আমি পকেট থেকে দাদুর ডায়েরিটা বের করলাম। হলদে হয়ে যাওয়া পাতার ওপর পেনসিলে আঁকা নদীর বাঁকটা হুবহু মিলে যাচ্ছে এই জায়গার সাথে। ম্যাপের এই অংশটায় একটা ক্রস চিহ্ন দেওয়া আছে, আর তার পাশে লেখা—‘প্রবেশদ্বার’।
“আমাদের এখানেই নামতে হবে, ম্যানুয়েল,” আমি দৃঢ় কণ্ঠে বললাম।
ম্যানুয়েল তার একমাত্র হাত দিয়ে নৌকার নোঙরটা কাদার মধ্যে ছুঁড়ে ফেলল। তার চোখ দুটো ভয়ে চকচক করছিল। “আমি আপনার দাদুকে চিনতাম সেনর। তিনি যখন বত্রিশ বছর আগে এই পথে গিয়েছিলেন, তখন তাঁর সাথে বারোজন সশস্ত্র লোক ছিল। কেউ ফিরে আসেনি। শুধু আমি… আমি তখন ছোট ছিলাম, নৌকায় বসেছিলাম। তাও এই জঙ্গল আমার কাছ থেকে এই হাতটা কেড়ে নিয়েছে।”
আমি ম্যানুয়েলের দিকে তাকালাম। “তাহলে তুমি কেন আমার সাথে আবার এলে?”
“কারণ আমি আপনার বাবার কাছ থেকে টাকা নিয়েছি, আর আমি হেন্ডারসন পরিবারের ঋণ শোধ করতে চাই। কিন্তু মনে রাখবেন সেনর, যদি সবুজ কফিনের ঢাকনা একবার বন্ধ হয়ে যায়, তবে পৃথিবীর কোনো শক্তি আমাদের বাঁচাতে পারবে না।”
নৌকা থেকে আমরা যখন কাদায় পা রাখলাম, তখন এক অদ্ভুত অনুভূতি হলো। পায়ের নিচের মাটিটা যেন সাধারণ কাদা নয়, কেমন যেন নরম আর স্পঞ্জের মতো, যেন কোনো বিশাল জীবন্ত প্রাণীর পিঠের ওপর দাঁড়িয়ে আছি। প্রতিটি কদম ফেলতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছিল। চারপাশের গাছগুলো অস্বাভাবিক রকম সবুজ, এতোটাই গাঢ় যে মনে হয় পাতাগুলোর শিরা-উপশিরা দিয়ে ক্লোরোফিল নয়, খাঁটি বিষ বইছে।
আমরা জঙ্গল কেটে এগোতে লাগলাম। ম্যানুয়েল তার বাম হাতে থাকা ধারালো মাশেতে (এক ধরণের বড় ছুরি) দিয়ে সামনের লতাগুল্ম কেটে পথ তৈরি করছিল। বাতাসে এক ধরণের অদ্ভুত, মিষ্টি সুবাস ভেসে আসছিল। সুবাসটা এতোটাই তীব্র যে মাথা ঝিমঝিম করে ওঠে।
“সাবধান সেনর! এই গন্ধ শুঁকবেন না,” ম্যানুয়েল চিৎকার করে উঠল। সে চট করে তার গলার গামছাটা দিয়ে নাক-মুখ বেঁধে ফেলল। “এটা হলো ‘মায়া লতা’র গন্ধ। এই গন্ধ মানুষকে অবশ করে দেয়, তারপর…”
হঠাৎ এক বিকট খড়খড় শব্দে আমাদের পায়ের নিচের মাটি কেঁপে উঠল।
আমি থমকে দাঁড়ালাম। আমার ঠিক পাঁচ হাত দূরে, একটা বিশাল ফার্ন গাছের ঝোপ নিজে থেকেই নড়ে উঠল। কোনো বাতাস নেই, অথচ পাতাগুলো তীব্রভাবে কাঁপছে। ঠিক তখনই আমি দেখলাম, মাটির নিচ থেকে চাবুকের মতো সরু আর কালো একগুচ্ছ শিকড় সাপের মতো কিলবিল করে বেরিয়ে আসছে।
“দৌড়ান!” ম্যানুয়েল আর্তনাদ করে উঠল।
কিন্তু আমার ঘোর কাটার আগেই, মাটির নিচ থেকে উঠে আসা একটি মোটা লতা তীব্র গতিতে এসে জড়িয়ে ধরল আমার ডান পা! লতাটার গায়ে ছোট ছোট কাঁটা ছিল, যা মুহূর্তের মধ্যে আমার প্যান্ট ফুড়ে চামড়ায় গেঁথে গেল। তীব্র যন্ত্রণায় আমি চিৎকার করে উঠলাম। মনে হলো যেন এক ডজন সুঁই একসাথে আমার পায়ে ফুটিয়ে দেওয়া হয়েছে।