“আমাদের ওই পিরামিড গাছটার দিকেই যেতে হবে,” আমি সামনের দিকে ইঙ্গিত করলাম। শহরের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে সেই আকাশছোঁয়া বৃক্ষ-পিরামিড। ওটার গা থেকে বের হওয়া সবুজ আলো পুরো উপত্যকাকে এক পরাবাস্তব রূপ দিয়েছে।
আমরা শিকড়ের রাস্তা ধরে এগোতে লাগলাম। দুপাশের উদ্ভিদের তৈরি ঘরগুলোর ভেতর থেকে এক অদ্ভুত আওয়াজ আসছিল। মনে হচ্ছিল, শত শত কণ্ঠস্বর একসাথে ফিসফিস করে কিছু বলছে, কিন্তু কোনো ভাষা বোঝা যাচ্ছে না। হঠাৎ, একটা ঘরের লতার জানলা দিয়ে আমি ভেতরের দৃশ্যটা দেখলাম এবং আমার পা দুটো যেন মাটিতে জমে গেল।
ঘরের ভেতরে, একটা গাছের কাণ্ডের সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে একজন মানুষের অবয়ব। তার শরীরের চামড়া আর মাংসের জায়গায় গজিয়ে উঠেছে সবুজ শ্যাওলা আর ছোট ছোট পাতা। তার চোখ দুটো খোলা, কিন্তু সেখানে কোনো মণি নেই, শুধু এক ফ্যাকাশে সবুজ আলো জ্বলছে। সবচেয়ে ভীতিপ্রদ ব্যাপার হলো, তার বুকের খাঁচার ভেতর থেকে হৃদপিণ্ডের বদলে একটা ছোট গাছের মূল স্পন্দিত হচ্ছে! সে বেঁচে আছে, কিন্তু মানুষ হিসেবে নয়, সে উদ্ভিদের এক জীবন্ত পুতুলে রূপান্তরিত হয়েছে!
“ওরা… ওরা আপনার দাদুর অভিযাত্রী দলের লোক, সেনর,” ম্যানুয়েল দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। “এই শহর মানুষকে মারে না… তাদের নিজেদের অংশ বানিয়ে নেয়!”
আমার বুকের ভেতর আতঙ্ক আছাড় খেতে লাগল। বত্রিশ বছর আগে দাদুর সাথে আসা মানুষগুলো এখনো এখানে এই অবস্থায় আটকে আছে! তাহলে দাদু কোথায়? তিনিও কি এই মাংসাশী শহরের কোনো একটা গাছের কাণ্ডে বিলীন হয়ে গেছেন?
ঠিক তখনই, আমাদের পায়ের নিচের সেই কালো শিকড়ের রাস্তাটা তীব্রভাবে কেঁপে উঠল।
আমরা সামাল দিতে না পেরে মেঝেতে পড়ে গেলাম। চারপাশের ঘরগুলোর লতা আর ডালপালাগুলো উন্মত্তের মতো নড়তে শুরু করল। শহরের সেই সবুজ আলো হুট করে বদলে গিয়ে টকটকে লাল হয়ে উঠল। পুরো উপত্যকা জুড়ে এক কানফাটানো গর্জন প্রতিধ্বনিত হলো—যেন কোনো বিশাল দানব তার ঘুম থেকে জেগে উঠেছে।
“ওরা আমাদের উপস্থিতি টের পেয়ে গেছে!” ম্যানুয়েল আর্তনাদ করে উঠল।
আমি সোজা হয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলাম, কিন্তু দেখলাম আমাদের চারপাশের শিকড়ের রাস্তাটা সাপের মতো কুঁকড়ে উঠছে। রাস্তাটাই এখন আমাদের গ্রাস করতে চাইছে! আমাদের সামনের এবং পেছনের শিকড়গুলো খাড়া হয়ে দেয়ালের মতো খাড়া হয়ে গেল, আমাদের এক বর্গফুটের একটা খাঁচার মধ্যে বন্দি করে ফেলল। মাথার ওপর থেকে নেমে আসতে লাগল শত শত মাংসাশী অর্কিডের কুঁড়ি, যা প্রতিটি মুহূর্তে পাপড়ি মেলে আমাদের গিলে খাওয়ার জন্য লালা ঝরাচ্ছে। এক মরণফাঁদের মাঝখানে আমরা দাঁড়িয়ে আছি, যেখান থেকে বের হওয়ার কোনো দৃশ্যমান পথ আর অবশিষ্ট নেই!
চারদিকের লালচে আলোয় চারপাশের পরিবেশটা যেন একটা ফুটন্ত রক্তের কড়াইয়ের মতো দেখাচ্ছিল। পায়ের নিচের মোটা শিকড়গুলো জ্যান্ত অজগরের মতো মোচড় দিয়ে আমাদের অবশ পা দুটোকে মাটির সাথে পেঁচে ধরার চেষ্টা করছিল। মাথার ওপর থেকে নেমে আসা মাংসাশী অর্কিডগুলোর পাপড়ি ছটফট করে খুলছিল আর বন্ধ