যক্ষপুরীর চাবুক

অন্ধকার ঘরে পুরনো চামড়ার গন্ধ আর আর্দ্রতার মিশেল। ধুলোয় জমাট বেঁধে থাকা প্রত্নতাত্ত্বিক মানচিত্রটার ওপর লণ্ঠনের আলো এসে পড়েছে। জগদীশ বাবু কাঁপাকাঁপা হাতে মানচিত্রের রেখাগুলোর ওপর আঙুল বোলালেন। মানচিত্রটি সাধারণ নয়, এটি কয়েকশ বছর পুরনো তালপাতায় খোদাই করা। তাতে স্পষ্ট ভাষায় লেখা—‘যক্ষপুরীর চাবুক’।

বাইরে শ্রাবণধারার অবিরাম বর্ষণ। বাংলার গহীন অরণ্যে অবস্থিত সেই পরিত্যক্ত রাজবাড়ির ধ্বংসাবশেষের কথা মনে পড়তেই জগদীশ বাবুর শিরদাঁড়া দিয়ে একটা হিমস্রোত বয়ে গেল। লোকগাথা বলে, মাটির নিচে সাত রাজার ধন লুকিয়ে আছে, কিন্তু সেই ধনসম্পদ মানুষের ভোগের জন্য নয়। ওটি পাহারা দিচ্ছে এক অদৃশ্য, অভিশপ্ত সত্তা।

হঠাৎই জানলার কাঁচে এক বিকট শব্দে ধাক্কা লাগল। যেন কোনো বিশাল ডানাওয়ালা প্রাণী ডানা ঝাপটাচ্ছে। জগদীশ বাবু দ্রুত মানচিত্রটা গুটিয়ে নিলেন। টেবিলের ওপর পড়ে থাকা ডায়েরিটা খুলতেই পাতা থেকে একটা প্রাচীন ধাতব চাবি ঝনঝন করে নিচে পড়ল। চাবিটার গায়ে অদ্ভুত এক প্রতীক—একটি কুণ্ডলী পাকানো সাপের ওপর একটি ছিন্নভিন্ন চাবুক। এটাই কি সেই চাবুক? যা দিয়ে অদৃশ্য সত্তা নিজের সাম্রাজ্য শাসন করে?

তিনি জানতেন, এই যাত্রার কোনো প্রত্যাবর্তন নেই। কৌতুহলের বশবর্তী হয়ে তিনি রাজবাড়ির সেই গোপন দরজাটি উন্মোচন করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি জানতেন না, যে দরজায় হাত দিয়েছেন, তা খুলে গেলে অশুভ ছায়াগুলো দুনিয়ায় নেমে আসবে। হঠাৎ ঘরের আলো দপ করে নিভে গেল। ঘোর অন্ধকার। জানলার বাইরে বৃষ্টির শব্দ থেমে গেছে, এখন শুধুই নিস্তব্ধতা—এক ভয়ানক, পাথুরে নিস্তব্ধতা।

হঠাৎ পায়ের কাছে কিছু একটা খসখস করে উঠল। তিনি হাতের লণ্ঠনটা জ্বালাতে গিয়ে দেখলেন, সেটি পাথরের মেঝেতে পড়ে আছে। নিভে যাওয়া লণ্ঠনের পাশে কালো আলকাতরার মতো কিছু একটা জমাট বাঁধছে। সেটা তরল, কিন্তু তার নড়াচড়া প্রাণীর মতো। জগদীশ বাবু পিছিয়ে যেতেই দেখলেন, দরজার কোণে একটা ছায়া মূর্ত হয়ে উঠেছে। সেটি মানুষের মতো, কিন্তু তার আকার অমানবিক লম্বা। সেটির হাতে সেই প্রাচীন চাবুকের মতোই এক দীর্ঘ, কালো রেখা দেখা যাচ্ছে।

তিনি চিৎকার করতে চাইলেন, কিন্তু গলা দিয়ে শব্দ বের হলো না। সেই ছায়াটি ইশারায় যেন তাকে ডাকছে। যেন বলছে, ‘যে দরজা খুলেছ, তার মাশুল এখন দিতেই হবে।’ জগদীশ বাবু নিজের অজান্তেই দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন। ঘর থেকে বেরিয়ে বারান্দায় আসতেই দেখলেন, চারপাশের পৃথিবী বদলে গেছে। রাজবাড়ির সেই জীর্ণ দেওয়ালগুলো হঠাৎ নতুন হয়ে উঠেছে, আর মাটির নিচ থেকে ভেসে আসছে অদ্ভুত এক গুঞ্জন—যেন হাজার হাজার মানুষ একসাথে আর্তনাদ করছে।

তিনি দৌড়াতে শুরু করলেন। পিছু পিছু সেই অদৃশ্য সত্তার পায়ের আওয়াজ। প্রতিটি পদক্ষেপে মাটির নিচে এক গভীর কম্পন অনুভূত হচ্ছে। অরণ্যের গহীন থেকে আসা ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক হঠাৎ থেমে গেছে। রাজবাড়ির মূল ফটকটি খোলা। সেই খোলা ফটকের ভেতর থেকে এক নীল রঙের আভা বেরিয়ে আসছে। তিনি বুঝতে পারলেন, এটাই সেই যক্ষপুরী। কিন্তু ভেতরে যাওয়ার অর্থ নিজেকে অন্ধকারের হাতে সঁপে দেওয়া।

আপনার মন্তব্য জানান।

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top