চাবুক। মোহরের ভারে তিনি মেঝেতে তলিয়ে যাচ্ছেন, আর তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ‘নিজের’ প্রতিচ্ছবিটি অট্টহাসি হাসছে। সত্তাটি স্থির দাঁড়িয়ে আছে, যেন সে কোনো ছায়াও নয়, কোনো রক্ত-মাংসের মানুষও নয়, বরং এক অমোঘ পরিণতি।
জগদীশ বাবু তার হাতের নীল হয়ে যাওয়া আঙুলগুলো মুঠো করলেন। অভিশপ্ত চাবুকটি এখন জ্বলন্ত অঙ্গারের মতো তেতে উঠেছে। তিনি বুঝতে পারলেন, মোহরের এই পাহাড় আসলে কোনো ধনসম্পদ নয়, এটি অতীতে যারা এই চাবুকের লোভে পড়েছিল, তাদের আত্মার অবশেষ। তিনি চাবুকটি মোহরের স্তূপের ওপর আছড়ে ফেললেন। এক তীব্র বৈদ্যুতিক ঝলকানিতে মোহরগুলো ছিটকে গেল, আর তিনি ধুলোর ভেতর থেকে উঠে দাঁড়ালেন।
প্রতিচ্ছবিটি ভ্রু কুঁচকে তাকাল। সে জগদীশ বাবুর দিকে এগিয়ে এসে তার গলা চেপে ধরল। সত্তাটির স্পর্শ বরফের মতো ঠান্ডা। সে ফিসফিস করে বলল, “তুমি নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করছ, কিন্তু তুমি তো নিজেই এই চাবুকের উত্তরাধিকারী। তোমার রক্তেই তো এই পুরীর তৃষ্ণা মেটানোর ক্ষমতা আছে।”
জগদীশ বাবুর শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। তিনি অনুভব করলেন, তার গলার ভেতর দিয়ে বিষাক্ত এক তরল নেমে যাচ্ছে। এটি সেই অভিশাপ, যা তাকে ধীরে ধীরে সেই সত্তার রূপান্তর ঘটাচ্ছে। তিনি তার বাম হাত দিয়ে পকেট থেকে সেই তালপাতার মানচিত্রটি বের করলেন। মানচিত্রটি এখন পুরোপুরি কালো, কেবল মাঝখানে একটি বিন্দু জ্বলছে। তিনি বুঝলেন, এই মন্দিরের গভীরে কোনো গোপন উৎস আছে, যা এই সত্তার শক্তির উৎস।
তিনি সত্তাটির বুকের ওপর চাবুকের হাতল দিয়ে প্রচণ্ড এক আঘাত করলেন। সত্তাটি পিছিয়ে গেল না, বরং তার বুক দিয়ে কালো ধোঁয়া বের হতে লাগল। এই ধোঁয়া মন্দিরের মেঝেতে ছড়িয়ে পড়তেই মেঝে ফেটে চৌচির হয়ে গেল। নিচে দেখা গেল অগণিত মৃতদেহের কঙ্কাল—সবাই প্রাচীন যোদ্ধা, যারা এই মন্দির পাহারা দিত। কঙ্কালগুলো ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে জগদীশ বাবুকে ঘিরে ফেলল।
মন্দিরের ছাদ দিয়ে বৃষ্টির মতো রক্ত ঝরতে শুরু করল। মন্দিরের ভেতরটা এখন এক কসাইখানার রূপ নিয়েছে। ছাদ থেকে ঝরতে থাকা সেই রক্তে জগদীশ বাবুর শরীর সিক্ত। তিনি দেখলেন, রক্তের প্রতিটি ফোঁটা যেখানে পড়ছে, সেখানে নতুন এক অদৃশ্য লতা জন্ম নিচ্ছে এবং তার পা জড়িয়ে ধরছে। তাকে বন্দি করা হচ্ছে এই মন্দিরের বলিদান মঞ্চে।
সত্তাটি আবার কাছে এগিয়ে এলো। সে বলল, “বলিদান চাই, জগদীশ। যক্ষপুরী বিনা রক্তে কখনো তার চাবুক ফিরিয়ে নেয় না।”
জগদীশ বাবু তার কুঠারটি খুঁজে পেলেন না, কিন্তু তার হাতে চাবুকটি এখন আগুনের মতো জ্বলছে। তিনি তার শরীরের সমস্ত যন্ত্রণা, ভয় আর ক্ষোভ চাবুকের ওপর চালিত করলেন। তিনি চিৎকার করে উঠলেন, “আমি আমার রক্ত দেব না, আমি দেব এই চাবুকের শেষ মুহূর্ত!”
তিনি শূন্যে চাবুকটি ঘোরালেন। চাবুকের নীল শিখা মন্দিরটিকে আলোয় ভাসিয়ে দিল। সেই আলোয় মন্দিরের দেয়ালগুলো স্বচ্ছ হয়ে গেল, তিনি দেখলেন বাইরের জগত—বাংলাদেশের সেই গহীন অরণ্য থেকে শুরু করে ভারতের এই মন্দির পর্যন্ত এক অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা। যক্ষপুরী কোনো জায়গা নয়, যক্ষপুরী হলো এক জালের নাম, যা পৃথিবীকে গ্রাস করে রেখেছে।
তিনি চাবুকটি মূর্তির দিকে নয়, বরং মন্দিরের মাঝখানের সেই রক্তের ঝরনার ওপর মারলেন। সাথে সাথে মন্দিরটি কেঁপে উঠল। ছাদ ধসে পড়ছে, বড় বড় পাথরের চাঙড় পড়ছে তার চারপাশে। কঙ্কালগুলো ছাইয়ে