“সেনর আর্থার! আমাকে ছেড়ে দিন! আপনি ভেতরে যান!” ম্যানুয়েল কর্কশ গলায় চিৎকার করে উঠল, তার চোখ দুটো কোটর থেকে বেরিয়ে আসার উপক্রম।
“চুপ করো, ম্যানুয়েল!” আমি চেঁচিয়ে উঠলাম।
আমার বাম হাতের তালু থেকে তখনো তাজা রক্ত টপটপ করে ঝরছিল। সেই কাটা হাত দিয়েই আমি আমার ফেলে দেওয়া লি-এনফিল্ড রাইফেলটা কুড়িয়ে নিলাম। এক হাত দিয়ে রাইফেল চালানো প্রায় অসম্ভব, কিন্তু এই মুহূর্তে আমার মাথায় তখন আদিম এক টিকে থাকার নেশা চেপে বসেছে। রাইফেলের কুঁদোটা বগলে চেপে ধরে আমি ম্যানুয়েলের হাত পেঁচিয়ে ধরা কালো লতাটার মাঝখানটা লক্ষ্য করে ট্রিগার চাপলাম।
ধুম!
রাইফেলের তীব্র ধাক্কায় আমার কাঁধের হাড় যেন চটকে গেল। কিন্তু নিশানা ভুল হয়নি। বুলেটটা লতার একটা বড় অংশ উড়িয়ে দিল। ছিটকে বের হলো কালচে সবুজ আঠালো রস। লতাটা যন্ত্রণায় ছটফট করে ম্যানুয়েলের হাতটা ছেড়ে দিল, কিন্তু পরমুহূর্তেই তার ক্ষতবিক্ষত অংশ থেকে আরও তিনটা নতুন উপশাখা তীরের মতো ম্যানুয়েলের দিকে ধেয়ে এলো।
আমি রাইফেল ফেলে দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লাম ম্যানুয়েলের ওপর। তাকে এক হ্যাঁচকা টানে পাথরের তোরণের ভেতরের দিকে টেনে নিলাম। ঠিক সেই মুহূর্তেই, প্রকাণ্ড পাথরের চাঁইটা এক তীব্র ঘর্ষণের শব্দ তুলে বন্ধ হয়ে গেল। বাইরের আলো পুরোপুরি মুছে গেল। জঙ্গল আর তার ভেতরের সেই মাংসাশী দানবদের শব্দ এক লহমায় স্তব্ধ হয়ে গেল, যেন কেউ পৃথিবীর সব আওয়াজ একটা বোতাম টিপে বন্ধ করে দিয়েছে।
চারপাশে এখন ঘুটঘুটে, নিচ্ছিদ্র অন্ধকার। শুধু আমাদের দুজনের ভারী শ্বাসের শব্দ আর ম্যানুয়েলের যন্ত্রণাকাতর গোঙানি এই বদ্ধ সুড়ঙ্গের বাতাসকে কাঁপিয়ে তুলছিল। বাতাসে এক ধরণের প্রাচীন, বন্ধ স্যাঁতসেঁতে গন্ধ, যেন কোনো কবরখানার নিচে আমরা এসে দাঁড়িয়েছি।
“ম্যানুয়েল? তুমি ঠিক আছো?” আমি পকেটে হাত দিয়ে দিয়াশলাইয়ের বাক্সটা খুঁজলাম। ১৯৫২ সালের এই ওয়াটারপ্রুফ দেশলাইয়ের বাক্সটাই এখন আমাদের একমাত্র আলোর উৎস।
একটা কাঠি জ্বালতেই চারপাশটা সামান্য আলোকিত হয়ে উঠল। আগুনের হলুদ আলোয় যা দেখলাম, তাতে আমার শিরদাঁড়া বেয়ে শীতল স্রোত বয়ে গেল। ম্যানুয়েলের বাম হাতটার চামড়া অলৌকিক উপায়ে কালো হয়ে গেছে। ওই লতার কাঁটাগুলো শুধু তার মাংস ফোটায়নি, তার শরীরের ভেতরে কোনো তীব্র বিষ বা পরজীবী ঢুকিয়ে দিয়েছে। তার হাতের শিরাগুলো কালচে রঙের হয়ে ফুলে উঠেছে, আর সেগুলো চামড়ার নিচে সাপের মতো নড়াচড়া করছে!
“সেনর…” ম্যানুয়েল বিড়বিড় করল, তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। “ওরা… ওরা আমার ভেতরে ঢুকে গেছে। বত্রিশ বছর আগে… ঠিক এভাবেই আমার ডান হাতটা…”
কথা শেষ করতে পারল না ম্যানুয়েল। সে জ্ঞান হারিয়ে মাটির ওপর ধপাস করে পড়ে গেল।
দিয়াশলাইয়ের কাঠিটা নিভে গেল। আবার সব অন্ধকার। আমি দ্রুত আমার ব্যাকপ্যাক থেকে জলপাই রঙের একটা ছোট টর্চলাইট বের করলাম। ব্যাটারির টিমটিমে আলোয় ম্যানুয়েলের হাতের দিকে তাকালাম। কালচে ভাবটা তার কবজি পেরিয়ে কনুইয়ের দিকে এগোচ্ছে। খুব দ্রুত কিছু না করলে এই বিষ বা যা-ই হোক না কেন, তার হৃৎপিণ্ডে পৌঁছে যাবে।