যক্ষপুরীর চাবুক

তাকে এই চাবুকটি বিসর্জন দিতে হবে। কিন্তু কীভাবে? চাবুকটি তাকে ছুঁতে দিচ্ছে না। তার চারপাশে এক অদৃশ্য দেয়াল তৈরি হয়েছে। দেয়ালের ওপারে দেখা যাচ্ছে তার নিজের জীবনের টুকরো টুকরো স্মৃতি। তার শৈশবের সেই শান্ত গ্রাম, যেখানে বৃষ্টির শব্দে ভোরের ঘুম ভাঙত। তার জীবনের সব শান্তি যেন আজ এই অভিশপ্ত চাবুকের সামনে বাজি রাখা হয়েছে।

তিনি উঠে দাঁড়ালেন। স্ফটিক বেদীর ওপর তিনি নিজের রক্ত দিয়ে একটি বৃত্ত আঁকলেন। এটি কোনো তুকতাক নয়, এটি এক প্রাচীন গণিত—যা তিনি তার প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় পড়েছিলেন। তিনি চাবুকটির সামনে গিয়ে বসলেন। চাবুকটি তার দিকে সাপের মতো ফণা তুলল। কিন্তু তিনি নড়লেন না। তিনি চোখ বন্ধ করে সেই প্রাচীন মন্ত্র পাঠ শুরু করলেন, যা এই অভিশাপের মূল উৎসকে ধ্বংস করতে সক্ষম।

মন্দিরটি কাঁপছে। উপরের ছাদ থেকে ধুলো ঝরছে। দেয়ালগুলো যেন কথা বলছে। প্রতিটি শব্দে তিনি এক এক করে পুরনো পাপের দায় মুক্তি দিচ্ছেন। হঠাৎ, চাবুকটি তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। তার বুকের ওপর চেপে বসল সেই ভয়াবহ ওজন। তিনি অনুভব করলেন, তার হৃদপিণ্ড থেমে যাচ্ছে। কিন্তু তার হাত তখনো সেই স্ফটিক বেদীর মূল বিন্দুতে স্থির। তিনি তার হাত সরালেন না।

চাবুকের নীল শিখা তার শরীরে প্রবেশ করছে। তিনি দেখছেন, তার শরীর দাউদাউ করে জ্বলছে। তিনি জ্বলে ছাই হয়ে যাচ্ছেন, কিন্তু তার ভেতরে থাকা সত্যটি অক্ষত থাকছে। তিনি যখন অনুভব করলেন তার অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাচ্ছে, তখনই এক প্রচণ্ড বিস্ফোরণে চারপাশ শান্ত হয়ে গেল। তিনি দেখলেন, তিনি একা নন। তার চারপাশে এখন কোনো ছায়া নেই, কোনো সত্তা নেই। শুধু এক বিশাল শূন্যতা।

সেই শূন্যতার মাঝে তিনি শুনতে পেলেন এক মিষ্টি সুর—এক বাউল গানের সুর, যা তিনি বাংলাদেশে শুনেছিলেন। তিনি বুঝতে পারলেন, তিনি বেঁচে আছেন, কিন্তু কোথায়? তার সামনে এখন কোনো মন্দির নেই, কোনো গহ্বর নেই। আছে শুধু এক আদিম অরণ্য, যেখানে ভোরের আলো ফুটছে। তিনি চাবুকটি কি বিসর্জন দিতে পেরেছেন? তার হাতে এখনো সেই প্রাচীন প্রতীকটি খোদাই করা আছে, যা কোনোদিনই মুছবে না। তিনি কি অভিশাপ মুক্ত হয়েছেন, নাকি তিনি নিজেই এক নতুন অভিশাপের পথপ্রদর্শক হয়ে উঠলেন?

ভোরের আলো যখন অরণ্যের পত্রপল্লব চিরে জগদীশ বাবুর চোখে পড়ল, মনে হলো তিনি বহু শতাব্দী পর আবার পৃথিবী দেখছেন। শরীরের প্রতিটি পেশি যন্ত্রণায় টনটন করছে, যেন কয়েকদিন ধরে কোনো পাহাড়ের চূড়া থেকে গড়িয়ে নিচে পড়েছেন। তার পাশে পড়ে আছে সেই চাবুকটি—কিন্তু এখন এটি আর কোনো রহস্যময় অশুভ অস্ত্র নয়, এটি এখন নিছকই এক প্রাচীন, মরচে ধরা ধাতব শৃঙ্খল। অভিশাপটি চুকে গেছে, কিন্তু তার রেশ রয়ে গেছে জগদীশ বাবুর প্রতিটি রক্তকণিকায়।

তিনি উঠে বসলেন। অরণ্যটি অদ্ভুত রকমের শান্ত। ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক নেই, পাখিদের কলকাকলি নেই—পুরো প্রকৃতি যেন কোনো এক বিশাল ঘটনার সাক্ষী হয়ে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তিনি বুঝতে পারলেন, তিনি ভারতের সেই মন্দিরের তলদেশ থেকে অরণ্যের ঠিক সেই জায়গায় ফিরে এসেছেন, যেখান থেকে তার যাত্রা শুরু হয়েছিল—বাংলাদেশের গহীন অরণ্যে। সময় যেন এক গোলকধাঁধায় আটকা পড়ে গিয়েছিল, কিন্তু তিনি সেই চক্র ভেদ করে বেরিয়ে এসেছেন।

নিজের হাতের দিকে তাকাতেই চমকে উঠলেন। তার হাতের তালুতে সেই সাপ ও চাবুকের প্রতীকটি এখন আর কালচে দাগ নয়, এটি যেন তার ত্বকের ভেতরেই খোদাই করা এক উজ্জ্বল তিলক। তিনি বুঝতে পারলেন, এই

আপনার মন্তব্য জানান।

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top