খোদাই করা চিত্রগুলোতে দেখা যাচ্ছে, একদল মানুষ এক বিশাল ধনভাণ্ডার বয়ে নিয়ে যাচ্ছে, আর তাদের পেছনে দাঁড়িয়ে এক অদৃশ্য সত্তা, যার হাতে চাবুক। নিচে লেখা— ‘যক্ষপুরীর চাবুক, যা লয় করে রক্ত, পায় না মুক্তি’।
ঠিক সেই মুহূর্তে চাতালটি ধসে পড়ার শব্দ শোনা গেল। তিনি বুঝতে পারলেন, ওপর থেকে সেই সত্তাটি কোনো পাথর বা ভারী কিছু ফেলছে। তিনি দৌড় দিলেন সুরঙ্গটার গভীরে। সুরঙ্গটি ক্রমশ নিচের দিকে ঢালু হয়ে নেমে গেছে। বাতাসের বেগ বাড়ছে। দেয়ালগুলো থেকে জল চুইয়ে পড়ছে, কিন্তু সেই জল সাধারণ বৃষ্টির জল নয়—সেটা ঘন, আঠালো এবং রক্তিম।
হঠাৎ তার পায়ের নিচে মাটি সরে গেল। তিনি গড়িয়ে পড়লেন এক বিশাল কক্ষের মাঝে। লণ্ঠনটি হাত থেকে ছিটকে দূরে গিয়ে পড়ল। অন্ধকারে তিনি শুধু শুনতে পাচ্ছেন নিজের হৃদস্পন্দন। চারপাশ থেকে ভারী কোনো ধাতুর নড়াচড়ার শব্দ ভেসে আসছে। যেন কোনো প্রাচীন যান্ত্রিক প্রহরী জেগে উঠেছে। তিনি উঠে দাঁড়াতেই তার হাতের তালুতে কিছু একটা অনুভব করলেন। ঠান্ডা, শক্ত, ধাতব। এটি সেই চাবি যা তিনি ডায়েরির ভেতর পেয়েছিলেন।
হঠাৎই কক্ষের চারকোণে চারটি মশাল দপ করে জ্বলে উঠল। আগুনের শিখা নীল। নীল আগুনের আলোয় তিনি দেখলেন, পুরো কক্ষটি প্রাচীন সোনার কয়েন এবং রত্নপাথরে পূর্ণ। কিন্তু এই সম্পদ সাধারণ নয়—প্রতিটি কয়েনের গায়ে রক্তমাখা মানুষের মুখ খোদাই করা। ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে এক বিশাল পাথরের মূর্তি, যার হাতে চাবুকটি নেই। চাবুকটি এখন শূন্যে ভাসছে, এবং সেটি ধীরে ধীরে জগদীশ বাবুর দিকে এগিয়ে আসছে।
তিনি বুঝতে পারলেন, এই ধনভাণ্ডার পাহারা দেওয়ার জন্য কোনো জীবন্ত মানুষ নেই, আছে এই অভিশপ্ত চাবুক—যা নিজেই নিজের মালিকানা দাবি করছে। চাবুকটি তার গলা জড়িয়ে ধরার উপক্রম করতেই তিনি তার ঝোলা থেকে একটি ছোট প্রত্নতাত্ত্বিক ব্রাশ বের করে সেটা দিয়ে চাবুকের ওপর খোদাই করা প্রতীকে চাপ দিলেন। সাথে সাথে এক প্রচণ্ড বিদ্যুৎস্পর্শে তার সারা শরীর কেঁপে উঠল। চাবুকটি ছিটকে গিয়ে মূর্তির পায়ের কাছে পড়ল। কিন্তু নিস্তব্ধতা ভাঙল এক কান ফাটানো চিৎকারে।
কক্ষটির ছাদ থেকে ধুলো ঝরছে। দেয়ালগুলো সরতে শুরু করেছে। তিনি দেখলেন, দরজার বাইরে অগণিত ছায়া মূর্তি সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে। তারা ভেতরে আসার জন্য উদগ্রীব। তিনি পকেট থেকে মানচিত্রটা বের করলেন। মানচিত্রের সেই প্রাচীন মন্দিরের চিহ্নটি এখন উজ্জ্বল হয়ে জ্বলছে। তিনি বুঝতে পারলেন, এটিই তার পরবর্তী গন্তব্য।
তিনি দৌড়ে কক্ষের অন্য প্রান্তের একটি সরু ফাটল দিয়ে বেরোনোর চেষ্টা করলেন। ফাটলটি দিয়ে গলতে গলতে দেখলেন, পেছনের কক্ষটি পাথরের বিশাল স্ল্যাবে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেল। কিন্তু তিনি একা নন। ফাটলের ভেতরেই আরেকটি হাত তার পা টেনে ধরার চেষ্টা করল। সেই হাতের চামড়া নেই, শুধু হাড়। তিনি পায়ের লাথি মেরে সেই হাড়ের হাতটি ভেঙে দিলেন।
তিনি এখন এক অন্ধকার গলি দিয়ে ছুটছেন। বাঁচার পথ কোথায়? তার মনে হলো, কেউ তাকে অনুসরণ করছে না, বরং সবাই তার জন্য অপেক্ষা করছে সামনে। প্রতিটা মোড়ে মোড়ে নতুন নতুন বিপদ। তিনি একটি পাথরের দরজার সামনে এসে থামলেন। দরজায় একটি অদ্ভুত লক সিস্টেম। তার হাতের সেই চাবিটা কি এখানে লাগবে? তিনি চাবিটা লকের খাঁজে ঢোকাতে গেলেন, ঠিক তখনই তার কানের কাছে এক ফিসফিসানি শোনা গেল— ‘যক্ষপুরী তার চাবুক ফেরত চায়, নয়তো প্রাণ।’
তিনি চাবি ঘোরালেন। দরজা খোলার শব্দে চারপাশ কেঁপে উঠল। কিন্তু দরজা খুলে যা দেখলেন, তাতে তার আত্মা শুকিয়ে গেল। দরজাটা কোনো বাইরের জগতের দিকে খোলেনি, বরং সেটি খোলেনি এক বিশাল সাপসংকুল কুয়ার