যক্ষপুরীর চাবুক

গতি কমল না। মূর্তিটি একটি গগনবিদারী চিৎকার করে উঠল, যা পাহাড়ের চূড়ায় প্রতিধ্বনিত হলো। সেই চিৎকারে পাহাড়ের বরফ গলতে শুরু করল এবং শুরু হলো এক প্রচণ্ড তুষারধস।

এই গুহার ভেতর এখন বরফের স্রোত নামছে। একপাশে লাভা, অন্যপাশে তুষারধস—জগদীশ বাবু এক অসম্ভব পরিস্থিতির মাঝে আটকে পড়েছেন। তিনি বুঝতে পারলেন, এই দুই শক্তির ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে বলেই যক্ষপুরীর অভিশাপ দানা বেঁধেছে। তাকে এই ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে হবে। তিনি চাবুকটি মূর্তির কপালে খোদাই করা প্রতীকের ওপর সজোরে আঘাত করলেন।

বিদ্যুৎ চমকাল। নীল শিখা আর বরফের সংঘর্ষে গুহার ভেতরটা অন্ধকার হয়ে গেল। জগদীশ বাবু জ্ঞান হারালেন। কতক্ষণ তিনি অচৈতন্য ছিলেন জানেন না, কিন্তু যখন চোখ খুললেন, দেখলেন তিনি শুয়ে আছেন এক প্রাচীন মন্দিরের চত্বরে। এটি ভারতের কোনো অখ্যাত পাহাড়ী এলাকার প্রাচীন সূর্য মন্দির। চারপাশ নিস্তব্ধ।

মন্দিরের স্থাপত্য দেখে তিনি অবাক হলেন। এটি তার দেখা সেই মানচিত্রের সাথে হুবহু মিলছে। তবে তার শরীরের অবস্থা ভয়াবহ। তার ডান হাতটি নীল হয়ে গেছে—চাবুকের শক্তির প্রভাবে। তিনি উঠে দাঁড়ালেন। মন্দিরের গম্বুজ থেকে বৃষ্টির মতো ঝরছে এক অদ্ভুত কুয়াশা। সেই কুয়াশার মধ্যে তিনি দেখতে পেলেন বহু ছায়া মূর্তিকে। তারা তাকে আক্রমণ করছে না, বরং একটি বৃত্ত তৈরি করে দাঁড়িয়ে আছে।

তারা তাকে কিছু একটা বলতে চাইছে। তিনি চাবুকটি উঁচিয়ে ধরলেন। চাবুকটি এখন মৃদু কম্পিত হচ্ছে। মন্দিরের গর্ভগৃহ থেকে ভেসে আসছে একটি সংগীতের সুর—যা অনেক শতাব্দী ধরে কেউ শোনেনি। সুরটির প্রতিটি তানে লুকিয়ে আছে যক্ষপুরীর ধ্বংসের গোপন রহস্য। তিনি মন্দিরের প্রধান ফটকের দিকে পা বাড়ালেন। কিন্তু ফটকের সামনে আসতেই দেখলেন, একটি অদৃশ্য প্রাচীর তাকে বাধা দিচ্ছে।

প্রাচীরটি স্পর্শ করতেই তার স্মৃতিতে ভেসে উঠল কয়েকশ বছর আগের দৃশ্য। তিনি দেখলেন, একদল সন্ন্যাসী এই মন্দিরে এই অভিশপ্ত চাবুকটি লুকানোর জন্য কত বড় ত্যাগ স্বীকার করেছিলেন। তিনি এখন আর শুধু একজন প্রত্নতাত্ত্বিক নন, তিনি এই ইতিহাসের ধারক। মন্দিরের গর্ভগৃহের দরজার সামনে একটি প্রাচীন লিখন দেখা যাচ্ছে—‘রক্ত দিয়ে যা অর্জিত, রক্ত দিয়েই তার সমাপ্তি’।

তিনি তার হাতের কাটা দাগ থেকে রক্ত চাবুকের ওপর ফেললেন। মুহূর্তেই মন্দিরের দরজা খুলে গেল। ভেতরে অন্ধকার। অন্ধকারের ভেতর থেকে একজোড়া জ্বলজ্বলে চোখ তার দিকে তাকিয়ে আছে। সেই সত্তাটি আবার ফিরে এসেছে, কিন্তু এবার সে এক মানুষের রূপ নিয়েছে। সেই মানুষটি হুবহু জগদীশ বাবুর মতোই দেখতে!

সত্তাটি তার দিকে এগিয়ে এসে বলল, “তুমি যা করছ, তা কেবল ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি মাত্র। যক্ষপুরী তোমার জন্য নতুন সিংহাসন সাজিয়ে রেখেছে।”

জগদীশ বাবু তার পিস্তল বের করলেন, কিন্তু পিস্তলটি পাথরে পরিণত হয়ে গেল। তার একমাত্র সম্বল এখন সেই চাবুক। সত্তাটি তার দিকে হাত বাড়িয়ে দিল—যেন সে তার শরীর দখল করতে চাইছে। ঠিক সেই মুহূর্তে মন্দিরের মেঝে থেকে বেরিয়ে এল হাজার হাজার সোনার মোহর। সেই মোহরগুলো যেন তাকে টেনে ধরছে। তিনি মোহরের স্তূপের মধ্যে হারিয়ে যাচ্ছেন।

সোনার মোহরের স্তূপ যেন জীবন্ত সাপের মতো জড়িয়ে ধরছে জগদীশ বাবুকে। একেকটি মোহর তার চামড়ায় গেঁথে যাচ্ছে, যেন তার মাংসের সাথে মিশে যেতে চাইছে। প্রতিটি মোহরের গায়ে সেই অশুভ চিহ্ন—সাপ আর

আপনার মন্তব্য জানান।

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top