আটলান্টিসের শেষ চাবি

কাঁধের ক্ষত থেকে ক্রমাগত রক্ত ক্ষরণ হচ্ছে। লোহিতঝড়ের নোনা বাতাস আর বৃষ্টির ঝাপটা তাঁর ক্ষতস্থানে চাবুকের মতো বিঁধছে।

জ্ঞান হারানোর ঠিক আগের মুহূর্তে তিনি দেখলেন, ঝড়ের দাপটে তক্তাটি তাঁকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে লোহিত সাগরের এক কুখ্যাত ও অভিশপ্ত দ্বীপের দিকে। এই অঞ্চলের নাবিকেরা একে বলে ‘প্রেতপুরী’। ১৮৮০ সালের নৌ-মানচিত্রে এই দ্বীপের চারপাশকে ‘মৃত্যুফাঁদ’ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে, কারণ এখানে কোনো জাহাজ এলে তার কম্পাস কাজ করা বন্ধ করে দেয় এবং জাহাজের কাঠামোগুলো রহস্যময়ভাবে ক্ষয়ে যায়।

পরদিন সকালে যখন নীলকান্তর জ্ঞান ফিরল, তখন ঝড় সম্পূর্ণ থেমে গেছে। কিন্তু চারপাশের আবহাওয়া অত্যন্ত থমথমে, ভ্যাপসা গরম আর কুয়াশায় ঢাকা। দ্বীপের মাটি সাধারণ বালি নয়, কুচকুচে কালো রঙের এক খনিজ গুঁড়ো। দ্বীপে পা রাখতেই এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা নীলকান্তকে গ্রাস করল। এখানে কোনো পাখির ডাক নেই, কোনো বাতাসের শব্দ নেই। চারধারে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে শত শত বছরের প্রাচীন সব জাহাজের কঙ্কাল। রোমান গ্যালন থেকে শুরু করে পর্তুগিজ যুদ্ধজাহাজ—সব যেন এক মহাসমুদ্রের শ্মশানে এসে জমা হয়েছে।

নীলকান্ত সোজা হয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেন। তাঁর শরীর জ্বরে পুড়ছে। কিন্তু বুকপকেটের সেই নীলকান্তমণি গোলকটি এখনও তাঁর কাছে নিরাপদ। গোলকটি থেকে এখন আর নীল আলো বেরোচ্ছে না, তবে সেটি বরফের মতো ঠাণ্ডা হয়ে আছে, যা নীলকান্তর শরীরের তীব্র জ্বরকে কিছুটা প্রশমিত করছে।

তিনি খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে দ্বীপের ভেতরের দিকে এগোতে লাগলেন। জাহাজের ধ্বংসাবশেষগুলোর মাঝ দিয়ে যাওয়ার সময় তাঁর মনে হলো, কঙ্কালগুলোর আড়াল থেকে কেউ তাঁর ওপর নজর রাখছে। মরচে পড়া লোহার চাদরে কার যেন ছায়া পড়ছে আর পরমুহূর্তেই তা মিলিয়ে যাচ্ছে।

“নীলকান্ত… তুমি জ্যান্ত ফিরবে, তা আমি ভাবিনি।”

একটি অতি চেনা কিন্তু কর্কশ কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হলো একটি ভাঙা স্প্যানিশ জাহাজের ভেতর থেকে। নীলকান্ত চমকে উঠে কোমর থেকে ছোরাটি বের করলেন। জাহাজের ভাঙা মাস্তুলের ছায়া থেকে বেরিয়ে এলেন প্রফেসর সেনগুপ্ত। কিন্তু তাঁর রূপ এখন সম্পূর্ণ বদলে গেছে। লোহিত সাগরের সেই বিস্ফোরণে তাঁর ডাইভিং স্যুটের অর্ধেকটা পুড়ে গলে চামড়ার সাথে সেঁটে গেছে, মুখের একপাশ ঝলসে এক বীভৎস রূপ ধারণ করেছে। তাঁর ডানহাতে একটি প্রাচীন, ভারী রিভলভার।

“প্রফেসর! আপনি এখনও মরেননি?” নীলকান্ত দাঁতে দাঁত চেপে বললেন।

“আটলান্টিসের অমরত্বের চাবি যার চোখের সামনে, তাকে মৃত্যু এত সহজে ছুঁতে পারে না, নীলকান্ত,” প্রফেসর এক চোখ কপালে তুলে হিংস্রভাবে হাসলেন। “লোহিতঝড়ের সেই রাতে আমার সাবমেরিন ধ্বংস হয়েছে, আমার সব লোক মারা গেছে। কিন্তু আমি জানি, এই দ্বীপের ঠিক কেন্দ্রবিন্দুতেই আছে সেই প্রাচীন শহরের মূল তোরণ। আর চাবিটা তোমার কাছে। এবার ওটা দিয়ে দাও, নয়তো এই প্রেতপুরীর কোনো একটা কঙ্কালের পাশে তোমার লাশটাও পচে খাক হবে।”

নীলকান্ত চারদিকে তাকালেন। পালানোর কোনো পথ নেই। তাঁর শরীর দুর্বল, কাঁধের ক্ষতটা আবার সটান হয়ে উঠেছে। কিন্তু তিনি প্রফেসরের চোখে দেখতে পাচ্ছেন এক চরম উন্মাদনা। এই লোকটা চাবির লোভে নিজের বিবেক, মানুষত্ব সব বিসর্জন দিয়েছে।

আপনার মন্তব্য জানান।

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top