আমি মনে মনে অনুবাদ করার চেষ্টা করলাম: ‘এই জঙ্গল কোনো সাধারণ উদ্ভিদ নয়। এটি পৃথিবীর সৃষ্টির সময়কার প্রথম প্রাণ। এটি মানুষকে হত্যা করে না, বরং তার চেতনাকে নিজের সাথে যুক্ত করে অমরত্ব দেয়। এখান থেকে বের হওয়ার একমাত্র পথ—এই আদিম হৃদপিণ্ডের ক্ষুধা অন্য কিছু দিয়ে শান্ত করা। এর জঠর থেকে বের হওয়ার সুড়ঙ্গটি ঠিক এই বেদির নিচেই লুকিয়ে আছে।’
“ক্ষুধা শান্ত করা…” আমি ফিসফিস করে বললাম।
ঠিক তখনই, ছাদের সেই প্রকাণ্ড মাংসাশী হৃদপিণ্ডটা যেন আমার উদ্দেশ্য বুঝতে পারল। ওটার গা থেকে চাবুকের মতো চারটে মোটা লাল শিকড় ছিটকে বের হয়ে এলো সোজা আমার দিকে। একই সাথে, ম্যানুয়েল যে শিকড়টা ধরে ঝুলে ছিল, সেটি নিজে থেকেই আলগা হতে শুরু করল। ম্যানুয়েল ভারসাম্য হারিয়ে সরাসরি নিচের সেই ফুটন্ত অ্যাসিডের নদীর দিকে পড়ে যেতে লাগল!
“সেনর আর্থার! বাঁচান!” ম্যানুয়েলের দুই হাতহীন শরীর বাতাসে ছটফট করে উঠল।
আমি একদিকে সেই ধেয়ে আসা লাল শিকড়গুলোর আক্রমণ থেকে বাঁচতে নিজেকে মাটিতে ছুঁড়ে দিলাম, আর অন্য দিকে আমার একমাত্র ভালো হাত বাড়িয়ে দিলাম ম্যানুয়েলকে ধরার জন্য। কিন্তু ম্যানুয়েল আমার হাতের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছিল। ঠিক তখনই, বেদির চারপাশের পাথরগুলো এক তীব্র ঘর্ষণের শব্দে দুপাশে সরতে শুরু করল। প্রকাশ পেল এক অন্ধকার, খাড়া সুড়ঙ্গ—যার নিচ থেকে বয়ে আসছে তাজা নদীর জলের তীব্র হাওয়া! কিন্তু সেই মুক্তির পথের মুখেই ম্যানুয়েল এখন মৃত্যুর অতল গহ্বরে তলিয়ে যাচ্ছে, আর সেই প্রকাণ্ড লাল শিকড়গুলো আমার পিঠের ওপর এসে আঘাত হানার জন্য এক ইঞ্চি উঁচুতে অবস্থান করছে!
লাল শিকড়গুলো যখন চাবুকের মতো বাতাসে শাঁ শাঁ শব্দ তুলে আমার পিঠের ওপর নেমে আসছিল, ঠিক সেই মুহূর্তে আমি আমার জীবনের সবচেয়ে বড় জুয়াটা খেললাম। নিজের শরীরটাকে এক পাশে মোচড় দিয়ে আমি বেদির ওপর থেকে সরাসরি নিচে পতনোন্মুখ ম্যানুয়েলের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়লাম।
আমি আমার ডান হাত দিয়ে ম্যানুয়েলের জ্যাকেটের কলারটা খপ করে চেপে ধরলাম। একই সেকেন্ডে ছাদের সেই দানবীয় হৃদপিণ্ড থেকে ধেয়ে আসা চারটে মোটা শিকড় বেদির পাথরে সজোরে আঘাত করল। প্রকাণ্ড পাথরের চাঁইটা সেই আঘাতে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল। যদি আমরা আর এক মুহূর্ত সেখানে থাকতাম, তবে আমাদের শরীর দুটো পিষে মণ্ড হয়ে যেত।
আমার পুরো শরীরের ভর এখন একটা মাত্র ঝুলন্ত লতার ওপর। বাম হাত দিয়ে লতাটা আঁকড়ে ধরে আছি, আর ডান হাতে ঝুলছে ম্যানুয়েলের দুই হাতহীন অবশ শরীর। আমাদের ঠিক দুই ফুট নিচেই তখন টগবগ করে ফুটছে সেই কালচে লাল অ্যাসিডের নদী। ওখান থেকে ওঠা ঝাঁঝালো ধোঁয়ায় আমার চোখের মণি দুটো যেন পুড়ে যাচ্ছিল।
“সেনর… আমাকে ছেড়ে দিন… আপনি ওই সুড়ঙ্গে ঢুকুন!” ম্যানুয়েল তীব্র বাতাসে ফুসফুস ফেটে যাওয়া গলায় চিৎকার করে উঠল।
“একসাথে মরব, নয়তো একসাথে বাঁচব!” আমি দাঁতে দাঁত চেপে গর্জন করলাম।