রাত ৩:১৩ এর অতিথি – পর্ব ১

হালকা তুষারপাতের শব্দও যে এতটা বধির করে দিতে পারে, তা ওতাকির পাহাড়ে না এলে বোধহয় কখনো জানা হতো না।

জানালা গলে যে কুয়াশাটা ঘরের মেঝেতে এসে লেপ্টে আছে, তার রঙ একদম মৃত মানুষের চোখের মণির মতো ঘোলাটে। এখানে শীত কেবল চামড়া ফালাফালা করে না, সে মগজের ভেতরে ঢুকে একটা একটা করে স্মৃতিকে জমিয়ে বরফ করে দেয়।

সায়োনি কাঠের চেয়ারটায় হাতল আঁকড়ে বসে ছিল।

তার নিঃশ্বাসের গরম বাতাস ঘরের কনকনে ঠান্ডায় সাদা ধোঁয়ার মতো কুণ্ডলী পাকিয়ে সিলিংয়ের দিকে উঠে মিলিয়ে যাচ্ছে। দেওয়ালঘড়ির পেন্ডুলামটা ডানে-বামে দুলছে, কিন্তু তার টিক-টিক শব্দটা যেন ঘরের দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে আরও ভারী, আরও কর্কশ হয়ে ফিরে আসছে। রাত ৩:০৫। আর মাত্র আট মিনিট।

এই জাপানি কাঠের বাংলোটা সায়োনির পূর্বপুরুষদের নয়। এটা সে কিনেছিল নিজের অতীত থেকে পালাতে। ওতাকির এই নির্জন পাহাড়ি উপত্যকায় শীতকালে কোনো জীবন্ত প্রাণী চট করে পা বাড়ায় না।

চারপাশটা যেন একটা জীবন্ত কবরস্থান, যার কাফনটা নিখাদ সাদা তুষারের তৈরি। সায়োনি ভেবেছিল, এই নিস্তব্ধতা তার মাথার ভেতরের চিৎকারগুলোকে শান্ত করবে। কিন্তু সে ভুল ছিল। নিস্তব্ধতা আসলে কোনো শূন্যতা নয়; এটা এক ধরণের উচ্চ কম্পাঙ্কের শব্দ, যা মানুষের কান সইতে পারে না।

৩:১০।

সায়োনির হাতের তালু ঘেমে উঠছে। এই হাড়কাঁপানো শীতেও তার কপালের পাশ বেয়ে এক ফোঁটা ঠাণ্ডা ঘাম নেমে এলো। সে চোখ বন্ধ করল। চোখ বন্ধ করলেই সে দেখতে পায় সেই পুরোনো ল্যাবরেটরি, ভাঙা কাচের টুকরো আর মেঝেময় ছড়িয়ে থাকা কালচে রক্ত। সে মাথাটা জোরে ঝাঁকালো।

অতীত একটা ক্ষুধার্ত পশুর মতো, তাকে যতবার তাড়িয়ে দেওয়া হয়, সে ততবার আরও ধারালো নখ নিয়ে ফিরে আসে।

৩:১২।

সায়োনি তার ডান হাতের আঙুলগুলো গুনতে শুরু করল। এক, দুই, তিন… তার বুকের ধড়ফড়ানি এখন ঘড়ির কাটার চেয়েও দ্রুত চলছে। সারা বাড়িটা কেমন যেন থমথম করছে। ঘরের কোণের বাতিটা মৃদু কাঁপছে, ভোল্টেজ নেমে যাওয়ার মতো। বাতাসে হঠাৎ করেই পাইন কাঠের পোড়া গন্ধের সাথে মিশে যাওয়া একটা চেনা সুবাস পাওয়া গেল। একটা খুব চেনা, অথচ মৃত সুবাস।

৩:১৩।

ঠিক এই মুহূর্তে, কোনো ভুল নেই, একদম নিখুঁত ৩:১৩ মিনিটে সদর দরজায় ভারী কাঠের ওপর তিনটে টোকা পড়ল।

ঠক। ঠক। ঠক।

শব্দটা এত ধীর অথচ এত গভীর যে সায়োনির মনে হলো হাতুড়িটা তার দরজায় নয়, সরাসরি তার করোটির ভেতরে এসে আঘাত করেছে। সে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তার পা দুটো কাঁপছে না, কিন্তু শরীরটা কেমন যেন অসাড় হয়ে আসছে। সে দরজার দিকে পা বাড়াল। প্রতিটি পদক্ষেপে কাঠের মেঝেটা আর্তনাদ করে উঠছে।

