যক্ষপুরীর চাবুক

পেছন থেকে এক হিমশীতল বাতাসের ঝাপটা তাঁর ঘাড়ের ওপর দিয়ে বয়ে গেল। তিনি বুঝতে পারলেন, সত্তাটি ঠিক তাঁর পেছনে দাঁড়িয়ে আছে। সেটির দীর্ঘ নখ তাঁর কাঁধ স্পর্শ করল। জগদীশ বাবু এক পা এগিয়ে ফটকের ভেতরে ঝাঁপ দিলেন। কিন্তু ভেতরে পড়ে তিনি যা দেখলেন, তাতে তাঁর রক্ত হিম হয়ে গেল। মেঝেতে সারি সারি মানুষের কঙ্কাল, তাদের সবার হাতে একটা করে অদ্ভুত মুদ্রা। এবং ঠিক সামনেই সেই প্রাচীন সিংহাসন, যার ওপর বসে আছে এক অশরীরী ছায়া। সেই ছায়ার হাতে জ্বলজ্বল করছে সেই অভিশপ্ত চাবুক।

তিনি দেখলেন, সিংহাসনের ওপর খোদাই করা নামগুলো পরিচিত—তাঁর হারিয়ে যাওয়া বন্ধুদের নাম। তিনি বুঝতে পারলেন, তিনি কেবল নিজের জীবন বাজি রাখেননি, তিনি এক এমন খেলায় জড়িয়েছেন যার শেষ কোথায় তা কেউ জানে না। সেই সত্তাটি হঠাৎ চাবুকটি শূন্যে ঘোরাল। একটা বিকট শব্দে ঘরটি কেঁপে উঠল, আর ঠিক তখনই তিনি দেখলেন—তাঁর নিজের ছায়াটা দেওয়াল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আলাদা হয়ে যাচ্ছে। সেটি তাঁর দিকেই তেড়ে আসছে, যেন তাকে শেষ করে দিতেই এই রূপান্তর।

তিনি প্রাণপণে দৌড়াতে লাগলেন সেই সুরঙ্গপথ ধরে। কিন্তু সুরঙ্গটি ছোট হতে শুরু করেছে। দেওয়ালগুলো ক্রমশ সংকীর্ণ হচ্ছে। বাতাসের অভাব অনুভব করছেন তিনি। বাঁচার কোনো পথ নেই। তিনি যখন সুরঙ্গের শেষ মাথায় পৌঁছালেন, দেখলেন সেখানে এক গভীর খাদ। আর সেই খাদের ওপারে দেখা যাচ্ছে ভারতের কোনো এক মন্দিরের আলোকচ্ছটা। কিন্তু খাদের নিচে? নিচে অসংখ্য সাপের ফণা দুলছে। তিনি এখন খাদের কিনারে দাঁড়িয়ে, পেছনে সেই সত্তার খসখস শব্দ এগিয়ে আসছে। ঝাঁপ দেওয়া ছাড়া আর কোনো পথ খোলা নেই।

অতল গহ্বরের কিনারে দাঁড়িয়ে জগদীশ বাবু যখন নিচে তাকালেন, মনে হলো পাতালপুরীর কোনো এক অন্ধকার মুখ হাঁ করে তাকে স্বাগত জানাচ্ছে। খাদের ভেতর থেকে উঠে আসছে নোনা স্যাঁতসেঁতে গন্ধ, আর সেই সাথে সাপের বিষাক্ত ফণায় ঘর্ষণের মৃদু হিসহিস শব্দ। পেছনে সেই ছায়াসঙ্গী—যে এখন তার নিজের ছায়া থেকে জন্ম নেওয়া এক অভিশপ্ত প্রতিচ্ছবি—তার শীতল আঙুল জগদীশ বাবুর ঘাড়ের কাছে প্রায় স্পর্শ করে ফেলেছে।

আর এক মুহূর্ত দেরি করা মানেই চিরস্থায়ী মৃত্যু। জগদীশ বাবু চোখ বন্ধ করে শূন্যে ঝাঁপ দিলেন।

বাতাসে তার শরীরটা যেন এক মুহূর্তের জন্য ঝুলে রইল। তারপরই এক প্রচণ্ড ধাক্কা। পাথরের খাঁজে হাত আটকে তিনি ঝুলে পড়লেন। যন্ত্রণায় মুখ দিয়ে অস্ফুট আর্তনাদ বেরিয়ে এলো, কিন্তু সেটি শোনাবার মতো কেউ নেই। ওপরের দিকে তাকিয়ে দেখলেন, সেই অশরীরী ছায়াটি খাদের কিনারে দাঁড়িয়ে আছে। তার মুখাবয়ব নেই, কেবল শূন্যতায় ভরা একজোড়া চোখ—যেখানে জ্বলছে অতৃপ্ত প্রতিহিংসা। ছায়াটি নিজের দীর্ঘ হাত বাড়িয়ে দিল, চাবুকটা সাপের মতো কুণ্ডলী পাকিয়ে তার মুঠোয় দুলছে।

জগদীশ বাবু দেখলেন, খাদের দেওয়াল থেকে পাথর খসে পড়ছে। নিচের সাপের দল নড়েচড়ে উঠেছে। তিনি হাতের নখ দিয়ে পাথরের খাঁজ আঁকড়ে ধরে ওপরের দিকে ওঠার চেষ্টা করলেন না, বরং নিচের দিকে নামতে শুরু করলেন। কারণ তিনি জানেন, উপরে মৃত্যু নিশ্চিত, নিচে হয়তো কোনো গোপন সুরঙ্গ আছে। নামতে নামতে তার আঙুল ছিঁড়ে রক্ত ঝরছে, পাথরের ধারালো অংশ চামড়া কেটে বসছে। কিন্তু সেই ব্যথার চেয়েও বড় ভয় হলো—যদি নিচে কোনো জ্যান্ত কবর তার জন্য অপেক্ষা করে থাকে?

প্রায় চল্লিশ ফুট নিচে নামার পর তিনি এক সরু পাথুরে চাতাল দেখতে পেলেন। কোনোমতে লাফিয়ে সেখানে অবতরণ করতেই জায়গাটি কেঁপে উঠল। এটি কোনো প্রাকৃতিক গুহা নয়, বরং কোনো প্রাচীন প্রকৌশলের অংশ। চাতালের দেয়ালে খোদাই করা আছে বিশাল এক মানচিত্র—যার কেন্দ্রবিন্দুতে একটি নির্দিষ্ট মন্দির। জগদীশ বাবু লণ্ঠনটা আবার জ্বালালেন। আলোর রোশনাইয়ে যা ফুটে উঠল, তাতে তার বুক ধড়ফড় করে উঠল। দেয়ালে

আপনার মন্তব্য জানান।

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top