যাওয়ার একমাত্র পথ হলো সেই জ্বলন্ত লাভার ওপর রাখা সংকীর্ণ পাথুরে সেতুটি। তিনি লাফ দিয়ে সেতুতে উঠলেন। সেতুটি প্রচণ্ড উত্তাপে গরম হয়ে আছে।
তিনি যখন চাবুকের হাতল স্পর্শ করতে গেলেন, ঠিক তখনই তার নিজের ছায়াটি তার পায়ের কাছ থেকে আলাদা হয়ে তাকে জড়িয়ে ধরল। ছায়াটি তাকে দম বন্ধ করে মারার চেষ্টা করছে। তার দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসছে। তিনি দেখলেন, লাভার গভীরে হাজার হাজার মানুষ হাত বাড়িয়ে তাকে ডাকছে—তার পূর্বসূরিরা, যারা এই অভিযানে এসে হারিয়ে গিয়েছিল।
তিনি নিজের শেষ শক্তি দিয়ে কুঠারটি ছায়ার ওপর বসিয়ে দিলেন। সাথে সাথে এক বিকট চিৎকারে পুরো গুহা কেঁপে উঠল। ছায়াটি ধোঁয়ায় পরিণত হলো, আর চাবুকটি ঝনঝন শব্দে মাটিতে আছড়ে পড়ল। কিন্তু সেই মুহূর্তেই গুহার ছাদ ধসে পড়তে শুরু করল। জ্বলন্ত পাথর তার চারপাশে বৃষ্টির মতো ঝরছে। তিনি চাবুকটি হাতে তুলে নিলেন—সেটি এখন আর গরম নয়, বরফের মতো ঠান্ডা।
তিনি প্রাণপণে দৌড় দিলেন গুহার বাইরের দিকে। তার পেছনে ধসে পড়ছে মন্দির। তিনি দেখলেন, গুহার শেষে একটি আলোর বিন্দু। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর আগেই তার পায়ের তলার মেঝেটা পুরোপুরি ধসে গেল। তিনি এখন শূন্যে ঝুলছেন, এক হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরা সেই অভিশপ্ত চাবুক, আর অন্য হাত দিয়ে আঁকড়ে ধরে আছেন একটি জ্বলন্ত শিকড়। নিচে আগ্নেয়গিরির উত্তাল লাভা। তিনি কি এখান থেকে ফিরতে পারবেন?
আগ্নেয়গিরির উত্তপ্ত লাভার ওপর জ্বলন্ত শিকড়টি ধরে ঝুলে থাকা জগদীশ বাবুর হাতের চামড়া পুড়ে কষ বেয়ে রক্ত ঝরছে। শিকড়টি যেকোনো মুহূর্তে ছিঁড়ে যাবে। নিচে লাভাস্রোত দানবীয় গর্জন করছে। তিনি বুঝতে পারলেন, এই শিকড়টি কোনো সাধারণ গাছ নয়; এটি এই প্রাচীন মন্দিরের ভিত্তিপ্রস্তরকে ধরে রেখেছে। তিনি যদি নিচে পড়েন, তবে আগুনের সমুদ্রে তার অস্তিত্ব চিরতরে মুছে যাবে।
তিনি সেই চাবুকটি শক্ত করে ধরে এক অদ্ভুত শক্তি অনুভব করলেন। চাবুকটি তার হাতের মুঠোয় যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছে। এটি এখন আর কোনো বস্তু নয়, এটি যেন তার হাত আর স্নায়ুর অংশ হয়ে গেছে। চাবুক থেকে নির্গত এক অদৃশ্য নীল আভা তাকে আগুনের তীব্র তাপ থেকে রক্ষা করছে। এই শক্তি তাকে অভিশাপ থেকে মুক্তি দিচ্ছে না, বরং অভিশাপের ওপর নিয়ন্ত্রণ দিচ্ছে।
নিজের শরীরের সমস্ত শক্তি একত্র করে তিনি শিকড় থেকে লাফ দিলেন খাদের গায়ে বেরিয়ে থাকা একটি পাথুরে তাকের ওপর। তাকটি নড়বড়ে, কিন্তু এটাই তার বাঁচার একমাত্র পথ। তিনি তাকটি ধরে দেওয়াল বেয়ে উপরে ওঠার চেষ্টা করলেন। প্রতিটি পদক্ষেপে দেয়াল থেকে পাথরের টুকরো খসে পড়ছে। ওপরে গুহার ছাদে এখন ফাটল দেখা দিয়েছে, সেখান থেকে আকাশ দেখা যাচ্ছে—এক বিশাল পূর্ণিমা চাঁদ যেন এই ধ্বংসলীলার সাক্ষী হয়ে আছে।
তিনি গুহার শেষ সীমানায় পৌঁছাতেই দেখলেন, পথ বন্ধ। তার সামনে একটি বিশাল পাথরের মূর্তি, যার মুখে কোনো ভাষা নেই, কিন্তু চোখগুলো দিয়ে অবিরাম রক্ত ঝরছে। মূর্তিটির কপালে খোদাই করা সেই একই প্রতীক—সাপ ও চাবুক। মূর্তিটি পথ আগলে দাঁড়িয়ে আছে। তিনি বুঝতে পারলেন, এটিই সেই ‘যক্ষপুরীর রক্ষী’। এটি কোনো পাথর নয়, এটি একটি জীবন্ত অভিশাপ।
মূর্তিটি তার পাথুরে হাত বাড়িয়ে জগদীশ বাবুকে পিষে ফেলার উপক্রম করল। তিনি তার হাতে থাকা চাবুকটি শূন্যে ঘোরালেন। চাবুকের নীল আভা মূর্তির বুকে আছড়ে পড়ল। মূর্তির শরীরে ফাটল ধরল। কিন্তু তাতে তার