সায়োনি দরজার হাতলে হাত রাখল। ব্রোঞ্জের হাতলটা বরফের মতো ঠান্ডা। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে এক ঝটকায় দরজাটা খুলে ফেলল।

বাইরে শুধু কুয়াশার অন্তহীন সমুদ্র। ধূসর, নিরেট এক প্রাচীর। পাহাড়ি বাতাস একটা ধারালো ছুরির মতো সায়োনির গালে এসে বিঁধল। লণ্ঠনের আলোয় যতটুকু দেখা যায়, বারান্দায় কেউ নেই। কোনো পায়ের ছাপ নেই, তুষারের ওপর কোনো দাগ নেই। কিন্তু সায়োনি জানে, কেউ একজন এসেছিল। অথবা… কেউ একজন এখনো আছে।

সে দরজাটা বন্ধ করে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ঘরটা আগের মতোই আছে। কিন্তু সায়োনির ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় তীব্র চিৎকার করে উঠল। ঘরের ভেতরের বাতাসটা বদলে গেছে। চেনা আসবাবপত্রগুলো যেন এক ইঞ্চি করে সরে গেছে তাদের জায়গা থেকে। ঘরের কোণে রাখা বুকশেলফের দিকে তাকাতেই সায়োনির হৃৎপিণ্ডটা এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল।

সেখানে, হোনশু দ্বীপের প্রাচীন লোকগাথার বইটার পাশে একটা ছোট, কালচে কাচের শিশি রাখা আছে। সায়োনি নিশ্চিত, এই শিশিটা আজ সন্ধ্যায় সেখানে ছিল না। সে কাঁপতে কাঁপতে শিশিটার দিকে এগিয়ে গেল। শিশির ভেতরে একটা নীল রঙের তরল ধীরগতিতে ফুটছে, যেন ওটার নিজস্ব একটা প্রাণ আছে। সায়োনি যেই হাত বাড়িয়ে শিশিটা ছুঁতে যাবে, ঠিক তখনই তার কানের একদম কাছে, ঘাড়ের ওপর একটা অতি পরিচিত ঠান্ডা নিঃশ্বাস আছড়ে পড়ল, আর একটা ফিসফিসানি ভেসে এলো—”তুমি কি সত্যিই ভেবেছিলে আমি মারা গেছি?”

সায়োনি ঝট করে পেছনে ফিরল, কিন্তু সেখানে কেউ ছিল না। শুধু ঘরের দেওয়ালঘড়িটা বিকট শব্দে ৩:১৪ মিনিটে পা দিল, আর ঘরের বাতিটা সম্পূর্ণ নিভে গিয়ে তাকে এক অনন্ত, কুৎসিত অন্ধকারে নিমজ্জিত করল।

অন্ধকার মানুষের চোখ দুটো কেড়ে নেয় ঠিকই, কিন্তু শ্রবণেন্দ্রিয়কে করে তোলে সাপের মতো সংবেদনশীল।

সায়োনি এক চুলও নড়ল না। তার পিঠের মেরুদণ্ড বেয়ে এক বালতি বরফ-ঠাণ্ডা জল নেমে যাওয়ার মতো অনুভূতি হচ্ছে। হাত বাড়িয়ে সে দেওয়ালের লাইট সুইচটা খোঁজার চেষ্টা করল। তার চেনা দেওয়ালটা যেন এই এক মিনিটে আরও মসৃণ, আরও অচেনা হয়ে গেছে। কয়েকবার চেষ্টার পর যখন সে সুইচটা খুঁজে পেল এবং নিচে চাপ দিল, ঘরটা আবার আলোয় ভেসে উঠল। কিন্তু সেই আলো আগের মতো স্বাভাবিক ছিল না; লণ্ঠনের হলদেটে আভাটা কেমন যেন ফ্যাকাশে, একটা রুগ্ন মানুষের চামড়ার মতো দেখাচ্ছে।

