দ্য গ্রিন কফিন

আমাদের ওপরের ফাটলের মুখটা নিমেষের মধ্যে প্রকাণ্ড কিছু শিকড় এসে বন্ধ করে দিল। বাইরের সব আলো আর গর্জন এক মুহূর্তে স্তব্ধ।

আমি পকেট থেকে আমার ভাঙা টর্চলাইটটা বের করে ঝাঁকুনি দিলাম। টিমটিমে একটা ম্লান আলো জ্বলে উঠল। চারপাশটা এক প্রাচীন পাথুরে কক্ষের মতো। এখানকার বাতাস বাইরের চেয়ে কিছুটা ঠাণ্ডা, কিন্তু গন্ধটা ভ্যাপসা। ম্যানুয়েল এক কোণায় পড়ে হাঁপাচ্ছিল, তার দুই হাতের কাটা অংশ থেকে তখনো আঠালো রস ঝরছে।

আমি দাদুর সেই চামড়ার পাউচটা খুললাম। ভেতরে পাওয়া গেল ১৯২০ সালের একটি ছোট মেটাল কেসে রাখা পোর্টেবল ওয়্যারলেস ট্রান্সমিটার সেট এবং কিছু হেক্টোগ্রাফিক পেপার। এত বছর এই আর্দ্রতায় ওটা নষ্ট হওয়ার কথা, কিন্তু মেটাল কেসটা এয়ারটাইট ছিল। আমার হঠাৎ মনে হলো, ১৯৫২ সালের প্রযুক্তিতে তৈরি আমার ব্যাকপ্যাকে একটা ছোট সিগন্যাল রিসিভার আর ব্যাটারি আছে। যদি আমি এটাকে সচল করতে পারি!

আমি টর্চের আলোয় দ্রুত কাজ শুরু করলাম। আমার ডায়েরির শেষ পাতায় দাদুর নিজের হাতে একটা ফ্রিকোয়েন্সি নম্বর লেখা ছিল। হাত কাঁপছিল আমার। যদি বাইরের দুনিয়ার সাথে একটা শেষ যোগাযোগ করা যায়! যদি কোনো বেস ক্যাম্প বা উদ্ধারকারী দল আমাদের এই সংকেত পায়!

তারগুলো জোড়া দিতে দিতে আমি ব্যাকপ্যাকের ছোট হেডফোনটা কানে লাগালাম। চারদিকের নিঝুম অন্ধকারের মধ্যে শুধু স্ট্যাটিকের ঘড়ঘড় শব্দ। ঝড়ড়ড়… ঝড়ড়ড়…

আমি ডায়ার ঘোরাতে লাগলাম। “মে-ডে! মে-ডে! কেউ শুনতে পাচ্ছেন? আমরা আমাজনের ভূগর্ভে… দ্য গ্রিন সিটি…”

হঠাৎ স্ট্যাটিকের শব্দের ভেতর থেকে একটা অত্যন্ত ক্ষীণ, যান্ত্রিক কণ্ঠস্বর ভেসে এলো।

“হ্যালো?… হ্যালো?… আমরা… বেস ক্যাম্প… আমরা আপনাদের… সিগন্যাল…”

আমার চোখে জল এসে গেল। “আমরা বেঁচে আছি! আমাদের অবস্থান নদীর দক্ষিণ বাঁকে…”

কিন্তু আমার কথা শেষ হওয়ার আগেই, হেডফোনের সেই যান্ত্রিক কণ্ঠস্বরটা বদলে গেল। সেখানে কোনো মানুষের গলার আওয়াজ আর রইল না। স্ট্যাটিকের শব্দের ভেতর থেকে ভেসে আসতে লাগল এক সুপরিচিত ছন্দময় শব্দ।

ধুক-ধুক… ধুক-ধুক…

সেই প্রকাণ্ড আদিম হৃদস্পন্দনের শব্দ এখন আমাদের এই ওয়্যারলেস সংকেতকেও গ্রাস করে নিয়েছে! রেডিও তরঙ্গের ওপার থেকেও জঙ্গল আমাদের শুনতে পাচ্ছে।

ঠিক তখনই, আমাদের চারপাশের পাথুরে মেঝের ফাটলগুলো থেকে ফিনকি দিয়ে বের হতে লাগল এক কালচে লাল রঙের তরল। চারপাশের দেয়ালগুলো থেকে পাথর খসে পড়তে শুরু করেছে। পায়ের নিচের মেঝেটা কাঁপছে এক তীব্র ভূমিকম্পের মতো। আমরা কোনো পাথরের ঘরে নেই; এই কক্ষটা আসলে সেই আদিম উদ্ভিদের পাকস্থলী, যা এখন আমাদের হজম করার জন্য তার অ্যাসিড আর পাচক রস ছাড়তে শুরু করেছে! মেঝের সেই লাল তরল আমার বুটের চামড়া পুড়িয়ে ভেতরের মাংসে কামড় বসাতে লাগল!

আপনার মন্তব্য জানান।

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top