আটলান্টিসের শেষ চাবি

দলের সর্দার, যার মুখটা কালো কাপড়ে ঢাকা, সে এক পা এগিয়ে এল। তার হাতে একটা ভারী রিভলভার। সে ভাঙা বাংলায় বলল, “নীলকান্ত, চাবিটা আমাদের দিয়ে দাও। তোমার লড়াই শেষ। এই জাহাজ আর বড়জোড় পাঁচ মিনিট ভাসবে। চাবি দিলে আমাদের সাবমেরিনে তোমার জায়গা হবে, নয়তো এই সমুদ্রই হবে তোমার কবর।”

নীলকান্ত এক মুহূর্ত ভাবলেন। চারদিকে আগুন, পায়ে বুলেটের মতো যন্ত্রণা, আর সামনে নিশ্চিত মৃত্যু। কিন্তু তিনি হার মানার পাত্র নন। তিনি হাসলেন, সেই চেনা দুঃসাহসী হাসি। “চাবিটা চাও? তবে এসো, কেড়ে নাও!” বলেই নীলকান্ত কুঠারটা ছুঁড়ে মারলেন জাহাজের মাস্তুলের দিকে, যেখানে প্রধান পালের দড়িটা বাঁধা ছিল।

এক কোপে দড়িটা কেটে গেল। সাথে সাথে বিশাল ভারী পাল আর তার কাঠের ফ্রেমটা হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ল জলদস্যুদের মাথার ওপর। চারপাশটা এক লহমায় ওলোটপালোট হয়ে গেল। সেই সুযোগে নীলকান্ত ডেকের কিনারে দৌড়ে গেলেন। ক্যাপ্টেন জনের দেহটা নিস্পন্দ পড়ে আছে। তাঁর নাড়ি পরীক্ষা করার সময় নেই। নীলকান্ত জাহাজের লাইফবোটগুলোর দিকে তাকালেন, কিন্তু সব কটা ইতিমধ্যেই ধ্বংস হয়ে গেছে।

ঠিক তখনই ‘দ্য সি-গাল’-এর বয়লারটা এক বিকট শব্দে ফেটে গেল। পুরো জাহাজটা দুভাগে ভাগ হয়ে যেতে লাগল। আগুনের হলকা আকাশের মেঘ ছুঁয়ে ফেলল। নীলকান্ত বুঝলেন, জাহাজে থাকা মানে জীবন্ত দাহ হওয়া। তিনি বুক ভরে শেষবারের মতো শ্বাস নিলেন এবং পিঠের ব্যাগটা চেপে ধরে জাহাজের রেলিং টপকে আবার ঝাঁপ দিলেন সমুদ্রে।

কিন্তু এবার আর শান্ত গভীরতা নয়। জাহাজের বিস্ফোরণের ফলে সমুদ্রের উপরিভাগে এক বিশাল ঘূর্ণাবর্তের সৃষ্টি হয়েছে। সেই জলঘূর্ণি নীলকান্তর শরীরকে লাটিমের মতো ঘোরাতে ঘোরাতে নিচের দিকে টেনে নিয়ে যেতে লাগল। জলের নিচে জ্বলন্ত কাঠ আর লোহার টুকরো তীরের মতো ছুটে আসছে। একটা বড় কাঠের টুকরো এসে সজোরে আঘাত করল নীলকান্তর মাথায়।

চোখের সামনে সব আলো নিভে যাওয়ার আগে নীলকান্ত শুধু অনুভব করলেন, এক জোড়া শক্তিশালী হাত জলের তলা থেকে এসে তাঁর জখম শরীরটাকে চেপে ধরেছে। সেই হাতের নখগুলো যেন মানুষের নয়, কোনো হিংস্র সামুদ্রিক পশুর!

অন্ধকার যখন কাটল, তখন নীলকান্তর প্রথম অনুভূতি হলো তীব্র নোনা স্বাদের আর গায়ের ওপর আছড়ে পড়া গরম বালির। মাথার ভেতরটা যেন হাজারটা কামানের গোলার মতো একসাথে ফেটে যাচ্ছে। চোখ মেলতেই বিকালের তপ্ত সূর্যটা তীরের মতো বিঁধল তাঁর মণিতে। ঝড় থেমে গেছে, কিন্তু আকাশ এখনও মেঘলা আর থমথমে। চারদিকের বাতাস এত গরম আর আর্দ্র যে নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।

তিনি উঠে বসার চেষ্টা করতেই পায়ের ক্ষতস্থান থেকে যন্ত্রণার একটা তীব্র অনুভুতি মেরুদণ্ড বেয়ে মাথায় উঠে গেল। লাল সাপের চেলারা তাঁর পা চিরে দিয়েছিল। কিন্তু অলৌকিকভাবে, ক্ষতস্থানের ওপর কেউ একজন কিছু বুনো পাতা আর কাদা লেপে দিয়েছে, যার ফলে রক্তপাত বন্ধ হয়েছে এবং একটা শীতল অনুভূতি হচ্ছে।

নীলকান্ত চমকে উঠলেন। কে করল এটা? তিনি দ্রুত নিজের পিঠের দিকে হাত বাড়ালেন। ওয়াটারপ্রুফ ব্যাগটা এখনও আছে! চেইনের ভেতরের সেই নীলকান্তমণি গোলকটা অক্ষত। কিন্তু ব্যাগটার গায়ে লেগে আছে এক অদ্ভুত সামুদ্রিক শ্যাওলা, আর বালির ওপর চারধারে পড়ে আছে কিছু অদ্ভুত পায়ের ছাপ। পায়ের পাতাগুলো মানুষের মতোই, কিন্তু আঙুলগুলোর মাঝে হাঁসের মতো পাতলা চামড়ার পর্দা থাকার দাগ স্পষ্ট।

আপনার মন্তব্য জানান।

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top