সাথে সাথে এক মহাজাগতিক আলোর উদ্ভাস ঘটল। নীল, বেগুনী আর রূপালী আলোর এক তীব্র স্রোত নীলকান্তর শরীর ভেদ করে ছড়িয়ে পড়ল পুরো তোরণে। ছাদ থেকে ভেঙে পড়া জলের ধারাগুলো অলৌকিকভাবে শূন্যে থমকে গেল। ফাটল ধরা স্ফটিকের স্তম্ভগুলো নিজে থেকেই আবার জোড়া লাগতে শুরু করল। আটলান্টিসের প্রাচীন শক্তি নিজেকে পৃথিবীর বুক থেকে চিরকালের জন্য গুটিয়ে নেওয়ার এক চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিল।
লকটি যখন সম্পূর্ণ বন্ধ হলো, এক তীব্র যান্ত্রিক ‘ক্লিক’ শব্দে গোলকটি বেদির সাথে একাকার হয়ে গেল। চাবিটি চিরতরে বিলীন হয়ে গেল তার আদিম উৎসে। কিন্তু সেই সাথে, তোরণের ভেতরের অতিরিক্ত শক্তি এক মৃদু শকওয়েভ তৈরি করে নীলকান্তর শরীরকে পেছনের দিকে ছুঁড়ে দিল।
নীলকান্ত যখন মেঝেতে আছড়ে পড়লেন, তাঁর মনে হলো তাঁর চারপাশের বিশ্ব চরাচর এক অদ্ভুত শান্তিতে ঢেকে যাচ্ছে। ভ্যাপসা গরম আর বৃষ্টির সেই দমচাপা অনুভূতি উধাও হয়ে গেছে। তাঁর চোখের সামনে ভেসে উঠল শান্ত, নীল সমুদ্রের বুক, যেখানে ‘দ্য সি-গাল’ জাহাজটি আবার নতুন করে ভাসছে, ক্যাপ্টেন জন হাসিমুখে তাঁর দিকে হাত নাড়ছেন।
রক্ষী প্রধান নীলকান্তর নিস্পন্দ শরীরের পাশে এসে দাঁড়াল। সে তাঁর কপালে নিজের নীলচে হাতটি রাখল। “তুমি ধন্য, মানুষ। তুমি প্রকৃতির এই অমোঘ সত্যের কাছে নিজের অহংকারকে বিসর্জন দিয়েছ। চেনা পৃথিবী কোনোদিন তোমার এই ত্যাগের কথা জানবে না, কিন্তু এই মহাসমুদ্র চিরকাল তোমার নাম মনে রাখবে।”
পাতালপুরীর আলোর উৎসগুলো ধীর গতিতে নিভে যেতে লাগল, এক পরম শান্ত অন্ধকার নেমে এল আটলান্টিসের শেষ তোরণে। সমুদ্র তার নিজের রহস্য নিজের বুকেই বন্দি করে রাখল।
কয়েক মাস পর। ১৮৮১ সালের এক কুয়াশাচ্ছন্ন সকালে, ভারত মহাসাগরের এক প্রত্যন্ত দ্বীপের সৈকতে কয়েকজন স্থানীয় জেলে এক অজ্ঞাতপরিচয় মানুষকে অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে। তাঁর ডান কাঁধ এবং বাম হাতে গভীর ক্ষতচিহ্নের দাগ, আর তাঁর মুঠোয় শক্ত করে ধরা ছিল একটি মরচে পড়া প্রাচীন তামাটে ধাতুর টুকরো—যা দেখতে কোনো অজানা জাহাজের লকের মতো।
নাবিকেরা তাঁর পরিচয় জানতে চাইলে তিনি শুধু সমুদ্রের দিগন্তের দিকে তাকিয়ে রহস্যময় এক হাসি হাসতেন। তিনি আর কেউ নন, তিনি নীলকান্ত। প্রকৃতির এক অমোঘ সত্যের কাছে মাথা নত করে তিনি ফিরে এসেছেন চেনা পৃথিবীতে, কিন্তু তাঁর মনটা রয়ে গেছে সেই সমুদ্রের ৩০০ ফুট নিচের এক অনন্ত অ্যাডভেঞ্চারের মাঝে।
সমাপ্ত।