দ্য গ্রিন কফিন

ম্যানুয়েলের ঠোঁটের কোণের সেই আত্মত্যাগের হাসি দেখে আমার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। সে নিজের শরীরের শেষ শক্তিটুকু দিয়ে আমার পিঠ থেকে পিছলে মাটির ওপর পড়ল। তার দুই হাতহীন রক্তাক্ত শরীর নিয়ে সে সোজা এগিয়ে গেল সামনের সেই কাঁটাতারের মতো লতার দেয়ালটার দিকে।

“সেনর আর্থার… আপনার দাদু এই জঙ্গলকে শান্ত করতে পারেননি, তাই তিনি এর অংশ হয়ে গিয়েছিলেন,” ম্যানুয়েলের কণ্ঠস্বর এখন এক অলৌকিক শান্তিতে ভরপুর। “কিন্তু আমি আজ এই সবুজ কফিনের ঢাকনা চিরতরে বন্ধ করব। আপনি ডায়েরি নিয়ে ফিরে যান… পৃথিবীকে জানান এই নরকের কথা।”

“ম্যানুয়েল! না!” আমি চিৎকার করে তাকে ধরার জন্য হাত বাড়ালাম।

কিন্তু তার আগেই ম্যানুয়েল তার রক্তাক্ত শরীরটা নিয়ে নিজেকে ছুঁড়ে দিল সেই মাংসাশী লতার দেয়ালের ওপর। কাঁটাযুক্ত লতাগুলো তাজা রক্তের স্পর্শ পাওয়া মাত্রই উন্মত্ত হয়ে উঠল। শত শত সূক্ষ্ম সুঁইয়ের মতো ডগা ম্যানুয়েলের শরীরে গেঁথে গেল। তারা পরম ক্ষুধায় ম্যানুয়েলের অবশিষ্টাংশটুকু গ্রাস করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই, রক্ত চোষার তীব্র নেশায় লতার দেয়ালটা একপাশে সংকুচিত হয়ে সামান্য একটু ফাঁকা পথ তৈরি করে দিল।

“দৌড়ান, সেনর! দৌড়ান!” ম্যানুয়েলের শেষ আর্তনাদ সুড়ঙ্গের দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হলো।

আমি আর এক সেকেন্ডও দ্বিধা করলাম না। চোখের জল আর রক্তের ঝাপসা দৃষ্টি নিয়ে আমি সেই সংকীর্ণ ফাঁক গলে বাইরের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়লাম। আমার পিঠের চামড়া লতার কাঁটায় ছিলে গেল, কিন্তু আমি থামলাম না।

আমি ছিটকে পড়লাম আমাজনের সেই বেনামী উপনদীর ঠাণ্ডা কালো জলের মধ্যে।

নদীর জলস্পর্শ করতেই আমার মনে হলো আমি এক নরককুণ্ড থেকে স্বর্গে এসে পড়েছি। ১৯৫২ সালের জুনের রাতের আকাশ তখন মাথার ওপর তারায় তারায় ভরে আছে। চাঁদের রূপোলি আলো নদীর বুকে ঝিলমিল করছে। আমি তীরের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, সেই সুড়ঙ্গের মুখটা প্রকাণ্ড সব শিকড় আর লতা এসে চিরতরে সিল করে দিচ্ছে। ম্যানুয়েল আর আমার দাদু চিরদিনের মতো বিলীন হয়ে গেলেন সেই সবুজ শহরের জঠরে।

আমি সাঁতরে আমাদের সেই ছোট মোটরচালিত নৌকাটার কাছে গেলাম। ওটা তখনো নদীর পাড়ে নোঙর করা অবস্থায় অক্ষত ছিল। কোনোমতে নৌকার ভেতরে নিজেকে টেনে তুললাম। আমার পুরো শরীর ক্ষতবিক্ষত, কাপড়ে রক্ত আর কাদার মাখামাখি। ১৯৫২ সালের সেই পুরনো লি-এনফিল্ড রাইফেলটা নদীতে হারিয়ে গেছে, কিন্তু আমার জ্যাকেটের পকেটে সুরক্ষিত আছে দাদুর ডায়েরি আর সেই প্রাচীন তামার ফলকটা।

আমি নৌকার ইঞ্জিনের দড়ি ধরে হ্যাঁচকা টান দিলাম। কর্কশ শব্দে ইঞ্জিনটা চালু হতেই আমি বিন্দুমাত্র পেছনে না তাকিয়ে নৌকা ছুটিয়ে দিলাম নদীর ডাউনস্ট্রিমের দিকে।

লন্ডনের রয়্যাল জিওগ্রাফিক্যাল সোসাইটির সভ্যদের কাছে আমি কোনোদিন এই অভিযানের কথা বলতে পারব না। কারণ কেউ বিশ্বাস করবে না যে এই আমাজনের গহীন অন্ধকারের নিচে পাথর বা ইটের কোনো প্রাচীন শহর নেই; সেখানে বেঁচে আছে এক একক, আদিম, মাংসাশী উদ্ভিদ—যা মানুষের রক্ত আর চেতনা খেয়ে হাজার বছর ধরে অমর হয়ে আছে। মানুষ প্রকৃতির ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে চায়, কিন্তু আমাজনের এই সবুজ কফিন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—প্রকৃতির কিছু সত্যের সামনে মানুষকে চিরকাল মাথা নত করেই বেঁচে থাকতে হবে।

সমাপ্ত।

আপনার মন্তব্য জানান।

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top