সায়োনি দ্রুত বুকশেলফের দিকে তাকাল। কালচে কাচের সেই রহস্যময় শিশিটা এখনো সেখানেই আছে। ভেতরের নীল তরলটা এখন স্থির, কিন্তু ওটার রঙ যেন আরও গাঢ় হয়েছে। সে তার কাঁপতে থাকা হাতটা বাড়িয়ে শিশিটা তুলে নিল। কাচটা এতটাই ঠাণ্ডা যে সায়োনির আঙুলের চামড়া অবশ হয়ে যাওয়ার জোগাড় হলো। ওটার গায়ে কোনো লেবেল নেই, শুধু নিচের দিকে একটা ছোট ল্যাটিন হরফে খোদাই করা—‘Mors’। মৃত্যু।

“বিভ্রম,” সায়োনি নিজের অজান্তেই বিড়বিড় করে উঠল। “এসবই আমার মগজের রাসায়নিক রাসায়নিক খেলা। অতিমাত্রায় নির্জনতা আর অপরাধবোধ মিলে এই হ্যালুসিনেশন তৈরি করছে।”

সে ল্যাবরেটরির একজন প্রথম সারির নিউরোসার্জন ছিল। মগজের কোন অংশটা উদ্দীপিত হলে মানুষ ভূত দেখে, কোন নিউরোট্রান্সমিটারের ঘাটতি হলে বাতাসে মরা মানুষের গন্ধ পাওয়া যায়—সব তার নখদর্পণে। কিন্তু নিজের এই জ্ঞানটাই এখন তার সবচেয়ে বড় শত্রু হয়ে দাঁড়িয়েছে। যখন বিজ্ঞান নিজেই নিজের ফাঁদে পড়ে, তখন যুক্তিগুলো একেকটা ধারালো অস্ত্রের মতো নিজেকেই কাটতে শুরু করে।

সে শিশিটা পকেটে পুরে জানালার দিকে এগিয়ে গেল। ওতাকির পাহাড়ি অঞ্চলের কুয়াশা এখন আরও ঘন হয়েছে, যেন একটা বিশাল অজগর সাপ পুরো বাংলোটাকে নিজের শরীরে পেঁচিয়ে ধরেছে। বাইরে বাতাসের একটানা শোঁ-শোঁ শব্দ হচ্ছে, যা মাঝে মাঝে দূর থেকে ভেসে আসা কোনো কান্নার মতো শোনায়। সায়োনি জানালার কাচে নিজের প্রতিবিম্ব দেখতে পেল। তার চোখ দুটোর নিচে কালচে দাগ, মুখটা অস্বাভাবিক শুকিয়ে গেছে। কিন্তু প্রতিবিম্বটার পেছনে, ঠিক তার কাঁধের ওপর…

সে ঝট করে ঘুরে তাকাল। কেউ নেই।

কিন্তু ঘরের মেঝেতে বিছানো তুষার-ধূসর কার্পেটটার দিকে তাকাতেই সায়োনির চোখ দুটো স্থির হয়ে গেল। দরজার গোড়া থেকে শুরু করে ঘরের ভেতরের দিকে চলে এসেছে একজোড়া ভেজা পায়ের ছাপ। জুতো পরা পায়ের ছাপ নয়, সম্পূর্ণ খালি পায়ের দাগ। তুষার গলে যাওয়া জলের সেই ছাপগুলো ডাইনিং টেবিল পার হয়ে সোজা চলে গেছে তার শোবার ঘরের দরজার দিকে।

সায়োনির মনে হলো তার বুকের ভেতর একটা বড় পাথর চেপে বসেছে। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। যদি এটা শুধুই তার মনের ভুল হতো, তবে কার্পেটের এই ভেজা দাগগুলো কোত্থেকে এলো? জড় বস্তু তো আর মনস্তাত্ত্বিক হ্যালুসিনেশনের অংশ হতে পারে না।

সে শোবার ঘরের দিকে পা বাড়াল। প্রতিটি পায়ের ছাপের দূরত্ব নিখুঁত, যেন কেউ খুব ধীর পায়ে, অত্যন্ত শান্ত মাথায় হেঁটে ভেতরে গেছে। সায়োনি পকেট থেকে একটা ছোট স্ক্যালপেল (অস্ত্রোপচারের ছুরি) বের করল। ওতাকির এই বাংলোতে আসার সময় সে নিজের নিরাপত্তার জন্য মাত্র অল্প কিছু জিনিস এনেছিল, যার মধ্যে এই পুরোনো ছুরিটা অন্যতম। ছুরির ফলার ওপর ঘরের ফ্যাকাশে আলো প্রতিফলিত হয়ে একটা রুপোলি রেখা তৈরি করল।

