যক্ষপুরীর চাবুক

খাদের অতলে ঝাপ দেওয়ার সাথে সাথে বাতাস যেন জগদীশ বাবুর শরীর থেকে অক্সিজেন শুষে নিল। গোলকধাঁধার অন্ধকার গলিপথগুলো যেন কোনো জীবন্ত প্রাণীর অন্ত্র—এর দেওয়ালগুলো থরথর করে কাঁপছে, আর তার ভেতর থেকে ভেসে আসছে এক অতিপ্রাকৃত গুঞ্জন। তিনি দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে আছড়ে পড়লেন পাথুরে মেঝেতে। ব্যথায় শরীর কুঁকড়ে গেল, কিন্তু জ্ঞান হারানোর অবকাশ নেই।

ঠিক উপরেই, যেখান থেকে তিনি ঝাঁপ দিয়েছেন, সেখানে ছায়া মূর্তিগুলোর অমানবিক অট্টহাসি প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। তারা তাকে ঘিরে ফেলেছে, কিন্তু অদ্ভুতভাবে তারা গোলকধাঁধার সীমানা অতিক্রম করছে না। তিনি বুঝতে পারলেন, এই গোলকধাঁধা এক প্রাচীন রক্ষাকবচ—যা অশুভ শক্তিকে বন্দি করে রাখে, কিন্তু তাকেও একই সাথে বন্দি করেছে।

তিনি উঠে দাঁড়ালেন। লণ্ঠনটি নিভে গেছে, কিন্তু মেঝে থেকে বেরিয়ে আসছে এক মৃদু নীলাভ আলো। তিনি দেখলেন, গোলকধাঁধার দেওয়ালগুলো পাথরের তৈরি নয়, বরং সেগুলো লক্ষ লক্ষ মানুষের হাড় দিয়ে গাঁথা। প্রতিটি হাড়ের ওপর সূক্ষ্ম অক্ষরে খোদাই করা আছে অভিশাপের মন্ত্র। তিনি মানচিত্রটি বের করলেন। মানচিত্রের কালি এখন রক্তের মতো লাল। নির্দেশ করছে গোলকধাঁধার ঠিক মাঝখানে একটি কক্ষের দিকে, যেখানে ‘মহাকাল চত্বর’ লেখা।

তিনি এগোতে শুরু করলেন। পথ চলতে চলতে দেখলেন, দেওয়ালে খোদাই করা মুখগুলো তার গতিবিধির দিকে তাকিয়ে আছে। হঠাৎ এক মোড় ঘুরতেই তিনি থমকে দাঁড়ালেন। সামনেই একটি বিশাল দরজা, যার ওপর কোনো তালা নেই, আছে কেবল একটি মানবমস্তিষ্কের আকৃতির খাঁজ। তার ঝোলা থেকে তিনি সেই প্রাচীন চাবিটি বের করলেন—যা আসলে চাবি নয়, একটি খোদাই করা প্রস্তরখণ্ড। তিনি সেটি খাঁজে বসাতেই মাটি কেঁপে উঠল।

দরজাটি খোলার সাথে সাথে এক তীব্র উষ্ণ স্রোত তাকে ধাক্কা দিল। এটি কোনো কক্ষ নয়, এটি একটি বিশাল ভূগর্ভস্থ মন্দির, যার মাঝখানে উপচে পড়ছে জ্বলন্ত লাভার একটি নদী। লাভার ওপারে দাঁড়িয়ে আছে একটি পাথরের সিংহাসন, আর তার সামনে সেই অশরীরী চাবুকটি ভাসমান অবস্থায় আছে। চাবুকটি এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি উজ্জ্বল, যেন এটি কারো হৃদপিণ্ড থেকে রক্ত শুষে নিয়ে শক্তি সঞ্চয় করছে।

হঠাৎই লাভার নদীর ওপার থেকে ভেসে এল এক গম্ভীর, পুরুষালি কণ্ঠস্বর—যা কোনো মানুষের নয়। “যক্ষপুরীর মালিকানা পেতে হলে, নিজের ছায়া বিসর্জন দিতে হবে। তুমি কি প্রস্তুত, প্রত্নতাত্ত্বিক?”

জগদীশ বাবু চারপাশ দেখলেন। কোনো মানুষ নেই, কিন্তু কথাগুলো যেন দেয়াল থেকে বেরিয়ে আসছে। তিনি বুঝতে পারলেন, এই পরীক্ষাটি তার ধৈর্য বা শক্তির নয়, এটি তার অস্তিত্বের। যদি তিনি ছায়া বিসর্জন দেন, তবে তিনি অমর হবেন, কিন্তু তার মানবীয় সত্তা হারিয়ে যাবে। আর যদি না দেন, তবে চাবুকটি তাকে চিরতরে দাস বানিয়ে নেবে।

তিনি সাহসের সাথে চিৎকার করে বললেন, “আমি দাসত্ব করতে আসিনি, আমি অভিশাপ মুক্ত করতে এসেছি!”

সাথে সাথে লাভার নদী থেকে আগুনের শিখাগুলো দানবের রূপ নিল। পাঁচটি শিখা পাঁচটি বিশাল যোদ্ধার আকার ধারণ করল। তারা জগদীশ বাবুর দিকে তেড়ে এল। তিনি তার কাছে থাকা প্রত্নতাত্ত্বিক খননের কুঠারটি হাতে নিলেন। যদিও সেটি তলোয়ার নয়, কিন্তু তার ওপর প্রাচীন মন্ত্র খোদাই করা। আগুনের যোদ্ধাদের সাথে তার মরণপণ লড়াই শুরু হলো।

প্রতিটি আঘাতে আগুন তার চামড়া ঝলসে দিচ্ছে। কিন্তু তিনি থামলেন না। তিনি যোদ্ধাদের আক্রমণ এড়িয়ে সরাসরি সেই ভাসমান চাবুকের দিকে দৌড় দিলেন। যোদ্ধারা তাকে ঘিরে ধরছে। তিনি দেখলেন, চাবুকটির সামনে

আপনার মন্তব্য জানান।

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top