এটা কোনো সাধারণ গুহা নয়। এটি পাহাড়ের তলদেশে খোদাই করা এক প্রাচীন কৃষ্ণগহ্বর বা গোলকধাঁধা। এর দেয়ালগুলো সাধারণ পাথর নয়, কুচকুচে কালো রঙের এক অজানা মসৃণ ধাতু দিয়ে তৈরি। দেয়ালের গায়ে হাজার হাজার বছর আগের এক প্রাচীন সভ্যতার ইতিহাস খোদাই করা আছে। সেখানে আঁকা আছে—সমুদ্রের তলদেশ থেকে উঠে আসা বিশাল সব শহর, পাখাওয়ালা মানুষ এবং এক রহস্যময় নীল গোলকের ছবি, যা হুবহু নীলকান্তর ব্যাগে থাকা গোলকটির মতো!
“চাবি… ওটা আটলান্টিসের চাবি…” এক ক্ষীণ, গোঙানি আওয়াজ শুনে নীলকান্ত লণ্ঠনটা ঘোরালেন।
কয়েক ফুট দূরে সেই জলদস্যুটা পড়ে আছে। তার একটা পা উল্টো দিকে বেঁকে গেছে, ওপর থেকে পড়া এক বিশাল পাথরের চাঁই তার বুকের ওপর চেপে বসেছে। তার মুখ দিয়ে গলগল করে রক্ত বেরোচ্ছে। তার বাঁচার আর কোনো আশা নেই। কিন্তু তার চোখ দুটো লোভ আর আতঙ্কে বড় বড় হয়ে নীলকান্তর ব্যাগের দিকে তাকিয়ে আছে।
নীলকান্ত তার কাছে এগিয়ে গেলেন। “তোমাদের দলবল এই দ্বীপের কথা জানল কীভাবে? কী আছে এই চাবির রহস্যে?”
লোকটা রক্তমাখা দাঁত বের করে এক নারকীয় হাসি হাসল। “আমরা… আমরা শুধু হুকুমের গোলাম, নীলকান্ত। আসল মালিক তো ধেয়ে আসছে। রেড সার্পেন্টের বস্ ‘দ্য শ্যাডো’ নিজে আসছে তার মূল জাহাজ নিয়ে। এই দ্বীপের নিচেই আছে সেই পাতাল তোরণ। চাবিটা ওখানে ছোঁয়ালেই… সারা পৃথিবীর ধনসম্পদ…” লোকটার কথা শেষ হলো না। একটা তীব্র কাশির সাথে সাথে তার শরীরটা নিথর হয়ে গেল। তার খোলা চোখ জোড়া সিলিংয়ের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইল।
নীলকান্ত এক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। ‘দ্য শ্যাডো’! আন্তর্জাতিক অপরাধ জগতের সবচেয়ে রহস্যময় আর নিষ্ঠুর মানুষ। সে নিজে আসছে এই গোলকের জন্য। তার মানে পুরো ভারত মহাসাগর এখন শত্রুর চাদরে ঢাকা।
তিনি আর সময় নষ্ট না করে লণ্ঠন উঁচিয়ে গুহার সামনের দিকে এগোতে লাগলেন। সুড়ঙ্গটা ক্রমশ নিচের দিকে নেমে গেছে। চারপাশের ভ্যাপসা গরম বাতাস আরও বেশি দমচাপা হয়ে উঠছে। প্রতিটা পদক্ষেপে মনে হচ্ছে, এই প্রাচীন ধাতব দেয়ালগুলো যেন তাঁকে গ্রাস করতে আসছে।
হঠাৎ করেই লণ্ঠনের আলোয় সুড়ঙ্গের শেষ প্রান্তে একটা বিশাল ধাতব দরজা ভেসে উঠল। দরজাটার মাঝখানে একটি বৃত্তাকার খাঁজ কাটা আছে, যার ব্যাসার্ধ নীলকান্তর হাতের নীল গোলকটির সমান। এটাই কি তবে সেই তোরণ?
ঠিক তখনই সুড়ঙ্গের পেছনের অন্ধকার থেকে এক অদ্ভুত খসখস শব্দ ভেসে এল। শব্দটা কোনো মানুষের নয়। শত শত, হাজার হাজার বিষাক্ত সামুদ্রিক কাঁকড়া আর অজানা কীটপতঙ্গ অন্ধকারের বুক চিরে নীলকান্তর দিকে ধেয়ে আসছে। তাদের দাঁতের কটকট শব্দে সুড়ঙ্গের দেয়াল কাঁপছে। ফিরে যাওয়ার পথ বন্ধ। সামনে বন্ধ দরজা। নীলকান্ত কি নিজের হাতের চাবিটা ওই অজানা খাঁজে প্রবেশ করাবেন, নাকি এই অন্ধকূপেই কীটপতঙ্গের খাদ্য হবেন?
কালো রঙের হাজার হাজার সামুদ্রিক কাঁকড়া আর অদ্ভুত দর্শন জলজ কীটপতঙ্গগুলো সুড়ঙ্গের মেঝে বেয়ে বন্যা স্রোতের মতো ধেয়ে আসছে। তাদের দাঁতের ও খোলসের কটকট শব্দে গুহার ভেতরের বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে।