দ্য গ্রিন কফিন

পায়ের নিচের কালচে লাল তরলটা ফুটন্ত লাভার মতো আমার চামড়ার বুট পুড়িয়ে ভেতরের মাংসে কামড় বসাতেই আমি তীব্র যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠলাম। ১৯৫২ সালের এই দুর্গম অভিযানে মাংসাশী জঙ্গল যে আমাদের প্রতিটা পদক্ষেপে এভাবে গ্রাস করতে আসবে, তা ছিল কল্পনাতীত। এই অ্যাসিডের মতো রস কয়েক মিনিটের মধ্যে আমাদের হাড় মাংস গলিয়ে এই আদিম জঠরের পুষ্টিতে রূপান্তরিত করে দেবে।

“ম্যানুয়েল! দেয়ালে উঠুন!” আমি টর্চের টিমটিমে আলোয় চারপাশটা দেখে চিৎকার করলাম।

কক্ষের দেয়ালগুলো প্রকাণ্ড সব শিকড়ের জটলা দিয়ে তৈরি হলেও, সেগুলো ওপরের দিকে খাড়া হয়ে একটা গম্বুজের মতো আকার ধারণ করেছে। ম্যানুয়েল দুই হাতহীন শরীর নিয়ে অলৌকিক দক্ষতায় তার কনুই আর পায়ের জোর খাটিয়ে একটা মোটা শিকড়ের খাঁজে নিজেকে আটকে রাখল। আমি আমার পিঠের রাইফেলটা আর দাদুর চামড়ার ব্যাগটা সামলে নিয়ে এক লাফে একটা ঝুলন্ত লতা ধরে ওপরে উঠে এলাম।

ঠিক আমাদের নিচেই তখন সেই কালচে রস পুরো মেঝেটাকে গ্রাস করে নিয়েছে। কক্ষের কোণায় পড়ে থাকা ১৯২০ সালের সেই মেটাল কেসের ওয়্যারলেস ট্রান্সমিটারটা অ্যাসিডে পড়ে ফেনা তুলে গলে গেল সেকেন্ডের মধ্যে। রেডিও তরঙ্গের সেই শেষ আশাটুকুও চিরতরে মুছে গেল। এখন আমরা পুরোপুরি একা, প্রকৃতির এই আদিম অন্ধকূপে বন্দি।

ধুক-ধুক… ধুক-ধুক…

হৃদস্পন্দনের শব্দটা এখন এতটাই তীব্র যে আমাদের বুকের পাঁজরগুলোও সেই ছন্দে কাঁপছিল। আমার মনে হলো, আমরা শুধু এই উদ্ভিদের পাকস্থলীতে নেই, আমরা এই পুরো জীবন্ত শহরের মূল হৃদপিণ্ডের একদম কাছাকাছি চলে এসেছি।

“সেনর আর্থার! ওপরের দিকে তাকান!” ম্যানুয়েল ওপরের দিকে মুখ তুলে ফিসফিস করে বলল।

আমি টর্চের আলোটা ওপরের দিকে ফেললাম। গম্বুজের মতো ছাদের ঠিক মাঝখান থেকে ঝুলছে একটা প্রকাণ্ড, কালচে লাল রঙের থলি—যা দেখতে অবিকল একটা বিশাল মানুষের হৃদপিণ্ডের মতো। ওটার গা বেয়ে মোটা মোটা নীল আর সবুজ রঙের শিরা-উপশিরা চারদিকের দেয়ালে ছড়িয়ে গেছে। ওটাই এই পুরো মাংসাশী সাম্রাজ্যের উৎস, এই জীবন্ত শহরের মূল চালিকাশক্তি। প্রতিবার ওটা যখন সংকুচিত হচ্ছে, চারপাশের দেয়ালে একটা তীব্র কম্পন সৃষ্টি হচ্ছে এবং নিচ থেকে সেই অ্যাসিড রস ফিনকি দিয়ে বেরোচ্ছে।

কিন্তু সবচেয়ে বড় চমকটা অপেক্ষা করছিল সেই হৃদপিণ্ডটার ঠিক নিচে।

সেখানে একটা প্রাচীন পাথরের বেদির মতো অংশ ওপরের দিকে উঠে এসেছে, যা এই অ্যাসিডের নদী থেকে মুক্ত। সেই বেদির ওপর লতাগুল্ম দিয়ে তৈরি একটা প্রাকৃতিক আসবাবের মতো জায়গায় রাখা আছে একটা কাঁচের বয়াম। ১৯২০ সালের সেই বিশেষ রাসায়নিক বয়ামটার ভেতরে লিকুইড প্রিজারভেটিভের মধ্যে রাখা আছে একটা প্রাচীন তামার ফলক। ওটাই এই শহরের শেষ রহস্য!

আমি ঝুলন্ত লতা ধরে দোল খেয়ে কোনোমতে নিজের শরীরটাকে সেই বেদির ওপর ছুঁড়ে দিলাম। বুটের তলাটা তখনো অ্যাসিডে পুড়ছিল, কিন্তু বেদির পাথরটা ছিল অদ্ভুত রকমের ঠাণ্ডা। আমি দ্রুত সেই কাঁচের বয়ামটা হাতে নিলাম। ধুলো আর শ্যাওলা পরিষ্কার করতেই ভেতরের তামার ফলকের লেখাগুলো প্রকট হয়ে উঠল। ওটা স্প্যানিশ ভাষায় লেখা, সম্ভবত কোনো প্রাচীন পর্তুগিজ বা স্প্যানিশ অভিযাত্রীর শেষ বার্তা।

আপনার মন্তব্য জানান।

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top