চিহ্নটি কোনো অভিশাপ নয়, এটি এক সতর্কবার্তা। যক্ষপুরী হয়তো ধ্বংস হয়েছে, কিন্তু পৃথিবীর গভীরে এমন আরও অনেক সুপ্ত রহস্য লুকিয়ে আছে, যার পাহারাদার এখন থেকে তিনিই।
হঠাৎ অরণ্যের নিস্তব্ধতা ভেঙে ভেসে এল মানুষের কোলাহল। তিনি কান পেতে শুনলেন। অনেক দূরে কোথাও কেউ ডাকছে তার নাম ধরে। না, এটি মানুষের ডাক নয়। এটি কোনো এক অশুভ ছায়ার ডাক, যা এতদিন তাকে অনুসরণ করছিল। তিনি চাবুকটি হাতে তুলে নিলেন। সেটি এখন আর কোনো অলৌকিক শক্তি ধারণ করে না, কিন্তু তার ভারে তিনি এক অদম্য আত্মবিশ্বাস পাচ্ছেন। তিনি বুঝতে পারলেন, লড়াইটি শেষ হয়নি, এটি কেবল তার স্বরূপ পরিবর্তন করেছে।
তিনি হাঁটতে শুরু করলেন। জঙ্গলের ভেতর দিয়ে পথ চলার সময় প্রতিটি গাছ, প্রতিটি পাথর তাকে চেনা মনে হচ্ছে। তিনি যখন রাজবাড়ির ধ্বংসাবশেষের জায়গায় পৌঁছালেন, দেখলেন সেখানে কোনো ধ্বংসস্তূপ নেই। সেখানে এখন সবুজ ঘাস আর বুনো ফুলের মেলা। রাজবাড়িটি যেন মাটির নিচে অদৃশ্য হয়ে গেছে, যেন সেটি কোনোদিন ছিলই না। কিন্তু তার ঝোলার ভেতর থাকা সেই তালপাতার মানচিত্রটি এখনো তার বুকের কাছে ধকধক করছে। মানচিত্রটি এখন সাদা—এর মানে, নতুন কোনো গন্তব্য বা নতুন কোনো রহস্যের জন্য এটি অপেক্ষা করছে।
হঠাৎ তার সামনে এক দীর্ঘ ছায়া এসে পড়ল। তিনি ঘুরে দাঁড়াতেই দেখলেন, এক বৃদ্ধ সন্ন্যাসী তার সামনে দাঁড়িয়ে। সন্ন্যাসীর চোখগুলো নীল, যেন সাগরের তলদেশ থেকে উঠে এসেছেন। তিনি শান্ত গলায় বললেন, “তুমি যক্ষপুরীর চাবুক ধ্বংস করেছ, প্রত্নতাত্ত্বিক। কিন্তু তুমি কি জানো, চাবুকটি ধ্বংস করার অর্থ কী?”
জগদীশ বাবু তার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন, “কী অর্থ এর?”
সন্ন্যাসী হাসলেন। সেই হাসিতে এক অদ্ভুত নিষ্ঠুরতা ছিল। তিনি বললেন, “চাবুকটি কোনো অস্ত্র ছিল না, চাবুকটি ছিল একটি তালা। সেই তালা তুমি খুলে ফেলেছ। এখন যে অদৃশ্য সত্তারা এই পৃথিবীর বাইরে আটকা ছিল, তারা এখন মুক্ত। তুমি তাদের মুক্তি দিয়েছ, কিন্তু তার বিনিময়ে তুমি এই অশুভ শক্তির নতুন প্রহরী।”
জগদীশ বাবু শিউরে উঠলেন। তার মানে, তিনি ভুল করেছিলেন? তিনি কি কোনো মহাজাগতিক ভুল করে বসেছেন? অরণ্যের গাছগুলো হঠাৎ নড়তে শুরু করল। বাতাসের গতিবেগ বেড়ে গেল, আর সেই বাতাসের সাথে ভেসে এল হাজার হাজার অশরীরী কণ্ঠস্বর। তিনি বুঝতে পারলেন, তিনি যা করেছেন তা কোনো জয় নয়, তা ছিল এক ভয়াবহ প্রলয়ের সূচনা।
তিনি সন্ন্যাসীর দিকে এগিয়ে যেতেই দেখলেন, সন্ন্যাসী বাতাসে বিলীন হয়ে গেছেন। তার জায়গায় পড়ে আছে কেবল একটি প্রাচীন ডায়েরি—তার নিজের ডায়েরি, যা তিনি হারিয়ে ফেলেছিলেন! ডায়েরির শেষ পাতায় লেখা—‘প্রত্নতাত্ত্বিক জগদীশ, তোমার অভিযান শেষ, এখন শুরু তোমার নির্বাসন।’
তিনি বুঝতে পারলেন, তিনি একা। এই পৃথিবীতে এখন তার কোনো পিছুটান নেই। তাকে যেতে হবে সেই পথে, যেখানে সত্য আর মিথ্যা মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। তিনি তার ঝোলা কাঁধে নিলেন। তার সামনের পথটি এখন কুয়াশায় ঢাকা, কিন্তু তার অন্তরে জ্বলছে এক নতুন জ্ঞান—প্রকৃতির এই রুক্ষ রূপের নিচে লুকিয়ে থাকা অন্ধকারকে কেবল লড়াই করে নয়, বরং বরণ করে জয় করতে হয়। তিনি কুয়াশার দিকে পা বাড়ালেন, আর ঠিক তখনই তার পায়ের নিচ থেকে মাটি কেঁপে উঠল এক অমোঘ ভূমিকম্পের পূর্বাভাস নিয়ে। তার এই যাত্রার শেষ কোথায়?