১৯২০ সালের সেই সামরিক শক্তির শেষ বিন্দুটা নিংড়ে দিয়ে আমি শরীরটাকে দোল খাওয়ালাম। আমাদের ঠিক পাশেই উন্মোচিত হওয়া সেই অন্ধকার, খাড়া সুড়ঙ্গটার মুখ। বাতাস বয়ে আসছিল ওটার ভেতর থেকে। আমি লতাটা ছেড়ে দিয়ে ম্যানুয়েলকে বুকে জড়িয়ে ধরে সেই সুড়ঙ্গের অন্ধকারের ভেতর ঝাপিয়ে পড়লাম।
আমরা সোজা নিচের দিকে পিছলে পড়তে লাগলাম। এই সুড়ঙ্গটা আগেরগুলোর মতো কাদার নয়, এটা মসৃণ পাথরের তৈরি এক প্রাচীন জলপথের মতো। পিঠ আর হাত-পা ছিলে রক্ত বের হচ্ছিল, কিন্তু আমাদের থামার কোনো উপায় ছিল না। আমাদের ঠিক পেছনেই, সেই আদিম জঠরের সুড়ঙ্গ মুখ থেকে তীব্র এক গর্জন ভেসে এলো। পুরো জঙ্গলটা বুঝতে পেরেছে তার শিকার হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে।
শত শত সরু আর মোটা শিকড় তীরের মতো আমাদের পিছু পিছু সুড়ঙ্গের ভেতরে ঢুকে পড়ল। ওগুলোর গায়ের ছোট ছোট কাঁটাগুলো পাথরের দেয়ালে ঘষা লেগে এক ভুতুড়ে খড়খড় শব্দ তুলছিল।
আমরা গড়িয়ে গড়িয়ে এসে পড়লাম এক বিশাল পাথুরে সুড়ঙ্গের মেঝেতে, যা সোজা সামনের দিকে চলে গেছে। অনেক দূরে, সুড়ঙ্গের শেষ প্রান্তে একটা ম্লান, রূপোলি আলোর বিন্দু দেখা যাচ্ছিল। ওটা চাঁদের আলো! আমরা আমাজনের মাটির তলার নরক থেকে বাইরের পৃথিবীর একদম কাছাকাছি চলে এসেছি।
“ম্যানুয়েল, আর একটু! ওই তো আলো!” আমি ম্যানুয়েলকে টেনে তুলে ধরে বললাম।
কিন্তু ম্যানুয়েল আর হাঁটতে পারছিল না। তার দুই হাতের ব্যান্ডেজ ছিঁড়ে গিয়ে কালচে রক্তে পুরো শরীর ভিজে গেছে। তার চোখ দুটো ফ্যাকাশে হয়ে আসছিল। “সেনর… আমার সময় শেষ। জঙ্গল আমার রক্ত পুরোপুরি চুষে নিয়েছে। আপনি দৌড়ান…”
“না!”
আমি ম্যানুয়েলকে আমার পিঠের ওপর তুলে নিলাম। ১৯৫২ সালের এই খাকি জ্যাকেট আর রাইফেলসহ একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষকে পিঠে নিয়ে দৌড়ানো সাধারণ সময়ে অসম্ভব, কিন্তু এই মুহূর্তে আমার ধমনীতে বইছিল আদিম টিকে থাকার তীব্র উন্মাদনা।
আমি আলোর বিন্দুর লক্ষ্য করে দৌড়াতে লাগলাম। আমাদের পেছনে সুড়ঙ্গের দেয়ালগুলো ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছিল। প্রকাণ্ড সব মাংসাশী শিকড় চাবুকের মতো ধেয়ে এসে আমার বুটের ঠিক এক ইঞ্চি পেছনে আছাড় খাচ্ছিল। সুড়ঙ্গের ছাদ থেকে বড় বড় পাথরের চাঁই ভেঙে পড়ছিল আমাদের চারপাশে।
আলোটা বড় হচ্ছিল। নদীর জলের সেই চিরচেনা গন্ধ আমার নাকে এসে লাগল। কিন্তু আমাদের ঠিক দশ হাত দূরে, সুড়ঙ্গের একদম শেষ মুখে এসে এক বিশাল, দুর্ভেদ্য সবুজ লতার দেয়াল মাটির নিচ থেকে ফুঁড়ে উঠে আমাদের মুক্তির পথটা পুরোপুরি বন্ধ করে দিল! লতাটার গায়ে হাজারটা চোখা কাঁটা চাঁদের আলোয় চকচক করছিল।
পেছনে শত শত মাংসাশী শিকড়, আর সামনে এই দুর্ভেদ্য সবুজ দেয়াল। আমাদের পিছু হটার বা এগোবার সমস্ত পথ বন্ধ। ঠিক তখনই, আমার পিঠে থাকা ম্যানুয়েল এক শেষবারের মতো নড়ে উঠল। তার ফ্যাকাশে চোখ দুটো খোলা। সে তার দুই কাটা হাতের অবশিষ্টাংশ দিয়ে সামনের সেই দেয়ালের দিকে ইঙ্গিত করল, আর তার ঠোঁটের কোণায় ফুটে উঠল এক অদ্ভুত, আত্মত্যাগের হাসি!