not be published. Required fields are marked *

0% | 0মি 0সে
Scroll to Top