আমার হাত কাঁপছিল। আমি আমার পকেট থেকে শিকারি ছুরিটা বের করলাম। ১৯৫২ সালের যুদ্ধের দিনগুলোতে সামরিক ডাক্তারদের অস্ত্রোপচার করতে দেখেছি, কিন্তু নিজের হাতে একজন জীবন্ত মানুষের অঙ্গচ্ছেদ করার কথা কখনো ভাবিনি। কিন্তু এই মুহূর্তে ম্যানুয়েলকে বাঁচাতে হলে এছাড়া কোনো পথ নেই। এই জঙ্গল তাকে পুরোপুরি গিলে খাওয়ার আগেই আমাকে ব্যবস্থা নিতে হবে।
“ঈশ্বর, আমাকে শক্তি দাও,” আমি ফিসফিস করে বললাম।
টর্চলাইটটা একটা পাথরের ওপর এমনভাবে সেট করলাম যাতে আলোটা ম্যানুয়েলের কনুইয়ের ওপর পড়ে। তারপর আমার জ্যাকেটের বেল্টটা খুলে ম্যানুয়েলের বাহুর ওপরের অংশে শক্ত করে বাঁধলাম, যাতে রক্তচলাচল বন্ধ হয়। ছুরিটার ফলকটা দিয়াশলাইয়ের আগুনে সামান্য সেঁকে নিলাম।
ম্যানুয়েল অচেতন, কিন্তু তার শরীর থরথর করে কাঁপছিল। আমি ছুরিটা তার কনুইয়ের ঠিক নিচে বসালাম।
প্রথম কোপটা দিতেই ম্যানুয়েল একটা পশুর মতো গোঙানি দিয়ে উঠল, তার চোখ দুটো বন্ধ অবস্থাতেই কোটর থেকে ঠিকরে আসতে চাইল। কিন্তু জঙ্গল তাকে এতটাই অবশ করে দিয়েছিল যে সে জেগে উঠতে পারল না। আমি দাঁতে দাঁত চেপে ছুরিটা আরও গভীরে চালালাম। মাংস কাটার পর যখন ছুরিটা হাড়ের গায়ে ঠেকল, তখন আমার নিজের বমি পাওয়ার উপক্রম হলো। ডায়েরি, অ্যাডভেঞ্চার, প্রাচীন শহর—সবকিছু এক নিমেষে অর্থহীন মনে হতে লাগল এই রক্ত আর মাংসের নারকীয় বাস্তবতার সামনে।
আমি ব্যাকপ্যাক থেকে ছোট হ্যাকসো ব্লেডটা বের করলাম, যা দুর্গম পথে ডালপালা কাটার জন্য এনেছিলাম। ধাতুর সাথে হাড়ের ঘর্ষণের সেই কর্কশ শব্দ এই প্রাচীন সুড়ঙ্গে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। প্রতিটা মুহূর্ত মনে হচ্ছিল একেকটা যুগ। অবশেষে, একটা চটচটে শব্দের সাথে ম্যানুয়েলের বাম হাতের অবশিষ্টাংশটা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে মাটিতে পড়ে গেল।
সবচেয়ে অদ্ভুত এবং ভয়াবহ দৃশ্যটা দেখলাম তখনই। বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া হাতটা মাটিতে পড়ার পরও শান্ত হয়নি। তার ভেতরের সেই কালচে শিরাগুলো মাটি স্পর্শ করতেই শিকড়ের মতো রূপ নিল! হাতটার আঙুলগুলো নড়ে উঠল এবং ছটফট করতে করতে সুড়ঙ্গের দেয়ালের একটা ফাটলের ভেতর ঢুকে গেল, যেন ওটা কোনো মানুষের হাত ছিল না, ছিল জংলি কোনো উদ্ভিদের অংশ!
আমি দ্রুত ম্যানুয়েলের ক্ষতস্থানে ফাস্ট-এইড বক্সের ওষুধ আর ব্যান্ডেজ শক্ত করে চেপে ধরলাম। রক্তপাত কিছুটা থামল, কিন্তু ১৯৫২ সালের এই অ্যান্টিসেপটিক কতক্ষণ এই বুনো জীবাণুকে আটকে রাখতে পারবে, তা আমি জানি না। ম্যানুয়েলের এখন দুটো হাতই কাটা। সে পুরোপুরি পঙ্গু আর এই নরকে আমার ওপর নির্ভরশীল।
আমি ক্লান্ত হয়ে সুড়ঙ্গের দেয়ালে পিঠ দিয়ে বসলাম। টর্চের আলোটা সামনের দিকে ফেলতেই দেখতে পেলাম, সুড়ঙ্গটা সোজা নিচের দিকে নেমে গেছে। আর সেই সুড়ঙ্গের দেয়ালে খোদাই করা আছে প্রাচীন কিছু লিপি আর ছবি। ছবিগুলো সাধারণ কোনো আদিবাসীর নয়। সেখানে দেখানো হয়েছে, বিশাল বিশাল আকৃতির কিছু মানুষ ডালপালা ছড়ানো গাছের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে আছে, আর সেই গাছগুলোর শিকড় সরাসরি ঢুকে গেছে ওই মানুষদের বুকের ভেতর।
হঠাৎ, সুড়ঙ্গের গভীর থেকে একটা মৃদু, ছন্দময় শব্দ ভেসে এলো। ধুক-ধুক… ধুক-ধুক…
শব্দটা কোনো পাথরের পতনের নয়, কোনো পানির ফোঁটার নয়। এটা অবিকল একটা বিশাল, প্রকাণ্ড হৃদপিণ্ডের স্পন্দনের শব্দ! সুড়ঙ্গের দেয়ালগুলো সেই শব্দের সাথে সাথে সামান্য স্পন্দিত হচ্ছে। পায়ের নিচের মাটিটাও যেন