“থামবেন না, সেনর! এই আওয়াজে পুরো জঙ্গল আমাদের দিকে ধেয়ে আসবে!” ম্যানুয়েল আমার শার্টের হাতা ধরে এক হ্যাঁচকা টান দিল।
আমরা দৌড়াতে শুরু করলাম। সামনে যে অন্ধকার সুড়ঙ্গের মতো পথটা খোলা ছিল, আমরা সেই দিকেই অন্ধের মতো ছুটলাম। পায়ের নিচে স্পঞ্জের মতো নরম মাটি প্রতি পদক্ষেপে আমাদের গতি কমিয়ে দিচ্ছিল। চারপাশের গাছগুলোর ডালপালা এমনভাবে কাঁপছিল, যেন তারা একে অপরকে সংকেত পাঠাচ্ছে। মাথার ওপরের পাতাগুলোর ঘষাঘষিতে এক অদ্ভুত ফিসফিস শব্দ হচ্ছিল—যেন হাজারটা প্রেতাত্মা ফিসফিস করে আমাদের মৃত্যুর পরোয়ানা পড়ছে।
দৌড়াতে দৌড়াতে আমার ফুসফুস ফেটে যাওয়ার উপক্রম হলো। ১৯৫২ সালের এই গুমোট আর্দ্রতায় শরীর থেকে জল শুকিয়ে আসছিল দ্রুত। আমার কাটা পা-টা থেকে তখনো রক্ত চুইয়ে পড়ছে, যা আমাজনের এই মাংসাশী মাটিকে আরও বেশি ক্ষুধার্ত করে তুলছিল। আমি টের পাচ্ছিলাম, আমাদের পায়ের ঠিক নিচ দিয়েই মাটির গভীর থেকে কিছু একটা সমান্তরালভাবে আমাদের পিছু পিছু ছুটছে। মাটি সামান্য ফুলে ফুলে উঠছে আমাদের ডান পাশে।
“ম্যানুয়েল, ডান দিকে দেখো!” আমি হাঁপাতে হাঁপাতে বললাম।
“ওদিকে তাকাবেন না, শুধু সোজা ছুটুন!” ম্যানুয়েল তার একমাত্র বাম হাত দিয়ে মাশেতে উঁচিয়ে সামনের ঝুলন্ত লতাগুলো কেটে পথ বানাচ্ছিল।
হঠাৎ করেই জঙ্গলটা যেন একটু হালকা হয়ে এলো। আমরা এসে পৌঁছালাম এক বিস্তীর্ণ পাথুরে চত্বরে। জঙ্গল যেখানে শেষ হয়েছে, সেখান থেকে শুরু হয়েছে এক বিশাল পাথরের প্রাচীন দেয়াল। দেয়ালটা প্রকাণ্ড সব পাথরের চাঁই দিয়ে তৈরি, যা দেখে মনে হয় হাজার বছর আগের কোনো সভ্যতার কীর্তি। কিন্তু সেই দেয়ালের প্রতিটি ইঞ্চিতে জেঁকে বসেছে গাঢ় সবুজ রঙের এক অদ্ভুত শ্যাওলা। শ্যাওলাগুলো সাধারণ নয়; সেগুলো হালকাভাবে কাঁপছে, যেন দেয়ালটার গায় কেউ সবুজ রঙের চামড়া পরিয়ে দিয়েছে।
আমরা দেয়ালটার সামনে এসে থামলাম। আমাদের পেছনে জঙ্গলটা থমকে দাঁড়িয়ে গেছে, যেন এক অদৃশ্য সীমারেখা তারা পার হতে পারছে না। কিন্তু সেই বুনো লতা আর শিকড়গুলো সীমানার ওপারেই হিংস্র সাপের মতো ফণা তুলে দুলছে, আমাদের একটু অসতর্কতার অপেক্ষায়।
“আমরা কোথায় এলাম, ম্যানুয়েল?” আমি দেয়ালের গায়ে হাত ছোঁয়াতে গেলাম।
“হাত দেবেন না!” ম্যানুয়েল আমার হাতটা চেপে ধরল। তার কাটা হাতের অবশিষ্টাংশটা কাঁপছিল। “এটা হলো সেই সীমানা, যার পর থেকে কোনো মানুষ জ্যান্ত ফেরেনি। আপনার দাদুর ডায়েরি কী বলে?”
আমি কাঁপা কাঁপা হাতে ব্যাগ থেকে স্যার রিচার্ড হেন্ডারসনের ডায়েরিটা বের করলাম। পাতা ওল্টাতেই একটা স্কেচ চোখে পড়ল—এক বিশাল পাথুরে তোরণ, যার ওপরে একটা তিনকোনা চোখের মতো চিহ্ন আঁকা। আমি দেয়ালটার দিকে তাকালাম। ঠিক আমাদের মাথার ওপরে, লতা আর শ্যাওলার নিচে ঢাকা পড়ে আছে সেই প্রাচীন তোরণ আর সেই রহস্যময় তিনকোনা চোখ!
ডায়েরির নিচে দাদুর হাতে লেখা: ‘সবুজ দেয়াল পার হওয়ার একটাই উপায়—শিকড়ের ক্ষুধা শান্ত করা। কিন্তু মূল্য বড় চড়া।’