আটলান্টিসের শেষ চাবি

নিশ্চিত। কেবিনের একেবারে শেষ প্রান্তে, একটি পাথরের সিন্দুকের মতো কাঠামোর ওপর নীলকান্তর চোখ আটকে গেল। সেখানে কোনো সোনাদানা বা হিরে-জহরত নেই। রয়েছে মাত্র একটি ধাতব গোলক। গোলকটি দেখতে সম্পূর্ণ নীল রঙের, যেন এক টুকরো জমাট বাঁধা নীল আকাশ। কিন্তু তার গায়ে খোদাই করা আছে জটিল সব জ্যামিতিক নকশা এবং চাকার মতো কিছু খাঁজ। নীলকান্ত হাত বাড়িয়ে গোলকটি স্পর্শ করতেই এক অদ্ভুত অনুভুতি হলো তাঁর। পুরো গোলকটি মৃদু কাঁপছে এবং তার ভেতর থেকে একটি অদ্ভুত নীল আলো বিচ্ছুরিত হচ্ছে। এটাই কি তবে সেই চাবি? কিংবদন্তির হারানো শহর আটলান্টিসের শেষ চাবি?

নীলকান্ত আর এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করলেন না। গোলকটি পরম যত্নে তাঁর ওয়াটারপ্রুফ ব্যাগে পুরে নিলেন। ঠিক তখনই এক অঘটন ঘটল। ওপর থেকে আসা এয়ার পাইপটি হঠাৎ প্রচণ্ড জোরে কেঁপে উঠল। নীলকান্ত বুঝলেন, ওপরে কিছু একটা মারাত্মক গণ্ডগোল হয়েছে। তিনি লাইফ-লাইন দড়িটি ধরে টান দিলেন, যার অর্থ তাঁকে ওপরে টেনে তোলা হোক। কিন্তু কোনো সাড়া নেই। উল্টো দড়িটি আলগা হয়ে নিচের দিকে নেমে আসতে লাগল। কেউ একজন ওপর থেকে দড়িটি কেটে দিয়েছে!

নীলকান্তর বুকের ভেতরটা হিম হয়ে গেল। সমুদ্রের তিনশো ফুট নিচে, তীব্র ঝড়ের মধ্যে তাঁর লাইফ-লাইন কেটে দেওয়া হয়েছে। বাতাস কমে আসছে। হেলমেটের ভেতরের অক্সিজেন আর মাত্র কয়েক মিনিটের জন্য অবশিষ্ট আছে। তিনি বুঝতে পারলেন, ওপরে কোনো শত্রু হানা দিয়েছে, যারা এই চাবিটির খোঁজ কোনোভাবে পেয়ে গেছে। বেঁচে ফিরতে হলে তাঁকে এখন নিজের শক্তিতেই ওপরে উঠতে হবে। কিন্তু ভারী ডাইভিং স্যুট পরে সাঁতরে ওপরে ওঠা অসম্ভব। নীলকান্ত পকেট থেকে ছোরা বের করে নিজের কোমরের ভারী সিসার ওজনগুলো কেটে বাদ দিলেন। শরীরটা হালকা হতেই তিনি ওপরের দিকে সাঁতরাতে শুরু করলেন। কিন্তু ফুসফুসের বাতাস শেষ হয়ে আসছে। চোখের সামনে অন্ধকার নেমে আসছে।

ঠিক তখনই জলের ভেতর দিয়ে আলোর এক তীব্র ঝলকানি তাঁর চোখে পড়ল। সেটা কোনো লণ্ঠনের আলো নয়, সেটা হলো এক বিধ্বংসী সাবমেরিনের সার্চলাইট! হ্যাঁ, এই গভীর সমুদ্রের নিচে ধেয়ে আসছে এক আধুনিক, কালো রঙের দানবীয় সাবমেরিন। তার গায়ে আঁকা আছে একটি রক্তবর্ণের সাপের চিহ্ন—আন্তর্জাতিক অপরাধ চক্র ‘রেড সার্পেন্ট’-এর প্রতীক! তারা নীলকান্তকে বাঁচাতে আসেনি, এসেছে তাঁর হাতের ওই নীল গোলকটি কেড়ে নিতে। সাবমেরিন থেকে একটি যান্ত্রিক হাত প্রসারিত হলো নীলকান্তর দিকে। একদিকে অক্সিজেনের অভাব, অন্যদিকে ধেয়ে আসা হন্তারক দানব। নীলকান্ত কি পারবেন এই পাতাল-ফাঁদ থেকে বেঁচে ফিরতে?

ফুসফুসের শেষ বাতাসটুকু যখন বিষাক্ত কার্বন ডাই-অক্সাইডে পরিণত হচ্ছিল, ঠিক তখনই নীলকান্তর চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। রেড সার্পেন্টের সেই কালো সাবমেরিনের দানবীয় যান্ত্রিক হাতটি যখন তাঁর শরীর স্পর্শ করতে যাবে, ঠিক তার আগের মুহূর্তে তিনি নিজের শরীরটাকে এক ঝটকায় বাঁ দিকে ঘুরিয়ে নিলেন। সমুদ্রের তলদেশের তীব্র জলের স্রোতকে কাজে লাগিয়ে তিনি ডুবোজাহাজের ভাঙা মাস্তুলের আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে ফেললেন। যান্ত্রিক হাতটি শূন্যে আঘাত করে প্রাচীন জাহাজের ইস্পাতের গায়ে আছড়ে পড়ল। প্রচণ্ড ধাতব শব্দে কেঁপে উঠল চারপাশ।

কিন্তু নীলকান্তর হাতে সময় নেই। তাঁর চোখের সামনে তখন লাল সর্ষে ফুল ফুটছে। অক্সিজেনের অভাবে মস্তিষ্ক অবশ হয়ে আসছে। তিনি জানতেন, ডাইভিং স্যুট পরে এই গভীরতায় বেশিক্ষণ টিকে থাকা অসম্ভব। তিনি নিজের তামার হেলমেটের লকটি খোলার জন্য হাত বাড়ালেন। সমুদ্রের ৩০০ ফুট নিচে হেলমেট খোলা মানে আত্মহত্যা, জলের প্রচণ্ড চাপে ফুসফুস ফেটে রক্ত বেরিয়ে আসবে। কিন্তু নীলকান্ত এক দুঃসাহসী বাজি ধরলেন। তিনি দেখছেন, প্রাচীন ডুবোজাহাজটির একটি অংশ থেকে অবিরাম বুদবুদ উঠছে। ওটা কোনো সাধারণ বাতাস নয়, ভেতরের কোনো এয়ার-পকেট থেকে বাতাস বেরোচ্ছে।

আপনার মন্তব্য জানান।

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top