পরিণত হচ্ছে। সত্তাটি আর্তনাদ করে উঠল, তার শরীরের চামড়া খসে পড়ছে। সে এখন এক কঙ্কালসার ছায়ায় পরিণত হয়েছে। কিন্তু তার হাত এখনো জগদীশ বাবুর গলা আঁকড়ে আছে।
তিনি অনুভব করলেন, তার শরীরের ভেতর থেকে এক অশরীরী শক্তি বেরিয়ে যাচ্ছে। তিনি বুঝতে পারলেন, তিনি কি তার আত্মা বিসর্জন দিচ্ছেন? মন্দিরের মেঝে থেকে একটা গর্ত তৈরি হচ্ছে, যা তাকে নিচে টেনে নিচ্ছে। সেই অন্ধকার গহ্বরের ভেতর থেকে ভেসে আসছে হাজার হাজার মানুষের আর্তনাদ—যাদের আত্মা এই চাবুকের অভিশাপে আটকে আছে। তিনি সেই গহ্বরের কিনারে ঝুলে আছেন, এক হাতে সেই অভিশপ্ত সত্তার কঙ্কাল হাত, অন্য হাতে চাবুক।
নিচে অন্ধকার, উপরে ধ্বংসস্তূপ। তার চোখের সামনে ভেসে উঠল তার অতীতের সব স্মৃতি। তিনি কি চিরতরে বিলীন হয়ে যাবেন? হঠাৎ তিনি দেখলেন, গহ্বরের একদম নিচে একটা ছোট আলোর বিন্দু—একটি প্রাচীন প্রদীপের শিখা। তিনি কি সেই শিখার কাছে পৌঁছাতে পারবেন? সত্তাটির হাত তার গলার ওপর চেপে বসে আছে, তার দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসছে। তিনি দেখলেন, মন্দিরটি পুরোপুরি মাটির নিচে দেবে যাচ্ছে, আর তাকেও নিয়ে যাচ্ছে সেই অতল গহ্বরে।
অতল গহ্বরের অন্ধকার জগদীশ বাবুকে গিলে ফেলছে। সেই সত্তার হাড়ের মতো আঙুলগুলো এখনো তার ঘাড় কামড়ে ধরে আছে, যেন মৃত্যুর সঙ্গী হিসেবে তাকে চিরকাল এই অন্ধকার পাতালপুরীতে বেঁধে রাখতে চায়। শূন্যে ঝুলে থাকা অবস্থায় জগদীশ বাবু অনুভব করলেন, তার শরীরের জীবনীশক্তি দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। চাবুকটি তার হাতের মুঠোয় এখনো নীল শিখা বিকিরণ করছে, কিন্তু সেই আলোয় তিনি নিজের হাতের হাড় দেখতে পাচ্ছেন। তার মাংসপেশি যেন স্বচ্ছ হয়ে যাচ্ছে।
তিনি বুঝতে পারলেন, এটিই সেই চূড়ান্ত পরীক্ষা। এই গহ্বরটি কোনো সাধারণ পাতাল নয়, এটি কালের স্রোতে হারিয়ে যাওয়া এক মহাজাগতিক বর্জ্যভূমি—যেখানে অভিশপ্ত আত্মাগুলো যুগের পর যুগ তৃষ্ণার্ত হয়ে ঘুরে বেড়ায়। সত্তাটি ফিসফিস করে উঠল, “ছেড়ে দাও নিজেকে। লীন হয়ে যাও আমাদের সাথে। তাহলেই আর কোনো যন্ত্রণা থাকবে না।”
জগদীশ বাবুর মনের কোণে এক মুহূর্তের জন্য দুর্বলতা ভর করল। এই যন্ত্রণাময় জগত থেকে মুক্তি পাওয়ার প্রলোভন অসীম। কিন্তু তখনই তার চোখের সামনে ভেসে উঠল সেই পুরনো ডায়েরির পাতাগুলো—সেখানে তিনি যে কথাগুলো লিখেছিলেন, তা কেবল অ্যাডভেঞ্চার ছিল না, ছিল এক অমোঘ সত্যের অন্বেষণ। তিনি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন, মানুষ অজেয় যদি তার ইচ্ছাশক্তি অটুট থাকে। তিনি তার দাঁতে দাঁত চেপে লড়ে গেলেন।
হঠাৎ, নিচের সেই ছোট আলোর বিন্দুটি দপ করে জ্বলে উঠল। সেটি কোনো সাধারণ প্রদীপ নয়, সেটি যেন এক জ্বলন্ত নক্ষত্র—যা এই অভিশপ্ত পাতালের অন্ধকার ছিঁড়ে বেরিয়ে আসছে। সেই আলো স্পর্শ করতেই সত্তার কঙ্কাল হাতগুলো কয়লার মতো কালো হয়ে ঝরে পড়তে শুরু করল। সত্তাটি এক ভয়াবহ আর্তনাদ করে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। জগদীশ বাবু সেই শূন্য থেকে ছিটকে পড়লেন গহ্বরের তলদেশের সেই আলোয় ঘেরা বেদীর ওপর।
বেদীটি কোনো পাথর নয়, এটি স্বচ্ছ স্ফটিকের তৈরি। তিনি তার চারপাশ দেখলেন। হাজার হাজার আত্মা, যারা এতোদিন এই অভিশাপে বন্দি ছিল, তারা এখন আলোর রূপ নিয়ে ওপরের দিকে উঠে যাচ্ছে। যক্ষপুরীর অভিশাপ ভাঙছে। কিন্তু সেই ভাঙনের মূল্য চড়া। স্ফটিক বেদীর ঠিক কেন্দ্রে রয়েছে সেই প্রাচীন চাবুক—যার আসল রূপ এখন বেরিয়ে এসেছে। এটি কোনো চাবুক নয়, এটি একটি মানুষের মেরুদণ্ড, যা জাদুর শক্তির দ্বারা এক অশুভ যন্ত্রে পরিণত করা হয়েছিল।