ঠিক তখনই হলঘরের একপাশের একটি গোপন দরজা খুলে গেল। সেখান থেকে চারজন সশস্ত্র জলদস্যু আধুনিক সাব-মেশিন গান হাতে বের হয়ে এল। তারা নীলকান্তকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলল।
নীলকান্ত বুঝলেন, তিনি এক বিশাল ষড়যন্ত্রের জালে আটকা পড়েছেন। তাঁর সবচেয়ে বিশ্বস্ত মানুষটিই আজ সবচেয়ে বড় শত্রু। তিনি গোলকটি নিজের হাতের মুঠোয় আরও শক্ত করে চাপলেন। তাঁর মাথা দ্রুত কাজ করতে লাগল। এই হলঘরের দেয়ালে খোদাই করা নকশাগুলোর দিকে তাঁর চোখ গেল। সেখানে লেখা আছে, চাবিটি যদি ভুল উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়, তবে এই পুরো পাতালপুরী ধসে সমুদ্রের নিচে তলিয়ে যাবে।
“প্রফেসর, আপনি চাবিটা চান তো? তবে এটা রাখুন!”
নীলকান্ত গোলকটি প্রফেসরের দিকে ছুঁড়ে দেওয়ার ভান করলেন, কিন্তু আসলে তিনি সেটা ছুঁড়ে মারলেন হলঘরের কোণে থাকা এক বিশাল স্ফটিক স্তম্ভের দিকে, যা এই পুরো ঘরের আলোর উৎস ছিল।
‘ঝনঝন’ করে এক বিকট শব্দে স্ফটিক স্তম্ভটি ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। সাথে সাথে পুরো হলঘর গভীর, জমাট বাঁধা অন্ধকারে ডুবে গেল।
“গুলি করো! ওকে জ্যান্ত ছাড়বে না!” প্রফেসরের চিৎকার অন্ধকারের বুক চিরে বেজে উঠল। সাথে সাথে সাব-মেশিন গানের অন্ধ বুলেটের ফুলকি অন্ধকারের ভেতর অগ্নিকুণ্ড তৈরি করল। নীলকান্ত মেঝেতে শুয়ে পড়ে হামাগুড়ি দিয়ে দরজার দিকে যাওয়ার চেষ্টা করলেন, কিন্তু একটি বুলেট এসে সজোরে তাঁর ডান কাঁধ স্পর্শ করে চলে গেল। তীব্র যন্ত্রণায় নীলকান্ত চিৎকার চেপে অন্ধকারের অতলে হারিয়ে যাওয়ার আগের মুহূর্তে অনুভব করলেন, পুরো ভূগর্ভস্থ মেঝেটি কাঁপতে শুরু করেছে। ভূমিকম্প শুরু হয়েছে!
ভূমিকম্পের তীব্রতায় পাতালপুরীর বিশাল পাথরের দেয়ালগুলো এমনভাবে কাঁপছে, যেন কোনো ক্রুদ্ধ দানব নিজের বন্দিদশা থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে। ছাদ থেকে পাথরের চাঁই খসে পড়ছে চারপাশে, কিন্তু নীলকান্তর কানে তখন আর কিছুর শব্দ নেই। তাঁর কাঁধ দিয়ে গলগল করে রক্ত ঝরছে, শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে গেছে প্রচণ্ড উত্তাপে। তিনি বুঝতে পারলেন, স্ফটিক স্তম্ভটি ভাঙার ফলে এই তোরণের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে গেছে। আটলান্টিসের এই প্রাচীন ধ্বংসাবশেষ এখন আত্মঘাতী ধ্বংসের মুখে।
অন্ধকারের মধ্যেই গুলির শব্দ আর প্রফেসর সেনগুপ্তর চিৎকার শোনা যাচ্ছে। “গোলকটি উদ্ধার করো! চাবি ছাড়া এই তোরণ থেকে বেরোনোর কোনো পথ নেই!” দস্যুরা পাগলের মতো এদিক-ওদিক ছুটছে। নীলকান্ত অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে নিজেকে এক কোণে গুটিয়ে নিলেন। তাঁর হাতের মুঠোয় এখনও সেই নীলকান্তমণি গোলক। তিনি তো ওটা স্তম্ভের দিকে ছোঁড়ার অভিনয় করেছিলেন, আসলে ওটা তাঁর হাতের তালুতেই লুকানো ছিল।
তিনি হামাগুড়ি দিয়ে পাশের একটি সরু নালার দিকে গেলেন, যেটা সম্ভবত সমুদ্রের দিকে যাওয়ার কোনো নিকাশী ব্যবস্থা। কিন্তু যাওয়ার আগে তিনি দেখলেন, প্রফেসরের জলদস্যুরা সেই গোলকটি না পেয়ে এক ভয়াবহ ভুল করে বসেছে। তারা অন্ধকারের মধ্যেই তোরণের মূল নিয়ন্ত্রক যন্ত্রের ওপর গুলি চালাতে শুরু করেছে।
“থামুন! আপনারা কী করছেন!” প্রফেসরের চিৎকার ভেসে এল, কিন্তু দস্যুদের রিভলভারের গর্জনে তা চাপা পড়ে গেল।