ভুমিকম্পের কম্পন অরণ্যের গহীন থেকে উঠে আসছে, যেন মাটির নিচে কোনো দানব জেগে উঠছে। জগদীশ বাবু বুঝতে পারলেন, সন্ন্যাসীর সতর্কবাণী মিথ্যা ছিল না। যক্ষপুরীর চাবুকটি কেবল তালা ছিল না, সেটি ছিল মহাবিশ্বের এক ভারসাম্য রক্ষাকারী দণ্ড। তিনি সেটি চূর্ণ করার মাধ্যমে প্রকৃতির অমোঘ নিয়মের সাথে যে প্রতারণা করেছেন, তার দাম চুকানোর সময় এসেছে। মাটি ফেটে বেরিয়ে আসছে উত্তপ্ত ধোঁয়া, আর সেই ধোঁয়ার ভেতর থেকে ফুটে উঠছে এক স্বচ্ছ জগত—যেখানে সময় নেই, স্থান নেই, শুধু অনন্ত শূন্যতা।
তিনি কুয়াশার ভেতরে হাঁটছেন। অরণ্যের গাছগুলো এখন আর আগের মতো নেই; সেগুলো যেন কাঁচের তৈরি, প্রতিটি পাতায় প্রতিবিম্বিত হচ্ছে তার অতীতের সমস্ত ভুল। তিনি দেখছেন, কীভাবে তার কৌতূহল এই অভিশপ্ত যাত্রার পথ সুগম করেছিল। তিনি দেখছেন, কীভাবে এক একটি পদক্ষেপ তাকে মৃত্যুর কাছাকাছি নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এই ধ্বংসের মধ্যেই তিনি খুঁজে পেলেন এক অদ্ভুত শান্তি। কারণ, সত্যের মুখোমুখি হওয়াটাই ছিল তার জীবনের সবচেয়ে বড় অ্যাডভেঞ্চার।
হঠাৎ কুয়াশা ভেদ করে সামনে ফুটে উঠল এক বিশাল পাথরের তোরণ। এটি কোনো মন্দির নয়, এটি পৃথিবীর প্রান্তসীমা। তোরণের ওপারে দেখা যাচ্ছে এক অসীম নীল আকাশ, যেখানে নক্ষত্ররা দিনেও জ্বলে। তিনি তোরণের নিচে দাঁড়ালেন। তার হাতের তালুর সেই চিহ্নটি এখন প্রচণ্ড উত্তাপে জ্বলছে। তিনি বুঝলেন, এই তোরণ পার হলেই তিনি চিরতরে এই জগত থেকে হারিয়ে যাবেন, কিংবা তিনি নিজেই হয়ে উঠবেন সেই শক্তির নতুন আধার।
পিছনে তাকিয়ে দেখলেন, তার পুরো যাত্রা—সেই প্রাচীন রাজবাড়ি, সেই অভিশপ্ত সুড়ঙ্গ, সেই ভারতের সূর্য মন্দির, আর এই অরণ্য—সবকিছু এক বিন্দুতে মিলিয় যাচ্ছে। তিনি নিলেন এক গভীর শ্বাস। তার ঝোলা থেকে মানচিত্রটি বের করে ছিঁড়ে ফেললেন কুচি কুচি করে। তিনি আর কোনো ক্লু খুঁজছেন না। তিনি আর কোনো রহস্যের পেছনে ছুটছেন না। তিনি এখন শুধু একজন মানুষ, যে প্রকৃতির রুক্ষতাকে জয় করতে গিয়ে নিজেই প্রকৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে।
তোরণের ভেতরে পা রাখতেই এক তীব্র আলোকচ্ছটা তাকে ঘিরে ফেলল। সেটি অন্ধকারের বিপরীত কোনো শক্তি নয়, সেটি এক পবিত্র তেজ। তিনি অনুভব করলেন, তার শরীরের প্রতিটি অণু-পরমাণু পুনর্গঠিত হচ্ছে। তার অতীতের ভয়, তার ক্লান্তি, তার জখম—সবকিছু মুছে যাচ্ছে। তিনি এখন আর একা নন; অরণ্যের ঝিঁঝিঁ পোকা, পাহাড়ের নিস্তব্ধতা, নদীর কলতান, সব তার হৃদস্পন্দনের সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে।
তিনি যখন তোরণের ওপারে পা রাখলেন, দেখলেন তিনি দাঁড়িয়ে আছেন বাংলার সেই আদি অরণ্যের এক পাহাড়ী চূড়ায়। সূর্য উঠছে। পাহাড়ের নিচে ধোঁয়া আর কুয়াশা সরে গিয়ে বেরিয়ে আসছে এক সমৃদ্ধ উপত্যকা। তিনি বুঝতে পারলেন, তিনি ফিরে এসেছেন ঠিকই, কিন্তু তিনি আর আগের মানুষটি নেই। তিনি এখন পাহাড়ের রুক্ষতা আর অরণ্যের রহস্যের প্রতীক।
তার পায়ের কাছে সেই প্রাচীন ধাতব চাবুকটি এখন এক টুকরো পাথরের মতো পড়ে আছে। তিনি সেটি তুলে নিয়ে ছুড়ে ফেলে দিলেন অসীম গভীরতায়। আকাশ চিরে এক ঝলক বিদ্যুৎ চমকাল—এটি কোনো অভিশাপের সংকেত নয়, এটি প্রকৃতির এক অমোঘ আশীর্বাদ। তিনি এখন মুক্ত। যক্ষপুরীর অভিশাপ ইতিহাস হয়ে গেছে, আর তিনি হয়ে উঠেছেন সেই ইতিহাসের সাক্ষী। পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে তিনি দেখলেন, অরণ্য তাকে ডাকছে। সেই ডাক আর ভয়ংকর নয়, সেই ডাক এখন তার নিজের হৃদয়ের স্পন্দন। তিনি নতুন এক অ্যাডভেঞ্চারের উদ্দেশ্যে পাহাড় বেয়ে নিচের দিকে নামতে শুরু করলেন, কিন্তু এবার তার হাতে মানচিত্র নেই, আছে কেবল অসীম আকাশ দেখার সাহস। প্রকৃতির অমোঘ সত্যের সামনে মাথা নত করে তিনি বুঝলেন—আসল অ্যাডভেঞ্চার তো এখন শুরু!
সমাপ্ত।