দ্য গ্রিন কফিন

জ্বলে উঠছিল, কিন্তু চোখ পিটপিট করার সাহসও আমার ছিল না। লতাটা যেন আমার শরীরের ভেতরের রক্তের উষ্ণতা টের পাচ্ছিল। ওটার গা বেয়ে এক ধরণের স্বচ্ছ আঠালো তরল চুইয়ে পড়ছে।

ঠিক সেই মুহূর্তে, আমার পকেটে থাকা ১৯৫২ সালের সেই পুরনো মেকানিক্যাল কম্পাসটা জ্যাকেটের বোতামের সাথে লেগে একটা মৃদু ধাতব শব্দ করে উঠল। টিক।

শব্দটা অতি সামান্য ছিল, কিন্তু এই নিঝুম নরকে তা ছিল এক বিস্ফোরণের মতো।

মুহূর্তের মধ্যে সেই ফ্যাকাশে সাদা লতাগুলো উন্মত্ত হয়ে উঠল। ঝাঁকে ঝাঁকে সুতোর মতো লতা ওপর থেকে তীরের মতো আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।

“দৌড়ান, সেনর!” ম্যানুয়েল চিৎকার করে সামনের দিকে অন্ধের মতো ছুট দিল।

আমি পিছু পিছু ছুটলাম, কিন্তু মাথার ওপর থেকে আসা লতাগুলো আমার কাঁধের চামড়া আর জ্যাকেট ভেদ করে ভেতরে ঢুকে গেল। তীব্র যন্ত্রণায় আমার চোখ ধাঁধিয়ে গেল। মনে হলো যেন শত শত সিরিঞ্জ একসাথে আমার শরীরে ফুটিয়ে রক্ত টেনে নেওয়া হচ্ছে। আমি দৌড়াতে দৌড়াতেই অনুভব করলাম, আমার শরীরের শক্তি হুহু করে কমে যাচ্ছে। লতাগুলো আমার রক্ত চুষে নেওয়ার সাথে সাথে তাদের ফ্যাকাশে সাদা রঙ বদলে টকটকে লাল হয়ে উঠছে!

“মর শয়তানের দল!”

আমি এক হাতে পিঠের রাইফেলটা ঘুরিয়ে নিয়ে এলোপাথাড়ি গুলি চালাতে লাগলাম ওপরের দিকে। বন্ধুকের বিকট আওয়াজ আর তীব্র ফ্ল্যাশের আলোয় লতাগুলো এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল, যেন তারা তীব্র আলো আর শব্দ সহ্য করতে পারে না। আগুনের হলকায় কয়েকটা লতা পুড়ে কালো হয়ে কুঁকড়ে গেল।

সেই সুযোগে আমি ম্যানুয়েলকে ধাক্কা দিয়ে সামনের একটা নিচু প্রবেশদ্বারের দিকে ঠেলে দিলাম। আমরা দুজনেই ছিটকে পড়লাম একটা ঢালু মাটির সুড়ঙ্গে। গড়িয়ে গড়িয়ে আমরা নিচের দিকে পড়তে লাগলাম। পিঠের চামড়া, কনুই আর হাঁটু পাথরের আঘাতে ছিলে যাচ্ছিল।

অবশেষে একটা শক্ত পাথুরে মেঝের ওপর এসে আমাদের পতন থামল।

আমি হাঁপাতে হাঁপাতে টর্চটা খুঁজলাম। ওটার কাঁচটা ভেঙে গেছে, কিন্তু সৌভাগ্যবশত বাল্বটা তখনো জ্বলছে। আলোটা চারধারে ঘোরাতেই আমার মুখ থেকে কথা হারিয়ে গেল।

আমরা কোনো সুড়ঙ্গে নেই। আমরা এসে পৌঁছেছি এক সুবিশাল, আদিম ভূগর্ভস্থ উপত্যকায়। আর আমাদের ঠিক সামনে, মাটির নিচে দাঁড়িয়ে আছে এক অবিশ্বাস্য প্রাচীন শহর! কিন্তু সে শহর পাথর বা ইটের তৈরি নয়। পুরো শহরটা তৈরি হয়েছে প্রকাণ্ড, হাজার বছরের পুরনো সব জীবন্ত বৃক্ষ দিয়ে। বাড়িগুলোর দেয়াল হলো গাছের কাণ্ড, জানলাগুলো লতার ফাঁক, আর রাস্তাগুলো তৈরি হয়েছে মোটা মোটা শিকড় দিয়ে। শহরের ঠিক মাঝখানে একটা বিশাল সবুজ রঙের পিরামিড আকৃতির গাছ দাঁড়িয়ে আছে, যা থেকে এক অলৌকিক সবুজ আলো বিচ্ছুরিত হচ্ছে।

কিন্তু সবচেয়ে ভয়ানক দৃশ্যটা ছিল আমাদের ঠিক পায়ের নিচে। সেই উদ্ভিদের শহরের প্রবেশদ্বারে, শত শত কঙ্কাল আর মমি হয়ে যাওয়া মানুষের শরীর গাছের শিকড়ের সাথে পেঁচিয়ে আছে। তাদের মুখগুলো হা করা—যন্ত্রণার শেষ চিৎকারটা যেন এখনো বাতাসে জমে আছে।

আপনার মন্তব্য জানান।

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top