যক্ষপুরীর চাবুক

দিকে, যেখানে হাজার হাজার জীবন্ত সাপ ফণা তুলে তার দিকে তাকিয়ে আছে। সে পড়ে যাচ্ছে সেই কুয়ার ভেতরে।

সার্পিল অতল গহ্বরের অন্ধকার মুখে পড়ার মুহূর্তটি ছিল এক অনন্ত পতনের মতো। জগদীশ বাবু জানতেন, এই কুয়ার তলদেশে সাপের বিষাক্ত ছোবল তার জন্য অপেক্ষা করছে। কিন্তু মৃত্যুর এক চুল আগে, নিজের জীবনের শেষ শক্তিটুকু দিয়ে তিনি দুহাত প্রসারিত করলেন। আঙুলের ডগায় স্পর্শ পেলেন কোনো এক পাথুরে কার্নিশের। শরীরের ওজন ঝুলে পড়ল সেখানে। নিচে সাপের হিসহিস শব্দ আরও তীব্র হলো, তাদের বিষাক্ত ফণাগুলো অন্ধকারে জ্বলে ওঠা আগুনের মতো কাঁপছে।

কোনোমতে কার্নিশ ধরে শরীরটাকে টেনে তুললেন তিনি। হাঁপাচ্ছেন। কপালে জমে থাকা বিন্দু বিন্দু ঘাম আর রক্ত মিশে চোখের ওপর এসে পড়ছে। কুয়ার দেওয়াল বেয়ে একটু একটু করে ওপরে ওঠার চেষ্টা করলেন, কিন্তু প্রতিটা ইঞ্চিতে যেন এক অশুভ শক্তি তাকে নিচের দিকে টেনে ধরছে। ওপরের দিকে তাকাতেই তার রক্ত হিম হয়ে গেল। কুয়ার মুখটা ধীরে ধীরে একটি পাথরের স্ল্যাব দিয়ে বন্ধ হয়ে আসছে। কেউ—অথবা কিছু একটা—বাইরে থেকে তাকে জ্যান্ত কবর দেওয়ার ষড়যন্ত্র করছে।

স্ল্যাবটা প্রায় আশি শতাংশ বন্ধ হয়ে গেছে। আর দেরি করা যাবে না। তিনি তার ঝোলা থেকে একটি দড়ি বের করলেন, যা দিয়ে প্রত্নতাত্ত্বিক খনন কাজে তিনি পাথর মাপতেন। দড়িটির শেষ মাথায় হুক আটকে তিনি উপরের লোহার গরাদ লক্ষ্য করে ছুঁড়লেন। একবারে, নিখুঁতভাবে আটকে গেল সেটি। তিনি নিজের ওজন দড়ির ওপর ছেড়ে দিয়ে বিদ্যুৎগতিতে ওপরে উঠতে শুরু করলেন।

পাথর যখন প্রায় বন্ধ হয়ে এসেছে, তখন তিনি শরীরের অর্ধেকটা বের করে এনেছেন। কিন্তু তখনই তার পায়ের গোড়ালি কামড়ে ধরল সেই অদৃশ্য সত্তার শীতল নখ। নিচের অন্ধকারে ঝুলে থাকা সাপের দল যেন তাকে টেনে নামাতে চাইছে। জগদীশ বাবুর আর্তনাদ গুহার দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হলো। তিনি হাতের পিস্তল বা অন্য কোনো অস্ত্র ব্যবহার করতে পারলেন না, কারণ তার পুরো মনোযোগ তখন দড়িটা ধরে রাখার ওপর। তিনি তার পকেটে থাকা সেই প্রাচীন ধাতব চাবিটি বের করে সজোরে পেছনের ছায়াটার দিকে ছুঁড়ে মারলেন। চাবিটি ধাতব শব্দে কোথাও গিয়ে ধাক্কা খেল, আর অমনি একটি অদ্ভুত যান্ত্রিক গর্জন উঠল। কুয়ার মুখটি আবার খুলে গেল।

তিনি ছিটকে বাইরে এলেন। রাজবাড়ির ধ্বংসাবশেষের এক অন্য অংশে তিনি এসে পড়েছেন, যা এতোদিন সবার চোখের আড়ালে ছিল। এটি যেন কোনো এক প্রাচীন কারাগারের মেঝে। চারপাশ জুড়ে ছড়ানো শত শত নরকঙ্কাল। তাদের হাতের মুদ্রাগুলো এখন উজ্জ্বল হয়ে জ্বলছে। তিনি বুঝতে পারলেন, এই মুদ্রাগুলোই হলো সেই চাবুকটির শক্তির উৎস। এগুলো কোনো সাধারণ সম্পদ নয়, এগুলো অভিশাপের বাহক।

হঠাৎ করেই বাতাসের গতিবেগ বেড়ে গেল। তার চারপাশ ঘিরে থাকা কঙ্কালগুলো নড়াচড়া করতে শুরু করেছে। হাড়ের ঠকঠক আওয়াজ পুরো রাজবাড়িতে ছড়িয়ে পড়ছে। এক অশরীরী হাওয়া তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল। মেঝেতে পড়ার সাথে সাথে তিনি দেখলেন, তার পায়ের কাছের ছায়াটি আরও দীর্ঘ হচ্ছে। সেটি এখন শুধু একটি ছায়া নয়, সেটি একটি আস্ত প্রতিমূর্তি হয়ে উঠেছে। তার নিজের চেহারারই এক বিকৃত রূপ।

সেই প্রতিচ্ছবিটি হাসল—এক নিষ্ঠুর, অমানবিক হাসি। সে জগদীশ বাবুর সামনে দাঁড়িয়ে বলল, “তুমি যা খুঁজছ, তা পাওয়ার যোগ্য নও। তুমি তো কেবল এক মৃত্যুকে সঙ্গী করে পথ চলছ।”

আপনার মন্তব্য জানান।

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top