হঠাৎ, আমাদের পেছনের ঢালু পথ থেকে এক তীব্র খড়খড় শব্দ শোনা গেল। সেই রক্তচোষা লতাগুলো পিছু ছাড়েনি। তারা রক্তের গন্ধ পেয়ে এই শহরের প্রবেশদ্বারের দিকেই নেমে আসছে দলে দলে। আর আমাদের ঠিক সামনে, সেই জীবন্ত শহরের প্রবেশদ্বারের বিশাল শিকড়ের দরজাটা নিজে থেকেই ধীরে ধীরে খুলতে শুরু করেছে, যেন এক পরম ক্ষুধায় আমাদের ভেতরে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে!
আমাদের চোখের সামনে আদিম সেই সবুজ আলোয় চকমক করে উঠল এক নারকীয় উপত্যকা। ভূগর্ভস্থ এই সুবিশাল প্রাঙ্গণে কোনো আকাশ নেই, আছে শুধু প্রকাণ্ড সব মহীরুহের জটলা, যা এক প্রাচীন মহানগরের অবয়ব ধারণ করেছে। বাড়িগুলোর জানলা দিয়ে উঁকি দিচ্ছে সরু সরু লতা, আর ছাদ থেকে ঝুলছে থোকা থোকা মাংসাশী ফুল। এই শহর নির্জন নয়; প্রতিটি পাতা, প্রতিটি কাণ্ড মৃদুভাবে কাঁপছে, যেন এক অখণ্ড যৌথ চেতনায় পুরো শহরটা কোনো গভীর শ্বাসের সাথে সাথে বেঁচে আছে।
“সেনর আর্থার… আমরা নরকের রাজধানী এসে গেছি,” ম্যানুয়েল মাটির ওপর হাঁটু গেড়ে বসে কাঁপতে কাঁপতে বলল। তার দুই হাতের কাটা অংশ থেকে ব্যান্ডেজ ভেদ করে আবার রস চুইয়ে পড়তে শুরু করেছে।
আমাদের পেছনে, সেই ঢালু পথ বেয়ে নামছে অসংখ্য সাদা রক্তচোষা লতার দল। তাদের ফ্যাকাশে সুঁইয়ের মতো ডগাগুলো মাটির ওপর হিংস্র সাপের মতো খড়খড় আওয়াজ তুলছে। আর আমাদের সামনে, উদ্ভিদের তৈরি শহরের সেই মূল তোরণ—যা দুটো বিশাল গাছের কাণ্ড পরস্পর জড়িয়ে তৈরি করেছে—তা ধীরে ধীরে দুই পাশে সরে গিয়ে আমাদের জন্য পথ করে দিচ্ছে।
“পেছনে তাকানোর সুযোগ নেই, ম্যানুয়েল! সামনে চলো!” আমি রাইফেলটা শক্ত করে ধরে ম্যানুয়েলকে প্রায় পাঁজকোলা করে তুলে সেই জীবন্ত তোরণের ভেতরে ঢুকে পড়লাম।
আমরা ভেতরে ঢোকা মাত্রই, পেছনের সেই দুই প্রকাণ্ড গাছের কাণ্ড এক তীব্র ঘর্ষণের শব্দে আবার জোড়া লেগে গেল। তোরণের বাইরের সাদা লতাগুলো সেই কাঠের দেয়ালে এসে আছাড় খেতে লাগল, কিন্তু তারা শহরের ভেতরে ঢোকার সাহস পেল না। যেন এই শহরের ভেতরের শক্তি তাদের চেয়েও অনেক বেশি প্রাচীন আর ভয়ঙ্কর।
চারপাশটা অদ্ভুত রকমের শান্ত। কিন্তু এই শান্ত ভাবটা মনের ভেতর এক তীব্র অস্বস্তি এনে দেয়। ১৯৫২ সালের এই স্যাঁতসেঁতে গুমোট পরিবেশে বাতাসের সুবাস এখন আরও তীব্র। গন্ধটা আর শুধু মিষ্টি নয়, এখন তার সাথে মিশে আছে পচা রক্তের এক ধাতব গন্ধ। শহরের রাস্তাগুলো তৈরি হয়েছে প্রকাণ্ড সব কালো শিকড় দিয়ে, যা মাটির ওপর জালের মতো বিছিয়ে আছে। আমরা যখনই একটা শিকড়ের ওপর পা রাখছিলাম, সেটি সামান্য নিচে দেবে গিয়ে আবার স্পঞ্জের মতো ওপরে উঠে আসছিল।
“আমাদের ম্যাপ… ম্যাপটা দেখুন,” ম্যানুয়েল ফিসফিস করে বলল।
আমি আমার পকেট থেকে দাদুর সেই ভেজা ডায়েরিটা বের করলাম। ১৯২০ সালের সেই বিবর্ণ পাতায় এই পিরামিড আকৃতির গাছটার একটা স্কেচ আঁকা আছে। তার নিচে দাদু লিখেছিলেন: ‘গ্রিন সিটির কেন্দ্রস্থলে রয়েছে আদিম জঠর। ওটাই এদের উৎস। সেখান থেকে বের হওয়ার একটা গোপন সুড়ঙ্গ আছে, যা নদীর অপর প্রান্তে গিয়ে মেশে। কিন্তু সেখানে পৌঁছানো মানে মৃত্যুর মুখ গহ্বরে স্বেচ্ছায় হেঁটে যাওয়া।’