যক্ষপুরীর চাবুক

জগদীশ বাবু পিছু হটলেন। তিনি দেখলেন, সেই প্রতিচ্ছবিটির হাতে একটি প্রাচীন ডায়েরি। সেটি তার নিজের ডায়েরি, যা তিনি হারিয়ে ফেলেছিলেন! ডায়েরির প্রতিটি পাতায় তার ভবিষ্যৎ লেখা আছে। তিনি পাতাগুলো উল্টে দেখলেন, শেষ পাতায় তার নিজের মৃত্যুর তারিখ আজকেই!

উত্তেজনা আর ভয়ে তার মস্তিষ্ক কাজ করা বন্ধ করে দিচ্ছে। তিনি দেখলেন, রাজবাড়ির দেওয়ালগুলো ক্রমশ সংকীর্ণ হচ্ছে। ছাদ নিচে নেমে আসছে। তিনি যদি এই মুহূর্তে এখান থেকে পালাতে না পারেন, তবে এই প্রাচীন কারাগারের অংশ হয়ে যাবেন চিরতরে। সামনেই একটি বড় আয়না। সেই আয়নায় তিনি নিজের প্রতিচ্ছবি দেখতে পেলেন, কিন্তু আয়নার ভেতরের জগদীশ বাবু তাকে টেনে নিতে চাইছে। আয়নার ভেতর থেকে একটা হাত বেরিয়ে এসেছে—সেটা তার নিজের হাত, কিন্তু তাতে নখগুলো ধারালো এবং চামড়া পচে যাওয়া।

তিনি প্রাণপণে দৌড় দিলেন। দরজার দিকে। কিন্তু দরজাটা এখন আর নেই, সেখানে একটা বিশাল দেয়াল। তিনি তার প্রত্নতাত্ত্বিক হাতুড়ি দিয়ে দেয়ালে আঘাত করলেন। দেওয়াল থেকে পাথর নয়, রক্ত ঝরতে শুরু করল। পুরো ঘরটা এখন রক্তের বন্যায় ভাসছে। সাঁতার কেটে তাকে বাঁচতে হবে। তিনি দেখলেন, দূরে এক মৃদু আলোর রেখা। সেটি কোনো দরজা নয়, সেটি একটি ড্রেন পাইপের মতো সরু রাস্তা। তার শরীরের মাপের চেয়েও ছোট। তাকে তার সমস্ত হাড় গুঁড়িয়ে দিয়ে হলেও ওদিকে যেতে হবে।

পিছনে সেই অশরীরী ছায়াটি তার পিঠের ওপর চাবুকের আঘাত করল। পিঠে জ্বালাপোড়া করা ব্যথা নিয়ে তিনি সেই সরু পাইপের ভেতর ঢুকে পড়লেন। পাইপের ভেতর থেকে আসা দমকা হাওয়ায় তিনি বুঝতে পারলেন, বাইরে এখন ঝড় বইছে। তাকে টেনে হিঁচড়ে পাইপ থেকে বের করে দিল বাইরের ঝোড়ো হাওয়া। তিনি যখন ঝোপের ওপর পড়লেন, দেখলেন রাজবাড়িটি তার চোখের সামনেই মুহূর্তের মধ্যে মাটির নিচে তলিয়ে যাচ্ছে। সাথে সাথে এক বিকট শব্দে আকাশ চিরে বিদ্যুৎ পড়ল—ঠিক তার পায়ের কাছে থাকা এক পুরনো পাথরের মন্দিরের প্রতীকের ওপর। তিনি কি বুঝতে পারলেন, ধ্বংসলীলা কেবল শুরু?

মুহূর্তের মধ্যে রাজবাড়িটি ধুলোর মেঘে পরিণত হয়ে মাটির গভীরে তলিয়ে গেল। চারপাশের বাতাস ভারী হয়ে আছে পোড়া মাটি আর প্রাচীন ধুলোর গন্ধে। জগদীশ বাবু অস্ফুট আর্তনাদ করে উঠে দাঁড়ালেন। পিঠে চাবুকের আঘাতের জায়গাটা এখনো জ্বলছে, যেন সেখানে কেউ জ্বলন্ত কয়লা চেপে ধরেছে। তিনি দেখলেন, মাটি খুঁড়ে বেরিয়ে এসেছে এক পুরনো পাথরের স্তম্ভ, যার গায়ে খোদাই করা সেই পরিচিত প্রতীক—সাপ আর চাবুক।

বিদ্যুৎ চমকের আলোয় স্তম্ভটি নীল রঙের শিখায় জ্বলে উঠল। এটি কোনো সাধারণ স্তম্ভ নয়, এটি একটি নির্দেশক। তার ঝোলায় থাকা তালপাতার মানচিত্রটি হঠাৎ কাঁপতে শুরু করল। তিনি মানচিত্রটি খুলতেই দেখলেন, তাতে কালি নিজে থেকেই পরিবর্তিত হচ্ছে। পুরোনো লেখাগুলো মিলিয়ে গিয়ে ফুটে উঠছে নতুন একটি পথ—ভারতের সীমান্ত পেরিয়ে এক প্রাচীন মন্দিরের দিকে।

কিন্তু তিনি একা নন। ঝোপঝাড়ের আড়াল থেকে ভেসে আসছে অদ্ভুত ফিসফিসানি। ছায়াগুলো রাজবাড়ির সাথে বিলীন হয়ে যায়নি, তারা তাকে অনুসরণ করছে। তিনি বুঝতে পারলেন, এই অভিশাপ কোনো ভৌগোলিক সীমানা মানে না। এটা তার মনের ভেতর গেঁথে গেছে। প্রতিটি পদক্ষেপে তিনি শুনতে পাচ্ছেন সেই অভিশপ্ত চাবুকের আওয়াজ—সাঁই, সাঁই।

তিনি দৌড়াতে শুরু করলেন। সামনের জঙ্গলটি ঘন, অন্ধকার আর গাছগুলোর ডালাপালা সাপের মতো জড়িয়ে আছে। রাতের এই নিস্তব্ধতায় কেবল তার হৃদস্পন্দন আর জঙ্গল থেকে আসা অশরীরী ডাক শোনা যাচ্ছে। হঠাৎ

আপনার মন্তব্য জানান।

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top