শোবার ঘরের দরজাটা আধখোলা ছিল। ভেতরের অন্ধকারটা বাইরের লিভিং রুমের চেয়েও অনেক বেশি ঘন। সায়োনি দরজার পাল্লায় হাত দিয়ে আলতো করে ধাক্কা দিল। একটা মৃদু ক্যাঁচক্যাচ শব্দ করে দরজাটা পুরোপুরি খুলে গেল।

ভেতরে কোনো মানুষ নেই। বিছানার চাদরটা নিখুঁতভাবে পাতা, যেভাবে সে বিকেলে গুছিয়ে রেখেছিল। কিন্তু ঘরের জানালার ভারী পর্দাটা বাতাসে মৃদু দুলছে। জানালাটা খোলা!

সায়োনি দ্রুত জানালার কাছে গেল। এই কনকনে ঠাণ্ডায় জানালা খুলে দেওয়া মানে ঘরের ভেতরের তাপমাত্রা মুহূর্তের মধ্যে হিমাঙ্কের নিচে নামিয়ে আনা। সে নিচে তাকাল। জানালার ঠিক বাইরে, বরফের ওপর স্পষ্ট একটা চিহ্ন। কেউ একজন এই জানালা দিয়ে ঘরের ভেতরে ঢুকেছিল এবং ৩:১৩ মিনিটে সদর দরজায় কড়া নেড়ে আবার এই পথেই বেরিয়ে গেছে।

কিন্তু এটা কীভাবে সম্ভব? সদর দরজা থেকে এই জানালার দূরত্ব অন্তত বিশ ফুট উঁচু এবং নিচে রয়েছে খাড়া পাথুরে ঢাল। কোনো সাধারণ মানুষের পক্ষে দড়ি বা মই ছাড়া এখানে পৌঁছানো অসম্ভব। আর যদি কেউ দড়ি ব্যবহার করত, তবে বরফের ওপর তার দাগ থাকত। কিন্তু সেখানে নিখাদ, অক্ষত তুষার ছাড়া আর কিচ্ছু নেই।

সায়োনি জানালাটা বন্ধ করতে যাবে, এমন সময় তার চোখ পড়ল বিছানার ঠিক মাঝখানে। বালিশের ওপর একটা সাদা কাগজের টুকরো পড়ে আছে।

তার হাত কাঁপছিল। সে কাগজের টুকরোটা তুলে নিল। কাগজের ওপর লাল কালিতে একটা অদ্ভুত জ্যামিতিক নকশা আঁকা, যার ঠিক নিচে বাংলায় গোটা গোটা অক্ষরে লেখা—

‘তুমি যে বৃত্তটা ভেঙেছিলে, সায়োনি, সেটা আবার জুড়তে শুরু করেছে। আগামীকালের ৩:১৩ মিনিটের জন্য প্রস্তুত থেকো।’

চিঠির হাতের লেখাটা দেখে সায়োনির হাতের স্ক্যালপেলটা মেঝেতে খসে পড়ল। এই হাতের লেখা সে হাজার বার দেখেছে। এই বাঁকা হরফ, এই লেখার ধরন… এটা হিরোশির হাতের লেখা! হিরোশি, যাকে সায়োনি নিজ হাতে তিন বছর আগে টোকিওর সেই গোপন ল্যাবরেটরিতে মৃত ঘোষণা করেছিল। যার ডেথ সার্টিফিকেটে সায়োনি নিজে স্বাক্ষর করেছিল।

সায়োনি দুই হাতে নিজের মাথাটা চেপে ধরে মেঝেতে বসে পড়ল। ঘরটা যেন বনবন করে ঘুরছে। তুষারের শোঁ-শোঁ শব্দটা এখন তার কানের ভেতরে ঢুকে একটা বিকট হাসিতে রূপ নিয়েছে। যদি হিরোশি বেঁচে থাকে, তবে সেই কফিনের ভেতরের শরীরটা কার ছিল? আর যদি সে মারা গিয়ে থাকে, তবে এই চিঠি কে লিখল?

