সবচেয়ে ভয়ানক ব্যাপার হলো, লতাটা আমাকে মাটির ভেতরের একটা গর্তের দিকে টেনে নিয়ে যেতে শুরু করল। আমি রাইফেলটা তোলার চেষ্টা করলাম, কিন্তু লতার টানে আমি উপুড় হয়ে মাটিতে পড়ে গেলাম। কাদা আর পচা পাতার মধ্যে হিঁচড়ে হেঁচড়ে আমাকে টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। চোখের কোণ দিয়ে দেখলাম, যেখানে লতাটা আমার চামড়া কামড়ে ধরেছে, সেখান থেকে চুইয়ে পড়া রক্ত শুষে নিয়ে লতাটার ফ্যাকাশে রঙ মুহূর্তের মধ্যে টকটকে লাল হয়ে উঠছে! গাছটা আক্ষরিক অর্থেই আমার রক্ত খাচ্ছে!
“ম্যানুয়েল! বাঁচাও!” আমি মরিয়া হয়ে চিৎকার করলাম।
ম্যানুয়েল তার মাশেতে উঁচিয়ে বাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল। তার এক হাতের সবটুকু শক্তি দিয়ে সে কোপ বসাল সেই রক্তচোষা লতার ওপর। একটা অদ্ভুত, মানুষের গোঙানির মতো শব্দ হলো এবং লতাটা থেকে ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে এলো ঘন, আঠালো লাল রঙের তরল—যা দেখতে অবিকল মানুষের রক্ত!
লতাটার বাঁধন আলগা হতেই আমি ছিটকে পিছিয়ে এলাম। ম্যানুয়েল আমার জ্যাকেটের কলার ধরে হ্যাঁচকা টানে আমাকে খাড়া করল। কিন্তু বিপদ সেখানেই শেষ হলো না।
আমাদের চারপাশে, পুরো জঙ্গলটা যেন হঠাৎ ঘুম থেকে জেগে উঠেছে। শত শত গাছপালা, লতাগুল্ম আর শিকড় মাটির নিচে ছটফট করতে শুরু করেছে। মাথার ওপরের ডালপালাগুলো এমনভাবে নিচে নেমে আসছে যেন এক বিশাল সবুজ খাঁচা আমাদের চারপাশ থেকে অবরুদ্ধ করে ফেলছে। আমাদের পিছু হটার সমস্ত পথ বন্ধ হয়ে গেছে। সামনে শুধু একটা অন্ধকার সুড়ঙ্গের মতো পথ খোলা, যা চলে গেছে জঙ্গলের আরও গভীরে, সেই প্রাচীন অভিশপ্ত শহরের দিকে। আর আমাদের ঠিক পেছনেই, মাটি ফুঁড়ে বেরিয়ে আসছে এক প্রকাণ্ড মাংসাশী অর্কিড, যার পাপড়িগুলো হা করা এক নরখাদক পশুর চোয়ালের মতো লালা ঝরাচ্ছে এবং তা দ্রুত গতিতে এগিয়ে আসছে আমাদেরই লক্ষ্য করে!
সামনে হা করা নরখাদক অর্কিডটার ভেতরের হলুদ পুংকেশরগুলো লালচে লালা ঝরাচ্ছিল, আর তীব্র এক পচা মাংসের গন্ধ আমাদের ফুসফুসকে অবশ করে দিচ্ছিল। পেছনে যাওয়ার কোনো পথ নেই; সেখানে শত শত শিকড় একে অপরের সাথে পেঁচিয়ে গিয়ে এক দুর্ভেদ্য সবুজ দেয়াল খাড়া করেছে।
“ঝুঁকে পড়ুন, সেনর!” ম্যানুয়েল কর্কশ গলায় চেঁচিয়ে উঠল।
আমি মাটিতে প্রায় বুক ঠেকিয়ে শুয়ে পড়লাম। ঠিক আমার মাথার ওপর দিয়ে চাবুকের মতো ধেয়ে গেল অর্কিডের একটা চ্যাটচেটে আঠালো পাপড়ি। বাতাসে শাঁ শাঁ শব্দ হলো। যদি ওটা আমার মাথায় লাগত, তবে মগজ ছিটকে বেরিয়ে যেত সন্দেহ নেই। মাটিতে শুয়ে থাকা অবস্থাতেই আমি আমার লি-এনফিল্ড রাইফেলটা সোজা করলাম। ১৯৫২ সালের তৈরি এই শিকারি রাইফেলের নলটা স্থির করলাম অর্কিডটার ঠিক কেন্দ্রস্থলে, যেখান থেকে ওই আঠালো তরল নিঃসৃত হচ্ছে।
ধুম!
বন্ধুকের বিকট আওয়াজে পুরো জঙ্গল যেন এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। শক্তিশালী কার্তুজের আঘাতে অর্কিডটার মাঝখানটা ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল। ফিনকি দিয়ে বের হতে লাগল হলদে-সবুজ রঙের এক ঝাঁঝালো রস, যা মাটিতে পড়তেই কাদা থেকে ধোঁয়া উঠতে শুরু করল। অ্যাসিডের মতো তীব্র সেই রস! গাছটা এক অদ্ভুত যন্ত্রণাকাতর ভঙ্গিতে দুমড়ে-মুচড়ে মাটিতে আছাড় খেয়ে পড়ল।