যক্ষপুরীর চাবুক

তিনি এক পরিত্যক্ত রেললাইনের সামনে এসে দাঁড়ালেন। এই লাইন চলে গেছে সীমান্তের দিকে। লাইনের পাশে দাঁড়িয়ে আছে এক জং ধরা ট্রেন ইঞ্জিন, যার গায়ে লেখা—‘শেষ গন্তব্য’।

ঠিক সেই মুহূর্তে আকাশ আবার গর্জে উঠল। দূরে দেখা যাচ্ছে এক বিশাল মেঘের পিণ্ড, যা কোনো প্রাকৃতিক ঝড় নয়। মেঘের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে অদ্ভুত সব আকৃতি—যেন সেই অদৃশ্য সত্তার সৈন্যরা আকাশ দখল করছে। জগদীশ বাবু ইঞ্জিনটির ভেতরে ঢুকে পড়লেন। এটি কয়েক দশক আগেকার কোনো মালবাহী ট্রেন। ইঞ্জিনের কন্ট্রোল প্যানেলের ওপর তিনি দেখলেন সেই চাবিটি, যা তিনি কিছু সময় আগেই হারিয়ে ফেলেছিলেন! চাবিটি এখানে কীভাবে এলো?

চাবিটি হাতে নিতেই ইঞ্জিনের বাষ্পীয় বয়লারগুলো প্রচণ্ড শব্দে কেঁপে উঠল। কোনো কয়লা বা আগুন ছাড়াই ইঞ্জিনটি নিজে থেকে স্টার্ট নিল। ট্রেনটি লাইনের ওপর চলতে শুরু করল। কিন্তু ট্রেনের চাকার আওয়াজ যেন আর্তনাদ। জানলা দিয়ে বাইরে তাকাতেই তিনি দেখলেন, ট্রেনের পাশে পাশে দৌড়াচ্ছে সেই অশরীরী ছায়াটি। সে ট্রেনের গতির সাথে তাল মিলিয়ে দৌড়াচ্ছে, তার হাতে সেই চাবুকটি এখন জ্বলন্ত শিখার মতো দুলছে।

ইঞ্জিনের ভেতর থেকে তিনি ডায়েরিটা বের করলেন। ডায়েরির পাতায় এখন নতুন এক সংকেত—‘যেখানে মৃত্যু কথা বলে, সেখানে সত্যের মুখ দেখা যায় না’। তিনি বুঝতে পারলেন, তাকে এই ট্রেন থেকে নামতে হবে, কিন্তু ট্রেনটি এখন কোনো অদৃশ্য শক্তির নিয়ন্ত্রণে। ট্রেনের গতি বাড়ছে, লাইনের শেষ মাথায় পাহাড়ের ঢাল। সামনেই এক বিশাল খাদ, যার ওপরে পুরনো একটা ঝুলন্ত সেতু। সেতুর কাঠে পচন ধরেছে।

তিনি বুঝতে পারলেন, ট্রেনটি তাকে সরাসরি সেই খাদের খাদ্যে পরিণত করতে চাইছে। তিনি ইঞ্জিনের ব্রেক মারার চেষ্টা করলেন, কিন্তু লিভারটি পাথর হয়ে গেছে। তিনি তার পিস্তল দিয়ে লিভারে আঘাত করলেন, কিন্তু গুলিগুলো যেন হাওয়ায় মিলিয়ে যাচ্ছে। অগত্যা তিনি ইঞ্জিনের ছাদের ওপর উঠে এলেন। বাতাসের ঝাপটায় তার শরীর টলে যাচ্ছে। সামনে সেতু, আর সেতুর ওপারে সেই রহস্যময় মন্দিরটি দেখা যাচ্ছে।

ট্রেনটি সেতুতে ওঠার সাথে সাথে কাঠের পাটাতনগুলো ভেঙে পড়তে লাগল। এক মুহূর্তের দ্বিধা মানেই মৃত্যু। সেতুটি যখন ভেঙে পড়ার উপক্রম, তখন তিনি ট্রেন থেকে লাফ দিলেন সেতুর মাঝখানের এক মজবুত পিলারের ওপর। তার ঠিক পরের মুহূর্তেই ট্রেনটি প্রচণ্ড শব্দে খাদের অতলে তলিয়ে গেল। কিন্তু তিনি একা নন। পিলারের ওপর তার পায়ের কাছেই এসে পড়েছে সেই অভিশপ্ত চাবুক!

সেটি নিজে থেকেই কুণ্ডলী পাকিয়ে তার গলার দিকে এগিয়ে আসছে। পিলারের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা জগদীশ বাবুর চারপাশে এখন হাজার হাজার ছায়া মূর্তি। তারা যেন দর্শক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে—দেখছে কীভাবে তাদের নতুন শিকারটি যক্ষপুরীর চাবুকের হাতে ধরা দেয়। পিলারের ওপর থেকে নিচে তাকাতেই তিনি দেখলেন, খাদের নিচে কোনো পানি নেই, সেখানে আছে কেবল এক অতিকায় গোলকধাঁধা। তাকে এখন নামতে হবে সেই গোলকধাঁধার গভীরে, যেখানে অপেক্ষা করছে পরবর্তী সংকেত।

পিলারটি কাঁপছে। ছায়া মূর্তিগুলো এগিয়ে আসছে। জগদীশ বাবু জানতেন, এই ঝাঁপ তাকে হয়তো শেষবারের মতো কোনো অজানায় নিয়ে যাবে। কিন্তু ফেরার আর কোনো পথ নেই। তিনি নিচের গোলকধাঁধার অন্ধকার মুখে ঝাঁপ দিলেন, কিন্তু মাঝপথে দেখলেন খাদের দেয়ালে এক বিশাল হাতের ছাপ—যার আঙুলগুলো উল্টো দিকে ঘোরানো। এটিই কি সেই প্রাচীন রাজা, যে এই চাবুক চুরি করেছিল?

আপনার মন্তব্য জানান।

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top