দ্য গ্রিন কফিন

আর হাতগুলো গাছের ডালের মতো ওপরের দিকে উঠে গেছে। তাদের মধ্যে একজনের পরনে বত্রিশ বছর আগের পুরনো, তামাটে রঙের ব্রিটিশ অভিযাত্রী কোটাবরণী অবিন্যস্ত অবস্থায় ঝুলছিল। তার বুকের পকেটে একটা চকমকে রুপোলি চেইন ঘড়ি ঝুলছে, যা ধুলো আর শ্যাওলার মধ্যেও চকচক করছে।

আমার বুকের ভেতরটা যেন থমকে গেল। ওই চেইন ঘড়িটা আমি চিনি! ওটা আমার দাদু স্যার রিচার্ড হেন্ডারসনের!

“দাদু…” আমার মুখ থেকে অবশ একটা ফিসফিসানি বের হলো।

সেই অর্ধ-মানব উদ্ভিদের অবয়বটা হঠাৎ করেই তার মাথাটা সামান্য তুলল। তার চোখের কোটর থেকে কোনো মণি নেই, সেখানে গজিয়ে উঠেছে ছোট ছোট দুটো লালচে কুঁড়ি। কিন্তু তার ঠোঁট দুটো অলৌকিকভাবে নড়ে উঠল। এক অতি ক্ষীণ, কর্কশ কণ্ঠস্বর এই বাতাসের ফিসফিসানির মধ্য থেকে ভেসে এলো—”আর্থার… পালিয়ে যাও… এটা কোনো শহর নয়… এটা একটা একটাই একক প্রাণী… আমরা সবাই এর খাদ্য…”

কথাটা শেষ হতেই দাদুর কঙ্কালসার বুকটা চিরে একটা নতুন, মোটা মাংসাশী শিকড় চাবুকের মতো ছিটকে বের হয়ে এলো। ওটা সোজা ধেয়ে এলো আমার বুকের পাঁজর লক্ষ্য করে, যার ডগায় ধারালো হাড়ের মতো একটা সুঁই চকচক করছে এবং তা আমার বুক ফুঁড়ে ভেতরে ঢোকার জন্য এক চুল দূরে এসে থমকে দাঁড়িয়েছে!

ঠিক আমার বুকের এক ইঞ্চি দূরে এসে থমকে দাঁড়িয়েছিল সেই রক্তমাখা সুঁইয়ের মতো শিকড়টা। দাদুর বুক চিরে বেরিয়ে আসা সেই আদিম দানবীয় অংশটা বাতাসে এক হিংস্র সাপের মতো ফণা তুলে কাঁপছিল। দাদুর ফ্যাকাশে ঠোঁট দুটো তখনো কাঁপছে, যেন ভেতরের শেষ মানবসত্তাটি এই সর্বগ্রাসী উদ্ভিদের সাথে লড়াই করছে আমাকে বাঁচানোর জন্য।

“সেনর! সরে আসুন!” ম্যানুয়েলের আর্তনাদ আমার কানে এসে লাগল।

আমি সম্বিৎ ফিরে পেলাম। ১৯৫২ সালের সামরিক প্রশিক্ষণের অভিজ্ঞতা আমার শরীরকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালিত করল। আমি এক ঝটকায় শরীরটাকে পাশে সরিয়ে নিলাম। ঠিক তখনই সেই তীক্ষ্ণ শিকড়টা আমার বুকের পাশ কাটিয়ে পেছনের প্রকাণ্ড কাণ্ডে সজোরে আঘাত করল। পাথর কাটার মতো এক বিকট শব্দ হলো।

আমি আর দ্বিধা করলাম না। দাদুর পকেটে ঝুলতে থাকা সেই রুপোলি চেইন ঘড়িটা আর তার সাথে পেঁচিয়ে থাকা একটা চামড়ার ছোট পাউচ এক হ্যাঁচকা টানে ছিঁড়ে নিলাম। দাদুর কঙ্কালটা এক শেষবার কেঁপে উঠে স্তব্ধ হয়ে গেল, যেন তার দীর্ঘ বত্রিশ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটেছে।

“ম্যানুয়েল, ওই দিকে! ওই গর্তটা!” আমি পিরামিড গাছের কাণ্ডের নিচের দিকে একটা বড় ফাটল দেখতে পেয়ে চিৎকার করে উঠলাম। ম্যাপ অনুযায়ী, এটাই একমাত্র পথ যা মাটির নিচে চলে গেছে।

আমরা দুজনেই অন্ধের মতো সেই অন্ধকার ফাটলের ভেতর ঝাঁপিয়ে পড়লাম। বাইরে তখনো পুরো উদ্ভিদের শহরটা লাল আলোয় কাঁপছে আর হাজার হাজার শিকড় আমাদের খোঁজে চাবুকের মতো আছাড় খাচ্ছে। আমরা একটা খাড়া সুড়ঙ্গ বেয়ে নিচের দিকে পিছলে পড়তে লাগলাম। ঘুটঘুটে অন্ধকার আর পচা কাদার মধ্য দিয়ে কতোটা নিচে নামলাম জানি না, অবশেষে একটা সমতল পাথুরে মেঝের ওপর এসে আছাড় খেলাম।

আপনার মন্তব্য জানান।

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top