হঠাৎ করেই লিভিং রুমের সেই দেওয়ালঘড়িটা আবার অদ্ভুতভাবে বেজে উঠল। কিন্তু এবার সেটা কোনো স্বাভাবিক সময় নির্দেশ করছিল না। ঘড়ির ভেতরের পেন্ডুলামটা এক জায়গায় আটকে গেছে, আর কাটা দুটো পিছনের দিকে ঘুরতে শুরু করেছে। তীব্র বেগে উল্টো ঘুরছে সময়। সায়োনি তাকিয়ে দেখল, ঘরের দেওয়ালের রঙগুলো ধীরে ধীরে গলে তরল হয়ে নিচে গড়িয়ে পড়ছে, যেন পুরো বাংলোটা একটা জলছাপের মতো মিলিয়ে যাচ্ছে।

সে চিৎকার করতে চাইল, কিন্তু তার গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না। অন্ধকারের এক বিশাল হাত যেন তার মুখটা চেপে ধরল। আর সেই অন্ধকারের গভীর থেকে একটা চেনা কণ্ঠস্বর ফিসফিসিয়ে বলল, “বাস্তবতা একটা চমৎকার পর্দা, সায়োনি। কিন্তু ওটার পেছনে যা থাকে, তা তুমি সহ্য করতে পারবে না।”

ভোর হওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তটা পৃথিবীতে সবচেয়ে নিষ্ঠুর। তখন চারপাশের অন্ধকার সম্পূর্ণ কালো থাকে না, বরং একটা কুৎসিত ছাই রঙ ধারণ করে।

সায়োনি যখন চোখ খুলল, তখন সকালের সেই মলিন আলো জানালার কাচ ভেদ করে তার মুখের ওপর এসে পড়েছে। সে নিজেকে আবিষ্কার করল শোবার ঘরের কাঠের মেঝেতে। সারা শরীর পাথরের মতো শক্ত আর ঠাণ্ডা হয়ে আছে। ঘাড়ের পেশিগুলো ব্যথায় টনটন করছে। সে ধীর পায়ে উঠে দাঁড়াল, মনের ভেতরের কুয়াশাটা বাইরের ওতাকির পাহাড়ের চেয়েও কোনো অংশে কম ঘন নয়।

“সব কি তবে একটা দুঃস্বপ্ন ছিল?” সায়োনি নিজের অবিন্যস্ত চুলগুলো হাত দিয়ে ঠিক করতে করতে বিড়বিড় করল।

কিন্তু মেঝেতে তাকাতেই তার সেই আশাটুকু তুষারের মতোই গলে গেল। তার পায়ের কাছেই পড়ে আছে রূপোলি স্ক্যালপেলটা। আর বিছানার ওপর সেই সাদা কাগজের টুকরো, যার লাল কালির লেখাগুলো ভোরের আলোয় আরও বেশি রক্তের মতো দেখাচ্ছে। সায়োনি পকেটে হাত দিল। কালচে কাচের সেই রাসায়নিকের শিশিটাও যথাস্থানে বিদ্যমান।

তার মানে, গতরাতের কোনো কিছুই বিভ্রম ছিল না। সবকিছুই বাস্তব। কিন্তু এই বাস্তবতার সমীকরণটা বিজ্ঞানের কোনো সূত্রে মিলছে না।

সে লিভিং রুমে ফিরে এলো। ঘরের আসবাবপত্রগুলো এখন একদম স্বাভাবিক জায়গায় আছে। মেঝেতে সেই ভেজা খালি পায়ের ছাপগুলোর কোনো অস্তিত্ব নেই, যেন কার্পেটটা নিজেই শুষে নিয়েছে সেই রহস্য। সায়োনি কিচেনে গিয়ে কড়া করে এক মগ ব্ল্যাক কফি তৈরি করল। গরম মগের উত্তাপটা তার হাতের তালুর জড়তা কিছুটা কাটাল, কিন্তু মগজের ভেতরের ঝড়টা শান্ত করতে পারল না।

তাকে তিন বছর আগের সেই দিনটায় ফিরে যেতেই হবে। মনের স্মৃতিশালা থেকে ধুলোবালি ঝেড়ে বের করতে হবে সত্যটাকে।

