আটলান্টিসের শেষ চাবি

তিনি বুক ভরে শেষবারের মতো বিষাক্ত বাতাসটুকু নিলেন এবং নিজের ব্যাগটি শক্ত করে পিঠে বেঁধে সেই ফুটন্ত রূপালী স্রোতের মধ্যে লাফিয়ে পড়লেন। জলটি ফুটন্ত হলেও অলৌকিকভাবে ব্যাগের ভেতরের নীল গোলকটি থেকে নির্গত এক শীতল আভা নীলকান্তর শরীরের চারপাশে এক অদৃশ্য কবচ তৈরি করল, যা তাঁকে লাভার উত্তাপ থেকে রক্ষা করল।

স্রোতটি তাঁকে এক অন্ধকূপের ভেতর দিয়ে তীরের মতো সামনের দিকে ছিটকে নিয়ে যেতে লাগল। চারপাশটা যেন এক ঘূর্ণায়মান নরক। লোহার পাইপের দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে তাঁর বাম হাতটি মট করে ভেঙে গেল। তীব্র যন্ত্রণায় নীলকান্তর চেতনা প্রায় লোপ পাওয়ার উপক্রম হলো। কিন্তু তাঁর ভেতরের বেঁচে থাকার আদিম জেদ তাঁকে চোখ বুজতে দিল না।

হঠাৎ করেই এক তীব্র আলোর ঝলকানি তাঁর চোখে পড়ল। পাইপের শেষ প্রান্ত চিরে তিনি ছিটকে বের হয়ে এলেন প্রেতপুরী দ্বীপের বাইরের উন্মুক্ত সমুদ্রে। কিন্তু সমুদ্রের ওপরের দৃশ্য দেখে তাঁর চোখ কপালে উঠল। পুরো প্রেতপুরী দ্বীপটি এখন এক জীবন্ত আগ্নেয়গিরির মতো জ্বলছে! দ্বীপের কালো মাটি চিরে আকাশের দিকে উঠে যাচ্ছে মাইলের পর মাইল বিস্তৃত আগুনের শিখা আর কালো ধোঁয়া।

পরমুহূর্তেই এক দানবীয়, মহাজাগতিক বিস্ফোরণে পুরো প্রেতপুরী দ্বীপটি ধুলোর মতো চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল। সেই বিস্ফোরণের শকওয়েভ বা তীব্র বায়ুপ্রবাহ সমুদ্রের জলকে একশো ফুট উঁচু ঢেউয়ে পরিণত করল। নীলকান্ত সেই সুনামির মতো ঢেউয়ের চূড়ায় খড়কুটোর মতো ভাসতে ভাসতে অন্ধকারের অতলে তলিয়ে গেলেন।

যখন তাঁর চোখ বন্ধ হয়ে আসছিল, তিনি দেখলেন সমুদ্রের বুক চিরে এক বিশাল, প্রাচীন শহরের চূড়া ক্ষণিকের জন্য ওপরে ভেসে উঠেই আবার চিরকালের জন্য জলের নিচে তলিয়ে গেল। আটলান্টিস তার চাবিকে নিজের বুকেই চিরদিনের জন্য টেনে নিল।

মহাবিস্ফোরণের সেই তীব্র শকওয়েভ যখন নীলকান্তর শরীরকে সমুদ্রের শত ফুট উঁচু ঢেউয়ের চূড়া থেকে এক লহমায় অতল গভীরে ছুঁড়ে ফেলল, তখন তাঁর মনে হয়েছিল এটাই বুঝি শেষ। চারপাশের জল লাভার উত্তাপে টগবগ করে ফুটছে, আর ওপর থেকে ভেঙে পড়া দ্বীপের প্রকাণ্ড পাথরের চাঁইগুলো তীরের মতো জলের নিচে নেমে আসছে। বাম হাতটি ভেঙে অবশ হয়ে গেছে, ডান কাঁধের ক্ষত থেকে নির্গত রক্ত সমুদ্রের জলে এক দীর্ঘ লাল রেখা তৈরি করেছে।

কিন্তু মৃত্যু যেন আজ নীলকান্তকে ছুঁয়েও ছুঁতে পারছিল না। চেতনা হারানোর ঠিক আগের মুহূর্তে তিনি অনুভব করলেন, সমুদ্রের তলদেশে এক বিশাল ফাটল তৈরি হয়েছে। দ্বীপটি ধ্বংস হওয়ার সাথে সাথে ভেতরের শূন্যতা পূরণের জন্য সমুদ্রের লক্ষ লক্ষ টন জল এক দানবীয় স্রোত তৈরি করে সেই ফাটলের দিকে ধেয়ে যাচ্ছে। নীলকান্ত সেই তীব্র জলপ্রপাতের মুখে পড়ে খড়কুটোর মতো শুষে গেলেন পাতালের আরও গভীরে।

যখন তাঁর জ্ঞান ফিরল, তখন চারপাশটা সম্পূর্ণ নিস্তব্ধ। কোনো ঝড়ের দাপট নেই, লাভার গর্জন নেই। নীলকান্ত নিজেকে আবিষ্কার করলেন এক অতিপ্রাকৃতিক, স্বপ্নিল জগতের মাঝখানে। তিনি শুয়ে আছেন এক বিশাল কাঁচের মতো স্বচ্ছাতোচ্ছ পাথুরে মেঝের ওপর। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এখানে কোনো জল নেই! এটি সমুদ্রের তলদেশের এক প্রকাণ্ড বায়ু-কুঠুরি বা ‘এয়ার পকেট’, যা প্রলয়ঙ্করী বিস্ফোরণের পরও অক্ষত রয়ে গেছে।

আপনার মন্তব্য জানান।

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top