দ্য গ্রিন কফিন

সেই ছন্দে কাঁপছে। যেন আমরা কোনো সুড়ঙ্গে নেই, আমরা ঢুকে পড়েছি কোনো এক আদিম, দানবীয় প্রাণীর খাদ্যনালীর ভেতর, যা এখন ধীরে ধীরে আমাদের হজম করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে!

সেই আদিম, ছন্দময় ধুক-ধুক শব্দটা প্রতি সেকেন্ডে আমাদের স্নায়ুর ওপর হাতুড়ির মতো আঘাত করছিল। সুড়ঙ্গের দেয়ালে টিমটিমে টর্চের আলো ফেলতেই মনে হলো, পাথরের খাঁজে খাঁজে জমে থাকা শ্যাওলাগুলো সেই স্পন্দনের তালে তালে সামান্য ফুলে উঠছে আর কমছে। ফুসফুস ভরে শ্বাস নেওয়া অসম্ভব হয়ে উঠছিল; বাতাস এতটাই ভারী আর অম্লীয় যে প্রতিটি প্রশ্বাসে গলার ভেতরটা পুড়ে যাচ্ছিল।

“ম্যানুয়েল, ওঠো। আমাদের এগোতেই হবে,” আমি ম্যানুয়েলের ভালো কাঁধটা ধরে আলতো ঝাঁকুনি দিলাম।

ম্যানুয়েল চোখ মেলল। তার চোখ দুটো রক্তবর্ণ, ঠোঁট দুটো শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। দুই হাত হারানো একজন মানুষ ১৯৫২ সালের এই আমাজনের গহীন নরকে কতটা অসহায়, তা তার মুখের দিকে তাকালেই বোঝা যাচ্ছিল। সে বিড়বিড় করে বলল, “সেনর… ওটা কিসের শব্দ? জঙ্গল কি তবে আমাদের বুক ধড়ফড়ানি শুনতে পাচ্ছে?”

“জানি না। তবে এখানে বসে থাকলে আমরা স্রেফ দম আটকে মারা যাব,” আমি উঠে দাঁড়িয়ে আমার রাইফেলটা পিঠে ঝুলিয়ে নিলাম। তারপর ম্যানুয়েলকে সাবধানে টেনে তুললাম। তার বাঁ হাতের ব্যান্ডেজটা রক্তে ভিজে লাল হয়ে গেছে, কিন্তু অলৌকিকভাবে রক্তপাত বন্ধ হয়েছে। যেন এই সুড়ঙ্গের বাতাসই রক্তকে জমিয়ে দিচ্ছে।

আমরা সুড়ঙ্গ বেয়ে নিচের দিকে নামতে লাগলাম। টর্চের আলোর পরিধি যত এগোচ্ছিল, চারপাশের দৃশ্য ততই বদলে যাচ্ছিল। পাথরের দেয়ালগুলো ধীরে ধীরে মিলিয়ে গিয়ে সেখানে জায়গা করে নিচ্ছিল এক বিশাল, জট পাকানো উদ্ভিদের কঙ্কাল। প্রকাণ্ড সব গাছের শিকড় ওপর থেকে ঝুড়ির মতো নেমে এসে চারপাশটা সিলিন্ডারের মতো ঘিরে ফেলেছে। মেঝেতে বিছিয়ে আছে নরম, ভেজা এক ধরণের জাল—যা দেখতে অবিকল মাকড়সার জালের মতো, কিন্তু আকারে অনেক মোটা আর চটচটে।

হঠাৎ করেই ম্যানুয়েল থমকে দাঁড়াল। “শুনুন, সেনর!”

শব্দটা ওপর থেকে আসছিল। এক ধরণের সরসর শব্দ, যেন হাজার হাজার সাপ একসাথে চামড়া ঘষে এগিয়ে আসছে। আমি টর্চের আলোটা মাথার ওপরে ফেললাম। যা দেখলাম, তা দেখে আমার হাতের টর্চটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।

ওপরের অন্ধকার সিলিং থেকে নেমে আসছে অসংখ্য সরু, সুতোর মতো লতা। লতাগুলো ফ্যাকাশে সাদা রঙের, কিন্তু তাদের ডগায় রয়েছে ছোট ছোট সূক্ষ্ম সুঁইয়ের মতো মুখ। সেগুলো অন্ধের মতো বাতাসে কিলবিল করছে, যেন আমাদের শরীরের উত্তাপ আর নিঃশ্বাসের কার্বন-ডাই-অক্সাইড অনুভব করার চেষ্টা করছে।

“রক্তচোষা লতা…” ম্যানুয়েল ভয়ে হিসহিসিয়ে উঠল। “এরা শব্দের দিকে ছোটে। এক ফোঁটা আওয়াজ করবেন না!”

আমরা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে গেলাম। আমাদের ঠিক এক ইঞ্চি ওপর দিয়ে একটা সাদা লতা আলতো করে নেমে এলো। ওটার সুঁইয়ের মতো মুখটা আমার গালের চামড়ার ঠিক পাশে এসে থামল। আমি আমার শ্বাস চেপে ধরলাম। আমার কপাল বেয়ে এক ফোঁটা ঘাম নেমে চোখের কোনায় এসে পড়ল। নোনা জলের তীব্রতায় চোখ

আপনার মন্তব্য জানান।

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top