টোকিওর সেই আন্ডারগ্রাউন্ড ল্যাবরেটরি, ‘প্রজেক্ট অ্যানাইমা’। সায়োনি এবং হিরোশি—দুজনে মিলে মানুষের মস্তিষ্কের ক্লিয়ারিং মেকানিজম নিয়ে কাজ করছিল। সহজ ভাষায়, মানুষের মন থেকে কোনো নির্দিষ্ট ভয়ঙ্কর বা যন্ত্রণাদায়ক স্মৃতিকে পার্মানেন্টলি মুছে ফেলার এক গোপন রাসায়নিক ফর্মুলা। হিরোশি ছিল অসম্ভব প্রতিভাবান, কিন্তু তার ভেতরে একটা আত্মঘাতী জেদ ছিল। সে নিজের তৈরি ড্রাগটা নিজের ওপরই প্রয়োগ করতে চেয়েছিল। সায়োনি বারবার বারণ করা সত্ত্বেও হিরোশি শোনেনি।

সেদিনের সেই শেষ রাতটার কথা মনে পড়লে সায়োনির এখনো বমি ভাব আসে। ল্যাবরেটরির কাচের চেম্বারে হিরোশি শুয়ে ছিল। তার মাথায় ইলেকট্রোড লাগানো। নীল রঙের সেই তরলটা যখন হিরোশির শিরায় প্রবেশ করানো হলো, প্রথম কয়েক সেকেন্ড সব ঠিক ছিল। তারপরই শুরু হলো সেই নারকীয় কাণ্ড। হিরোশির চোখ দুটো উল্টে গেল, মুখ দিয়ে ফেনা বের হতে লাগল, আর হৃদস্পন্দন মাপার মনিটরটা এক দীর্ঘ, একটানা তীক্ষ্ণ শব্দে থমকে গেল।

সায়োনি নিজে হিরোশির নাড়ি পরীক্ষা করেছিল। কোনো স্পন্দন ছিল না। সে নিজে তার চোখের মণি পরীক্ষা করে ডেথ সার্টিফিকেট তৈরি করেছিল। ল্যাবরেটরির নিয়ম অনুযায়ী, সেই রাতেই লাশটি একটি বিশেষ চুল্লিতে ভস্মীভূত করার কথা ছিল। সায়োনি সেই শেষ প্রক্রিয়াটা আর নিজের চোখে দেখতে পারেনি; অপরাধবোধ আর ভয়ে সে টোকিও ছেড়ে এই প্রত্যন্ত পাহাড়ে পালিয়ে এসেছিল।

“কিন্তু লাশটা যদি পোড়ানোই না হয়ে থাকে?” সায়োনি কফির মগে একটা বড় চুমুক দিয়ে ভাবল। “হিরোশি কি তবে কোনোভাবে বেঁচে গিয়েছিল? কিন্তু হৃদস্পন্দন এবং মস্তিষ্কের তরঙ্গ সম্পূর্ণ শূন্য হওয়ার পর কোনো মানুষ কীভাবে জীবিত ফিরতে পারে?”

ভাবতে ভাবতে সায়োনি বাংলোর বাইরের বারান্দায় এসে দাঁড়াল। তুষারপাত বন্ধ হয়েছে, কিন্তু চারপাশের বাতাস এত ঠাণ্ডা যে নিঃশ্বাস নিলে ফুসফুসটা যেন জমে যায়। ঠিক তখনই দূর থেকে একটা অবয়ব কুয়াশা ফুঁড়ে বাংলোর দিকে এগিয়ে আসতে দেখা গেল।

সায়োনি সতর্ক হয়ে দাঁড়াল, তার হাতটা অজান্তেই পকেটের স্ক্যালপেলের হাতলটা ছুঁয়ে গেল।

অবয়বটা স্পষ্ট হতেই সায়োনি কিছুটা স্বস্তি পেল, যদিও তার ভেতরের উত্তেজনা কমল না। লোকটা কেনজি—এই পাহাড়ি অঞ্চলের একমাত্র ডাকপিয়ন এবং সায়োনির এই নিঃসঙ্গ জীবনের একমাত্র বাইরের যোগাযোগ। কেনজির পরনে ভারী পশমি কোট, মাথায় টুপি আর পিঠে একটা চামড়ার ব্যাগ। তার দাড়ি-গোঁফে বরফ জমে সাদা হয়ে আছে।

