১৯৫২ সালের জুন মাস। আমাজনের বুক চিরে বয়ে চলা এক বেনামী উপনদীর কুচকুচে কালো জলের ওপর দিয়ে আমাদের ছোট মোটরচালিত নৌকাটা এগিয়ে চলছিল। চারপাশের বাতাস এতটাই ভারী আর আর্দ্র যে, শ্বাস নিতে গেলে মনে হচ্ছিল জলীয় বাষ্প ফুসফুসে জমে যাচ্ছে। মাথার ওপর প্রাচীন মহীরুহদের পাতা আর ডালপালার এমন এক দুর্ভেদ্য চাঁদোয়া তৈরি হয়েছে, যার কারণে ভরদুপুরেও নিচে নেমে এসেছে এক মায়াবী, ভুতুড়ে গোধূলি আলো। এখানে কোনো ঋতুর বদল নেই, আছে শুধু এক অনন্ত, শ্বাসরোধকারী স্যাঁতসেঁতে উত্তাপ আর পচা পাতার তীব্র গন্ধ।
আমার বুটের তলায় জলছাপ লেগে থাকা চামড়ার ব্যাগটার ভেতর যত্নে রাখা আছে ১৯২০ সালের একটি ডায়েরি। ডায়েরিটি আমার দাদু, বিখ্যাত ব্রিটিশ অভিযাত্রী স্যার রিচার্ড হেন্ডারসনের। আজ থেকে ঠিক বত্রিশ বছর আগে তিনি এই নরককুণ্ডে হারিয়ে গিয়েছিলেন। লন্ডনের ধুলোবালি জমা লাইব্রেরি ঘর থেকে যখন আমি তাঁর এই ব্যক্তিগত ডায়েরি আর তার ভাঁজে লুকিয়ে থাকা হাতে আঁকা অদ্ভুত রুট ম্যাপটা খুঁজে পাই, তখন আমার ধমনীতে রক্ত নাচতে শুরু করেছিল। ম্যাপের শেষ প্রান্তে দাদুর কাঁপা কাঁপা হাতের লেখায় লেখা ছিল—‘দ্য গ্রিন সিটি… গড ফরগিভ আস, ইট ইজ অ্যালাইভ!’
“সেনর আর্থার, আর বেশিদূর যাওয়া ঠিক হবে না।”
চমক ভেঙে আমি তাকালাম আমার গাইড ম্যানুয়েলের দিকে। ম্যানুয়েল এই অঞ্চলের আদি বাসিন্দা, যার গায়ের চামড়া আমাজনের মাটির মতোই তামাটে আর শক্ত। কিন্তু এই মুহূর্তে তার সেই শক্ত মুখেও ভয়ের স্পষ্ট ছাপ। সবচেয়ে রহস্যময় হলো ম্যানুয়েলের ডান হাতটা। কনুইয়ের নিচ থেকে তার ডান হাতটা কাটা। কোনো ধারালো অস্ত্র দিয়ে নয়, দেখলে মনে হয় কোনো হিংস্র পশু কামড়ে তার মাংস আর হাড় উপড়ে নিয়েছে। কিন্তু ম্যানুয়েল কখনো বলে না কীভাবে সে হাতটা হারিয়েছে। যখনই জিজ্ঞেস করেছি, সে তার বাম হাত দিয়ে ক্রশ চিহ্ন এঁকে চুপ করে গেছে।
“কেন ম্যানুয়েল? ম্যাপ অনুযায়ী আমরা তো একদম সঠিক পথেই আছি,” আমি আমার কাঁধে ঝোলানো পুরনো লি-এনফিল্ড রাইফেলটা একটু ঠিক করে নিয়ে বললাম। ১৯৫২ সালের এই দুর্গম জঙ্গলে এই একটা অস্ত্রই আমার একমাত্র ভরসা।
“ম্যাপ মানুষের তৈরি হতে পারে সেনর, কিন্তু এই জঙ্গল শয়তানের তৈরি,” ম্যানুয়েল নৌকার গতি কমিয়ে একটা প্রকাণ্ড, জলমগ্ন গাছের শিকড়ের পাশে এসে দাঁড় করাল। “এই সীমানার পর থেকে পাখিরা গান গায় না, বানরেরা ডাকে না। খেয়াল করে দেখুন, চারপাশটা কেমন নিঝুম।”
ম্যানুয়েলের কথাই সত্য। গত এক ঘণ্টা ধরে জঙ্গলের চিরচেনা ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক বা জ্যাকারান্দা পাখির কিচিরমিচির একদম বন্ধ। এক অলৌকিক, থমথমে নীরবতা গ্রাস করেছে পুরো পরিবেশকে। শুধু পানির ছলাৎ ছলাৎ শব্দ আর আমাদের নিজেদের শ্বাসের আওয়াজ ছাড়া আর কিচ্ছু নেই। গাছের গা বেয়ে নেমে এসেছে মোটা মোটা লতা, যেন হাজারটা অজগর সাপ ওপর থেকে নিচে ঝুলছে।