“শুভ সকাল, ডক্টর ওতাকি,” কেনজি বারান্দার সিঁড়িতে উঠে এসে জাপানি কায়দায় মাথা নিচু করল।

“শুভ সকাল, কেনজি। এই তীব্র ঠাণ্ডায় পাহাড়ে ওঠা তো বেশ ঝুঁকিপূর্ণ,” সায়োনি শান্ত গলায় বলল, যদিও তার চোখ কেনজির হাতের ব্যাগের দিকে।

“তা ঠিক। কিন্তু টোকিও থেকে আপনার নামে একটা বিশেষ পার্সেল এসেছে। জরুরি সিল মারা, তাই না এসে পারলাম না,” কেনজি ব্যাগ থেকে একটা মাঝারি সাইজের কাঠের বাক্স বের করল। বাক্সটার ওপর কোনো পোস্টাল স্ট্যাম্প নেই, শুধু সায়োনির নাম লেখা।

সায়োনি বাক্সটা হাতে নিল। সেটার ওজন বেশ ভারী। “ধন্যবাদ, কেনজি। ভেতরে এসে একটু কফি খেয়ে যাও।”

“না ডক্টর, নিচে বরফ জমতে শুরু করেছে। এখনি না নামলে পথ বন্ধ হয়ে যাবে,” কেনজি আবার মাথা ঝুঁকিয়ে কুয়াশার মধ্যে মিলিয়ে গেল।

সায়োনি বাক্সটা নিয়ে লিভিং রুমে ফিরে এলো। ডাইনিং টেবিলের ওপর বাক্সটা রেখে সে একটা ছোট ছেনি দিয়ে ওটার ঢাকনাটা আলগা করল। কাঠের ঢাকনাটা সরাতেই ভেতরে যা দেখল, তাতে সায়োনির মুখের সমস্ত রক্ত চট করে নেমে গেল।

বাক্সের ভেতরে রাখা আছে একটা মানুষের করোটি। নিখুঁতভাবে রাসায়নিক দিয়ে পরিষ্কার করা এক সাদা করোটি। আর সেই করোটির কপালের ঠিক মাঝখানে, নীল কালিতে একটা সময় লেখা রয়েছে—৩:১৩

সায়োনি স্তম্ভিত হয়ে তাকিয়ে রইল। করোটির নিচে একটা ছোট্ট অডিও ক্যাসেট প্লেয়ার রাখা ছিল, যা সায়োনির স্পর্শ পেতেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালু হয়ে গেল। ক্যাসেটের ফিতা ঘোরার খসখস শব্দের পর এক অতি পরিচিত, যান্ত্রিক কণ্ঠস্বর ঘরজুড়ে প্রতিধ্বনিত হলো:

“সায়োনি, তুমি যাকে মৃত ভেবেছিলে, সে আসলে মরেনি। সে শুধু নিজের মস্তিষ্কের এমন এক অন্ধকার ঘরে বন্দি হয়েছিল, যার চাবিটা তুমি লুকিয়ে রেখেছ। আজ রাতে আমি চাবিটা নিতে আসব। ঠিক ৩:১৩ মিনিটে।”

শব্দটা শেষ হতেই ক্যাসেট প্লেয়ারের ভেতর থেকে একটা ছোটখাটো বিস্ফোরণের শব্দ হলো এবং ওটা থেকে কালো ধোঁয়া বের হতে লাগল। সায়োনি দেখল, করোটির চোখের কোটর দুটো থেকে হঠাৎ করেই সেই পরিচিত নীল তরলটা ফোঁটায় ফোঁটায় গড়িয়ে পড়ছে মেঝেতে। আর ঠিক সেই মুহূর্তে, ঘরের দেওয়ালঘড়ির পেন্ডুলামটা এক অদ্ভুত কর্কশ শব্দে কেঁপে উঠে আবার তার স্বাভাবিক টিক-টিক শব্দ শুরু করল, যেন সে সায়োনিকে মনে করিয়ে দিচ্ছে—রাত ৩:১৩ এর আর বেশি দেরি নেই।

পর্ব ১ সমাপ্ত

আপনার মন্তব্য জানান।

Your email address will not be published. Required fields are marked *

0% | 0মি 0সে
Scroll to Top